চট্টগ্রাম ১-দলীয় কোন্দলে জর্জরিত বিএনপি চমকের অপেক্ষায় জামায়াত
নিজস্ব প্রতিবেদক, জনতার আওয়াজ ডটকম
প্রকাশের তারিখ:
বুধবার, সেপ্টেম্বর ২৪, ২০২৫ ১২:৩৭ পূর্বাহ্ণ পরিবর্তনের তারিখ:
বুধবার, সেপ্টেম্বর ২৪, ২০২৫ ১২:৩৭ পূর্বাহ্ণ

জনতার আওয়াজ ডেস্ক
ছবি: সংগৃহীত
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০২৬ ঘিরে ভোটের মাঠে বেশ উত্তাপ ছড়াচ্ছে চট্টগ্রাম-১ মিরসরাই আসন (সংসদীয় আসন নং ২৭৮)। নির্বাচনকে সামনে রেখে জমে উঠেছে গ্রামগঞ্জের চায়ের দোকান। চলছে সরব আলোচনা। বিএনপি’র একাধিক ও জামায়াতে ইসলামীর একক প্রার্থী চষে বেড়াচ্ছে পুরো উপজেলা। অন্য দলের প্রার্থীরা নীরবে প্রচার চালাচ্ছেন। ১৬টি ইউনিয়ন ও ২টি পৌরসভা নিয়ে গঠিত এ আসনে মোট ভোটার সংখ্যা ৩ লাখ ৮১ হাজার ১৮১ জন। এরমধ্যে পুরুষ ভোটার ১ লাখ ৯৬ হাজার ৯২ জন, নারী ভোটার ১ লাখ ৮৫ হাজার ৮৬ জন এবং নতুন ভোটার রয়েছেন ১৫ হাজার ৫১ জন।
ইতিহাস বলছে, এ আসনে ৫৪ বছরে আওয়ামী লীগের হেভিওয়েট নেতা ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন সাতবার, বিএনপি’র ওবায়দুল হক খন্দকার ও এমএ জিন্নাহ দুইবার করে এবং জাতীয় পার্টির আবু সালেক একবার নির্বাচিত হয়েছেন। সর্বশেষ ২০২৪ সালের জাতীয় নির্বাচনে মোশাররফের ছেলে আওয়ামী লীগের মো. মাহবুর রহমান রুহেল জয়ী হন। ১৯৯৬ সালে ৭ম সংসদ নির্বাচনে বিএনপি’র অভ্যন্তরীণ কোন্দল সামাল দিতে বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া নিজেই এ আসন থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে আওয়ামী লীগের মোশাররফকে ৪২৯৩ ভোটে পরাজিত করে জয়ী হন। বর্তমানে মিরসরাইয়ে সবচেয়ে আলোচিত বিষয় বিএনপি’র অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব। চট্টগ্রাম উত্তর জেলা বিএনপি’র সাবেক দুই যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক নুরুল আমিন ও নুরুল আমিন চেয়ারম্যানের অনুসারীদের মধ্যে সংঘাত চরমে উঠেছে। এই গ্রুপিংয়ের জেরে কয়েকটি হত্যাকাণ্ড, ১৪৪ ধারা ভঙ্গ, পহেলা বৈশাখে সশস্ত্র মিছিলসহ একাধিক সহিংস ঘটনায় জাতীয়ভাবে সংবাদ শিরোনাম হয়েছে বারবার। ফলে কেন্দ্র থেকে বিএনপি’র ৫ শীর্ষ নেতাকে বহিষ্কারও করা হয়েছে। কিন্তু তাদের থামানো যাচ্ছে না। এসব নেতিবাচক প্রচার ভোটের মাঠে বিএনপি’র জন্য ক্ষতিকর প্রভাব ফেলতে পারে বলে অনেকেই মনে করছেন। এর আগে, ২০২৪ সালের ১৭ই আগস্ট কেন্দ্রীয় যুবলীগ নেতা নিয়াজ মোর্শেদ এলিটের বাবা কেন্দ্রীয় মুক্তিযোদ্ধা দলের ভাইস-প্রেসিডেন্ট মনিরুল ইসলাম ইউসুফের বাড়িতে বিএনপি’র চেয়ারম্যান গ্রুপের নেতাকর্মীরা উত্তর জেলা বিএনপি’র সাবেক আহ্বায়ক ও সাবেক এমপি গোলাম আকবর খন্দকারকে ৪ ঘণ্টা অবরুদ্ধ করে রাখে। পরে সেনাবাহিনী গিয়ে উদ্ধার করে। গ্রুপিং রাজনীতি এরপর থেকে বিএনপিতে আরও চাঙ্গা হয়। ফলে প্রার্থী তালিকা দিন দিন দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হচ্ছে।
বিএনপি’র সম্ভাব্য প্রার্থী তালিকায় রয়েছেন যারা: নুরুল আমিন, নুরুল আমিন চেয়ারম্যান (বহিষ্কৃত; যদি বহিষ্কারাদেশ তুলে নেয় দল), শাহিদুল ইসলাম চৌধুরী, সাবেক এমপি এম এ জিন্নাহ, ক্লিপটন গ্রুপের ডিএমডি মহিউদ্দিন চৌধুরী, মুক্তিযোদ্ধা মনিরুল ইসলাম ইউসুফ, ব্যবসায়ী শাহাদাত হোসেন, সাবেক এমপি ওবায়দুল হক খন্দকারের সন্তান আইরিন পারভীন ও এমদাদুল হক খন্দকার, প্রবাসী সাজ্জাদ পারভেজ, ইঞ্জিনিয়ার ফখরুল ইসলাম, চট্টগ্রাম চেম্বারস অব কমার্সের সাবেক সভাপতি কামাল উদ্দিন।
তবে, এত সংখ্যক মনোনয়নপ্রত্যাশী থাকা সত্ত্বেও দলীয় কোন্দল বিএনপি’র জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। একাধিক প্রার্থী ইতিমধ্যে দলীয় মনোনয়ন চেয়ে সংবাদমাধ্যমে নিজেদের অবস্থান তুলে ধরেছেন। কেউ কেউ আবার দলের প্রতি অনুরোধ জানিয়েছেন, যেন সন্ত্রাস বা চাঁদাবাজির সঙ্গে জড়িত কাউকে মনোনয়ন না দেয়া হয়। একক প্রার্থী দিতে পারলে এ আসনে সহজ জয় পেতে পারে দলটি।
জামায়াতের সংগঠিত প্রস্তুতি: ডাকসু-জাকসুতে ছাত্রশিবিরের ভূমিধস বিজয়ের পর উজ্জীবিত নেতাকর্মীদের নিয়ে জামায়াতে ইসলামীর মনোনীত প্রার্থী ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল এডভোকেট সাইফুর রহমান ইতিমধ্যে পুরো উপজেলায় বিরামহীন প্রচারণায় চমক দেখাচ্ছেন। তিনি বলেন, মিরসরাইকে একটি টেকসই ও মানবিক উন্নয়নের রোল মডেল হিসেবে গড়ে তুলবো। সন্ত্রাস, দুর্নীতি ও রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলার অবসান ঘটিয়ে নাগরিক অধিকার প্রতিষ্ঠা করবো। ইসলামী দলগুলোর মধ্যে তিনিই এখন পর্যন্ত একমাত্র নিশ্চিত প্রার্থী।
অন্যান্য দলের সম্ভাব্য প্রার্থীরা: ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ-এর প্রার্থী এডভোকেট ফেরদৌস আহমদ চৌধুরী, খেলাফত মজলিসের প্রার্থী মাওলানা জাফর উল্যাহ নিজামী, ইসলামী ফ্রন্ট-এর প্রার্থী আব্দুল মান্নান, এনসিপি (জাতীয় নাগরিক পার্টি)’র প্রার্থী কেন্দ্রীয় যুগ্ম সচিব অধ্যাপিকা সাগুফতা বুশরা মিশমা প্রচার-প্রচারণা চালাচ্ছেন। এনসিপি’র মিরসরাই উপজেলা সাংগঠনিক সম্পাদক মিরজাদা সোহেল বলেন, আমাদের দলে একাধিক প্রার্থীর সুযোগ নেই। গঠনতন্ত্র অনুযায়ী কেন্দ্রীয় কাউন্সিলের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত। অধ্যাপিকা সাগুফতা পদাধিকার বলে সম্ভাব্য প্রার্থী, তাকে ঘিরেই প্রস্তুতি চলছে।
ভোটের সমীকরণ কী বলছে? আওয়ামী লীগ যদি অংশগ্রহণ করতে না পারে, তবে তাদের সোয়া লাখ ভোট কোন দলের বাক্সে যাবে, তা এখনও পরিষ্কার নয়। জামায়াত ও ইসলামী দলগুলো যদি ঐক্যবদ্ধ হয়, তবে এডভোকেট সাইফুর রহমান শক্তিশালী প্রার্থী হতে যাচ্ছেন। অন্যদিকে, বিএনপি যদি অভ্যন্তরীণ কোন্দল নিরসন করে ঐক্যবদ্ধভাবে মাঠে নামে, তাহলে বড় ফ্যাক্টর হয়ে উঠতে পারে। দলীয় কোন্দল ঠেকাতে যদি ৯৬ সালের মতো জিয়া পরিবার থেকে কাউকে মনোনয়ন দিতেও পারে। যদি জিয়া পরিবার কাউকে চাপিয়ে দেয়, তাহলে বিএনপি’র অভ্যন্তরীণ অসন্তোষ আরও বাড়বে বলেই ত্যাগী নেতাকর্মীদের অনেকে মনে করছেন। সবমিলিয়ে মিরসরাই আসনের নির্বাচনী লড়াইয়ে বড় ফ্যাক্টর হয়ে উঠেছে তিনটি বিষয়। প্রথমত বিএনপি’র কোন্দল, দ্বিতীয়ত জামায়াতের সংগঠিত প্রস্তুতি এবং সর্বশেষ আওয়ামী লীগের অংশগ্রহণ অনিশ্চয়তা। এখন দেখার বিষয়, শেষ পর্যন্ত ভোটারদের মন জয় কারা করতে পারে আর আওয়ামী লীগের ভোট কারা টানতে পারেন।
জনতার আওয়াজ/আ আ