তৃণমূল থেকে আন্দোলন শুরু করে ধাপে ধাপে সেটিকে রাজধানীমুখী করার চিন্তা রয়েছে হাইকমান্ডের
নিজস্ব প্রতিবেদক, জনতার আওয়াজ ডটকম
প্রকাশের তারিখ:
মঙ্গলবার, এপ্রিল ১১, ২০২৩ ৯:০৪ পূর্বাহ্ণ পরিবর্তনের তারিখ:
মঙ্গলবার, এপ্রিল ১১, ২০২৩ ৯:০৪ পূর্বাহ্ণ

ডেস্ক নিউজ
ঈদুল ফিতরের পর সরকারবিরোধী আন্দোলন আরও বেগবান করবে ১০ দফার ভিত্তিতে যুগপৎ আন্দোলনে থাকা বিএনপি। তবে দলটির টার্গেট সেপ্টেম্বর, অক্টোবর ও নভেম্বর এই তিন মাস। অবশ্য এর আগে জুন-জুলাই থেকেই কর্মসূচির ধরনে পরিবর্তন আসতে পারে। আর সেপ্টেম্বর থেকেই চূড়ান্ত আন্দোলনে যেতে চান নীতিনির্ধারকরা। এবার তৃণমূল থেকে আন্দোলন শুরু করে ধাপে ধাপে সেটিকে রাজধানীমুখী করার চিন্তা রয়েছে হাইকমান্ডের। চলমান আন্দোলনকে ‘চূড়ান্ত রূপ’ দিতে এমন পরিকল্পনা নিয়ে রোডম্যাপ তৈরি করছে বিএনপি। দুই ঈদ এবং বর্ষা মৌসুমের বিষয়টি মাথায় রেখে আন্দোলনের পরিকল্পনা সাজাচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা। তবে ঈদুল ফিতরের আগেই রূপরেখা চূড়ান্ত করে যুগপৎ শরিকদেরও তা জানিয়ে দেবে বিএনপি। সেই রূপরেখা অনুযায়ী ঈদের পর থেকে আন্দোলন শুরু হবে।
দলীয় সূত্রে জানা গেছে, বিভাগীয় গণসমাবেশে সরকারি প্রতিবন্ধকতা উপেক্ষা করে নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণে আন্দোলনের যে আবহ তৈরি হয়েছিল—ঈদের পরে আন্দোলনকে আবার সে জায়গায় নিতে চায় বিএনপি। তবে দলটির নীতিনির্ধারকদের দৃষ্টি, ‘নির্বাচনকালীন সরকার গঠন’ এবং দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনের তপশিলের দিকে। বিএনপি মনে করছে, নভেম্বর নাগাদ এই দুটি কাজ সম্পন্ন হবে। দাবি আদায়ে তার আগেই ‘অলআউট’ আন্দোলনে যাবে দলটি, যেটি হবে স্বল্পকালীন সময়ের। সে লক্ষ্যে হাইকমান্ডের নির্দেশে বিএনপি নেতারা এখন সারা দেশে ইফতার মাহফিলের মধ্য দিয়ে নেতাকর্মীদের সংগঠিত ও আন্দোলনের জন্য সংগঠনকে প্রস্তুত করছেন।
জানতে চাইলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সিনিয়র সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেন, আমরা আন্দোলনে আছি। দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চলবে। আন্দোলনে নেতাকর্মীদের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ ক্রমেই বাড়ছে। এটা দেখে ক্ষমতা হারানোর ভয়ে সরকার ভীত হয়ে পড়েছে। সেজন্য আন্দোলন দমাতে মামলা-হামলা, গ্রেপ্তার, অত্যাচার-নির্যাতনের মাত্রা বাড়িয়ে দিয়েছে। সব ফ্যাসিস্ট সরকারই তাই করে; কিন্তু এসব করে এবার আর পার পাওয়া যাবে না। জনগণের চলমান আন্দোলনেই তাদের বিদায় নিতে হবে। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আন্দোলন চলছে, ক্রমেই তা বেগবান হবে। তবে কোন পর্যায়ে গিয়ে সেটা চূড়ান্ত রূপ লাভ করবে, তা আন্দোলনের পরিবেশ-পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করবে।
২০১৮ সালের ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত একাদশ সংসদ নির্বাচনে ভরাডুবির পর ঘুরে দাঁড়াতে সংগঠন পুনর্গঠনের কাজে মনোযোগ দেয় বিএনপি। তৃণমূলে সংগঠন গুছিয়ে দীর্ঘ সময় পর গত ২২ আগস্ট থেকে জনস্বার্থ ইস্যুতে দেশব্যাপী ধারাবাহিক কর্মসূচি দিয়ে মাঠে নামে দলটি। জ্বালানি তেল, পরিবহন ভাড়াসহ দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির প্রতিবাদে উপজেলা, থানা, ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড পর্যায়ে সভা, সমাবেশ ও বিক্ষোভ মিছিলের কর্মসূচি পালন করে। পরে ঢাকা মহানগরে ১৬ জনসভার পর ঢাকাসহ সব বিভাগীয় শহরে গণসমাবেশ করে বিএনপি। দলটির দাবি, ওইসব গণসমাবেশে সরকারি শত বাধা পেরিয়ে নেতাকর্মীদের পাশাপাশি সাধারণ মানুষ ব্যাপকভাবে অংশগ্রহণ করেছে। এর মধ্য দিয়ে জনগণ বিএনপির আন্দোলনের প্রতি সমর্থন এবং সরকারের প্রতি অনাস্থা জানিয়েছে। ওই ১০ সাংগঠনিক বিভাগীয় গণসমাবেশের মাধ্যমে ‘আন্দোলনের ভিত্তি’ তৈরি হয়েছে বলে দাবি নেতাদের।
এরপর ১০ ডিসেম্বর ঢাকার গণসমাবেশ থেকে যুগপৎ আন্দোলনের ঘোষণা দেয় বিএনপি। আওয়ামী লীগ সরকারের পদত্যাগ ও নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনসহ ১০ দফা দাবি আদায়ে গত ২৪ ডিসেম্বর থেকে যুগপৎ আন্দোলন শুরু হয়। এ আন্দোলনে সমমনা ৩৮টি রাজনৈতিক দল সম্পৃক্ত হয়েছে। গত শনিবার যুগপতের সবশেষ কর্মসূচি পালিত হয়েছে। এ ছাড়া রমজানে ১০ থেকে ১৬ এপ্রিল পর্যন্ত দেশব্যাপী বিভাগভিত্তিক ইউনিয়ন পর্যায়ে মানববন্ধন/অবস্থান, প্রচারপত্র বিতরণ কর্মসূচি পালিত হবে।
বিএনপির নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের দুজন নেতা বলেন, রমজানে ইফতার মাহফিলের মধ্য দিয়ে নেতাকর্মীদের সংগঠিত এবং বড় আন্দোলনের জন্য সংগঠনকে প্রস্তুত করা হচ্ছে। বিভাগ, জেলা, উপজেলা, ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড পর্যায়ে ইফতারের মধ্য দিয়ে আমরা সেটা করছি। সেখানে আন্দোলনের বার্তাও দেওয়া হচ্ছে। শুধু নেতাকর্মীরা নয়, স্থানীয় জনসাধারণও সেখানে অংশগ্রহণ করছেন। সাধারণ মানুষ এখন বিএনপির রাজনৈতিক কর্মসূচির পাশাপাশি সাংগঠনিক কর্মসূচিতেও অংশ নিচ্ছেন।
তারা আরও বলেন, সর্বাত্মক আন্দোলন সামনে রেখে এরই মধ্যে দলের কাঠামোর বাইরে গিয়ে বর্তমান ও সাবেক প্রায় তিন হাজার ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যানের সঙ্গে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান ভার্চুয়ালি মতবিনিময় করেছেন। এই জনপ্রতিনিধিদের তৃণমূল পর্যায়ে সাধারণ মানুষকে সংগঠিত করতে বলেছেন। এখন বিভাগ এবং জেলা পর্যায়ে দল, অঙ্গ ও সংগঠনের ইফতার মাহফিলে ভার্চুয়ালি যুক্ত হয়ে নেতাকর্মীদের উজ্জীবিত ও সংগঠিত করার চেষ্টা করছেন। এ ছাড়া সিনিয়র নেতারাও তৃণমূলের বিভিন্ন জায়গায় যাচ্ছেন। উদ্দেশ্য, আগামীতে সর্বাত্মক এবং সর্বব্যাপী আন্দোলনের ক্ষেত্র প্রস্তুত করা।
ঈদের পরে কী ধরনের কর্মসূচি আসতে পারে জানতে চাইলে তারা বলেন, ‘সেটা নিয়ে আলোচনা চলছে। আমরা এরই মধ্যে গণমিছিল, মিছিল, অবস্থান, সমাবেশ, পদযাত্রা, মানববন্ধনের মতো কর্মসূচি পালন করেছি। এখন নতুন কিছু ভাবা হচ্ছে। ঈদের পরে রাজধানী ঢাকা ছাড়াও বিভাগীয়, জেলা, উপজেলা, থানা এমনকি ইউনিয়ন পর্যায় পর্যন্ত আন্দোলনের ব্যাপকতা বাড়বে। আন্দোলনের মধ্য দিয়ে সরকারকে দাবি মানতে বাধ্য করা হবে।
বিএনপির নীতিনির্ধারকরা মনে করছেন, সরকার সংবিধানের বাইরে যাবে না। দশম ও একাদশ সংসদের মতো এবারও দলীয় সরকারের অধীনেই নির্বাচন করতে চাইবে। এমন প্রেক্ষাপটে দাবি আদায়ে কঠোর আন্দোলনের বিকল্প নেই। দলীয় সূত্রে জানা গেছে, সরকারবিরোধী চলমান আন্দোলনকে ধাপে ধাপে চূড়ান্ত আন্দোলনে রূপ দিতে চায় বিএনপি। এবার তৃণমূল থেকে আন্দোলন শুরু করে সেটিকে পর্যায়ক্রমে ঢাকামুখী করার কথা ভাবছে হাইকমান্ড। এক্ষেত্রে তৃণমূল থেকে কেন্দ্র পর্যন্ত ঘুরেফিরে কর্মসূচি দেওয়া হবে। আর তৃণমূলে কয়েক ধাপের কর্মসূচি শেষে দেওয়া হবে রাজধানীকেন্দ্রিক কর্মসূচি। সে ক্ষেত্রে হরতাল-অবরোধের মতো সহিংস কর্মসূচির পরিবর্তে সচিবালয় ঘেরাও, ঢাকামুখী লংমার্চ, রোডমার্চ, চলো চলো ঢাকা চলো এ ধরনের কর্মসূচির কথা বিবেচনা করা হচ্ছে। এ ছাড়া জনস্বার্থ ইস্যুতেও কর্মসূচি অব্যাহত রাখবে বিএনপি। তবে আন্দোলনের চূড়ান্ত পর্যায়ে হরতাল-অবরোধের মতো কর্মসূচিও আসতে পারে বলে জানান দলটির নেতারা।
আন্দোলন প্রসঙ্গে জানতে চাইলে বিএনপির সাংগঠনিক ও ভারপ্রাপ্ত দপ্তর সম্পাদক সৈয়দ এমরান সালেহ প্রিন্স বলেন, নিত্যপণ্যের দামের ঊর্ধ্বগতি, সরকারের সর্বগ্রাসী দুর্নীতির প্রতিবাদ এবং নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনসহ ১০ দফা দাবি আদায়ে আমরা আন্দোলনে রয়েছি। রোজার মাসেও আমরা কর্মসূচি দিতে বাধ্য হয়েছি। এসব কর্মসূচিতে নেতাকর্মীদের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের ব্যাপক উপস্থিতি আমরা দেখছি। সরকারও তার অবস্থান পরিষ্কার করেছে। তাদের দিয়ে যে নিত্যপণ্যের দাম কমবে না এবং দুর্নীতিও কমবে না সেটা এরই মধ্যে প্রমাণিত হয়েছে। সুতরাং আমাদের আন্দোলনের গতি বাড়ানো ছাড়া পথ নেই। রোজার মধ্যেও আমরা তীব্র গতিতে আন্দোলন করছি, রোজার পরেও সে ধারা অব্যাহত থাকবে এবং আন্দোলনের গতি আরও বাড়বে।
এদিকে গত ৭ এপ্রিল যুগপতের শরিক ১২ দলীয় জোটের সঙ্গে বৈঠকে আন্দোলনের রোডম্যাপ প্রণয়নের বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করে বিএনপি। এ বিষয়ে বৈঠকে উপস্থিত ১২ দলীয় জোটের এক নেতা জানান, বৈঠকে বিএনপির পক্ষ থেকে তাদের জানানো হয়েছে, ঈদের পরে চলমান আন্দোলন আরও বেগবান হবে। সেটার রোডম্যাপ প্রণয়ন করা হচ্ছে। ঈদের আগেই তা চূড়ান্ত করে যুগপতের শরিকদের জানিয়ে দেওয়া হবে, যাতে ঈদের পরে তাৎক্ষণিকভাবে আন্দোলন শুরু করা যায়।
জনতার আওয়াজ/আ আ