চকরিয়া-পেকুয়ায় সালাহউদ্দিনের প্রত্যাবর্তনের রাজনীতি
নিজস্ব প্রতিবেদক, জনতার আওয়াজ ডটকম
প্রকাশের তারিখ:
শনিবার, ফেব্রুয়ারি ১৪, ২০২৬ ২:১৪ অপরাহ্ণ পরিবর্তনের তারিখ:
শনিবার, ফেব্রুয়ারি ১৪, ২০২৬ ২:১৪ অপরাহ্ণ

পেকুয়া (কক্সবাজার) প্রতিনিধি
সংগৃহীত ছবি
দীর্ঘ ১৪ বছরের ব্যবধান। জাতীয় রাজনীতির ঝড়-ঝাপটা, গুমের স্বীকার, নির্বাসিত সময়- সবকিছু পেরিয়ে আবারও নিজের নির্বাচনি মাঠে সরাসরি জনসংযোগে নেমেছিলেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ।
কক্সবাজার-১ (চকরিয়া পেকুয়া) আসনে এবারের প্রচারণায় শুধু ভোটের আবেদন নয়, ছিল আবেগ, আদর্শ, তর্ক, উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি এবং ধর্মের নামে রাজনীতির বিরুদ্ধে সরাসরি অবস্থান। ফলে পুরো নির্বাচনি এলাকা কয়েক সপ্তাহ ধরে ছিল উত্তপ্ত, উৎসবমুখর এবং আলোচনায় ভরপুর।
গ্রামে গ্রামে গণসংযোগ:
৩ ডিসেম্বর থেকে শুরু করে শেষদিন পর্যন্ত টানা গণসংযোগ। শিলখালী, বারবাকিয়া, টৈটং, ফাঁসিয়াখালী, রাজাখালী, উজানটিয়া, কোনাখালীসহ প্রায় প্রতিটি ইউনিয়নে উঠান বৈঠক, নারী সমাবেশ, পথসভা ও গণমিছিল ও সমাবেশ করেন তিনি।
স্থানীয়দের ভাষ্য, এত বিস্তৃত ও ধারাবাহিক প্রচারণা বহু বছর দেখা যায়নি।
প্রচারণার শুরুতেই তিনি বলেন, ‘আমার চলার পথে ফুলের পাপড়ি ছিটিয়ে দিতে হবে এমন মহাপুরুষ আমি নই। আমি চাই আমাদের সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিরাপদ হোক।’
এই বক্তব্যে ব্যক্তিকেন্দ্রিকতার বদলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকেন্দ্রিক রাজনীতির ইঙ্গিত স্পষ্ট।
‘ভোট দিলে জান্নাত’ বিতর্কে কঠোর জবাব:
প্রচারণার অন্যতম আলোচিত দিক ছিল ধর্মীয় আবেগকে ভোটের সঙ্গে যুক্ত করার বিরোধিতা। একাধিক সভায় তিনি বলেন, ‘ভোটের নামে জান্নাতের সার্টিফিকেট বিলানো জাতীয় প্রতারণা।’
তিনি আরও যোগ করেন, ‘কে জান্নাতে যাবে, তা আল্লাহ নির্ধারণ করবেন। কোনো প্রতীকে ভোট দিলেই জান্নাত, এ কথা কোরআন-হাদিসে নেই।’
এ বক্তব্য ঘিরে রাজনৈতিক বিতর্ক তৈরি হলেও তার সমর্থকদের মতে এটি ছিল ধর্ম ও রাজনীতির সীমারেখা টানার প্রয়াস।
আওয়ামী লীগ ও জামায়াত প্রসঙ্গে তীব্র ভাষ্য:
বদরখালী ও চকরিয়ার কয়েকটি সমাবেশে তিনি আওয়ামী লীগকে গণতন্ত্রের জন্য ভাইরাস আখ্যা দেন। অন্যদিকে জামায়াতের বিরুদ্ধে স্বাধীনতাবিরোধী ভূমিকার অভিযোগ তুলে বলেন, ‘যারা মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করেছে, তারা আজ ইতিহাসের ভাষ্য দিচ্ছে, এটাই জাতির ট্র্যাজেডি।’
তিনি শহিদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের অবদান তুলে ধরে বিএনপিকে স্বাধীনতার পক্ষের শক্তি হিসেবে তুলে ধরেন।
উন্নয়নের প্রতিশ্রুতিতে নদী থেকে বন্দর:
প্রচারণাজুড়ে তিনি একাধিক অবকাঠামো উন্নয়ন পরিকল্পনা তুলে ধরেন। চট্টগ্রাম-কক্সবাজার সড়ক ছয় লেন, মাতামুহুরী নদীতে স্থায়ী বাঁধ, বদরখালী বাঁশখালী সড়ক চার লেন, চকরিয়া বদরখালী সড়ক উন্নয়ন, কাকারা হাজিয়ান এলাকায় সেতু নির্মাণ, পেকুয়াকে পৌরসভায় উন্নীতকরণ, মাতামুহুরি উপজেলা গঠন, বাজারে চাঁদাবাজি বন্ধ, কৃষকদের কৃষি কার্ড, স্বাস্থ্য কার্ড, ফ্যামিলি কার্ড, লবণচাষিদের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা।
তিনি দাবি করেন, কর্মসংস্থান সৃষ্টির মাধ্যমে তরুণকে দেশের ভেতরেই কাজের সুযোগ দেওয়া সম্ভব।
গুমের স্মৃতি ও আবেগঘন মুহূর্ত:
প্রায় প্রতিটি পথসভায় নিজের গুম হওয়া প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, ‘আমাকে গুম করে হত্যা করতে চেয়েছিল। আল্লাহ ও জনগণের দোয়ায় ফিরে এসেছি।’
একাধিক নারী সমাবেশে শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ, মিছিল ও ফুলেল সংবর্ধনা তার প্রচারণাকে আবেগঘন মাত্রা দেয়।
সাংবাদিকদের সঙ্গে অঙ্গীকার:
চকরিয়ায় সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময়ে তিনি বলেন, ‘গণমাধ্যমের পূর্ণ স্বাধীনতা নিশ্চিত করা হবে। সাংবাদিকরা মালিকের নয়, বিবেকের চাকরি করবেন।’
তিনি দলের ঘোষিত ৩১ দফা সংস্কার কর্মসূচির কথাও তুলে ধরেন।
শেষ পর্যন্ত বিজয়:
প্রচারণার শেষদিকে পাঁচ কিলোমিটার দীর্ঘ গণমিছিল করেন তিনি। হাজারো নেতা-কর্মীর অংশগ্রহণে পেকুয়ার প্রধান সড়কগুলো জনসমুদ্রে পরিণত হয়।
তার আহ্বান ছিল, ‘প্রত্যেক ভোটকেন্দ্রে সজাগ থাকবেন। মা-বোনেরা যেন নির্বিঘ্নে ভোট দিতে পারেন।’
ভোটগ্রহণ শেষে গণনা পর্বে স্পষ্ট হয়ে ওঠে প্রচারণার প্রভাব। দীর্ঘদিন পর সরাসরি মাঠে নেমে টানা গণসংযোগ, উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি এবং রাজনৈতিক অবস্থান মিলিয়ে শেষ পর্যন্ত তিনি প্রায় লাখের কাছাকাছি ভোটের ব্যবধানে বিজয়ী হন।
এই ফলাফলকে তার সমর্থকরা দেখছেন জনসম্পৃক্ত প্রচারণার সাফল্য হিসেবে।
স্থানীয়দের মতে, দীর্ঘ বিরতির পর এলাকায় প্রত্যাবর্তন এবং ধারাবাহিক গ্রামভিত্তিক যোগাযোগই তার বিজয়ের প্রধান ভিত্তি হয়ে ওঠে।
জনতার আওয়াজ/আ আ