ঘেরাওসহ একাধিক শক্ত কর্মসূচির কথা ভাবছে বিএনপি
নিজস্ব প্রতিবেদক, জনতার আওয়াজ ডটকম
প্রকাশের তারিখ:
শুক্রবার, জুলাই ৭, ২০২৩ ২:১৩ অপরাহ্ণ পরিবর্তনের তারিখ:
শুক্রবার, জুলাই ৭, ২০২৩ ২:১৩ অপরাহ্ণ

নিউজ ডেস্ক
সরকারের পদত্যাগ ও নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবিতে গত এক বছর ধরে সভা-সমাবেশ, বিক্ষোভ মিছিল, পদযাত্রাসহ নানা কর্মসূচি পালন করেছে বিএনপি। দলটি এখন আবারো একই ধরনের কর্মসূচিতে যেতে চায় না। জানা গেছে, এক দফা ঘোষণার সাথে সাথে যে কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে, তা অপেক্ষাকৃত কঠোর হবে। এ ক্ষেত্রে ঘেরাওসহ একাধিক শক্ত কর্মসূচির কথা ভাবা হচ্ছে।
গত দুই দিন বিএনপি যুগপৎ আন্দোলনের শরিক জাতীয়তাবাদী সমমনা জোট ও ১২ দলীয় জোটের সাথে বৈঠক করেছে। এসব বৈঠকে কী ধরনের কর্মসূচি দেয়া যায় তা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। জানা গেছে, কেউ কেউ আবারো সভা-সমাবেশের মতো সাধারণ কর্মসূচির কথা বললে তা নাকচ হয়ে যায়। বিএনপির তরফ থেকে বলা হয়েছে, একই কর্মসূচিতে তারা আর যেতে চায় না। শক্ত কর্মসূচি দিতে হবে।
জানা গেছে, ১৫ জুলাইয়ের মধ্যেই সরকারের পদত্যাগের এক দফা দাবি ঘোষণা করতে চায় বিএনপিসহ সরকারবিরোধী দলগুলো। এক দফার এই ঘোষণা এক মঞ্চ থেকে আসতে পারে অথবা যুগপৎভাবেও ঘোষণা করা হতে পারে।
১২ দলীয় জোটের নেতা এহসানুল হুদা গতকাল বিএনপির সাথে বৈঠক শেষে বলেন, আমরা একই ধরনের কর্মসূচির কথা আর চিন্তা করছি না। কর্মসূচির ধরনে অবশ্যই পরিবর্তন আসবে।
এক দফার আন্দোলনের দিনক্ষণের বিষয়ে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, আমরা যুগপৎ আন্দোলনের সঙ্গে সম্পৃক্ত দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা করছি। সব দলের সাথে আলোচনার ভিত্তিতে অতি শিগগিরই চূড়ান্ত কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে। তিনি বলেন, এবারের আন্দোলন হবে চূড়ান্ত পর্যায়ের আন্দোলন। এই আন্দোলন দেশের সব মানুষ সম্পৃক্ত হবে এবং জনগণ তার অধিকার আদায় করে নেবে।
এ দিকে চূড়ান্ত আন্দোলনে সফল হতে সাংগঠনিক সব শক্তিকে কাজে লাগাতে চায় বিএনপি। এর অংশ হিসেবে সবার কাছে বার্তা দেয়া হয়েছে যে, নিষ্ক্রিয় থাকার দিন শেষ, রাজপথে সক্রিয় হতে হবে সবাইকে। এক দফার আন্দোলনের কর্মসূচি ঘোষণার আগে সব অঙ্গ-সহযোগী ও সমর্থিত সংগঠনের ব্যানারে কর্মসূচি দিয়ে সবাইকে মাঠে নামানোর উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।
বিএনপি সূত্র মতে, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে মোকাবেলা করতে তিনটি বিষয় প্রাধান্য পাচ্ছে বিএনপিতে। এগুলো হচ্ছে- মাঠের রাজনীতি নিয়ন্ত্রণ, মিত্রদের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়ন এবং কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদার। তবে আন্তর্জাতিক মহলের চাপ এবং মিত্রদের সমর্থনের চেয়ে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে রাজপথে নিজস্ব শক্তি প্রদর্শনের বিষয়টি। এ জন্য একটি নেতা-কর্মীও যাতে নিষ্ক্রিয় না থাকে সেই দিকটি বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে।
জানা গেছে, সরকার পতনের একদফা আন্দোলনে দলের অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনগুলোর সাংগঠনিক শক্তিকে কাজে লাগানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিএনপি। এর অংশ হিসেবে তিনটি সংগঠনের যৌথ উদ্যোগে ছয়টি বড় শহরে ‘তারুণ্যের সমাবেশ’ হচ্ছে। এ ছাড়া অপর পাঁচটি সংগঠনের উদ্যোগে ছয় জেলায় ‘মেহনতি মানুষের পদযাত্রা’ অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। এসব কর্মসূচির মধ্য দিয়ে সংগঠনগুলোর সাংগঠনিক সক্ষমতা যাচাই করছেন বিএনপির নীতি-নির্ধারকরা। যাতে সাংগঠনিক কোনো দুর্বলতা থাকলে তা কাটিয়ে চূড়ান্ত আন্দোলনে অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে।
আন্দোলন ঘিরে সাংগঠনিক তৎপরতার বিষয়ে বিএনপি চেয়ারপারসনের বিশেষ সহকারী ও শ্রমিক নেতা শামসুর রহমান শিমুল বিশ্বাস বলেন, যুবদল, স্বেচ্ছাসেবক দল ও ছাত্রদলের যৌথ উদ্যোগে তারুণ্যের সমাবেশের পাশাপাশি শ্রমিক দল, কৃষক দল, তাঁতী দল, মৎস্যজীবী দল ও জাসাসের যৌথ উদ্যোগে ‘দেশ বাঁচাতে মেহনতি মানুষের পদযাত্রা’ শীর্ষক নতুন কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে, যা রাজনীতিতে নতুন মাত্রা যুক্ত করবে। নোয়াখালীতে ওই পাঁচ সংগঠন যৌথভাবে পদযাত্রা কর্মসূচি পালনের মাধ্যমে দেশব্যাপী শ্রমজীবী মানুষের নবজাগরণ ঘটাবে।
বিএনপির ১১টি অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের মধ্যে আন্দোলন-সংগ্রামে মূল চালিকাশক্তি হিসেবে পরিচিত জাতীয়তাবাদী যুবদল, স্বেচ্ছাসেবক দল ও ছাত্রদল। সরকারবিরোধী আন্দোলনে অতীতে এই তিনটি সংগঠনই রাজপথে জোরালো ভূমিকা পালন করেছে। তাই আগামীতে সরকার পতনের একদফা আন্দোলনেও দলের প্রধান তিন এই অঙ্গ-সহযোগী সংগঠন অর্থাৎ তারুণ্যের শক্তিকে কাজে লাগাতে চায় বিএনপির হাইকমান্ড। তাই সারা দেশে আয়োজন করছে অঞ্চলভিত্তিক ‘তারুণ্যের সমাবেশ’। গত ১৪ জুন চট্টগ্রাম দিয়ে বিএনপির এ ‘তারুণ্যের সমাবেশ’ শুরু হয়। পরবর্তী সময়ে ১৯ জুন বগুড়া এবং ২৪ জুন বরিশালে এই কর্মসূচি পালন করা হয়। আগামী ৯ জুলাই সিলেট, ১৭ জুলাই খুলনা এবং ২২ জুলাই ঢাকায় তারুণ্যের সমাবেশের মধ্য দিয়ে শেষ হবে এ কর্মসূচি। এই কর্মসূচির মধ্য দিয়ে তরুণ সমাজকে উজ্জীবিত করছে আন্দোলনরত বিএনপি।
দলটির নীতিনির্ধারকরা মনে করছেন, এরই মধ্যে যেসব সমাবেশ হয়েছে তাতে দেশের তরুণ-যুবকদের স্বতঃস্ফূর্ত সাড়া মিলেছে। বাকি সমাবেশগুলোতেও তরুণ জনগোষ্ঠীর বিরাট অংশ সম্পৃক্ত হয়ে সরকারের বিরুদ্ধে অনাস্থা জানাবে বলে আশা তাদের। সরকার পতনের আন্দোলনে তরুণদের মাঠে নামিয়ে রাজনীতির মোড় ঘুরিয়ে দিতে চান তারা।
তারুণ্যের এই সমাবেশ সফলে যুবদল সভাপতি সুলতান সালাউদ্দিন টুকু ও ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক শফিকুল ইসলাম মিল্টন, স্বেচ্ছাসেবক দলের সভাপতি এস এম জিলানী ও সাধারণ সম্পাদক রাজীব আহসান এবং ছাত্রদলের সভাপতি কাজী রওনকুল ইসলাম শ্রাবণ ও সাধারণ সম্পাদক সাইফ মাহমুদ জুয়েল সারা দেশ ছুটে বেড়াচ্ছেন। সিলেটে তারুণ্যের সমাবেশ সফলে সেখানে গেছেন যুবদল সভাপতি। জেলা বিএনপি আয়োজিত প্রস্তুতি সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্য দেন। সেখানে সুলতান সালাউদ্দিন টুকু বলেন, তারুণ্যের সমাবেশ তরুণদের মধ্যে আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। আজকে মানুষের ভোটাধিকার নেই। প্রায় চার কোটি নতুন ভোটার হয়েছে। তারা কেউ ভোট দিতে পারেননি। মানুষের ভোটাধিকার নিশ্চিত করতে হবে। জনগণের দাবি-দাওয়া নিয়ে মাঠে নেমেছি। দাবি আদায় না করা পর্যন্ত মাঠে থাকব।
এ দিকে তারুণ্যের সমাবেশের মধ্যেই দেশের ছয় বড় শহরে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ‘দেশ বাঁচাতে মেহনতি মানুষের পদযাত্রা’। বিএনপির পাঁচ অঙ্গ-সহযোগী সংগঠন জাতীয়তাবাদী কৃষক দল, শ্রমিক দল, তাঁতী দল, মৎস্যজীবী দল ও জাসাসের যৌথ উদ্যোগে এই কর্মসূচি পালিত হবে। প্রথমে চারটি সংগঠনের উদ্যোগে এই কর্মসূচি হওয়ার কথা থাকলেও পরে জাসাসকে যুক্ত করা হয়েছে। স্বল্প আয়ের মানুষের দুর্দিন, দুর্নীতি-শোষণ-নির্যাতনের প্রতিবাদে পদযাত্রার এই কর্মসূচি পালিত হবে। ‘শ্রমজীবী মানুষের জাগরণের’ লক্ষ্যে আগামী ১৪ জুলাই নোয়াখালীতে পদযাত্রার মধ্য দিয়ে কর্মসূচি শুরু হবে। এর পর দিনাজপুরে ১৯ জুলাই, রাজশাহীতে ২৮ জুলাই, যশোরে ৫ আগস্ট, হবিগঞ্জে ১২ আগস্ট এবং বরিশালে ১৯ আগস্ট অনুষ্ঠিত হবে এই পদযাত্রা। এই কর্মসূচিতে বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার মানুষ বিশেষ করে শ্রমজীবী মানুষকে ব্যাপক হারে সম্পৃক্ত করাতে চায় বিএনপি। উদ্দেশ্য, বিএনপির চূড়ান্ত আন্দোলনেও যাতে শ্রমজীবী মানুষ রাস্তায় নামে।
জানা গেছে, পদযাত্রা কর্মসূচি সফলে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা: জাহিদ হোসেনকে সমন্বয়ক করে কেন্দ্রীয়ভাবে ইতোমধ্যে সমন্বয় কমিটি গঠন করা হয়েছে। প্রতিটি কর্মসূচিতে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকার কথা রয়েছে। কর্মসূচি সফল করতে পাঁচ সংগঠনের পক্ষ থেকে ব্যাপক প্রস্তুতি নেয়া হচ্ছে। কর্মসূচিতে নোয়াখালী ছাড়াও লক্ষ্মীপুর, ফেনী, কুমিল্লা উত্তর ও দক্ষিণ জেলা এবং মহানগর, চাঁদপুর জেলার পাঁচ সংগঠনের নেতা-কর্মীরা অংশ নেবেন বলে জানা গেছে ।
জনতার আওয়াজ/আ আ