দুর্ঘটনার নামে অন্যকিছু! : ইলিয়াস খান - জনতার আওয়াজ
  • আজ সকাল ৭:৪৭, শুক্রবার, ১৫ই মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ১লা জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ, ২৮শে জিলকদ, ১৪৪৭ হিজরি
  • jonotarawaz24@gmail.com
  • ঢাকা, বাংলাদেশ

দুর্ঘটনার নামে অন্যকিছু! : ইলিয়াস খান

নিজস্ব প্রতিবেদক, জনতার আওয়াজ ডটকম
প্রকাশের তারিখ: বৃহস্পতিবার, মে ২৩, ২০২৪ ৯:০০ অপরাহ্ণ পরিবর্তনের তারিখ: বৃহস্পতিবার, মে ২৩, ২০২৪ ৯:০০ অপরাহ্ণ

 

ইরানের প্রেসিডেন্ট ড. সাইদ ইব্রাহিম রাইসি এমন সময় হেলিকপ্টার দুর্ঘটনায় মারা গেলেন, যখন ৭ মাসের বেশি সময় ধরে হামাস এবং ইসরায়েলের মধ্যে গাজায় ব্যাপক যুদ্ধ চলছে। ইসরায়েল গাজায় ঢুকে নির্বিচারে ফিলিস্তিনি হত্যা করছে। হামাসের পক্ষে ইরান সমর্থিত হিজবুল্লাহ এবং হুতিও সঙ্গে যোগ দিয়েছে যুদ্ধে। ইরানের ঊর্ধ্বতন সামরিক কর্মকর্তাকে ইসরায়েল হত্যা করেছে। সিরিয়ায় অবস্থিত ইরানের কনস্যুলেটে হামলার জন্য ইসরায়েলকে দায়ী করা হয়। এরপর প্রতিশোধ হিসেবে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে ইসরায়েলের ওপর হামলা চালায় ইরান।

এই যুদ্ধে রাশিয়া এবং চীন বিভিন্নভাবে হামাস এবং ইরানকে সহযোগিতা করছে। আবার আমেরিকা ও ন্যাটোভুক্ত দেশগুলো সহযোগিতা করছে ইসরায়েলকে। বিশেষ করে, মধ্যপ্রাচ্যে নিয়ন্ত্রণ হারাতে বসেছে আমেরিকা ও ইসরায়েল। এমন পরিস্থিতিতে হলো বিমান দুর্ঘটনা। পুড়ে ঝলসে গেলেন ইরানের প্রেসিডেন্ট রাইসি ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী হোসেন আমির আব্দোল্লাহিয়ানসহ হেলিকপ্টারের বাকি ৭ আরোহী। প্রেসিডেন্টের বহরে ছিল ৩টি হেলিকপ্টার। তাদের গন্তব্যও ছিল এক। বাকি দুটো হেলিকপ্টার নিরাপদে গন্তব্যে পৌঁছলেও, প্রেসিডেন্টের হেলিকপ্টারটি দুর্ঘটনার শিকার হয়।

নিষেধাজ্ঞার কারণে খুচরা যন্ত্রাংশের অভাবে হেলিকপ্টারের আধুনিকায়নও সম্ভব হয়নি। এসব পরিস্থিতি বিবেচনা করে বিশ^ জুড়ে বিভিন্ন দেশে এমন সন্দেহ তৈরি হয়েছে যে, এটা টার্গেট কিলিং নাকি স্বাভাবিক দুর্ঘটনা? কিন্তু পশ্চিমারা চুপ রয়েছে। এখন পর্যন্ত জানা পশ্চিমা মিডিয়ার তথ্য বলছে, বিষয়টি দুর্ঘটনা। একই সঙ্গে এও জানা যাচ্ছে, বিমান এবং হেলিকপ্টার কোন পরিবেশে আকাশপথে স্বাভাবিক চলাচল করতে পারে। তবে এটা ঠিক, অল্প কিছুদিন পরই সব সত্য জানা যাবে। এ পর্যন্ত আকাশপথে পৃথিবীর যত জাতীয় নেতা নিহত হয়েছেন, তাদের প্রত্যেকের মৃত্যুর কারণ জানা না গেলেও মনে হচ্ছে, এই দুর্ঘটনায় তৈরি হওয়া বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর অল্প কিছুদিন পরই পাওয়া যাবে। কারণ ইরানের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত মহাশক্তিধর রাশিয়া এবং চীন। যদিও ইরান পরবর্তী সময়ে জানিয়েছে, এটা ছিল দুর্ঘটনাই। বিষয়টি যুদ্ধকৌশলের বিচারে পরিষ্কার নয়। ইরানের সরকারি সংবাদ সংস্থা বলছে, পর্বতে ধাক্কা খেয়ে ভেঙে পড়ে রাইসির হেলিকপ্টার। সে সময় দুর্ঘটনাস্থলে ভারী বৃষ্টি ও ঘন কুয়াশার কারণে দৃশ্যমানতা খুব কম ছিল। তা সত্ত্বেও সন্দেহভাজন হিসেবে উঠে আসছে ইসরায়েলের গুপ্তচর সংস্থা মোসাদের নাম। তারাই কৌশলে রাইসিকে হত্যা করল কি না, উঠছে সেই প্রশ্ন। যদিও দুর্ঘটনার পরপরই ইসরায়েল বলেছে, এ বিষয়ে তাদের কোনো হাত নেই।

হামাস-ইসরায়েল যুদ্ধকে কেন্দ্র করে ইরান এবং ইসরায়েলের মধ্যে এক ধরনের ছায়াযুদ্ধ চলছে। ইসরায়েল এ পর্যন্ত ইরানের উচ্চপদস্থ অনেক সামরিক কর্মকর্তাকে হত্যা করেছে। আবার ইরান পারমাণবিক শক্তির অধিকারী হতে যাচ্ছে। রাইসির মৃত্যুর পর ‘উচ্ছ্বাস’ প্রকাশ করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের রিপাবলিকান কংগ্রেসম্যান মাইক ওয়াল্টজ।

ইরানি সংবাদমাধ্যমের বিভিন্ন সাংঘর্ষিক তথ্য, সরকারি কর্মকর্তাদের মন্তব্য ও পরে তা ভুল প্রমাণিত হওয়ায় দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ নিয়ে অনেকের মনে সন্দেহ দেখা দিয়েছে। ইসরায়েল ও আমেরিকার একচ্ছত্র আধিপত্য মধ্যপ্রাচ্যে ক্রমে কমছে। ইরান সেখানে ক্রীড়নকের ভূমিকা পালন করছিল প্রেসিডেন্ট রাইসির নেতৃত্বে। অন্যদিকে এগিয়ে আসছে আমেরিকার চিরশত্রু দেশ রাশিয়া ও চীন। এ রকম পরিস্থিতিতে এমন দুর্ঘটনায় সন্দেহ তৈরি হওয়া স্বাভাবিক। যারা বিমান দুর্ঘটনায় মারা গেছেন, তাদের চেহারা বলতে কিছু ছিল না। রাইসির এমন মৃত্যুর ফলে কোনোভাবেই ইরানের পররাষ্ট্রনীতির পরিবর্তন হবে না। এরই মধ্যে ইরান তা জানিয়ে দিয়েছে।

দীর্ঘসময় ধরে আমেরিকার নিষেধাজ্ঞার মধ্যে রয়েছে ইরান। এরপরও দেশটি সবাইকে অবাক করে মধ্যপ্রাচ্যে ক্ষমতাধর হয়ে উঠছে। এটা অনেকেরই সহ্য করার কথা নয়। অন্যদিকে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে ইরান ড্রোন এবং বিভিন্ন অস্ত্র দিয়ে রাশিয়াকে সহযোগিতা করছে। আবার আমেরিকাসহ ন্যাটোভুক্ত দেশগুলো সহযোগিতা করছে ইউক্রেনকে। ইসরায়েল-হামাস যুদ্ধের কারণে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে ইউক্রেন। কারণ তারা আগের মতো পশ্চিমা জোটের কাছ থেকে সহযোগিতা পাচ্ছে না। যদিও আবার কিছু সহযোগিতা শুরু হয়েছে। কিন্তু পূর্বের গতি আর নেই। কারণ এখন আমেরিকা এবং ন্যাটোভুক্ত দেশগুলো ব্যস্ত ইসরায়েলকে নিয়ে। এই সুযোগটাই নিয়েছে রাশিয়া।

ইরানের প্রেসিডেন্ট রাইসির আকস্মিক মৃত্যুর পরপরই রাশিয়া তদন্ত দল পাঠিয়েছে। বলেছে, সর্বাত্মক সহযোগিতা করবে। এখনো তারা তদন্ত করছে। বিস্তারিতভাবে জানা যাবে, দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ। এই মুহূর্তে ইরানের অভ্যন্তরীণ যে রাজনৈতিক অবস্থা, তা রাইসির পক্ষেই। আসলে এটি একটি জটিল পরিস্থিতি। সংক্ষেপে তা বিশ্লেষণ করা কঠিন। তবে এখন ইরানে কোনোভাবেই রাজনৈতিক অস্থিরতা সৃষ্টি করা যাবে না। কারণ সবকিছুই আগে থেকেই পরিকল্পনা করা। রাইসির মৃত্যুর পর ভাইস প্রেসিডেন্ট অন্তর্বর্তীকালীন প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব নিয়েছেন। পররাষ্ট্রমন্ত্রীর মৃত্যুর পর উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী ভারপ্রাপ্ত পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্ব নিয়েছেন। ভাইস প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের আগ পর্যন্ত অর্থাৎ সামনের ২ মাস ইরানের অন্তর্র্বর্তীকালীন প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব পালন করবেন। ফলে একটুও নড়চড় হবে না, ইরানের পররাষ্ট্রনীতি। জার্মান ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড সিকিউরিটি টাইসের গবেষক হামিদরেজা আজিজি বলেছেন, ‘৬৯ বছর বয়সী মোখবার শিয়া ধর্মীয় নেতাদের আস্থাভাজন। তার সঙ্গে ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ডের (আইআরজিসি) সম্পর্কও ভালো। ফলে প্রশাসনে আইআরজিসির ভূমিকা আগের মতোই থাকবে। প্রশাসনিক ক্ষেত্রে আইআরজিসির নিয়ন্ত্রণ আরও বাড়তে পারে।’ রাইসির মৃত্যুর পর ইরানের নীতির কোনো পরিবর্তন আসবে না। কারণ ইরানের নীতিনির্ধারণ হয় তাদের সর্বোচ্চ নেতার (আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি) মাধ্যমে।

ইকোনমিস্টের এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, রাইসির মৃত্যুর পেছনে ইসরায়েলের জড়িত থাকা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করার যথেষ্ট কারণ রয়েছে। কারণ ইসরায়েল কখনো কোনো রাষ্ট্রপ্রধানকে হত্যা করার দিকে যায়নি। এমন কিছু করতে যাওয়া মানে নিশ্চিতভাবেই যুদ্ধ শুরু করা এবং ইরানের তরফে কঠোর অবস্থান নেওয়ার পথ তৈরি করা। তাহলে সন্দেহের তীর কোন দিকে যায়? টাইমস অব ইসরায়েল, স্পুটনিক নিউজ এবং আলজাজিরা জানাচ্ছে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রীর অফিসের ডেপুটি মিনিস্টার আভি মাওজ বলেছেন, এক মাসের কম সময় আগে তিনি (রাইসি) হুমকি দিয়েছিলেন, ইসরায়েল যদি আক্রমণ করে তাহলে কিছুই অবশিষ্ট থাকবে না। এখন তিনিই ইতিহাসের ধূলিকণা হয়ে গেলেন। এ রকম বিভিন্ন দেশ রাইসির মৃত্যুতে খুশি না হলেও স্বস্তি পেয়েছেন। প্রশ্ন হচ্ছে, এর ফলে কি বর্তমানে চলা হামাস-ইসরায়েল যুদ্ধের কোনো লাভ হবে? হামবুর্গের থিংকট্যাংক জার্মান ইনস্টিটিউট ফর গ্লোবাল অ্যান্ড এরিয়া স্টাডিজের ইরান বিশেষজ্ঞ সারা বাজোবান্দি বলেছেন, ‘এখন এই নিয়ে নানান ধরনের অনুমান ও অসমর্থিত রিপোর্ট সামনে আসবে।’ তার মতে, ‘এই দুর্ঘটনার কারণ যান্ত্রিক হতে পারে, অন্তর্ঘাতও হতে পারে, এমনকি রাইসির রাজনৈতিক বৃত্তে থাকা কারোর হাতও থাকতে পারে। কিছুই উড়িয়ে দেওয়া যায় না।’ তিনি মনে করেন, ‘ইরানের মানুষ চাইবেন, এই দুর্ঘটনা নিয়ে আগামী দিনে আরও তথ্য সামনে আসুক।’ তথ্য যে আসবে, সে বিষয়ে সন্দেহ নেই। কোনো দেশ চাক বা না চাক। সেটা কারও ওপর নির্ভর করবে না। তবে এই ঘটনা যে কোনোভাবেই স্বাভাবিক দুর্ঘটনায় মৃত্যু নয়, বেশ কিছুদিন পর তেমন তথ্য জানা যাওয়ার সম্ভাবনাই প্রবল। তখনই জানা যাবে, ইব্রাহিম রাইসি মারা যাননি, হয়তো অন্যকিছু হয়েছে।

লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক, সাবেক সাধারণ সম্পাদক, জাতীয় প্রেস ক্লাব

eliaskhan71@gmail.com

 
 
জনতার আওয়াজ/আ আ
 
 

জনপ্রিয় সংবাদ

 

সর্বোচ্চ পঠিত সংবাদ