ধরাছোঁয়ার বাইরে সেই অস্ত্রধারীরা চট্টগ্রামে ৩০ মামলায় আসামি ৪৫ হাজার - জনতার আওয়াজ
  • আজ দুপুর ২:০০, বৃহস্পতিবার, ১৪ই মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ৩১শে বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ, ২৭শে জিলকদ, ১৪৪৭ হিজরি
  • jonotarawaz24@gmail.com
  • ঢাকা, বাংলাদেশ

ধরাছোঁয়ার বাইরে সেই অস্ত্রধারীরা চট্টগ্রামে ৩০ মামলায় আসামি ৪৫ হাজার

নিজস্ব প্রতিবেদক, জনতার আওয়াজ ডটকম
প্রকাশের তারিখ: রবিবার, জুলাই ২৮, ২০২৪ ১২:১৩ পূর্বাহ্ণ পরিবর্তনের তারিখ: রবিবার, জুলাই ২৮, ২০২৪ ১২:১৩ পূর্বাহ্ণ

 

জনতার আওয়াজ ডেস্ক

কোটা সংস্কার আন্দোলনকে কেন্দ্র করে গত ১৬ই জুলাই চট্টগ্রাম নগরের মুরাদপুর ও ১৮ই জুলাই বহদ্দারহাটে সরকারদলীয় নেতাকর্মী ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে শিক্ষার্থীদের সংঘর্ষ হয়। সে সময় গুলিতে ৪ শিক্ষার্থীসহ মোট ৬ জনের মৃত্যু হয়েছে। আহত হয়েছেন কমপক্ষে সাড়ে ৩শ’ মানুষ। সে সময় যুবলীগ- ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের অনেককেই প্রকাশ্যে স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র নিয়ে গুলি করতে দেখা যায়। হতাহতদের অধিকাংশই সরকারদলীয় নেতাকর্মীদের গুলিতেই হয়েছেন বলে জানিয়েছেন প্রত্যক্ষদর্শীরা। তাদের প্রকাশ্যে গুলি করার অনেক ছবি এবং ভিডিও ফুটেজ এরমধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। তবে এসব অস্ত্রধারী ক্যাডারের বিরুদ্ধে এখনো কোনো ব্যবস্থা নেয়নি পুলিশ। এমনকি সেই দুইদিনের সংঘর্ষের ঘটনায় এ পর্যন্ত ৩০টি মামলা হলেও সেসব অস্ত্রধারীর নাম এজাহারে উল্লেখ করা হয়নি।

এদের মধ্যে ১৬ই জুলাই মুরাদপুরে সংঘর্ষের ঘটনায় নিহত হয়েছেন চট্টগ্রাম কলেজের স্নাতক তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী ওয়াসিম আকরাম (২২), এমইএস কলেজের স্নাতক প্রথমবর্ষের শিক্ষার্থী ফয়সাল আহমেদ (২০) ও ফার্নিচার দোকানের কর্মচারী মোহাম্মদ ফারুক (৩২)। ১৮ জুলাই সংঘর্ষের ঘটনায় নিহতরা হলেন- সরকারি আশেকানে আউলিয়া ডিগ্রি কলেজের এইচএসসি পরীক্ষার্থী তানভীর আহমেদ (১৮), চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ইতিহাস বিভাগের তৃতীয়বর্ষের শিক্ষার্থী হৃদয় চন্দ্র তারুয়া (২২), মুদি দোকানের কর্মী সায়মন (২২)। সংঘর্ষে নিহতদের মধ্যে ৫জন ছিলেন গুলিবিদ্ধ।

এদের মধ্যে বহদ্দারহাটের মুদি দোকানের কর্মচারী সায়মন ছাড়া সবাই কোটাপন্থি অস্ত্রধারীদের গুলিতেই নিহত হয়েছেন বলে কয়েকটি সূত্র নিশ্চিত করেছেন।
সূত্র মতে কোটা সংস্কার আন্দোলনে সংঘর্ষের জেরে চট্টগ্রাম জেলায় এ পর্যন্ত ৩০টি মামলা হয়েছে। এরমধ্যে মহানগরে হয়েছে ১৯টি। বাকিগুলো উপজেলায়। এসব মামলায় আসামি করা হয়েছে প্রায় ৪৫ হাজার মানু?ষকে। এদের মধ্যে শহরের মামলায় আসামি প্রায় ৩৭ হাজায়। শহরে ৪৭৬ জনসহ পুরো জেলাতে গ্রেপ্তার করা হয়েছে প্রায় এক হাজার জনকে। আটককৃতদের অধিকাংশই বিএনপি-জামায়াতের নেতাকর্মী। গ্রেপ্তার আতঙ্কে দল দু’টির সমর্থকরাও এখন ঘরছাড়া। তবে ভাইরাল হওয়া এসব অস্ত্রধারীর বিরুদ্ধে এখনো কোন ব্যবস্থা নেয়া হয়নি।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, চট্টগ্রাম জেলাতে করা মামলাগুলোর বেশির ভাগই অজ্ঞাতপরিচয় আসামি হিসেবে দেখানো হয়েছে। আর যাদেরকে গ্রেপ্তার করা হচ্ছে তাদের বেশির ভাগই বিএনপি, ছাত্রদল, যুবদল ও জামায়াত- শিবিরের কর্মী। তবে পুলিশের দাবি, ঘটনার সময় সিসিটিভি ফুটেজে পাওয়াসহ বিভিন্ন তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে আসামিদের শনাক্ত করে গ্রেপ্তার করা হচ্ছে।
নগর বিএনপি’র দপ্তরের দায়িত্বপ্রাপ্ত ইদ্রিস আলী মানবজমিনকে বলেন, কোটা সংস্কার আন্দোলনকে কেন্দ্র করে গত ১৬ই জুলাই থেকে ২৭শে জুলাই পর্যন্ত চট্টগ্রামে বিএনপি’র ৩৭০ জন নেতাকর্মীকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। ১৮টি মামলা দায়ের করেছে। এরমধ্যে গতকাল শুক্রবার থেকে আজকে বিকাল পর্যন্ত ২০ জনকে গ্রেপ্তার করেছে।

চট্টগ্রাম মহানগর জামায়াতের আমীর শাহজাহান চৌধুরী গণমাধ্যমে পাঠানো বিবৃতিতে বলেন, চট্টগ্রামে ব্লক রেইডের নামে নগরীর বিভিন্ন এলাকায় সাধারণ মানুষকে হয়রানি করছে পুলিশ। সাধারণ নিরীহ মানুষের বাসা বাড়ি, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, মসজিদে মসজিদে ঢুকে তল্লাশি করে নিরীহ মানুষকে গ্রেপ্তার করছে। আন্দরকিল্লা শাহী জামে মসজিদ থেকে নামাজ আদায় করে বের হওয়ার সময় কয়েকজন মুসল্লিকে সন্দেহভাজন গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

তিনি বলেন, দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী জনগণের বিপক্ষে গিয়ে ফ্যাসিস্ট সরকারের নির্দেশে হত্যা, দাঙ্গা, সন্ত্রাসী কার্যক্রম ও নাশকতা চালাচ্ছে। বিভিন্ন নাটক সাজিয়ে চট্টগ্রাম মহানগরীতে ১৯ মামলায় গত ২৪ ঘণ্টায় ২৭ জনসহ মোট ৪৭৬ জনকে গ্রেপ্তার করেছে। নতুন করে আরও ৩৭ জনকে আসামি করা হয়েছে। তবে অস্ত্রধারীদের আটকসহ সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের জনসংযোগ বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা এডিসি তারেক আজিজ মানবজমিনকে বলেন, ‘আমাদের এখানে এ পর্যন্ত ১৯টি মামলায় ৩৭ হাজার আসামি করা হয়েছে। আর গ্রেপ্তার করা হয়েছে ৪৭৬ জনকে। এরমধ্যে অস্ত্রধারী যাদের কথা বলছেন, তাদের বিষয়টি মামলা দায়েরের কয়েকদিন পর প্রকাশ্যে আসে। যে কারণে এজাহারে হয়তো তাদের বিষয়টি উল্লেখ নেই। তাদের সন্ধান পেলে আটক করা হবে। আর এজাহারে না থাকলেও চার্জশিটের বিষয়তো আছে। আর এখন যেসব নাশকতাকারীকে ধরা হয়েছে, ফুটেজ দেখেই ধরা হয়েছে।

জানা যায়, শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সংঘর্ষের দু’দিনই যুবলীগ- ছাত্রলীগের বেশ কয়েকজনকেই অস্ত্র হাতে গুলি করতে দেখা গেছে। তবে সেখানে সাংবাদিকদের ফুটেজ নিতে নিষেধ করতে থাকেন তারা। এদের মধ্যে ৯-১০জনের অস্ত্রসহ ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।

এরমধ্যে ১৬ তারিখের ঘটনায় যুবলীগের মুহাম্মাদ ফিরোজ, এইচএম মিঠু, মোহাম্মদ জাফর ও স্বেচ্ছাসেবক লীগের দেলোয়ারকে প্রকাশ্যেই অস্ত্র নিয়ে ছোটাছুটি করতে দেখা যায়। তাদের গুলিতে সেদিন ৩ জনের মৃত্যুর পাশাপাশি অসংখ্য শিক্ষার্থী গুরুতর আহত হন। আর ১৮ই জুলাই বহদ্দারহাটের ঘটনায় ৫জনকে প্রকাশ্যে গুলি করতে দেখা গেছে। এদের মধ্যে ৩জনের পরিচয় পাওয়া গেছে। তারা হলেন- চান্দগাঁও থানা স্বেচ্ছাসেবক লীগের সাবেক সভাপতি মহিউদ্দিন ফরহাদ, যুবলীগ কর্মী মোহাম্মদ জালাল ও মোহাম্মদ ফরিদ।

প্রাপ্ত ফুটেজ অনুযায়ী, ১৬ই জুলাই মুরাদপুরে মোহাম্মদ ফিরোজ রিভলবার নিয়ে এবং দেলোয়ার শটগান নিয়ে গুলি করেছেন। বাকি দু’জনকে রিভলবার নিয়ে গুলি করতে দেখা গেছে। একটি ভিডিওতে দেখা যায়, ধূসর রঙের পোলো টি-শার্ট পরা এক যুবক পিস্তল হাতে পাঁয়চারি করছেন। এ সময় আশপাশের মানুষকে শাসাতে দেখা যায় তাকে। আবার অন্য একজনের কাছ থেকে গুলি নিয়ে পিস্তলেও ভরতে দেখা যায়। হেলমেট পরা এই যুবক মোহাম্মদ ফিরোজ।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, যুবলীগের ফিরোজ একসময় দুর্ধর্ষ ডাকাত ছিলেন। মুরাদপুরের ত্রাস ছিলেন তিনি। তার বিরুদ্ধে থানায় একাধিক হত্যা ও ডাকাতির মামলা রয়েছে। সর্বশেষ চট্টগ্রামের আলোচিত স্কুলছাত্রী তাসফিয়া আমিন হত্যা মামলার অন্যতম আসামি এই যুবলীগ নেতা। এক সময় ‘শিবির ফিরোজ’- বলে পরিচিত থাকলেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে খোলস পাল্টে হয়ে যান যুবলীগ নেতা। সংগঠনে কোনো পদ-পদবি না থাকলেও তিনি এখন নগর আওয়ামী লীগের সেক্রেটারি আ.জ.ম. নাসিরের অনুসারী ‘প্রভাবশালী’ যুবলীগ নেতা। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, সেদিন বেলা ২টা থেকে ষোলোশহর স্টেশনে অবস্থান নেন ছাত্রলীগ-যুবলীগের কর্মীরা। অন্যদিকে মুরাদপুরে অবস্থান নেন কোটা আন্দোলনকারীরা। বিকাল সাড়ে ৩টার দিকে দুই নম্বর গেট থেকে নগর ছাত্রলীগের সাবেক এক নেতার নেতৃত্বে একটি মিছিল যায় মুরাদপুরের দিকে। তারা সেখানে অবস্থানরত কোটা আন্দোলনকারীদের মারধর করেন। একপর্যায়ে কোটা বিরোধী আন্দোলনকারীরা ধাওয়া দিলে পিছু হটেন তারা।

কিছুক্ষণ পর যুবলীগের আরেকটি ছোট মিছিল আসে। সেই মিছিল থেকে গুলি করতে দেখা যায় যুবলীগ নেতা ফিরোজকে। একপর্যায়ে গুলি থামিয়ে তাকে বলতে শোনা যায়, ‘গুলি দে, গুলি দে’। কিছুক্ষণ পর একজন গুলি এনে দেন তাকে। গুলি ভরে আবারো শিক্ষার্থীদের লক্ষ্য করে গুলি ছোড়েন ফিরোজ। সে সময় আরও বেশ কয়েকজনকে গুলি করতে দেখা যায়।
একপর্যায়ে শিক্ষার্থীদের ধাওয়ায় যুবলীগ ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা পিছু হটে। এরমধ্যে শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা করতে আসা ২০-২৫জন নেতাকর্মী মুরাদপুর বেলাল মসজিদ সংলগ্ন বিল্ডিংয়ের ছাদের উপর আটকা পড়েন। একপর্যায়ে শিক্ষার্থীদের হাত থেকে বাঁচতে তাদের কয়েকজন ছাদ থেকে লাফ দিয়ে গুরুতর আহত হন। তাদের ছাদ থেকে পড়ার বেশকিছু ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে। সেদিন সংঘর্ষের সময় শিক্ষার্থীদের সঙ্গে ছাত্রদল-শিবিরের কর্মীরাও যোগ দিয়েছিলেন বলে অভিযোগ উঠেছে। এরমধ্যে ওইদিন নিহতদের একজন ছিলেন চট্টগ্রাম কলেজ ছাত্রদলের যুগ্ম আহ্বায়ক ওয়াসিম আকরাম।
এদিকে ১৮ই জুলাই চট্টগ্রামের বাকলিয়ার শাহ আমানত সেতু এলাকায় পূর্ব-ঘোষিত কর্মসূচি অনুযায়ী আন্দোলনকারীরা সড়কের দু’পাশ অবরোধ করে রাখেন। পুলিশের বাধার মুখে সড়কের একপাশে অবস্থান করেন আন্দোলনকারীরা। তার কিছুক্ষণ পর দু’পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ শুরু হয়। এতে পুরো এলাকা রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। পুলিশ আন্দোলনকারীদের লক্ষ্য করে টিয়ারশেল ছুড়তে থাকে। আন্দোলনকারীরা পুলিশের দিকে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করেন। এ সময় শিবির আখ্যা দিয়ে আন্দোলনকারীদের একজনকে আটক করে পুলিশ। পরে আন্দোলনকারীরা মিছিল নিয়ে চান্দগাঁও থানাধীন বহদ্দারহাট এলাকায় এসে জড়ো হয়। সেখানে দুইঘণ্টা শান্তিপূর্ণ অবস্থানের পর পুলিশের সঙ্গে শিক্ষার্থীদের সংঘর্ষ শুরু হয়। সেই সংঘাতে পরে যোগ দেন স্থানীয় যুবলীগ ও ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। সেদিন শিক্ষার্থীরা চান্দগাঁও থানায় হামলা চালায়। তারা বহদ্দারহাট পুলিশ ফাঁড়িও পুড়িয়ে দেন। জানা গেছে, ১৮ই জুলাই বহদ্দারহাটে ছাত্রদের দিকে গুলি ছোড়েন ৭-৮জন অস্ত্রধারী। তাদের সবাই সরকারদলীয় নেতাকর্মী। তবে গণমাধ্যমে ৫জনের ছবি ভাইরাল হয়েছে। এদের মধ্যে ৩ জনের পরিচয় জানা গেছে। এরমধ্যে হেলমেট ও সাদা গেঞ্জি পরে গুলি ছুড়েছেন চান্দগাঁও থানা স্বেচ্ছাসেবক লীগের সাবেক সভাপতি মহিউদ্দিন ফরহাদ।

রিয়াল মাদ্রিদের গেঞ্জি-ক্যাপ ও মুখোশ পরে রিভলবার দিয়ে গুলি ছুড়েছেন যুবলীগ কর্মী মো. জালাল। এছাড়া রিভলবার দিয়ে গুলি করেছেন স্থানীয় আওয়ামী লীগ কর্মী মোহাম্মদ ফরিদ। এদিকে অস্ত্রধারীদের বিষয়সহ সার্বিক পরিস্থিতি জানতে চাইলে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম মানবজমিনকে বলেন, আমরা সব ধরনের দুষ্কৃতকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিচ্ছি। এরমধ্যে অস্ত্রধারীদেরকেও চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নেয়ার উদ্যোগ নিয়েছি। তাদেরকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে। কাউকে ছাড় দেয়া হবে না।

 
 
জনতার আওয়াজ/আ আ
 
 

জনপ্রিয় সংবাদ

 

সর্বোচ্চ পঠিত সংবাদ