নারায়ণগঞ্জ-৩: ভোটাররা চান দখলবাজ-চাঁদাবাজমুক্ত মেঘনাপাড়
নিজস্ব প্রতিবেদক, জনতার আওয়াজ ডটকম
প্রকাশের তারিখ:
রবিবার, ডিসেম্বর ১৪, ২০২৫ ৪:৩৭ অপরাহ্ণ পরিবর্তনের তারিখ:
রবিবার, ডিসেম্বর ১৪, ২০২৫ ৪:৩৭ অপরাহ্ণ

জনতার আওয়াজ ডেস্ক
ছবি: সংগৃহীত
প্রাচীন বাংলার নগরী সোনারগাঁ ও শিল্প অঞ্চল সিদ্ধিরগঞ্জ নিয়ে গঠিত নারায়ণগঞ্জ-৩ আসন। এখানে বিএনপির মনোনীত প্রার্থীর সঙ্গে ভোটের লড়াইয়ে প্রস্তুত জামায়াত-এনসিপিসহ অন্যান্য দলের একাধিক প্রার্থী। তারা এরই মধ্যে ভোটারদের দ্বারে দ্বারে গিয়ে ভোট প্রার্থনা করছেন। সভা-সমাবেশ, গণসংযোগ আর উঠান বৈঠকে নানান প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন। তবে ভোটাররা বলছেন, তারা যোগ্য ব্যক্তিকেই বেছে নেবেন। দখলবাজ ও চাঁদাবাজ কোনো ব্যক্তি যেন এই আসনে আসতে না পারে সেই ব্যবস্থা করবেন।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, নারায়ণগঞ্জ-৩ আসন গঠিত হয়েছে প্রাচীন বাংলার রাজধানী সোনারগাঁ উপজেলা ও নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের সিদ্ধিরগঞ্জ অঞ্চলের দশটি ওয়ার্ড নিয়ে। আসনটিতে এবার মোট ভোটার ৫ লাখ ৮৩ হাজার ৯৫২ জন। বিগত ১০টি জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এ আসনে বিএনপি চারবার, জাতীয় পার্টি চারবার ও আওয়ামী লীগ দুইবার জয় পেয়েছে।
নির্বাচনকে ঘিরে এ আসনের ভোটারদের চাহিদা এখন দখলবাজ আর চাঁদাবাজ ঠেকানো, সঙ্গে এলাকার উন্নয়ন। সংঘাত এড়িয়ে শান্তিপূর্ণ নির্বাচনি পরিবেশ চান বলে জানিয়েছেন ভোটাররা। সোনারগাঁয়ের মেঘনা এলাকার ভোটার স্থানীয় মাছ ব্যবসায়ী তরিকুল ইসলাম বলেন, ‘এখানকার বহু গ্রাম প্রভাবশালীদের দখলে। বিগত সময়ে এখানকার ভোটাররা তাদের পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দিতে পারেনি। কিন্তু এবার যোগ্য ব্যক্তিকে নির্বাচিত করতে ভোটদান করব।’
উপজেলার জামপুর ইউনিয়নের ভোটার স্কুলশিক্ষক সোলাইমান গাজী বলেন, ‘এখানে চিকিৎসাব্যবস্থা নেই বললেই চলে। এখান থেকে উপজেলা হাসপাতাল অনেক দূর। পাশাপাশি থাকা তিন ইউনিয়নের মানুষ চিকিৎসা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে ভোগান্তি পোহাচ্ছেন। বিগত ১৬ বছরে বহু জনপ্রতিনিধি নানা উদ্যোগের কথা বললেও শেষ পর্যন্ত কিছুই করেননি। কিন্তু এবার সময় এসেছে, যিনি কথা রাখবেন তাকেই ভোট দেব।’
সোনারগাঁয়ের পশ্চিম প্রান্তের শেষ গ্রাম শম্ভুপুরার ভোটার চাল আড়তের ম্যানেজার মোহাম্মদ আলী বলেন, ‘রাস্তাঘাট হলেও শিক্ষার মানের দিক থেকে আমাদের এলাকা অনেক পিছিয়ে। তার মধ্যে নদীর পাশে থাকা গ্রামের মানুষের জমিগুলো দখল হয়ে যাচ্ছে। যিনি এগুলো পরিবর্তন করতে পারবেন, এলাকার মানুষ তাকেই ভোট দেবে।’
এবার সিদ্ধিরগঞ্জের ভোটারদের চাহিদাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হতে পারে বলে মনে করেন হিরাঝিল এলাকার ভোটার তানিয়া রহমান। তিনি বলেন, ‘দীর্ঘদিন এলাকাটি সিটি করপোরেশনের মধ্যে থাকলেও কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন হয়নি। বরং এখানে শিল্পাঞ্চল থাকায় আধিপত্য বিস্তার নিয়ে সংঘাত, ঝুট সেক্টরের নিয়ন্ত্রণ ও চাঁদাবাজি বেড়েছে। এখানকার ভোটাররা আর গণ্ডগোল চায় না। তাই যিনি শান্তি বজায় রাখতে পারবেন, তাকেই ভোটাররা বিজয়ী করবেন।’
আসনটিতে বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য আজহারুল ইসলাম (মান্নান) মনোনয়ন পেয়েছেন। দলের নেতা-কর্মীদের নিয়ে সভা-সমাবেশ, গণসংযোগ আর উঠান বৈঠক করে জনগণের সাড়া পাচ্ছেন বলে জানান তিনি। তবে তার প্রার্থিতা বাতিলের জন্য কেন্দ্রে চিঠি পাঠানোসহ বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করেছেন বিএনপির মনোনয়নপ্রত্যাশী আরও ছয়জন। তবে বিগত সময়ে আন্দোলন-সংগ্রামে যারা মাঠে ছিলেন না, তাদের নিয়ে কথা বলতে চান না আজহারুল ইসলাম মান্নান। তার ভাষ্য, দলীয় কর্মকাণ্ড, বিপদে নেতা-কর্মীদের পাশে থেকে দলের নির্দেশনা মেনে চলায় সোনারগাঁয়ের জনগণের হৃদয়ে স্থান পেয়েছেন তিনি। এবার সিদ্ধিরগঞ্জের জনগণও তার পাশে আছে। তাকে এমপি নির্বাচিত করলে দুই অঞ্চলের জনগণের সেবক হিসেবে কাজ করবেন তিনি।
বিএনপির এই প্রার্থী ছাড়াও ভোটের মাঠে সক্রিয় জামায়াতে ইসলামী মনোনীত দলের কেন্দ্রীয় মজলিসের শুরা সদস্য ইকবাল হোসেন ভুঁইয়া, গণসংহতি আন্দোলন থেকে মনোনয়ন পাওয়া দলটির নারায়ণগঞ্জের নির্বাহী সমন্বয়কারী অঞ্জন দাস, জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) যুব সংগঠন যুবশক্তির কেন্দ্রীয় সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক তুহিন মাহমুদ ও ইসলামী আন্দোলন, বাংলাদেশ মনোনীত গোলাম মসীহ। এর মধ্যে সম্প্রতি জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য থেকে পদত্যাগ করে এই আসনে প্রার্থী হয়েছেন গোলাম মসীহ।
এ ছাড়া আসনটিতে গণঅধিকার পরিষদ থেকে প্রার্থী হয়েছেন ওয়াহেদুর রহমান মিল্কি, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মনোনয়ন পেয়েছেন শাহজাহান শিবলী, ইসলামী ঐক্য জোটের প্রার্থী হিসেবে রয়েছেন মাওলানা আব্দুল দাইয়ান, খেলাফত আন্দোলন থেকে প্রার্থী হয়েছেন আতিকুর রহমান নান্নু মুন্সি ও খেলাফত মজলিসের মনোনীত প্রার্থী মুফতি সিরাজুল ইসলাম।
নির্বাচনি তফসিল ঘোষণার আগে থেকেই এসব দলের প্রার্থীরা মাঠে সক্রিয় রয়েছেন। তারাও নেতা-কর্মীদের নিয়ে সভা-সমাবেশ, গণসংযোগ ও উঠান বৈঠক করে নির্বাচনের মাঠে তৎপরতা চালাচ্ছেন। ভোটারদের দিচ্ছেন নানা প্রতিশ্রুতি।
এ আসনের জনগণের চাহিদা পূরণে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ জানিয়ে জামায়াত মনোনীত প্রার্থী ইকবাল হোসেন ভুঁইয়া বলেন, ‘গত ১৬ বছরে সোনারগাঁয়ে তেমন কোনো উন্নয়ন হয়নি। এখানকার মেঘনা ও সিদ্ধিরগঞ্জের শিল্প অঞ্চলের ঝুট সেক্টরের আধিপত্য নিয়ে প্রায় গণ্ডগোল হয়েছে। অথচ জনগণ এসব চায় না। তাই ভোটারদের হৃদয়ে জামায়াত নিয়ে ভাবনা আছে।’
অন্যদিকে এ আসনে দখলবাজ আর চাঁদাবাজি বন্ধে জনগণ গণসংহতিকে বেছে নেবেন বলে জানান দলটির মনোনীত প্রার্থী অঞ্জন দাস। তিনি বলেন, ‘প্রতিশ্রুতিতে শুধু দখলবাজ ও চাঁদাবাজি বন্ধই নয়, শিক্ষা-স্বাস্থ্যব্যবস্থার উন্নতি ও কর্মসংস্থান গড়ার উদ্যোগ নেওয়া হবে। আশা করছি ভোটের দিন পর্যন্ত জনগণ পাশে থাকবে।’
তিন আসনের উন্নয়নের পাশাপাশি সংস্কার কাজ বাস্তবায়ন এগিয়ে নেওয়ার কথা জানিয়েছেন এনসিপির প্রার্থী তুহিন মাহমুদ। আর গণঅধিকার পরিষদের প্রার্থী ওয়াহেদুর রহমান মিল্কি গড়তে চান আধুনিক নগর। এ ছাড়া ইসলামী আন্দোলন ও খেলাফত মজলিসসহ অন্য রাজনৈতিক দলের মনোনীতরা দিচ্ছেন নানান প্রতিশ্রুতি। ভোটারদের আকৃষ্ট করতে তারা প্রচার চালিয়ে যাচ্ছেন। সমালোচনা করছেন প্রতিদ্বন্দ্বীদের নিয়েও।
জনতার আওয়াজ/আ আ