তেল পেতে রোদে পুড়ে দীর্ঘ অপেক্ষা ‘এ যেন মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা’
নিজস্ব প্রতিবেদক, জনতার আওয়াজ ডটকম
প্রকাশের তারিখ:
সোমবার, এপ্রিল ২০, ২০২৬ ১:৫১ অপরাহ্ণ পরিবর্তনের তারিখ:
সোমবার, এপ্রিল ২০, ২০২৬ ১:৫১ অপরাহ্ণ

জনতার আওয়াজ ডেস্ক
ছবি সংগৃহীত
‘জ্বালানি তেলের দাম বাড়িয়ে পেট্রল পাম্পের দুর্ভোগ কমানো সম্ভব না। বরং জ্বালানির দাম একসঙ্গে এত পরিমাণে বাড়িয়ে আমাদের মতো স্বল্প আয়ের মানুষের আরও বাড়তি খরচের চাপ ফেলা হলো। এ যেন মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা। কেননা, জ্বালানি তেলের এই মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব পড়বে আমাদের দৈনন্দিন জীবনযাপনের সবখানে। তারপরও আমরা চাই, তেল সরবরাহ স্বাভাবিক হোক।’
রবিবার (১৯ এপ্রিল) দুপুরে রাজধানীর বিমানবন্দর রেলওয়ে স্টেশনসংলগ্ন ‘ডিএল ফিলিং স্টেশনে’ জ্বালানি তেলের জন্য দীর্ঘ লাইনে অপেক্ষায় থাকা গ্রাহক শেখ সাহেব আলম ক্ষোভের সঙ্গে এসব কথা বলেন।
এ সময় তিনি বলেন, ‘সামান্য পরিমাণে তেল পেতেও দিনরাত রোদে পুড়ে বা অসহনীয় গরমের মাঝে অপেক্ষা করতে হয়। তার মাঝে যদি জ্বালানির দাম বাড়ানো হয় এবং গ্রাহকদের তেল দেওয়ার পরিমাণও যদি আগের মতোই থাকে, তাহলে দুর্ভোগ কীভাবে কমবে? পেট্রল পাম্পের ভোগান্তি দূর করতে হলে গ্রাহকদের চাহিদামতো তেল দিতে হবে।’
গতকাল পৃথক সময়ে রাজধানীর আসাদগেটে সোনার বাংলা ফিলিং স্টেশনে কথা হয় বাইকচালক মো. তোফাজ্জল হোসেনের সঙ্গে।
তিনি বলেন, ‘সাড়ে ৮ ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থেকে ৫০০ টাকার অকটেন পেলাম। আরও দুঃখের বিষয়, লিটারে ২০ টাকা বাড়ানোর কারণে আগের তুলনায় কম তেল পেলাম। এতে ভোগান্তি আরও বাড়ল। কেননা, আগে ৫০০ টাকায় ৪ লিটারের বেশি পেতাম। এখন সাড়ে ৩ লিটারে নেমে গেছে, যা দিয়ে ৩ দিনও যাবে না। তাহলে ভোগান্তির পরিস্থিতি কোথায় দাঁড়াচ্ছে, সহজেই বোঝা যাচ্ছে।’
শুধু তোফাজ্জল কিংবা শেখ সাহেব আলম নন, অধিকাংশ চালক জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর পর ক্ষোভের সঙ্গে প্রায় অভিন্ন ভোগান্তির কথা জানান। তাদের অভিযোগ, ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়েও তেল পাচ্ছেন না। দীর্ঘ এই সময়ে রোদে পুড়ে কলা, রুটি, চা খেয়েই পার করছেন দীর্ঘ সময়। বৈশাখের প্রচণ্ড গরমে অনেকেই ক্লান্ত হয়ে মোটরসাইকেলেই ঘুমিয়ে পড়েন। অনেক ফিলিং স্টেশন ঝামেলা এড়াতে দিনে বন্ধ রেখে রাতে জ্বালানি তেল বিক্রি করছে।
মোটরসাইকেলচালক ইয়াসিন আলী খবরের কাগজকে বলেন, ‘সকাল ৮টায় মোহাম্মদপুরের টাউন হল বাজারের ভেতরে লাইনে দাঁড়াই। ঘণ্টার পর ঘণ্টা রোদে পুড়ে পোস্ট অফিসের সামনে আসি দুপুর ১২টার দিকে। কলা, রুটি খেয়ে অবশেষে ৪টার দিকে মাত্র ৫০০ টাকার তেল পেলাম। কিন্তু আগের তুলনায় তো পরিমাণে কম। দাম বাড়ায় তেলের পরিমাণ কমে গেছে। কিন্তু ভোগান্তি তো কমেনি। আগের মতোই সেই দীর্ঘ লাইন। যেই লাউ সেই কদু।’
সবাই কমবেশি ৬ থেকে ৯ ঘণ্টা পর্যন্ত অপেক্ষা করেন।
বিভিন্ন ফিলিং স্টেশনে চালকরা অভিযোগ করেছেন, গত শনিবার হঠাৎ করে অকটেনের দাম লিটারে ২০ টাকা বাড়িয়ে ১৪০ টাকা করা হয়েছে। পেট্রলের দাম লিটারপ্রতি ১৯ টাকা বাড়িয়ে ১৩৫ টাকা ও ডিজেলের দাম লিটারে ১৫ টাকা বাড়িয়ে ১১৫ টাকা নির্ধারণ করেছে সরকার। কেরোসিনের দাম ১৮ টাকা বাড়িয়ে ১৩০ টাকা করা হয়েছে। তারপরও ফিলিং স্টেশনে আগের মতোই মোটরসাইকেলে ৫০০ টাকার, ব্যক্তিগত গাড়িতে ২ হাজার ও মাইক্রোবাসে ৩ হাজার টাকার তেল দেওয়া হয়।
তাদের অভিযোগের ব্যাপারে রাজধানীর আসাদগেট এলাকার সোনার বাংলা ফিলিং স্টেশনের ম্যানেজার সজীব সরকার শংকর খবরের কাগজকে বলেন, ‘দাম বাড়ানো হলেও আমরা তো বেশি তেল পাচ্ছি না। তাহলে কীভাবে বেশি করে দেব? তবে ফুয়েল পাস রেজিস্ট্রেশন হলেই ১ হাজার টাকার তেল দেওয়া হচ্ছে বাইকে।’
চালকদের দীর্ঘ লাইনের ব্যাপারে তিনি বলেন, ‘অধিকাংশ ফিলিং স্টেশন তেল দিতে পারলে চালকের লাইন ছোট হবে। তাই সরকারকে উদ্যোগ নিতে হবে যাতে সবাই তেল পায়। আমরা যমুনার বড় ডিলার। প্রতিনিয়ত চেষ্টা করছি সবাইকে তেল দেওয়ার। যতক্ষণ থাকছে ততক্ষণ তা দিচ্ছি। না থাকলে হয়তো পাম্প বন্ধ থাকে।’
এই পাম্পের বিপরীতেই তখন দেখা গেছে তালুকদার ফিলিং স্টেশন বন্ধ। বাঁশ ও রশি দিয়ে আটকানো। ভেতরে কিছু মোটরসাইকেল ও ব্যক্তিগত গাড়ি আটকে আছে। সড়কে বাইকচালক ও ব্যক্তিগত গাড়ির চালকদের দীর্ঘ লাইন গণভবন ছাড়িয়ে যায়।
এ ব্যাপারে ধানমন্ডি ১১ নম্বর এলাকার চালক মো. সাহাবুদ্দিন খবরের কাগজকে বলেন, ‘ভোর ৫টায় সংসদ ভবনের পূর্ব দিকে মণিপুরি পাড়ার দিকে লাইনে দাঁড়াই। এখানে এসেছি দুপুর ১২টায়। তখন থেকেই অপেক্ষা করছি, কখন তেল পাব জানি না। তবে ৬টার পর ডিপো থেকে তেলের গাড়ি আসবে বলে পাম্প থেকে বলা হচ্ছে। সেই আশায় দাঁড়িয়ে আছি। অন্য পাম্পে গিয়েও তো লাভ নেই, সব জায়গাতে একই ভোগান্তি।’
তালুকদার ফিলিং স্টেশন পাম্প বন্ধের ব্যাপারে হিসাবরক্ষক বিমল কৃষ্ণ মেহেদী খবরের কাগজকে বলেন, জ্বালানি তেল নিয়ে যে ঝামেলা হচ্ছে, তাতে পাম্প দিনের বেলায় বন্ধ রাখাই ভালো। অনেক সময় গ্রাহকরা দল বেঁধে চলে আসেন, যা সামলানো করা কঠিন হয়ে যায়। কারণ ডিপো থেকে চাহিদামতো তেল পাওয়া যায় না। দিনে সাড়ে ১৩ হাজার লিটার অকটেন ও ৯ হাজার লিটার ডিজেল দিচ্ছে সরকার, যা সন্ধ্যায় পেয়ে কয়েক ঘণ্টার মধ্যে রাত ১২ টার মধ্যেই শেষ হয়ে যাচ্ছে। বাধ্য হয়ে তাই দিনে বন্ধ রাখতে হচ্ছে।’
রাজধানীর মহাখালী, তেজগাঁও, নীলক্ষেত, কল্যাণপুর ফিলিং স্টেশনেও দেখা যায় একই দৃশ্য। তেল না থাকায় অধিকাংশ সময় বন্ধ। তারপর চালকদের দীর্ঘ লাইন। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরু হলে এই সংকট শুরু হয়।
জনতার আওয়াজ/আ আ