ছাত্র-জনতা হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের বিচারসহ ৮ দাবি ইউপিডিএফ’র
নিজস্ব প্রতিবেদক, জনতার আওয়াজ ডটকম
প্রকাশের তারিখ:
মঙ্গলবার, আগস্ট ২৭, ২০২৪ ২:৫২ অপরাহ্ণ পরিবর্তনের তারিখ:
মঙ্গলবার, আগস্ট ২৭, ২০২৪ ২:৫২ অপরাহ্ণ

জনতার আওয়াজ ডেস্ক
ছাত্র-গণঅভ্যুত্থানের জুলাই- আগস্টে নিহত সকল শহীদের নাম প্রকাশ ও হত্যাকাণ্ডের সাথে জড়িত ফ্যাসিস্টদের গ্রেফতার পূর্বক বিচার নিশ্চিত করাসহ ৮ দফা দাবি জানিয়েছেন পার্বত্য চট্টগ্রাম ভিত্তিক একটি আঞ্চলিক রাজনৈতিক দল ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ)। এসময় দলের সংগঠক মাইকেল চাকমা গোপন বন্দীশালা ‘আয়না ঘর’ থেকে যাদের এখনো মুক্তি দেয়া হয়নি তাদের মুক্তির দাবিও তোলেন।
মঙ্গলবার (২৭ আগস্ট) জাতীয় প্রেস ক্লাবের জহুর হোসেন চৌধুরী হলে ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ) আয়োজিত ‘জামিনে মুক্তদের জেল গেইটে পুনঃগ্রেফতার বন্ধ, আনন্দ প্রকাশ চাকমাসহ ইউপিডিএফ ও দেশের রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মীদের নিঃশর্ত মুক্তির দাবিতে এবং পার্বত্য চট্টগ্রামের বর্তমান পরিস্থিতির ওপর অনুষ্ঠিত সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন।
সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে মাইকেল চাকমা বলেন, অভ্যুত্থানের মাধ্যমে বাংলাদেশ দ্বিতীয়বার স্বাধীন হয়েছে। দেশের মানুষ এখন মুক্ত হাওয়ায় প্রাণভরে নিঃশ্বাস নিতে পারছে। কিন্তু দুঃখের সাথে বলতে হচ্ছে, পার্বত্য চট্টগ্রামের জনগণ এখনও স্বাধীনতার সেই স্বাদ পায়নি। পাহাড়ে এখনও পরিবর্তনের হাওয়া পৌঁছেনি। সমতলে অন্যায়ভাবে আটক রাজবন্দীরা মুক্তি পেতে শুরু করলেও, পার্বত্য চট্টগ্রামে বন্দী ইউপিডিএফ ও তার সহযোগি সংগঠনের নেতাকর্মীদের এখনও ছেড়ে দেয়া হয়নি। এই বন্দীদের অনেকে পাঁচ বছরের বেশি সময় ধরে বিনা বিচারে কারাগারে অন্তরীণ রয়েছেন। হাসিনার আমলে জামিন পাওয়ার পরও জেল গেট থেকে পুনরায় গ্রেফতার করার কারণে তারা এখন নতুন করে আদালতে জামিনের আবেদন করতে সাহস পাচ্ছেন না।
পার্বত্য চট্টগ্রামে সেনাশাসন বা নিপীড়নমূলক অবস্থা জারি রেখে দেশের অন্যান্য অঞ্চলে গণতন্ত্র কায়েম সম্ভব না বলে মনে করেন মাইকেল চাকমা। তিনি বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামকে বাদ দিয়ে দেশে প্রকৃত অর্থবহ সংস্কার সম্ভব না। পার্বত্য চট্টগ্রামকে মুক্তি না দিয়ে সমতলের জনগণও প্রকৃত মুক্তি পেতে পারে না।
এসময় পার্বত্য চট্টগ্রামের সংস্কারে ইউপিডিএফের ৮ দফা দাবি তুলে ধরেন তিনি। তাদের দাবিগুলো হলো:
অবিলম্বে জুলাই-আগস্ট ছাত্র-গণঅভ্যুত্থানের সময় নিহত সকল শহীদের নাম প্রকাশ ও হত্যাকান্ডের সঙ্গে জড়িত ফ্যাসিস্টদের গ্রেফতার পূর্বক বিচার নিশ্চিত করতে হবে; অবিলম্বে খাগড়াছড়ি ও রাঙ্গামাটি জেলে আটক ইউপিডিএফ ও তার সহযোগি সংগঠনের নেতা-কর্মী ও সমর্থকদের মুক্তি দিতে হবে; আদালত থেকে জামিন লাভের পর জেল গেট থেকে পুনরায় গ্রেফতার বন্ধ করতে হবে এবং ফ্যাসিস্ট হাসিনা সরকারের আমলে ইউপিডিএফ ও তার সহযোগি সংগঠনের নেতা-কর্মী ও সমর্থকদের নামে দায়ের করা সকল মিথ্যা মামলা ও হুলিয়া প্রত্যাহার করতে হবে; ফ্যাসিস্ট সরকারের আমলে সৃষ্ট ঠ্যাঙাড়ে নব্য মুখোশ বাহিনী ও মগ পার্টি ভেঙে দিতে হবে এবং তাদের মধ্যে যারা খুন, গুম, অপহরণ ও সন্ত্রাসের সাথে জড়িত তাদের গ্রেফতার পূর্বক শাস্তি দিতে হবে;
এছাড়াও স্বনির্ভর গণহত্যা ও পানছড়িতে চার যুব নেতা হত্যাসহ ফ্যাসিস্ট হাসিনার আমলে পার্বত্য চট্টগ্রামে সংঘটিত সকল হত্যাকাণ্ডও মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিচারের জন্য বিশেষ ট্রাইবুনাল গঠন করতে হবে এবং তদন্ত ও বিচার প্রক্রিয়ায় জাতিসংঘকে যুক্ত করতে হবে; অবিলম্বে নির্দলীয়, সৎ ও যোগ্য ব্যক্তিদের নিয়োগ দিয়ে তিন পার্বত্য জেলা পরিষদ ও পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ পুনর্গঠন করতে হবে; অবিলম্বে বান্দরবানে চলমান কেএনএফ-বিরোধী অভিযানের নামে বম জাতিগোষ্ঠীকে নিশানা করে জাতি-নিধন অভিযান বন্ধ করতে হবে এবং শিশু ও নারীসহ আটককৃত বমদের মুক্তি দিতে হবে; খাগড়াছড়ির রামগড়ে গৃহবধূকে ধর্ষণকারীদের গ্রেফতার এবং রাঙামাটি ও বান্দরবানে ধর্ষণ প্রচেষ্টার সাথে জড়িতদের শাস্তি দিতে হবে; এবং পার্বত্য চট্টগ্রামে গণতান্ত্রিক পরিবেশ সৃষ্টির জন্য অপারেশন উত্তরণ বাতিল পূর্বক সেনাশাসন প্রত্যাহার ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রণালয়ের ১১ দফা নির্দেশনা বাতিল করতে হবে এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম সমস্যার রাজনৈতিক সমাধানের লক্ষ্যে সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।
পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তি চুক্তির সংস্কার চান কিনা? সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে মাইকেল চাকমা বলেন, যে শান্তি চুক্তি আছে সেটি পরিপূর্ণ নয়। আমরা অবশ্যই এর পরিবর্তন চাই।
ইউপিডিএফ এবং তাদের সমর্থকদের ২৯ জন সদস্য বর্তমানে কারাগারে রয়েছে বলে জানান মাইকেল চাকমা। জামিনে মুক্তির পর জেলগেটে ইউপিডিএফ এর কতজন কর্মী ও সমর্থককে পুনঃগ্রেফতার করা হয়েছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমাদের তিনজন সমর্থককে জামিনের পর গ্রেফতার করা হয়েছে। এর মধ্যে একজনকে তিনবার, একজনকে দুইবার এবং একজনকে চারবার পুনঃগ্রেফতার করা হয়েছে।
দীর্ঘদিন আয়নাঘরে বন্দি ছিলেন মাইকেল চাকমা। আয়না ঘর সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আয়না ঘরে অমানবিকভাবে আটকে রাখা হতো। হিটলার যেভাবে তার কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পে ধরে নিয়ে রাখতো, আয়না ঘর ধরে নিতে পারেন ঠিক তেমন একটি জায়গা। যেখানে মানুষকে তার সমস্ত মানবাধিকার লঙ্ঘন করে রাখা হতো।
উল্লেখ্য, ২০১৯ সালের ৯ই এপ্রিল থেকে নিখোঁজ ছিলেন পার্বত্য চট্টগ্রাম কেন্দ্রিক একটি রাজনৈতিক দল ইউপিডিএফ-এর সংগঠক মাইকেল চাকমা। পাঁচ বছরেরও বেশি সময় ধরে তাকে গোপন বন্দীশালায় আটকে রাখা হয়েছিল, যেটি ‘আয়নাঘর’ নামে পরিচিত। পরে ছাত্র জনতার প্রবল আন্দোলনের মুখে গত ৫ আগষ্ট শেখ হাসিনার পদত্যাগের পর ছয় আগস্ট তাকে চট্টগ্রামের একটি সড়কের ধারে চোখ বেঁধে ছেড়ে দেয়া হয়। মুক্তি পাওয়ার প্রায় তিন সপ্তাহ পর ঢাকার প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলনে আসেন মাইকেল চাকমা।
এসময় আরও উপস্থিত ছিলেন পাহাড়ি ছাত্র পরিষদের সাবেক সভাপতি সুনয়ন চাকমা, ইউপিডিএফ সদস্য থুইখোচিং মারমা।
জনতার আওয়াজ/আ আ