নির্বাচনে হেরে ভোটারদের থেকে টাকা ফেরত চাইলেন আ’লীগ নেতা
নিজস্ব প্রতিবেদক, জনতার আওয়াজ ডটকম
প্রকাশের তারিখ:
মঙ্গলবার, অক্টোবর ১৮, ২০২২ ১১:০১ অপরাহ্ণ পরিবর্তনের তারিখ:
মঙ্গলবার, অক্টোবর ১৮, ২০২২ ১১:০১ অপরাহ্ণ

টাঙ্গাইল জেলা পরিষদ নির্বাচনে ১১ নম্বর ওয়ার্ডে সদস্য পদে ভোট কিনেও হেরেছেন রফিকুল ইসলাম সংগ্রাম নামে এক আওয়ামী লীগ নেতা। নির্বাচনে ভোট না দেওয়া জনপ্রতিনিধিদের কাছে টাকা ফেরত চেয়েছেন তিনি। এমনকি, ভবিষ্যতে আর কোনও নির্বাচনে না দাঁড়ানোর ঘোষণা দিয়েছেন এই প্রার্থী।
মঙ্গলবার (১৮ অক্টোবর) সকাল সাড়ে ৯টার দিকে রফিকুল ইসলাম তার ফেসবুক আইডি থেকে একটি পোস্ট দেন। সেখানে ভোটারদের কাছে ‘ক্রয় করা ভোটের’ টাকা ফেরত চেয়েছেন তিনি। মহুর্তেই এই পোস্ট ভাইরাল হয়ে যায়। এ নিয়ে শুরু হয় সমালোচনা। রফিকুল ইসলাম বাসাইল সদর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক।
ফেসবুক পোস্টে রফিকুল ইসলাম সংগ্রাম লেখেন, জেলা পরিষদ নির্বাচনে বাসাইলে (সদস্য-১১) আমরা চারজন প্রার্থী ছিলাম। ভোটার ছিল ৯৪ জন। দিন শেষে জানা গেল প্রত্যেক প্রার্থী ৫০-৬০ জন ভোটারকে টাকা দিয়েছে। তারমধ্যে আমাকে ৬০ জন ভোটার কথা দিলেও তারমধ্যে কম বেশি ৫৫ ভোটার আমার কাছ থেকে টাকা গ্রহণ করল। ভোট দিল মাত্র ৭ জনে। এই হল ভোটারদের আসল চরিত্র।
তিনি আরও লেখেন, পৃথিবীর সবকিছুই এক বার দেখলে চেনা যায়, শুধু মানুষ বাদে। আমাকে যারা ভোট দেননি মনে হয় আপনাদের নামের তালিকা হওয়ার আগে আমার টাকা ফেরত দেওয়া উচিত। আপনারা না জনপ্রতিনিধি। ভোট আপনি যাকে খুশি তাকে দেন, এটা আপনাদের অধিকার, তাই বলে টাকা নেবেন ৪ জনের কাছ থেকে। আর ভোট দেবেন একজনকে, এটা কেমন চরিত্র? আপনাদের কাছ থেকে আপনার এলাকার জনগণ কী সেবা পেতে পারে?
এ বিষয়ে জানতে চাইলে পরাজিত প্রার্থী রফিকুল ইসলাম সংগ্রাম জানান, পোস্ট দেওয়ার পর টাকা গ্রহণকারী অনেকেই আমাকে ফোন করে টাকা ফেরত দিতে চেয়েছেন। অনেকেই আজ রাতের মধ্যেই টাকা ফেরত দেবেন বলে অঙ্গীকার করেছেন। এ জন্য আমি পোস্টটি সরিয়ে নিয়েছি।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক ভোটার বলেন, ‘প্রত্যেক ভোটার টাকা নিয়েছেন। আমি নিয়েছি একজনের কাছ থেকে। এ ছাড়া আরও দুজন আমাকে জোর করে টাকা দিয়েছেন। নির্বাচনে হেরে এখন টাকা ফেরত চাচ্ছেন তারা।’
‘ভোট কেনা জঘন্য অপরাধ। এটা অন্যের অধিকার টাকা দিয়ে কিনে নেওয়া। একজন মানুষের মানবিক সত্ত্বাকে হরণ করার অপরাধ।’
বাসাইল সদর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সোহানুর রহমান সোহেল বলেন, ‘ভোটারদের টাকা দেওয়ার বিষয়টি এখন প্রার্থীরা বলছেন। এক প্রার্থী টাকা ফেরত চেয়ে ফেসবুকে পোস্ট দিয়েছেন। অবশ্য পরে তিনি সেটি ডিলিট করে দিয়েছেন। তারা কেন ভোট কিনলেন বুঝলাম না।’
এ বিষয়ে বাসাইলের প্রিজাইডিং অফিসার মুহাম্মদ বাবুল হাছান জানান, নির্বাচনের আগে ভোটারদের মধ্যে কেউ টাকা লেনদেন করেছেন কী না সে বিষয় জানা নেই। গতকাল নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার আগে কেউ কোনো অভিযোগ করেননি।
এ ব্যাপারে উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তা মনি শংকর রায় জানান, নির্বাচনের আগে কেউ টাকা দেলদেনের বিষয়ে অভিযোগ করেনি। এখন হেরে গুজব ছড়াচ্ছেন। ভোটারদের টাকা দিয়ে থাকলে তিনি এটা অন্যায় করেছেন।
এ বিষয়ে মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (মাভাবিপ্রবি) ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগের চেয়ারম্যান প্রফেসর ড. উমর ফারুক বলেন, ভোট কেনা জঘন্য অপরাধ। এটা অন্যের অধিকার টাকা দিয়ে কিনে নেওয়া। একজন মানুষের মানবিক সত্ত্বাকে হরণ করার অপরাধ। সাময়িক রাজনৈতিক অবস্থা যে পর্যায়ে পৌঁছেছে, এটি নীতি-নৈতিকতা মানবিক বর্জিত ও মানবিক বিসর্জিত। যার ফলে এখন এই বিষয়গুলো প্রকাশ্যেই ঘটে।
তিনি বলেন, এক সময় যারা ভোট কিনতো বা বিক্রি করতো- তারা এটাতে লজ্জাবোধ করতো। এখন ওই মূল্যবোধগুলো অবক্ষয় বা নষ্ট হয়ে গেছে। এটা একটা স্বাভাবিক সহনশীল মাত্রায় এটা মানুষ বিবেচনা করছে। এতে একজন ব্যক্তি তার আত্মমর্যাদা এবং সামাজিক মূল্যবোধ মানুষ এখন আর বুঝতে পারে না। ভোট কেনা-বেচায় আইনের যথাযথ প্রয়োগ করতে হবে। যারা রাজনৈতিক ব্যক্তি বা ভোটদাতা রয়েছেন- তাদের মানবিক, সামাজিক ও নৈতিকভাবে সচেতন এবং সতর্ক হতে হবে।
ড. উমর ফারুক বলেন, এছাড়া আইনশৃঙ্খলা বাহিনী শক্তিশালীভাবে আইনের যে প্রয়োগ, সেটা করতে হবে। এটার ব্যাপারে আইন আছে। তবে আইনের প্রয়োগটা সেই অর্থে ব্যবহার হয় না। নিয়মিত নজরদারির পাশাপাশি যদি দৃষ্টান্ত স্থাপন করা যায়, তাহলে মানুষ এটা থেকে বিরত থাকবে।
প্রসঙ্গত, টাঙ্গাইল জেলা পরিষদ নির্বাচনে ১১ নম্বর ওয়ার্ডে (বাসাইল) সদস্য পদে সোমবার (১৭ অক্টোবর) বাসাইল উপজেলা হলরুমে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এ ওয়ার্ডে ভোটার ছিল ৯৪ জন। এতে নাছির খান টিউবওয়েল প্রতীকে ৫৫ ভোট পেয়ে সদস্য পদে নির্বাচিত হন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী অটোরিকশা প্রতীকের প্রার্থী হোসাইন খান সবুজ পান ২১ ভোট।
এছাড়া উটপাখি প্রতীকের প্রার্থী রফিকুল ইসলাম সংগ্রাম সাত ভোট, মিজানুর রহমান খান হাতি প্রতীকে ১১ ভোট ও আতিকুর রহমান তালা প্রতীকে কোনো ভোট পাননি। সংরক্ষিত ৪ নম্বর ওয়ার্ডে নারী সদস্য পদে দোয়াত-কলম প্রতীকে খালেদা সিদ্দিকী পান ৪১ ভোট, ফুটবল প্রতীকের প্রার্থী রওশন আরা আক্তার রিতা ২১ ভোট ও হরিণ প্রতীকের প্রার্থী রুমা খান পান ৩১ ভোট। পাঁচ প্রার্থীর মধ্যে তিন প্রার্থীরই জামানত বাজেয়াপ্ত হয়।
জনতার আওয়াজ/আ আ