নিরপেক্ষতা প্রশ্নে বিএনপি জামায়াত এনসিপি ও সরকার কি মুখোমুখি?
নিজস্ব প্রতিবেদক, জনতার আওয়াজ ডটকম
প্রকাশের তারিখ:
শুক্রবার, অক্টোবর ১৭, ২০২৫ ৫:০২ অপরাহ্ণ পরিবর্তনের তারিখ:
শুক্রবার, অক্টোবর ১৭, ২০২৫ ৫:০২ অপরাহ্ণ

জনতার আওয়াজ ডেস্ক
ছবি: সংগৃহীত
বাংলাদেশে বর্তমানে নির্বাচনের কয়েক মাস আগে প্রভাবশালী রাজনৈতিক দলগুলো অন্তর্বর্তী সরকারের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ তুলেছে।
সরকারের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে বিএনপি। এছাড়া ‘ষড়যন্ত্র তত্ত্ব’ উত্থাপন করেছে জামায়তে ইসলামী এবং তারা সরকারের কিছু উপদেষ্টার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের অভিযোগ করেছে।
সেফ এক্সিট সংক্রান্ত প্রশ্নও উঠে এসেছে—এই প্রশ্নটি তুলেছে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের ছাত্র নেতৃত্বের দল জাতীয় নাগরিক পার্টি বা এনসিপি।
এই তিনটি দলই অন্তর্বর্তী সরকারের ওপর প্রভাব রাখে বলে ধারণা করা হয়। শুরু থেকেই তারা সরকারকে সহায়তার কথা বলেছে।
কিন্তু এখন তারা সরকারের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ তুলেছে। সেজন্যই তাদের অভিযোগ ও এর লক্ষ্য-উদ্দেশ্য নিয়ে তীব্র আলোচনা চলছে। প্রশ্ন উঠছে, দলগুলো কোন পথে যেতে চাচ্ছে?
জাতীয় নির্বাচন সামনে আসার সঙ্গে সঙ্গে সরকার ও রাজনৈতিক দলগুলো মুখোমুখি অবস্থানে দাঁড়াচ্ছে কি না—এ বিষয়েও নানা আলোচনা চলছে।
দল তিনটি সরকারের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুললেও প্রতিপক্ষ রাজনৈতিক দলকে জড়িয়েছে, যদিও সরাসরি নাম উল্লেখ করা হয়নি। তবে কার দিকে আঙ্গুল তোলা হচ্ছে তা বোঝার অসুবিধা হওয়ার কথা নয়।
বিএনপি জামায়াতের দিকে ইঙ্গিত করছে, আর জামায়াত ও এনসিপি বিএনপির দিকে আঙুল তুলেছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, ভোটের আগে প্রশাসনে রদবদল বা নিয়োগ কোন দলের পক্ষে হচ্ছে—এটাই দলগুলোর কাছে প্রধান বিবেচ্য বিষয়। এ কারণেই তারা গুরুতর অভিযোগ তুলছে বা সরকারের বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করছে।
এ বিষয়ে দলনেতাদের ব্যাখ্যাতেও এই বিষয়টি উঠে এসেছে। এমন চিন্তা থেকে তারা সরকার ও প্রতিপক্ষের ওপর চাপ তৈরির কৌশল হিসেবে অভিযোগ তুলছে—এ নিয়েও আলোচনা রয়েছে।
পাল্টাপাল্টি অভিযোগের পটভূমিতে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা প্রশ্ন তুলছেন, অন্তর্বর্তী সরকার কি সত্যিই নিরপেক্ষ নির্বাচন করতে পারবে?
বিএনপি: সরকারের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন
এবার বিএনপির নীতিনির্ধারণী ফোরাম জাতীয় স্থায়ী কমিটির সভায় প্রশ্ন উঠেছে অন্তর্বর্তী সরকারের নিরপেক্ষতা নিয়ে।
সোমবার (১৩ অক্টোবর) অনুষ্ঠিত ওই বৈঠকে বলা হয়েছে, সরকারের কিছু উপদেষ্টার বক্তব্য, তৎপরতা এবং প্রশাসনে রদবদল ও পদায়নের পক্ষপাতমূলক ইঙ্গিত সরকারের নিরপেক্ষতা ক্ষুণ্ণ করছে।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সভায় বলা হয়েছে, ৫ আগস্টের পর প্রশাসনে যে রদবদল বা নতুন পদায়ন হয়েছে, সেখানে একটি বিশেষ রাজনৈতিক দলের ঘনিষ্ঠদের অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।
মাঠপর্যায়ে ভোট গ্রহণ কর্মকর্তাদের তালিকাতেও ওই দলের প্রভাব রয়েছে, বিএনপি নেতারা মনে করছেন। ভোট যত ঘনিয়ে আসছে, সরকারের নিরপেক্ষতা নিয়ে বিতর্কও তত বাড়ছে।
বিএনপি নেতাদের সঙ্গে কথা বলে বোঝা যায়, জুলাই গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিতে এবং বর্তমান সক্রিয় দলের মধ্যে জামায়তকে তারা ভোটের রাজনীতিতে প্রতিপক্ষ হিসেবে দেখছে। ফলে তাদের অভিযোগের লক্ষ্য জামায়াত।
বিএনপি নেতাদের মতে, সরকারের কিছু উপদেষ্টা বিশেষ ওই দলের পক্ষে প্রশাসন সাজাচ্ছে। সরকারের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তোলার পেছনেও প্রশাসনই মূল টার্গেট।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, কয়েকজন উপদেষ্টার বক্তব্য ও তৎপরতা সন্দেহ সৃষ্টি করেছে। এজন্য সরকারকে নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
উপদেষ্টাদের তালিকায় বিএনপির সন্দেহ
বিএনপি যাদের সন্দেহ করছে, তাদের নাম প্রকাশ করেনি। তবে প্রশাসনে রদবদল বা পদায়নের জন্য গঠিত মন্ত্রিসভা কমিটিই তাদের আপত্তির কেন্দ্রবিন্দু।
ওই কমিটিতে সরকারের চারজন উপদেষ্টা রয়েছেন—সালেহউদ্দিন আহমেদ, মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান, সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান ও মাহফুজ আলম। এছাড়া মন্ত্রী পরিষদ বিভাগ ও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সচিবরা রয়েছেন।
বিএনপির নেতারা মনে করেন, কমিটির মধ্যে দুজন উপদেষ্টা পক্ষপাতমূলক আচরণ করছেন। তারা নাম প্রকাশ করতে রাজি নন, তবে অভিযোগের বিষয়টি তাদের বক্তব্য ও তৎপরতায় স্পষ্ট।
দলটি এ বছরের ডিসেম্বরে নির্বাচনের দাবি করেছিল। শেষ পর্যন্ত জুনে লন্ডন সফরে প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গে বৈঠক করেন। বৈঠক থেকে আগামী বছরের ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচনের বিষয়ে কথা বলা হয়।
রাজনীতিতে ধারণা তৈরি হয়েছিল, সরকারের সঙ্গে বিএনপির টানাপোড়ন কমে গেছে। কিন্তু এখন নীতিনির্ধারণী ফোরাম থেকে সরকারের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হলো। ভোটকে কেন্দ্র করে দলীয় স্বার্থ এখন প্রধান বিষয় বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন।
জামায়াতের ‘ষড়যন্ত্র তত্ত্ব’
দলটির শীর্ষ পর্যায়ের একজন নেতা ‘ষড়যন্ত্র তত্ত্ব’ উত্থাপন করেছেন। ঢাকায় মানববন্ধনে জামায়াতের নায়েবে আমির সৈয়দ আব্দুল্লাহ মো. তাহের অভিযোগ করেছেন, অন্তর্বর্তী সরকারের কিছু উপদেষ্টা ষড়যন্ত্রে লিপ্ত। তাদের নাম ও কণ্ঠ রেকর্ড আছে বলেও দাবি করেছেন।
তিনি বলেছেন, প্রশাসনের অবস্থা এবং যে ষড়যন্ত্র চলছে, এটাকে বন্ধ করুন। যদি না হয়, কোন উপদেষ্টা ষড়যন্ত্রে লিপ্ত, আমাদের কাছে নাম ও কণ্ঠ রেকর্ড আছে। মিটিংয়ে তারা কী বক্তব্য দেন, তার খবরও আছে।
দলটির সিনিয়র নেতা অভিযোগ করেছেন, কয়েকজন উপদেষ্টা বিশেষ দলের সঙ্গে গোপন সম্পর্ক রেখে অধ্যাপক ইউনূসকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করছেন।
জামায়াত নেতারা বলছেন, তারা অধ্যাপক ইউনূসের সঙ্গে দেখা করে তাদের অভিযোগ তুলে ধরবেন। শুরু থেকেই সরকারের সঙ্গে জামায়াতের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকলেও তারা কেন অভিযোগ তুলছে, এ প্রশ্ন স্বাভাবিক।
জামায়াতও অভিযোগে কিছু উপদেষ্টার সঙ্গে একটি দলকে জড়িয়েছে, বিশেষ দল বলতে তারা বিএনপির দিকে আঙুল তুলেছে।
প্রশাসনও বড় ইস্যু। জনপ্রশাসনে আগের সচিবকে বাদ দিয়ে নতুন সচিব নিয়োগ হয়েছে, যা জামায়াত আপত্তি করছে। ভোটের আগে ডিসি-এসপি রদবদল ও প্রশাসনে পদায়নের বিষয়েও তাদের অভিযোগ রয়েছে।
সেফ এক্সিটকে কেন্দ্র করে এনসিপির অভিযোগ
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ছাত্র নেতাদের নিযোগকর্তা হিসেবে অধ্যাপক ইউনূস উল্লেখ করেছিলেন। অন্তর্বর্তী সরকারে ছাত্র প্রতিনিধিও রয়েছে।
শুরুর দিকে সরকারে প্রভাবশালী এনসিপি, কিন্তু যখন উপদেষ্টাদের সেফ এক্সিটের প্রশ্ন ওঠে, তখন সম্পর্কের টানাপোড়ন তৈরি হয়।
উপদেষ্টার পদ থেকে পদত্যাগ করে দায়িত্ব নেওয়া নাহিদ ইসলাম সম্প্রতি একটি সাক্ষাৎকারে বলেছেন, উপদেষ্টারা বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে লিয়াজোঁ করে ফেলেছেন, তারা নিজেদের সেফ এক্সিটের কথা ভাবছেন।
এছাড়া এনসিপির সদস্য সচিব আখতার হোসেন বলেছেন, কয়েকজন উপদেষ্টা বিশেষ একটি দলের জন্য পক্ষপাতিত্ব করছেন, এ ধারণা থেকে তারা অভিযোগ তুলছে। এনসিপিও দলীয় ফোরামে আলোচনা করে সরকারের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলছে।
তবে ভিন্ন কারণে সরকারের প্রতি তারা ক্ষুব্ধ, যেমন শাপলা প্রতীক এখনও পাননি। সেফ এক্সিটের বিষয়ে সরকারের অন্তত পাঁচজন উপদেষ্টা প্রতিক্রিয়া দিয়েছেন। সরকারের সঙ্গে এনসিপির সম্পর্ক আরও তিক্ত হতে পারে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।
সূত্র: বিবিসি বাংলা
জনতার আওয়াজ/আ আ