দরজা ভেঙে বাসা থেকে গ্রেপ্তার এ্যানীআমাকে থানায় নির্যাতন করা হয়েছে
নিজস্ব প্রতিবেদক, জনতার আওয়াজ ডটকম
প্রকাশের তারিখ:
বৃহস্পতিবার, অক্টোবর ১২, ২০২৩ ১:২৮ পূর্বাহ্ণ পরিবর্তনের তারিখ:
বৃহস্পতিবার, অক্টোবর ১২, ২০২৩ ১:২৮ পূর্বাহ্ণ

নিউজ ডেস্ক
বিএনপি’র প্রচার সম্পাদক ও লক্ষ্মীপুর জেলা বিএনপি’র সভাপতি শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানীকে তার বাসার দরজা ভেঙে থানায় নিয়ে পুরনো দু’টি মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়েছে পুলিশ। গতকাল তাকে আদালতে পাঠিয়ে সাত দিনের রিমান্ড আবেদন করে ধানমণ্ডি থানা পুলিশ। পরে আদালত শুনানি শেষে এ্যানীর চার দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। লক্ষ্মীপুর জেলায় ও রাজধানীর ধানমণ্ডির দু’টি মামলায় ওয়ারেন্টের ভিত্তিতে এ্যানিকে পুলিশ গ্রেপ্তার দেখালেও এসব মামলার বিষয়ে তিনি নিজেও জানতেন না। পুলিশ বলছে, ওয়ারেন্ট হলেও তিনি আদালতে হাজির হননি, জামিন নেননি। কোনো মামলায়ই হাজির হননি। ওয়ারেন্ট থাকায় তাকে পুলিশ গ্রেপ্তার করে। ওয়ারেন্টের কথা এ্যানিকে থানা পুলিশ বার বার জানিয়েছিল কিন্তু তিনি হাজির হননি। কিন্তু বিএনপির পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, সব মামলায় আদালত থেকে জামিনে আছেন এ্যানি। তারপরও পুলিশ তাকে আটক করেছে।
গভীর রাতে পুলিশ জোরপূর্বক তার বাসায় প্রবেশ করে তাকে আটক করে।
গত মঙ্গলবার দিবাগত রাতে প্রায় দেড় ঘণ্টার অভিযান চালিয়ে এ্যানিকে ধানমণ্ডি থানায় তুলে নেয়ার পর গতকাল দুপুরে এ্যানিকে আদালতে হাজির করে পুলিশ। এরপর মামলার সুষ্ঠু তদন্তের জন্য তাকে সাত দিনের রিমান্ডে নিতে আবেদন করেন মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ধানমণ্ডি থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) শাহিদী হাসান। মামলার শুনানিতে এ্যানি কিছু বলবেন কিনা জানতে চান বিচারক। এ্যানি বিচারকের সামনে কান্না জড়িত কণ্ঠে বলেন, আমি রাজনীতি করি। কোনো অপরাধ করলে গ্রেপ্তার করবে। কিন্তু আমাকে থানায় নিয়ে পুলিশের উপস্থিতিতে অত্যাচার-নির্যাতন করা হয়েছে। আমরা কোন যুগে বসবাস করছি। আমি কি চোর, না ডাকাত। এ্যানি আরও বলেন, রাত ৩টার সময় তারা এসে আমার বাসার দরজা ভাঙছে। আমি বলেছি আমাদের বাসায় ছোট ছোট বাচ্চা আছে। আমাকে যদি গ্রেপ্তার করতেই হয় আপনারা অপেক্ষা করুন। যেহেতু রাত ৩টা বেজে গেছে আমি ফজরের নামাজ পড়েই আপনাদের সঙ্গে যাবো। তারপরও তারা দরজা ভেঙেছে। ৫ মাস আগের মামলায় আমাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এতদিন ধরে আমি রাস্তায়ই ছিলাম। কয়েকবার ডিএমপি কমিশনারের কার্যালয়ে গিয়েছি, মিটিং করেছি। তখন কেন ধরলো না। রাত তিনটার সময় কেন আমাকে টেনেহিঁচড়ে বাসা থেকে বের করে আনবে। আমি একজন হার্টের রোগী। আমি এর বিচার চাই।
শুনানিতে এ্যানির পক্ষে এডভোকেট ওমর ফারুক ফারুকী, এডভোকেট মোসলেহ উদ্দিন জসিম, ইকবালসহ অর্ধশত আইনজীবী উপস্থিত ছিলেন। পরে এডভোকেট ওমর ফারুক ফারুকী মানবজমিনকে বলেন, আইনে সুস্পষ্টভাবে বলা আছে আসামিকে কখন আটক করা যাবে আর কখন করা যাবে না। অথচ আইনকে অবজ্ঞা করে পুলিশ মধ্য রাতে একজন রাজনৈতিক ব্যক্তিকে তার বাসগৃহের দরজা ভেঙে আটক করেছে। এটা মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন। আমরা আদালতে এসব বিষয় তুলে ধরেছি। শুনানি শেষে আদালত তার চারদিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছে। তিনি বলেন, সরকার বিরোধী দলের আন্দোলনকে নস্যাৎ করতে গ্রেপ্তার ও রিমান্ডের মতো পথ বেছে নিয়েছে।
এ্যানিকে যে মামলায় রিমান্ডে আনা হয়েছে ওই মামলার অভিযোগ থেকে জানা যায়, গত ২৩শে মে ২০২৩ ধানমণ্ডি সিটি কলেজের সামনে বিএনপি’র বিভিন্ন অঙ্গ-সংগঠনের প্রায় ১০-১৫ হাজার নেতাকর্মী জড়ো হয়ে পদযাত্রার সমাপনী বক্তব্য শেষে চলে যাওয়ার প্রাক্কালে দেশীয় অস্ত্রশস্ত্র, লাঠিসোটা, ইটপাটকেল ও ককটেল ইত্যাদি মারাত্মক অস্ত্রশস্ত্রসহ পুলিশের সরকারি কাজে বাধাদান, পুলিশের ওপর আক্রমণ, সরকারকে উৎখাত ও জনসাধারণের জানমালের ক্ষতিসাধন, গণপরিবহন ভাঙচুর করে ক্ষতিসাধন, ককটেল বিস্ফোরণ করে ত্রাস সৃষ্টি ও নাশকতামূলক কর্মকাণ্ড শুরু করে। এ সময় পুলিশ বাধা দিলে পুলিশের ওপর হামলা করে এবং ইটপাটকেল নিক্ষেপ করে। এতে পুলিশ অফিসার ও ফোর্স গুরুতর আহত হন। পরে সরকারি সম্পত্তি, জনসাধারণের জানমালের নিরাপত্তার জন্য বেআইনি সমাবেশ ছত্রভঙ্গ করার জন্য আসামিদের ধাওয়া করলে আসামিরা ঘটনাস্থল থেকে বিভিন্নভাবে ছত্রভঙ্গ হয়ে বিভিন্ন দিকে দৌড়ে পালিয়ে যায়। এ ঘটনায় ধানমণ্ডি থানায় পুলিশ বাদী হয়ে একটি মামলা করে।
এ্যানির বাসায় কী ঘটেছিল ওই রাতে: সরজমিন গতকাল শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানীর ধানমণ্ডির বাসায় গিয়ে দেখা যায়, তার ফ্ল্যাট এ-২ এর দরজার লক ভাঙা। বাসায় কেউ নেই। বাসাটির নিরাপত্তারক্ষী, কেয়ারটেকার কেউ মুখ খুলছেন না ভয়ে। রাতের ওই ঘটনাটি সকলেই এড়িয়ে যেতে চান। নাম না জানানোর শর্তে বাড়ির একজন স্টাফ বলেন, আমরা এখানে কাজ করি। এটা পুলিশের বিষয়। আমরা পরিবার-পরিজন নিয়ে থাকি। তাই ঝামেলায় জড়ানোর ভয়ে কেউ কিছু বলতে চাচ্ছি না। গত মঙ্গলবার দিবাগত রাত ১টার পর বেশ কয়েকজন পুলিশ আসেন। এসে গেট খুলতে বলেন। গেট খোলার পর তারা এ্যানি স্যারের বাসায় যান। অনেক ধাক্কাধাক্কি করেন। প্রায় ঘণ্টাখানেক ধরে বাসার দরজা খোলা নিয়ে পুলিশ সদস্য ও এ্যানি স্যারের মধ্যে তর্কাতর্কি চলে। স্যার বার বার বলছিলেন- আপনারা সকালে আসেন। আমার মেয়ে ভয় পাচ্ছে। কিন্তু তারা কোনো কথা শোনেন নাই। একপর্যায়ে শাবল ও আরও কি কি দিয়ে যেন দরজার লক ভেঙে এ্যানি স্যারকে থানায় নিয়ে যায় পুলিশ। বাচ্চাটা তখন খুব কান্নাকাটি করছিলো। আমাদের চেয়ে চেয়ে দেখা ছাড়া আর কিছুই করার ছিল না। পরে স্যারের আত্মীয়স্বজন এসে বাচ্চাটাকে নিয়ে যায়। এখন বাসায় কেউ নেই। বাসা ফাঁকা। রাতের ওই ঘটনার পর থেকে বাড়িটির সকলের মধ্যেই একটা আতঙ্ক কাজ করছে বলেও জানান তিনি।
এ্যানির ভাই হ্যাপি চৌধুরী মানবজমিনকে বলেন, ভাইয়ের বাসা ধানমণ্ডিতে। আর আমার বাসা এলিফ্যান্ট রোডে। আমাকে যখন তিনি ফোন করেন তখন তিনি খুবই বিচলিত ছিলেন। বার বার বলছিলেন বাচ্চাটা ভয় পাচ্ছে। আমি ফোনেই দরজায় আঘাতের শব্দ শুনছিলাম। এরপরই আমি ছুটে যাই তার বাসায়। সেখানে গিয়ে দেখি বাসার দরজা ভেঙে বের করা হয়েছে ভাইকে। থানায় নিয়ে যাওয়ার সময়ও তাকে হেনস্তা করা হয়। রাত দেড়টায় ঢুকে পুলিশ বাসা থেকে বের হয় রাত আড়াইটেরও পরে। বাসা থেকে প্রথমে তাকে নেয়া হয় ধানমণ্ডি মডেল থানায়। সারারাত সেখানে রাখার পর সকালে নেয়া হয় নিউমার্কেট থানায়। সেখান থেকে গতকাল আদালতে চালান করে পুলিশ। হ্যাপি চৌধুরী বলেন, ভাইকে যেসব মামলায় আটক দেখানো হয়েছে, সেগুলো সম্পর্কে কখনোই জানতেন না তিনি। হঠাৎ করেই রাতের আঁধারে বাসার দরজা ভেঙে তাকে তুলে নিয়ে গিয়ে এখন ওয়ারেন্টভুক্ত আসামি দেখানো হচ্ছে। রাতে আমাদের পক্ষের বেশ কয়েকজন আইনজীবী থানায় যান। তখনও কিছু আমাদের জানানো হয়নি। সকালে শুনি আগের ওয়ারেন্টে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে। একই সঙ্গে ৪ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছে আদালত। এখন তাকে আদালত থেকে আবারো ধানমণ্ডি থানায় নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। হ্যাপি বলেন, বুধবার রাতের ওই ঘটনায় এখনো আতঙ্কে কারোর সঙ্গে কথা বলছে না আমার ১০ বছরের ছোট্ট ভাতিজি। তাকে নিয়েও আমরা চিন্তিত। শুধু বাচ্চাটাই নয় আতঙ্কে রয়েছে আমাদের পুরো পরিবার।
জনতার আওয়াজ/আ আ