চারুকলায় রঙের উচ্ছ্বাস, নাম বদলে নতুন যাত্রা - জনতার আওয়াজ
  • আজ রাত ১১:৩১, বৃহস্পতিবার, ১৪ই মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ৩১শে বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ, ২৭শে জিলকদ, ১৪৪৭ হিজরি
  • jonotarawaz24@gmail.com
  • ঢাকা, বাংলাদেশ

চারুকলায় রঙের উচ্ছ্বাস, নাম বদলে নতুন যাত্রা

নিজস্ব প্রতিবেদক, জনতার আওয়াজ ডটকম
প্রকাশের তারিখ: শনিবার, এপ্রিল ১১, ২০২৬ ৩:৩৯ অপরাহ্ণ পরিবর্তনের তারিখ: শনিবার, এপ্রিল ১১, ২০২৬ ৩:৩৯ অপরাহ্ণ

 

জনতার আওয়াজ ডেস্ক
ছবি সংগৃহীত
পহেলা বৈশাখ উপলক্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের শিক্ষার্থীদের তৈরি মুখোশ দেখছেন এক ক্রেতা। ছবি: খবরের কাগজ

দরজায় কড়া নাড়ছে পহেলা বৈশাখ। সেই সঙ্গে আবারও প্রাণ ফিরে পেয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদ। বর্ষবরণের অন্যতম আকর্ষণ শোভাযাত্রাকে ঘিরে সেখানে এখন ব্যস্ততা, রং আর সৃষ্টির এক অন্যরকম উৎসব। তবে এবারের প্রস্তুতিতে যুক্ত হয়েছে নতুন মাত্রা। শোভাযাত্রার নাম পরিবর্তনকে ঘিরে বিতর্ক, আর সেই বিতর্ক পেরিয়ে ‘বৈশাখী শোভাযাত্রা’ নামে ঘটছে নতুন সূচনা।

চারুকলা অনুষদের ভারপ্রাপ্ত ডিন অধ্যাপক ড. মো. আজহারুল ইসলাম শেখ খবরের কাগজকে জানান, এই সিদ্ধান্ত এসেছে সম্মিলিত মতামত থেকে। তার ভাষায়, ‘আনন্দ ও মঙ্গলের ধারণা সামনে রেখে বিভিন্ন মতের সমন্বয়ে বৃহত্তর সিদ্ধান্তেই এবার শোভাযাত্রার আয়োজন করা হচ্ছে। লক্ষ্য একটাই, উৎসবের মাধ্যমে জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করা।’

চারুকলায় ঢুকলেই চোখে পড়ে প্রস্তুতির চেনা কিন্তু চিরনতুন দৃশ্য। কেউ মুখোশে রং দিচ্ছেন, কেউ মাটির তৈরি অবয়বে তুলির আঁচড় দিচ্ছেন। কোথাও চাটাই বোনা হচ্ছে, কোথাও কাগজের স্তর বসিয়ে তৈরি হচ্ছে বিশাল কাঠামো। ছোট ছোট দলে ভাগ হয়ে শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা দিন-রাত কাজ করে যাচ্ছেন।

এবারের প্রতিপাদ্য–‘নববর্ষের ঐকতান, গণতন্ত্রের পুনরুত্থান’। এই ভাবনাকে ধারণ করে তৈরি হচ্ছে পাঁচটি বড় মোটিফ। কথা হয় চারুকলার ভাস্কর্য বিভাগের ১১তম ব্যাচের ছাত্র ভাস্কর দীপক রঞ্জন সরকারের সঙ্গে। তিনি জানান, এ বছর বাউল সংস্কৃতির ওপর আঘাতের প্রতিবাদে দেওয়া হচ্ছে বিশেষ গুরুত্ব, এর প্রতীক হিসেবে থাকছে ‘দোতারা’। পাশাপাশি শান্তির বার্তাবহ পায়রা, লোকজ ঐতিহ্যের মোটিফ হাতি ও ঘোড়া, আর নতুন দিনের সূচনার প্রতীক মোরগ থাকছে। শোভাযাত্রার অগ্রভাগে থাকবে মোরগ। তারপর দোতারা, পায়রা, হাতি ও ঘোড়ার অবয়ব টেনে নিয়ে যাবেন শিক্ষার্থীরা। ইতিহাসনির্ভর পটচিত্রও থাকছে শোভাযাত্রায়। বড় মোটিফগুলোর পাশে চার শতাধিক শিক্ষার্থী বাঘ ও পেঁচার মাস্ক হাতে নিয়ে হাঁটবেন এই শোভাযাত্রায়। আগের বছরের চরকা, রাজা-রানির অবয়বও থাকবে এবারের শোভাযাত্রায়। নিয়ম অনুযায়ী, শোভাযাত্রায় আগতরা কেউ মুখে মুখোশ পড়তে পারবেন না।

এবারের আয়োজনের দায়িত্ব পেয়েছে চারুকলার ৭১তম ব্যাচ। এই ব্যাচের ভাস্কর্য বিভাগের শিক্ষার্থী সুপ্রিয় জানালেন, নিজেদের তৈরি শিল্পকর্ম বিক্রি ও অনুদানের অর্থেই এগিয়ে চলছে পুরো আয়োজন।

এই কর্মযজ্ঞে যুক্ত বর্তমান শিক্ষার্থীদের উৎসাহ চোখে পড়ার মতো।

ভাস্কর্যের স্নাতকোত্তর শিক্ষার্থী মাধুর্য বিশ্বাস বিষয়টিকে দেখছেন ভিন্নভাবে। তার কাছে নাম নয়, গুরুত্বপূর্ণ হলো সবার অংশগ্রহণে উৎসব উদযাপন।

নববর্ষের দিন সকাল ৯টায় চারুকলা অনুষদ থেকে শুরু হবে শোভাযাত্রা। রাজু ভাস্কর্য, দোয়েল চত্বর ও বাংলা একাডেমি ঘুরে আবার চারুকলাতেই শেষ হবে এই যাত্রা।

মঙ্গল শোভাযাত্রার কারিগর মাহবুব জামাল শামীম
ইউনেসকোর বিশ্ব সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের মর্যাদা পাওয়া এই বর্ণিল উৎসবের বীজ বপন হয়েছিল আজ থেকে ৪১ বছর আগে সীমান্তবর্তী জেলা শহর যশোরে। ১৯৮৫ সালের ১৪ এপ্রিল (১ বৈশাখ ১৩৯২) যশোরের ‘চারুপীঠ’ চত্বর থেকে প্রথমবারের মতো বের হয় এই শোভাযাত্রা। আর এর নেপথ্যের কারিগর ছিলেন চিত্রশিল্পী মাহবুব জামাল শামীম। বর্তমানে চারুপীঠ আর্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউটের অধ্যক্ষ মাহবুব জামাল শামীম জানান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলার ছাত্র থাকাকালে একুশের প্রভাতফেরি থেকেই এই উৎসবের ভাবনা তার মাথায় আসে।

স্মৃতিচারণা করে তিনি বলেন, ‘একুশের প্রভাতফেরি শোকের, কিন্তু দেশ স্বাধীন হওয়ার পর সব ধর্মের মানুষের মিলনমেলা হবে এমন একটি আনন্দ উৎসবের আকুতি তৈরি হয় মনে। সেই ভাবনা থেকেই বন্ধুদের নিয়ে যশোরের চারুপীঠকে কেন্দ্র করে শুরু হয় এই আয়োজন।’

শুরুতে শিল্পী এস এম সুলতানের পরামর্শ ও সান্নিধ্যে দুই শতাধিক শিশুকে নিয়ে মাসব্যাপী প্রশিক্ষণের মাধ্যমে বাঘ, প্রজাপতি ও বিবিধ লোকজ অনুষঙ্গ তৈরি করা হয়। ১৯৮৫ সালে ছোট পরিসরে শুরু হলেও দ্বিতীয় বছর থেকেই এটি বিশাল আকার ধারণ করে। যশোরের এই সফলতায় অনুপ্রাণিত হয়ে ১৯৮৯ সালে মাহবুব জামাল শামীম ঢাকার চারুকলা ইনস্টিটিউটে গিয়ে শিক্ষার্থীদের সহায়তায় রাজধানীতে প্রথম শোভাযাত্রার উদ্যোগ নেন।

শোভাযাত্রার নামকরণ প্রসঙ্গে জানা যায়, শুরুতে যশোরে এটি ‘বর্ষবরণ শোভাযাত্রা’ এবং পরে ঢাকায় ‘আনন্দ শোভাযাত্রা’ নামে পরিচিত ছিল। পরে ছায়ানটের প্রতিষ্ঠাতা ওয়াহিদুল হক ও শিল্পী এমদাদ হোসেনের প্রস্তাবে এর নামকরণ হয় ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’।

চারুপীঠের সভাপতি হারুন-অর-রশীদ বলেন, ‘শোকের প্রভাতফেরির বিপরীতে অনাবিল আনন্দের এই যাত্রা মৌলবাদ প্রতিহত করে মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করতে শুরু হয়েছিল।’

তবে এই ঐতিহাসিক শুরুর কৃতিত্ব যথাযথভাবে স্বীকৃত না হওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন শামীমের অন্যতম সহযোগী হিরণ্ময় চন্দ্র।

উল্লেখ্য, ২০১৬ সালে ইউনেসকো মঙ্গল শোভাযাত্রাকে ‘ইনট্যানজিবল কালচারাল হেরিটেজ’ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। বর্তমানে এটি বাংলাদেশের জাতীয় উৎসব ও শিক্ষাক্রমের অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

 
 
জনতার আওয়াজ/আ আ
 
 

জনপ্রিয় সংবাদ

 

সর্বোচ্চ পঠিত সংবাদ