তৃণমূলে বিএনপির নেতাকর্মীদের মধ্যে নতুন করে গ্রেপ্তার আতঙ্ক দেখা দিয়েছে
নিজস্ব প্রতিবেদক, জনতার আওয়াজ ডটকম
প্রকাশের তারিখ:
শুক্রবার, ফেব্রুয়ারি ১০, ২০২৩ ৩:০৬ অপরাহ্ণ পরিবর্তনের তারিখ:
শুক্রবার, ফেব্রুয়ারি ১০, ২০২৩ ৩:০৬ অপরাহ্ণ

নিত্যপণ্যের দাম কমানো এবং ১০ দফার ভিত্তিতে চলমান গণআন্দোলনের যুগপৎ কর্মসূচির অংশ হিসেবে ১১ ফেব্রুয়ারি ইউনিয়ন পর্যায়ে পদযাত্রা করবে বিএনপি ও সমমনা দলগুলো। এই কর্মসূচিকে ঘিরে নেতাকর্মীদের নতুন করে গ্রেপ্তার শুরু করেছে পুলিশ।
বিএনপির দাবি, গত দুদিনে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে অন্তত ৩৬ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এ ঘটনায় তৃণমূলে নেতাকর্মীদের মধ্যে নতুন করে গ্রেপ্তার আতঙ্ক দেখা দিয়েছে।
দলটির নেতারা বলছেন, নেতাকর্মীদের গ্রেপ্তার-হয়রানি করে চলমান আন্দোলনকে নস্যাৎ করতে চায় সরকার। তবে কোনো অবস্থাতেই পিছু হটবে না বিএনপি। সরকারের ফাঁদেও পা দেবে না। শান্তিপূর্ণ আন্দোলনে সরকারের পতন ঘটিয়ে নির্দলীয় সরকারের অধীনে সুষ্ঠু নির্বাচনের মধ্য দিয়ে দেশে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা হবে।
জানতে চাইলে বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক ও ভারপ্রাপ্ত দপ্তর সম্পাদক সৈয়দ এমরান সালেহ প্রিন্স বলেন, ১০ দফা ও জনগণের জীবিকার বিভিন্ন সমস্যা এবং সরকারের দুর্নীতি, লুটপাট, জনদুর্ভোগের বিরুদ্ধে গড়ে ওঠা গণআন্দোলন নস্যাৎ করতে সরকার দমন-পীড়ন অব্যাহত রেখেছে। নেতাকর্মীদের গ্রেপ্তার-হয়রানি করে আন্দোলনের কর্মসূচি বানচাল করতে চায় তারা। ১১ ফেব্রুয়ারি দেশব্যাপী ইউনিয়ন এবং ১২ ফেব্রুয়ারি ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির পদযাত্রার কর্মসূচিকে পণ্ড করতে নতুন করে নেতাকর্মীদের গ্রেপ্তার শুরু করেছে সরকার। তবে হামলা-মামলা-গ্রেপ্তার করে আন্দোলন দমানো যাবে না।
বিএনপির সিনিয়র নেতাদের দাবি, বিএনপি যখন সরকারবিরোধী চূড়ান্ত আন্দোলনের জন্য সর্বাত্মক প্রস্তুতি নিচ্ছে, তখন মামলা দিয়ে বিএনপিকে কাবু রাখতে চায় সরকার। কেন্দ্র থেকে শুরু করে তৃণমূলের সক্রিয় নেতাদের টার্গেট করে নতুন মামলা দেওয়া হচ্ছে অথবা অজ্ঞাতপরিচয় মামলার আসামি হিসেবে গ্রেপ্তার দেখানো হচ্ছে।
বিএনপির অভিযোগ, আওয়ামী লীগ ২০০৯ সালে ক্ষমতাসীন হওয়ার পর থেকেই বিএনপি নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে দমন-পীড়ন শুরু করেছে। আন্দোলন দমাতে মিথ্যা ও গায়েবি মামলাকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে। দলের কেন্দ্র থেকে তৃণমূলে এমন কোনো নেতা খুঁজে পাওয়া যাবে না যার বিরুদ্ধে একাধিক মামলা নেই। মামলা, গ্রেপ্তার, রিমান্ড ও হাজিরায় দলটির সারাদেশের নেতাকর্মীরা আজ পর্যুদস্ত।
জানা গেছে, বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে বর্তমানে ৩৭টি মামলা রয়েছে। ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের বিরুদ্ধে প্রায় দুই ডজন মামলা হয়েছে। এ ছাড়া দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের বিরুদ্ধে গত ১০ বছরে ৯২টি মামলা হয়েছে। স্থায়ী কমিটির প্রতিটি সদস্যের বিরুদ্ধেও একাধিক মামলা রয়েছে।
বিএনপির দপ্তর সূত্র জানায়, ২০০৯ থেকে ২০২২ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে মোট মামলার সংখ্যা ১ লাখ ১১ হাজার ৪২৭টি। মোট আসামি ৩৯ লাখ ৮৮ হাজারের বেশি। একই সময়ে ১ হাজার ৫৫২ জনকে হত্যা করা হয়েছে। বিএনপি ও জোটের ১ হাজার ২০৪ জন গুম থাকলেও ৭৮১ জনকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়। এর মধ্যে বিএনপির গুম ছিল ৪২৩ জন। বর্তমানে বিএনপিসহ বিভিন্ন অঙ্গ-সংগঠনের ৭২ জন নেতাকর্মী গুম রয়েছেন। এ ছাড়া গত ২২ আগস্ট থেকে ২৭ ডিসেম্বর পর্যন্ত ১ হাজার ৭৫০ জন নেতাকর্মী আহত ও জখম হয়েছেন।
গত বছরের ২২ আগস্ট থেকে একাধিক ইস্যুতে ধারাবাহিক কর্মসূচির মাধ্যমে আন্দোলনে নামে বিএনপির হাইকমান্ড। জেলা, মহানগর, উপজেলা এমনকি ইউনিয়ন পর্যায় পর্যন্ত বিক্ষোভ মিছিল সমাবেশ করেছে দলটি। এরপর ঢাকায় ১৬টি জনসভা করে মহানগর উত্তর ও দক্ষিণ বিএনপি। পরে বিভাগীয় গণসমাবেশের কর্মসূচি পালন করে দলটি, গত ১০ ডিসেম্বর ঢাকায় গণসমাবেশের মধ্য দিয়ে যা শেষ হয়। ঢাকা বিভাগীয় গণসমাবেশ থেকে নির্দলীয়-নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচনসহ ১০ দফার ভিত্তিতে যুগপৎ আন্দোলনের ঘোষণা দেয় বিএনপি। ২৪ ডিসেম্বর ঢাকার বাইরে এবং ৩০ ডিসেম্বর ঢাকায় গণমিছিলের মধ্য দিয়ে যুগপৎ আন্দোলন শুরু করে বিএনপি ও সমমনা দলগুলো। এরপর ১১ জানুয়ারি দেশব্যাপী গণঅবস্থান, ১৬ ও ২৫ জানুয়ারি বিক্ষোভ মিছিল সমাবেশ, ৪ ফেব্রুয়ারি বিভাগীয় সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। যুগপৎ আন্দোলনের ষষ্ঠ কর্মসূচি হিসেবে শনিবার ১১ ফেব্রুয়ারি দেশব্যাপী ইউনিয়ন পর্যায়ে পদযাত্রা হবে।
বিএনপি নেতারা জানান, ওইসব কর্মসূচির আগে ও পরে দলটির নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে বেড়েছে মামলা-গ্রেপ্তার। নতুন-পুরোনো মামলায় প্রায় প্রতিদিনই গ্রেপ্তারের খবর আসছে। জামিন নিতে তাদের ছুটতে হচ্ছে আদালতে, সময় কাটছে আদালতের বারান্দায়। আবার অনেকেই গ্রেপ্তার ও হয়রানি আতঙ্কে ঘরছাড়া, গ্রামছাড়া। তাই এসব মামলা-গ্রেপ্তারের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে বিএনপির হাইকমান্ডকে সরকারবিরোধী চূড়ান্ত আন্দোলনের ছক কষতে হচ্ছে।
বিএনপির দপ্তর সূত্র জানায়, গত ১০ ডিসেম্বর থেকে এ পর্যন্ত নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে ৫৪২টি। এসব মামলায় ১৯ হাজার ১১৩ জনকে আসামি এবং ৭৮ হাজার অজ্ঞাতপরিচয় আসামি করা হয়েছে। গ্রেপ্তার করা হয়েছে ২ হাজার ৫৫৫ জনকে। সবচেয়ে বেশি মামলা হয়েছে ঢাকা (৬৮টি) ও রাজশাহী মহানগরে (১৭টি) এবং গাজীপুর (৭৮টি) ও পঞ্চগড় (১৭টি) জেলায়।
ইউনিয়ন পদযাত্রা অব্যাহত থাকবে: প্রিন্স
এদিকে, তুরস্ক ও সিরিয়ায় ভয়াবহ ভূমিকম্পে বিপুল প্রাণহাণির প্রেক্ষাপটে ঢাকা মহানগর দক্ষিণের গতকালের পদযাত্রা স্থগিত করলেও ১১ ফেব্রুয়ারি ইউনিয়ন পদযাত্রা এবং ১২ ফেব্রুয়ারি মহানগর উত্তরের পদযাত্রা অপরিবর্তিত থাকবে বলে জানিয়েছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত দফতর সম্পাদক সৈয়দ এমরান সালেহ প্রিন্স।
সেইসঙ্গে বিএনপির স্বেচ্ছাসেবক বিষয়ক সম্পাদক মীর সরফত আলী সপুকে গ্রেপ্তারের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, সপুকে গ্রেপ্তার চলমান আন্দোলনে নেতাকর্মীদের ভীত করার সরকারি অপকৌশল মাত্র। তিনি অবিলম্বে সপুসহ গ্রেপ্তারকৃত সকল নেতাকর্মীর নিঃশর্ত মুক্তি এবং সারাদেশে গ্রেপ্তার ও হয়রানি বন্ধের দাবি জানান।
জনতার আওয়াজ/আ আ