ধর্মীয় স্লোগান দিয়ে ব্যাংক দখল হয়েছে: সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী
নিজস্ব প্রতিবেদক, জনতার আওয়াজ ডটকম
প্রকাশের তারিখ:
শুক্রবার, মে ১, ২০২৬ ৪:০০ অপরাহ্ণ পরিবর্তনের তারিখ:
শুক্রবার, মে ১, ২০২৬ ৪:০০ অপরাহ্ণ

জনতার আওয়াজ ডেস্ক
ছবি সংগৃহীত
২৫ কার্যদিবসে শেষ হলো ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন। গতকাল বৃহস্পতিবার অধিবেশনের সমাপনী দিনে সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে তীব্র রাজনৈতিক বিতর্ক দেখা দেয়। বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল- সংবিধান সংস্কার, গণভোট, ‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থান’-এর ব্যাখ্যা, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস এবং রাষ্ট্রপতির ভূমিকা নিয়ে আলোচনা। একই সঙ্গে রাষ্ট্রপতির মর্যাদা, সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের প্রতি সম্মান, ‘জুলাই চেতনা’ ঘিরে রাজনৈতিক অবস্থান এবং অর্থনীতির সংকট ও ভবিষ্যৎ করণীয় নিয়েও আলোচনা হয়।
প্রথম অধিবেশনের শেষ দিন গতকাল স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ব্যাংক দখল প্রসঙ্গ উল্লেখ করে বলেছেন, সরাসরি নারায়ে তাকবির, আল্লাহু আকবার বলে ধর্মীয় স্লোগান দিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে ব্যাংক দখল হয়েছে। জাতীয় সংসদে রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর আনা ধন্যবাদ প্রস্তাবের আলোচনায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এসব কথা বলেন।
জামায়াতের কোনো ব্যাংক নেই বিরোধীদলীয় উপনেতা সৈয়দ আবদুল্লাহ মুহাম্মদ তাহেরের এমন দাবির জবাবে সালাহউদ্দিন আহমদ আরও বলেন, ‘ব্যাংকের বিষয়ে বলা হয় আমাদের কোনো ব্যাংক-ট্যাংক নেই। আবার যখন কথা বলছেন তখন ওউন করছেন, কৃতিত্ব নিচ্ছেন। ব্যাংক থাকা তো ভালো। অস্বীকার করার দরকার কী? তবে শুধু দুষ্টু লোকেরা বলে, কত শতাংশ শেয়ার কার আছে–এটা খোলাসা করা দরকার।’
এই অধিবেশনে মোট ৯৪টি বিল পাস হয়েছে, যার মধ্যে ৯১টি ছিল অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা অধ্যাদেশসংশ্লিষ্ট বিল। বাকি তিনটি ছিল অন্যান্য সাধারণ বিল। আগামী জুনের দ্বিতীয় সপ্তাহে দ্বিতীয় অধিবেশন বসতে পারে এবং ১১ জুন বাজেট উপস্থাপনের সম্ভাবনা রয়েছে। বাজেট উপস্থাপন করবেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।
সংবিধান সংস্কার ও গণভোট নিয়ে মতবিরোধ
শেষ দিনের আলোচনায় ‘সংবিধান সংস্কার’ ছিল কেন্দ্রীয় ইস্যু। এ বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, সংসদকে পাশ কাটিয়ে ভিন্ন কোনো পদ্ধতিতে সংবিধান সংস্কারের চেষ্টা আইনি কাঠামোর সঙ্গে সাংঘর্ষিক। তিনি জোর দিয়ে বলেন, বড় ধরনের পরিবর্তনের জন্য জনগণের সরাসরি অংশগ্রহণ প্রয়োজন, এ জন্য গণভোটের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। তিনি অভিযোগ করেন, সংসদের বাইরে ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদ’ গঠনের উদ্যোগ রাজনৈতিক সমঝোতার বাইরে গিয়ে নেওয়া হয়েছে। এতে সাংবিধানিক শৃঙ্খলা ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তিনি অভিযোগ করেন, জুলাই জাতীয় সনদকে উপেক্ষা করে এ ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হলে তা প্রতারণার শামিল হবে। তিনি আরও বলেন, সংবিধানের মৌলিক কাঠামো পরিবর্তনের জন্য সংশোধন প্রয়োজন— এই অবস্থানে বিএনপি অটল।
অন্যদিকে বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, বিএনপি যদি সংবিধান সংস্কারের ঐকমত্য থেকে সরে যায়, তবে নতুন সংবিধান বা পুনর্লিখনের দাবিতে তারা ফিরে যাবেন।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থান বনাম মুক্তিযুদ্ধ
অধিবেশনে সবচেয়ে আলোচিত বিষয় ছিল জুলাই গণ-অভ্যুত্থান ও মুক্তিযুদ্ধের সম্পর্ক। নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধ আমাদের ফাউন্ডেশন–জুলাই গণ-অভ্যুত্থান সেই মুক্তিযুদ্ধের নবায়ন। জুলাইয়ের মাধ্যমে বৈষম্যহীন গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র গঠনের প্রত্যাশা ব্যক্ত হয়েছে।
নাহিদের এই বক্তব্যের তীব্র সমালোচনা করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস নিয়ে বিভ্রান্তি তৈরি করা বা বারবার বিতর্ক উসকে দেওয়া জাতির জন্য সম্মানজনক নয়। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, ১৯৭১ সালে যারা পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াই করেছেন, তারাই প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা— এ বিষয়ে কোনো বিভ্রান্তি থাকা উচিত নয়। মুক্তিযোদ্ধার সংজ্ঞা ইতোমধ্যে আইন দ্বারা নির্ধারিত হয়েছে এবং এ নিয়ে বিভ্রান্তি ছড়ানো অনুচিত।
একই ধারায় জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকুও মুক্তিযুদ্ধের মাহাত্ম্য তুলে ধরে বলেন, ‘একাত্তরের চেতনা নিয়ে বিভ্রান্তিকর বক্তব্য গ্রহণযোগ্য নয়।’ তিনি একাত্তরে জামায়াতের ভূমিকার সমালোচনা করে বলেন, ‘একাত্তর না হলে আমরা কেউ এই সংসদে বসতে পারতাম না।’
‘জুলাই চেতনা’ ও রাজনৈতিক সমালোচনা
‘জুলাই চেতনা’কে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক ব্যবসা এবং ‘ছায়া মন্ত্রিসভা’ গঠনের ঘোষণার কড়া সমালোচনা করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি বলেন, এটি দায়িত্বশীল রাজনীতির পরিচয় নয়। একই সঙ্গে তিনি অভিযোগ করেন, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে প্রায় ৩০ লাখ কোটি টাকা বিদেশে পাচার হয়েছে। এই অর্থ দিয়ে বহু বড় অবকাঠামোগত প্রকল্প বাস্তবায়ন সম্ভব ছিল। এদিকে বিরোধী দল নিজেদের অবস্থান ব্যাখ্যা করে দাবি করে, জুলাই আন্দোলন কোনো একক দলের নয়; এটি ছিল সর্বস্তরের মানুষের আন্দোলন।
রাষ্ট্রপতি ইস্যুতে উত্তাপ
রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনকে ঘিরে তীব্র বাগবিতণ্ডা হয় সংসদে। নাহিদ ইসলাম রাষ্ট্রপতির বক্তব্য প্রত্যাখ্যান করে তার অপসারণ ও গ্রেপ্তারের দাবি জানান এবং তার ভূমিকা নিয়ে কঠোর সমালোচনা করেন। এর জবাবে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, ‘রাষ্ট্রপতি ব্যক্তি নন, একটি প্রতিষ্ঠান।’ তিনি বলেন, ‘যারা রাষ্ট্রপতির কাছ থেকে শপথ নিয়েছেন, তাদেরই এখন সেই প্রতিষ্ঠানের প্রতি অসম্মান দেখানো গ্রহণযোগ্য নয়।’ তিনি সতর্ক করে বলেন, সাংবিধানিক গণতন্ত্রে বিশ্বাস করলে রাষ্ট্রপতির মতো প্রতিষ্ঠানের প্রতি সম্মান দেখানো সবার দায়িত্ব।
অর্থনীতি নিয়ে সতর্কবার্তা
অর্থমন্ত্রী সংসদে বলেন, দেশের অর্থনীতি বর্তমানে গভীর সংকটে রয়েছে এবং তা কাটিয়ে উঠতে আগামী দুই বছর ‘কঠিন সময়’ হতে পারে। তিনি সতর্ক করে বলেন, সরকারকে কিছু অজনপ্রিয় সিদ্ধান্ত নিতে হতে পারে। তিনি জানান, দেশে খেলাপি ঋণের হার ৩০ শতাংশ ছাড়িয়েছে, যা অর্থনীতির জন্য বড় ঝুঁকি। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে বিপুল ভর্তুকির চাপও সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। অর্থমন্ত্রী বিরোধী দলের সহযোগিতা কামনা করে বলেন, অর্থনীতিকে পুনরুদ্ধার করতে জাতীয় ঐক্য প্রয়োজন।
প্রথম অধিবেশনের শেষ দিনের আলোচনায় মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস, গুম-খুনের অভিজ্ঞতা এবং রাজনৈতিক সংগ্রামের বিষয়ও উঠে আসে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নিজের নির্বাসন ও নির্যাতনের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে আবেগঘন বক্তব্য দেন।
এ ছাড়া অধিবেশনে অংশ নিয়ে বিভিন্ন সদস্য মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট তুলে ধরেন। জামায়াতের নেতা ডা. সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের নিজেকে ‘শিশু মুক্তিযোদ্ধা’ দাবি করলে তা নিয়েও আলোচনার সৃষ্টি হয়। অন্যদিকে সরকারি দলের সদস্যরা মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বিকৃতির অভিযোগ তুলে বিরোধী দলের সমালোচনা করেন।
সব মিলিয়ে ত্রয়োদশ সংসদের প্রথম অধিবেশনটি রাজনৈতিক উত্তাপ, মতপার্থক্য এবং নীতিগত বিতর্কে ভরপুর ছিল, যার প্রভাব আগামী অধিবেশনগুলোতেও পড়বে– এমন ধারণা করছেন বিশ্লেষকরা।
জনতার আওয়াজ/আ আ