তরিকুল ইসলাম একজন সংশপ্তক জাতীয়তাবাদী রাজনীতিবিদ - জনতার আওয়াজ
  • আজ রাত ১:৫৩, বৃহস্পতিবার, ১৪ই মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ৩১শে বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ, ২৭শে জিলকদ, ১৪৪৭ হিজরি
  • jonotarawaz24@gmail.com
  • ঢাকা, বাংলাদেশ

তরিকুল ইসলাম একজন সংশপ্তক জাতীয়তাবাদী রাজনীতিবিদ

নিজস্ব প্রতিবেদক, জনতার আওয়াজ ডটকম
প্রকাশের তারিখ: বৃহস্পতিবার, নভেম্বর ১০, ২০২২ ৮:১৮ অপরাহ্ণ পরিবর্তনের তারিখ: বৃহস্পতিবার, নভেম্বর ১০, ২০২২ ৮:১৮ অপরাহ্ণ

 

খান মোঃ. মনোয়ারুল ইসলাম শিমুল
যশোরে জন্ম ও বেড়ে ওঠার সময়কালেই সচেতন সাংস্কৃতিক কর্মী ও রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে দীপ্তি ছড়ান তরিকুল ইসলাম । যশোর থেকে তরিকুল ইসলামের রাজনৈতিক কর্মকান্ড সারা দেশেই দীপ্তি ছড়িয়েছিল । রাজনীতিতে যে অসাধারণ ত্যাগ শিকারের নিদর্শন তিনি রেখে গিয়েছেন সমকালীন দেশীয় রাজনীতিতে সেটি বিরল।
যশোরে জন্ম নেয়া তরিকুল ইসলাম ভাষা শহীদদের স্মরণে শহীদ মিনার নির্মাণ করে স্বৈরাচার আইয়ুব সরকারের রোষানলে পড়ে যখন জেলে যান, তখন মাত্র ১৬ বছরের তরুণ । এরপর ছাত্র ইউনিয়নের প্রার্থী হিসেবে এম এম কলেজের জিএস নির্বাচিত হন ১৯৬৩-৬৪ সালে । স্বৈরাচার আয় বিরোধী আন্দোলনে প্রায় এক বছর জেল খাটেন ১৯৬৮ সালে । মাওলানা ভাসানের রাজনীতিতে অনুরক্ত হয়ে ন্যাপের রাজনীতিতে যুক্ত হন ১৯৭০এ ।এরপর দেশমাতৃকার টানে মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয় অংশগ্রহণ করেন। স্বাধীনতার পরেই ১৯৭৩ সালে যশোর পৌরসভার ভাইস চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন । জিয়াউর রহমানের উন্নয়ন ও উৎপাদনের রাজনীতিতে আকৃষ্ট হয়ে ন্যাপ থেকে জাতীয়তাবাদী গণতান্ত্রিক দল (জাগদল) হয়ে বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হন প্রতিষ্ঠা লগ্ন থেকেই । বিএনপির ৭৬ সদস্য বিশিষ্ট প্রথম আহবায়ক কমিটির সদস্য হন । ১৯৭৯ সালের সংসদ নির্বাচনে যশোর সদর থেকে প্রথমবারের মতো সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন । এরপর থেকে জাতীয়তাবাদী দলের প্রভাবশালী ভূমিকায় দেখা যায় তাঁকে। ১৯৮০ সালে চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করছেন। এরপরে পর্যায়ক্রমে দলের যুগ্ম মহাসচিব, ১৯৮৭ সালে ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব, ভাইস চেয়ারম্যান ও ২০০৯ সালের পঞ্চম জাতীয় কাউন্সিলের স্থায়ী কমিটির সদস্য হন । ১৯৮১ সালে মাত্র ৩৫ বছর বয়সে সড়ক ও রেলপথ প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পান । ১৯৯১ সালে বিএনপি ক্ষমতায় আসলে প্রথমে সমাজ কল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ও পরে পূর্ণ মন্ত্রী, এরপরে ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী হন । ২০০১ সালে পর্যায়ক্রমে খাদ্য, তথ্য এবং পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয় মন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন ।
যশোরের স্থানীয় রাজনীতি থেকে জাতীয়তাবাদী রাজনীতির একেবারে শীর্ষ পর্যায়ে দলীয় রাজনীতিতে যেমন অবদান রাখেন তেমনি মন্ত্রী হিসেবেও রাষ্ট্রের উন্নয়ন ও উৎপাদনের রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
১৯৮১ সালে জিয়াউর রহমান শহীদ হওয়ার পর তিনি দলের প্রতি অনুপম দায়িত্বশীলতার স্বাক্ষর রাখেন। স্বৈরাচার এরশাদ বিএনপি ভাঙ্গার ষড়যন্ত্র করেন এবং সেই ষড়যন্ত্রে বিএনপির কতিপয় নেতাকর্মী বিপথগামী হলেও তরিকুল ইসলাম দেশনেত্রী বেগম জিয়ার পক্ষে শক্ত অবস্থান নেন । বিএনপির ভাঙ্গার ষড়যন্ত্রমূলক কর্মকান্ডে যুক্ত না হওয়াতে ষড়যন্ত্রমূলক মামলার মুখোমুখি হয়ে অকথ্য শারীরিক নির্যাতন ভোগ করেন । প্রায় নয় মাস বিনা চিকিৎসায় স্বৈরাচার এরশাদের জেলখানায় কাটান । সেই অকথ্য শারীরিক নির্যাতনে সৃষ্ট অসুস্থতা তাঁকে আমৃত্যু ভুগিয়েছে । তবুও তিনি দল ও আদর্শকে সর্বাগ্রে স্থান দিয়ে অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন ।
স্বৈরাচার এরশাদের জেলখানা ছাড়াও বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনীতি পরিবর্তন করে দেওয়া ওয়ান ইলেভেনের সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার, নব্য স্বৈরাচার শেখ হাসিনার কারাগারেও এই সংশপ্তক রাজনীতিবিদ কারাবরণ করেছেন ।
মন্ত্রী হিসেবে রাষ্ট্রের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব সামলালেও তিনি যশোরকে ভুলে যাননি । যশোরের উন্নয়নে তিনি কিংবদন্তিতুল্য ভূমিকা রেখেছেন । যশোর বিজ্ঞান প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, যশোর মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, যশোর কারিগরি প্রশিক্ষণ মহাবিদ্যালয়, ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট হাসপাতাল, বিভাগীয় কাস্টমস অফিস, বেনাপোল স্থল বন্দর, আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিস, যশোর মডেল পৌরসভা, আঞ্চলিক পাঠাগার সহ অসংখ্য প্রতিষ্ঠান বিনির্মাণে ঐতিহাসিক ভূমিকা রাখেন।
এখন প্রশ্ন হল এই সংশপ্তক রাজনীতিবিদকে আমরা কেন মনে রাখব তিনি কি এখনো প্রাসঙ্গিক ? বিশেষ করে দেশে অসংখ্য রাজনীতিবিদ রয়েছেন । তরিকুল ইসলাম রাজনীতিতে যেসব পজিশন পেয়েছিলেন সেগুলো অনেকেই পেয়েছেন । অনেকেই বিভিন্ন মন্ত্রণালয় দায়িত্ব পালন করেছেন । তাহলেও আমরা তাঁকে কিভাবে স্মরণ করব ?
প্রথমত: তরিকুল ইসলাম একেবারে কিশোর বয়স থেকে রাজনীতিতে যুক্ত ছিলেন । প্রথম জীবনে ছাত্র ইউনিয়নের রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন এরপর ন্যাপের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হন এবং সত্তরের দশকের শেষের দিকে জাতীয়তাবাদী রাজনীতিতে যুক্ত হন । কিশোর বয়স থেকে জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত করেছেন রাজনীতি। করেছেন মুক্তিযুদ্ধ । তিনি জীবনে একটি কাজ করেননি ! সেটি হলো আওয়ামী লীগের রাজনীতি । আওয়ামী লীগ প্রগতিশীলতার কথা বলে আওয়ামী লীগ মুক্তি যুদ্ধের কথাও বলে । তরিকুল ইসলামের জীবনব্যাপী রাজনৈতিক দর্শনে প্রগতিশীলতা ও মুক্তিযুদ্ধ ছিল । কিন্তু তিনি সারা জীবনে আওয়ামী লীগ করেননি। তাঁর রাজনৈতিক জীবন দ্ব্যার্থহীনভাবে এটা প্রমাণ করে প্রগতিশীলতা ও মুক্তিযুদ্ধ আওয়ামী লীগের পৈত্রিক সম্পত্তি নয়।
দ্বিতীয়ত: ১৯৮১ সালে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান যখন শহীদ হন তখন বিএনপির শৈশবস্থা । দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্রের সারথি স্বৈরাচার এরশাদ জাতীয়তাবাদী রাজনীতি নির্মূলে যখন বিএনপি ভাঙার এজেন্ডা বাস্তবায়নে ব্যস্ত তখন যেসব জাতীয়তাবাদী সৈনিক দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার পক্ষে শক্ত অবস্থান নেন তাদের মধ্যে তরিকুল ইসলাম অগ্রগণ্য । জাতীয়তাবাদী রাজনীতির স্বপক্ষে আশির দশকের প্রথম দিকে তরিকুল ইসলামের সেই পদক্ষেপ, তার ব্যক্তিগত জীবনে নিদারণ বিপর্যয় নিয়ে আসলেও সামগ্রিক রাজনীতিতে পরবর্তীতে সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলেছিল । স্বৈরাচার এরশাদের কারাগারে নিদারুণ নির্যাতন ভোগ করেও তিনি ত্যাগের রাজনীতির আদর্শ স্থাপন করেন জাতীয়তাবাদী রাজনীতিতে ।
তৃতীয়ত: বাংলাদেশের রাজনীতিতে কিছু মাইল ফলক রয়েছে যেমন -১৯৭১ এর মুক্তিযুদ্ধ, ৭৫ এর ১৫ ই আগস্ট, ৭৫ এর ০৭ই নভেম্বর, ৩০ মে ১৯৮১, এবং ১১ই জানুয়ারি ২০০৭। এগুলো প্রত্যেকটি আমাদের জাতীয় জীবনে সুদূরপ্রসারি ও তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। সর্বশেষ ১১ই জানুয়ারি ২০০৭ সালের সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ক্যু টি ছিল দেশি-বিদেশি চক্রের “রেজিম চেঞ্জ” রাজনীতির অংশ । এই রাজনীতির ধারাবাহিকতায় দেশে এখন গণতন্ত্র অনির্দিষ্ট সময়ের জন্য নির্বাসিত হয়ে গেছে! সেই সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার এসেই তরিকুল ইসলামকে এ্যারেস্ট করেছিল । কেন? তাদের বাসনায় ছিল জাতীয়তাবাদী রাজনীতি নির্মূল করতে হবে । এ লক্ষ্যে তারা জাতীয়তাবাদী রাজনীতির নিউক্লিয়াস দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে মাইনাসের যেমন ষড়যন্ত্র করে তেমনি পরিক্ষিত জাতীয়তাবাদী নেতাদেরনেতাদেরও টার্গেট করা হয় । তারা সেই বাসনাতেই, পূর্ব অভিজ্ঞতাতেই (স্বৈরাচার এরশাদ) সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার তরিকুল ইসলামকে টার্গেট করেছিলেন । প্রথম আঘাতেই যেসব নেতা এ্যারেস্ট হয়েছিলেন তাঁর মধ্যে তরিকুল ইসলাম অগ্রগণ্য । এতে তাঁর রাজনৈতিক পরিশুদ্ধতার পরিচয় পাওয়া যায় ।
চতুর্থত: পূর্বে যেমনটি বললাম ওয়ান ইলেভেন সৃষ্টি হয়েছিল জাতীয়তাবাদী রাজনীতিকে নির্মূল করার দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্রের এজেন্ডা নিয়ে । এখন এই ২০২২ সালে এসে মনে হচ্ছে জাতীয়তাবাদী রাজনীতি নির্মূল করা সম্ভব নয়, ফিনিক্স পাখির মতোই এটি ধ্বংসস্তূপ থেকে জেগে উঠবে। বিএনপি’র এই পুনরুজ্জীবনের পেছনের দর্শনটা কি? বিএনপি’র জাতীয়তাবাদী রাজনীতির দার্শনিকভিত্তি দাড় করাতে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান সহযোদ্ধা হিসেবে প্রথম যেসব নেতৃবৃন্দকে পেয়েছিলেন তরিকুল ইসলাম তাদের মধ্যে অগ্রগণ্য ।তিনি স্বৈরাচারের কারাগারে অকথ্য নির্যাতন সয়েছেন কিন্তু দলের আদর্শের প্রতি অবিচল ছিলেন সর্বক্ষণ । তিনি ১৯৮৭ সালেই ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব হয়েছিলেন । দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া তাকে বারবার মহাসচিব এর দায়িত্ব নিতে বললেও তিনি বারবার প্রত্যাখ্যান করেছেন অসুস্থতার কারণে । সর্বশেষ ২০০৯ সালের পরেও তাঁকে কয়েকবার মহাসচিব এর প্রস্তাব দিবে তিনি অসুস্থতার কারণে প্রত্যাখ্যান করেন । তিনি অসুস্থতার মাঝেই মহাসচিব এর দায়িত্ব নিতে পারতেন কিন্তু তিনি সেটা করেননি, তাঁর অসাধারণ রাজনৈতিক সততার কারণে । মহাসচিবের পদটি তিনি দেখেছিলেন দায়িত্ব হিসেবে। এমন উদাহরণ আমাদের দেশে বিরল । বাংলাদেশের জাতীয়তাবাদী রাজনীতি গর্বের সঙ্গে স্মরণ করতে পারে আমাদের একজন তরিকুল ইসলাম ছিলেন, যিনি ত্যাগ ও আদর্শে অনুকরণীয়।
একজন তরিকুল ইসলাম জাতীয়তাবাদী রাজনীতিতে মুক্তিযুদ্ধ ও প্রগতিশীলতার অনন্য অনুপম নিদর্শন হিসেবে ভাবিকালের জাতীয়তাবাদী কর্মীদের উদ্দীপ্ত করবে নিঃসন্দেহে । তিনি একজন সংশপ্তক জাতীয়তাবাদী রাজনীতিবিদ হিসেবে বাংলাদেশের রাজনীতিতে স্মরণীয় থাকবেন ।
তাঁর মৃত্যু দিবসে রইল অকৃত্রিম শ্রদ্ধাঞ্জলি ।

 
 
জনতার আওয়াজ/আ আ
 
 

জনপ্রিয় সংবাদ

 

সর্বোচ্চ পঠিত সংবাদ