দেশপ্রেম ও দ্রোহে দ্বিখন্ডিত বাংলাদেশ
নিজস্ব প্রতিবেদক, জনতার আওয়াজ ডটকম
প্রকাশের তারিখ:
রবিবার, অক্টোবর ২৭, ২০২৪ ৩:৫৮ অপরাহ্ণ পরিবর্তনের তারিখ:
রবিবার, অক্টোবর ২৭, ২০২৪ ৩:৫৮ অপরাহ্ণ

মারুফ কামাল খান
প্রয়াত প্রবীণ সাংবাদিক এবিএম মূসা জনমভর আওয়ামী লীগ করে গেছেন। সবখানে প্রায় সব ইস্যুতেই আমরা তাকে আওয়ামী লীগের কণ্ঠস্বর হিসেবেই দেখেছি। তিনি আওয়ামী লীগের এমপি ছিলেন। স্বাধীনতার পর রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন চালাবার দায়িত্ব পালন করেছেন। তবে তিনি বিবেকহীন মানুষ বা একেবারে অন্ধ সমর্থক ছিলেন না। শুনেছি, মুজিব আমলে গণতন্ত্র হত্যা করে একদলীয় বাকশাল পদ্ধতি প্রবর্তনের দিন মূসা ভাই জাতীয় সংসদে এর পক্ষে ভোট দেওয়া এড়াতে বিলের কপি হাতে নিয়ে মাথা নিচু করে সেটি গভীর মনোযোগ দিয়ে পড়ার অভিনয় করছিলেন। মাত্র কয়েক মিনিটে বিনা আলোচনায় বিলটি পাসের পর সাংবাদিকরা তাকে ডেকে বলেন মূসা ভাই, এখন আর পড়ে কী হবে? বিল তো পাস হয়ে গেছে। মূসা ভাই মাথা তুলে বিষাদমাখা হাসি হেসে বলেন, তাই? লেজ উল্টাইয়া তো দেখতেই পারলাম না এঁড়ে নাকি বকনা বাছুর! শেষ বয়সে এসে মূসা ভাই আওয়ামী শাসনামলের অবাধ লুটপাট, দুর্নীতি, হত্যাযজ্ঞ, গুম, দখল, অপশাসন দেখে প্রচণ্ড ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছিলেন। কোনো এক টিভি চ্যানেলে মতিউর রহমান চৌধুরীর সঞ্চালনায় এক টকশোতে তিনি বলেছিলেন, আওয়ামী লীগের কাউকে দেখলেই বলা উচিত ‘তুই চোর, তুই চোর।’
টানা প্রায় ষোলো বছর ধরে হাসিনার নেতৃত্বে চালিত আওয়ামী দুঃশাসনকালে কী পরিমাণ লুট-লোপাট ও চুরি হয়েছে তা কল্পনা করাও কঠিন। ওটা ছিল ‘ওলোট পালট করে দে মা লুটেপুটে খাই’-এর জমানা। সরকারি কেনাকাটায় একটি পর্দা ৩৭ লাখ টাকা এবং একটি বালিশের ১৯ হাজার টাকা দাম দেখানো হয়। এটা অবাধ লুটপাটের একটা ছোট্ট উদাহরণ মাত্র। মহাদুর্নীতি করে ব্যয় প্রায় আড়াই গুণ বাড়িয়ে দেখিয়ে কর্ণফুলী নদীর তল দিয়ে টানেল বানানো হয় এগারো হাজার কোটি টাকায়। এ সম্পর্কে হাসিনা বিরাট আশার বাণী শুনিয়ে বলেছিলেন, এ টানেল দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের জনগণের জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন এবং দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখবে। বাংলাদেশের জিডিপি প্রায় শূন্য দশমিক ১৬৬ শতাংশ বৃদ্ধি পাবে। হাসিনার কথার পুরোটাই ছিল ধাপ্পা। এই টানেল বানানোর নামে লুটপাট করে টাকা হাতিয়ে নিয়ে তারা দেশের জন্য এক গলার কাঁটা রেখে গেছে। এখন রোজ এই টানেলে ব্যয় হয় ৩৭ লাখ টাকা। আর আয় হয় ১২ লাখ টাকা। যে হিসাব দেখানো হয়েছিল, ততটা গাড়ি ‘বঙ্গবন্ধু’ নামের এই টানেল দিয়ে পারাপার করে না। এতে রোজ লোকসান হচ্ছে ২৫ লাখ টাকার বেশি।
‘বঙ্গবন্ধু’ নামের আরেক মহাসাগর চুরির প্রকল্প ছিল স্যাটেলাইট। ওটা ছিল হাসিনাপুত্র সজীব ওয়াজেদ জয়ের লুটের প্রকল্প। প্রায় তিন হাজার কোটি টাকা ব্যয়ের এই স্যাটেলাইট নিয়ে বরাবর ঢাকঢাক গুড়গুড় কৌশল নিয়েছিল হাসিনা সরকার। এখন ওই স্যাটেলাইটেরই খবর নেই। এর কোনো কার্যকারিতাও নেই। পুরো টাকাটাই গচ্চা গেছে। পদ্মা সেতু প্রকল্পের দুর্নীতির কোনো লেখাজোকা নেই। সেই দুর্নীতি ঢাকতে ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে দায়ী করে নিজেই এক প্রোপাগান্ডা ক্যাম্পেইন চালান প্রধানমন্ত্রী হাসিনা। এ রকম প্রতিটি প্রকল্প, কেনাকাটা ও সরকারি ব্যয়ে হাসিনা রেজিম অবাধ দুর্নীতি-লুণ্ঠনের এক নজিরবিহীন ক্লেদাক্ত নজির স্থাপন করে। এই সীমাহীন চুরি-চামারি ও লুটপাটের ভিকটিম হয়েছে গরিব দেশের সাধারণ মানুষ। যে দরিদ্র কিশোর, লোলচর্ম বৃদ্ধ, শীর্ণকায় নারী উদয়াস্ত ঘাম ঝরানো শ্রমে কায়ক্লেশে জীবনধারণ করছে, তাদের ট্যাক্সের টাকা হাসিনারা চুরি করেছেন। তাদের ওপরে বৈদেশিক ঋণের বিরাট বোঝা চাপিয়ে সেই টাকার সিংহভাগ মেরে খেয়ে বিদেশে অবৈধ সম্পদের পর্বত তৈরি করা হয়েছে। হাসিনা তো পালিয়েছেন কিন্তু সাড়ে বারো লাখ কোটি টাকার বৈদেশিক দেনা শোধ করতে হবে এই দরিদ্র দেশের নাগরিকদেরই। হাসিনা ক্ষমতায় থাকতে প্রায়ই ভাবতাম, এরা যা করছে তাতে এক সময় এদের বিদায় নিতে হলে দেশটা মনে হয় আর কেউ চালাতে পারবে না। আসলে তাই হয়েছে। আমাদের দেশটা আর দেশ নেই। এক পরিত্যক্ত উপদ্রুত জনপদে পরিণত হয়েছে। প্রায় ষোলো বছরের ভোট ডাকাত শাসকরা দেশপ্রেম ও মানবতার সামান্যতম নজিরও স্থাপন করতে পারেনি। তারা কেবল নিজেরা নিষ্ঠুর নির্যাতন ও লুটপাটই করেনি, জাতীয় স্বার্থ বিসর্জন দিয়ে আদানি, মোদি ও ইন্ডিয়ার স্বার্থরক্ষা করেছে। তাই মাঝে মাঝে মনে হয়, আওয়ামী লীগের অভিধানে দেশপ্রেম ও মানবতার কোনো অস্তিত্বই নেই। চোরেরও কিন্তু কিছুটা বিবেক ও মনুষ্যত্ব থাকে। বাংলাদেশের আওয়ামী লুটেরাদের তাও নেই। তারপর দেখুন তাদের সৃষ্ট অলিগার্কদের দিকে তাকিয়ে। এরা সুযোগ পেয়ে ব্যাংক, বীমা, শেয়ারবাজার, সরকারি সব প্রতিষ্ঠান লুটেপুটে খেয়ে জাতীয় অর্থনীতিকে ফোকলা করে ফেলেছে। রেন্টাল ও কুইক রেন্টাল পাওয়ার প্ল্যান্টের নামে কত লাখ কোটি টাকা লুটে যে তারা বিদেশে পাচার করেছে তার ইয়ত্তা নেই। হাসিনার অনুগ্রহভাজন একজন তো সিঙ্গাপুরের সেরা ধনীদের তালিকায় নাম লিখিয়েছেন। আমাদের রক্ত শুষেই তো গড়ে উঠেছে এ বিপুল বিত্তবৈভব। এই বেপরোয়া লুণ্ঠন চলেছে মহান মুক্তিযুদ্ধ ও উন্নয়নের নামে। ভন্ডামি, প্রতারণা ও মোনাফেকির কী পৈশাচিক রূপ! বাংলাদেশে এই দীর্ঘ নষ্ট শাসন সৃষ্টি করেছে দুর্বৃত্তায়িত প্রশাসন, পুলিশ, বিচারক, সাংবাদিক, পেশাজীবী, এমনকি স্বার্থান্ধ শিল্পী ও বুদ্ধিজীবী সমাজ। এরা শয়তানের কাছে আত্মা বন্ধক দিয়ে অন্যায়-অনাচারের শাসনকে চোখ বুজে সমর্থন দিয়ে গেছে। ব্যবসায়ীদের কথাই ধরুন। সিন্ডিকেট করে যখন তখন যেকোনো পণ্যের যা-খুশি দাম বাড়িয়ে সীমিত আয়ের মানুষদের সীমাহীন কষ্ট দিতে ওদের বিবেকে একটুও বাধে না। মানুষের খাবারে পর্যন্ত এরা বিষ মেশায়। প্রাণরক্ষার ওষুধও নকল করে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেয় রোগাক্রান্ত মানুষকে। নষ্ট পরিবেশের দেশটাকে এই দূষিত মানুষেরা মিলে বসবাসের পুরো অযোগ্য করে তুলেছে। এই হতাশার সময়ে আমাকে জটিল রোগের চিকিৎসার জন্য কিছুদিন কাটাতে হয় যুক্তরাষ্ট্রে। সেখানে আমি দেখা পাই বাংলাদেশি একদল টগবগে মেধাবী তরুণের। আমাদের এ রকম হাজার হাজার ছেলেমেয়ে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অধ্যয়ন, গবেষণা ও শিক্ষকতায় নিয়োজিত। ওদের দেখে আমার ভেতরের হতাশার অন্ধকার পর্দা দুলে উঠল। জাগলো নতুন আশার আলো। ওদের ভাবনার কেন্দ্রবিন্দু বাংলাদেশ। দেশের অকল্যাণ ও মন্দ ওদের ব্যথিত ও দুঃখে জর্জরিত করে। একটি সুন্দর সম্ভাবনার বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখে ওরা। তেমন বাংলাদেশ গড়তে ওরা উজাড় করে নিঃশেষে বিনিয়োজিত করতে চায় তাদের মেধা ও শ্রম।
প্রবাসী তরুণদের সঞ্চারিত এই আশাবাদ নিয়ে দেশে ফিরে এক নতুন অভিজ্ঞতা, নতুন এক স্বদেশকে অনুভব করলাম। এখানে ছাত্র-তরুণ, ছেলেমেয়ে এবং সর্বস্তরের মানুষ ঘাতক বুলেটের সামনে বুক পেতে দিয়ে, রক্তসিঞ্চনে সিক্ত ইতিহাসের নতুন অধ্যায় রচনা করেছে। তারা ফ্যাসিবাদী দুঃশাসনকে উৎখাত ও পালাতে বাধ্য করেছে। তারপর সরকার ও শাসন-প্রশাসনশূন্য এক নৈরাজ্যিক অবস্থায় তারা ট্রাফিক সামলাচ্ছে। রাতের প্রহরী দল হয়ে ডাকাতি রোধ করছে নগরে-বন্দরে। ঘুমন্ত দেশপ্রেমের দেশে এটা এক অপার বিস্ময়। এই বিস্ময়ের স্পর্শে আমার ভেতরে সৃষ্ট বিমুগ্ধতার ঘোর কাটার আগেই দেশের বিরাট অঞ্চল জুড়ে নেমে এলো প্রলয়ঙ্করী বন্যা। অগণিত মানুষ হলো বিপন্ন। এ সময় দেশবাসী সবাই মিলে ঝাঁপিয়ে পড়ে পরিস্থিতি মোকাবিলা করল। এই ভালোবাসা ও পরার্থপরতা স্থাপন করল এক নতুন নজির। এমনটা আগে কখনো দেখিনি। বন্যার ছোবল শস্য ও শাকসবজির অনেক ক্ষতি করে গেল। সেই অজুহাতে পতিত ফ্যাসিবাদী রেজিমের বেনিফিশিয়ারি সিন্ডিকেট সচল হয়ে উঠল। অস্বাভাবিকভাবে দাম বাড়াতে শুরু করল তারা নানান নিত্যপণ্যের। সীমাহীম কষ্টে দরিদ্র মানুষের মধ্যে হাহাকার শুরু হলো। মানুষের সে দুর্ভোগ দেখে পতিত স্বৈরাচারের দোসরদের উৎকট আনন্দ দেখে কে! আকর্ণ বিস্তৃত হাসি হেসে তারা বিচিত্র সব অপপ্রচার ও গুজব নিয়ে মাঠে নেমে পড়ল।
এই পর্বেও সাধারণ মানুষ তাদের সামান্য সাধ্য নিয়ে প্রাণপণে পরিস্থিতি সামলাতে সক্রিয় হয়েছে। এটাও এক নতুন মিরাকল। তাকিয়ে দেখুন, দেশের বিভিন্ন স্থানে ছাত্র-তরুণ ও অতি সাধারণ মানুষেরা চাল-ডাল, শাক-সবজি, ডিম, আলু-পেঁয়াজের মতো দরকারি সব পণ্যের পসরা সাজিয়ে বসে গেছে। তবে বাণিজ্যের উদ্দেশ্যে নয়। কম দামের বা ন্যায্যমূল্যের দোকান বসিয়ে তারা বিক্রি করছে ওইসব জিনিসপত্র। স্বল্প আয়ের মানুষ সস্তায় সেখানে করতে পারছে বাজার সদাই। এ সব স্বেচ্ছাসেবীদের কতটুকুই বা সাধ্য? তারা পণ্য কিনে বিনা মুনাফায় বা কিছুটা ভর্তুকি দিয়ে বিক্রি করছে। এর মাধ্যমে তারা তাদের সামান্য সামর্থ্য দিয়ে সিন্ডিকেট ভাঙার চেষ্টা করছে। চেষ্টা করছে পণ্যমূল্য গরিবের ক্রয়সীমায় রাখতে এবং বাজারদরের লাগাম টানতে। নানামুখী সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি জনসাধারণের এই সামান্য উদ্যোগ কিছুটা হলেও ফল দিচ্ছে। এই যে দেশপ্রেম, মানুষের প্রতি ভালোবাসা একে তুচ্ছ করে দেখার উপায় নেই। যে দেশপ্রেম থেকে উৎসারিত সাহস ও একতা দুর্বিনীত স্বৈরাচারের জগদ্দল পাথরকে হটাতে পেরেছে তাকে দাম দিতেই হবে। এই দেশপ্রেম বহমান ও জাগ্রত রাখতে পারলে তা অনেক অসম্ভবকেই সম্ভব করতে পারবে।
বাংলাদেশে দানব আছে, আছে নিষ্ঠুর দানবিকতা, আছে দেশের প্রতি চরম বিশ্বাসঘাতকতা ও দ্রোহ। আবার তার বিপরীতে অসংখ্য মানুষ আছে বুকভরা ভালোবাসা, পরিপূর্ণ মানবতা ও জ্বলন্ত দেশপ্রেম নিয়ে। এভাবেই বাংলাদেশ অন্ধকার ও আলোয় দ্বিখণ্ডিত। আশা ও নিরাশায় বিভাজিত। আছে বিপর্যয় ও সম্ভাবনার আলো-আঁধারির খেলা। ফ্যাসিবাদী দুঃশাসন হঠাবার পর উজ্জ্বলতর হয়ে উঠেছে সম্ভাবনার দীপ্তি। কল্যাণের নহবত বাজছে সিংহ-দরোজায়। আমাদের বেশিরভাগ মানুষের দেশপ্রেম যদি ঘুমিয়ে না পড়ে এবং অসুরের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ লড়াই যদি তারা বহাল রাখতে পারে, তাহলে বাংলাদেশকে আর কেউ পেছনে টেনে রাখতে পারবে না।
লেখক: সাংবাদিক, বিএনপি চেয়ারপারসনের সাবেক প্রেস সচিব
জনতার আওয়াজ/আ আ