নির্বাচন নিয়ে শঙ্কা বাড়ছে জনমনে
নিজস্ব প্রতিবেদক, জনতার আওয়াজ ডটকম
প্রকাশের তারিখ:
শুক্রবার, মে ১২, ২০২৩ ১২:৫০ পূর্বাহ্ণ পরিবর্তনের তারিখ:
শুক্রবার, মে ১২, ২০২৩ ১২:৫০ পূর্বাহ্ণ

আবদুর রহমান মল্লিক
জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে কোনো রাজনৈতিক সমঝোতা না হওয়ায় জনমনে শঙ্কা বাড়ছে। আগামী নির্বাচন ২০১৪ বা ২০১৮ এর মতো হবে নাকি উৎসবমুখর ও অংশগ্রহণমূলক হবে তা নিয়ে বিস্তর আলোচনা সমালোচনা হচ্ছে। ২০২৩ সালের শেষ কিংবা ২০২৪ সালের শুরুতে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা রয়েছে। তবে ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে নির্বাচন অনুষ্ঠানের কথা ভাবছে বলে মনে করা হচ্ছে। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রথম তিনটি নির্বাচন ছাড়া স্বাধীনতার পর যে নির্বাচনগুলো অনুষ্ঠিত হয়েছে তার কোনোটারই অভিজ্ঞতা সুখকর নয়। বাংলাদেশে একটি স্বাধীন নির্বাচন কমিশনের অধীনে নিরপেক্ষ নির্বাচন যেন সোনার হরিণে পরিণত হয়েছে।
রাজনৈতিক দলসমূহের মধ্যে আস্থাহীনতার বিষয়টি পুরনো। আর এই আস্থাহীনতা তারা নিজেরাই তৈরি করেছে। প্রতিটি সরকার পুনরায় ক্ষমতায় থেকে যাওয়ার জন্য অগণতান্ত্রিক ও অন্যায্য পন্থা গ্রহণ করেছে। আমরা দেখেছি একটি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে যে দল ক্ষমতায় ছিল পরের বার তারা আসতে পারেনি। কারণ জনসমর্থন হারানোর ফলাফল তারা হাতেনাতে পেয়েছে। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের নির্বাচনী ব্যবস্থা কোনোভাবেই ঠুঁটো জগন্নাথ মার্কা ইসির মতো নয়। তখন কোনো রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ কার্যকর ছিল না। বর্তমান বাস্তবতায় বড় দুটো দল যদি নির্বাচনে না আসে তবে সেই নির্বাচনের প্রতি জনগণের কোনো আগ্রহ থাকে না। কিন্তু নির্বাচন কমিশন যদি বলে দেন, কে নির্বাচনে এলো কে এলো না এটা কমিশনের দায় নয়। ভোট কেন্দ্রে ভোটার এলো কি এলো না সেটাও ইসির দায় নয়। তাহলে দায়টা কিসের? এসব বক্তব্য শুনলে স্বাভাবিকভাবে জনগণ মনে করে এ নির্বাচন কমিশন সরকারের আজ্ঞাবহ।
একটু ভেবে দেখুন, সরকারের ইচ্ছা অনুযায়ী ইসি বলতে থাকেন নির্বাচন ইভিএম পদ্ধতিতেই হবে। এখন ইভিএম মেশিন বিকল থাকায় তা মেরামতে যে ব্যয় হবে সে অর্থ সরকারের কাছে নেই। ফলে ইভিএম নিয়ে কোনো উচ্চবাচ্য এখন শোনা যায় না। অথচ ইভিএম নিয়ে তর্ক বিতর্ক আমরা কম শুনিনি। নির্বাচন নিয়ে নেতানেত্রীরা যা বলেন তা বগলে ইট মুখে শেখ ফরিদের মতো। কেউ একটি স্বাধীন নির্বাচন কমিটি গঠন নিয়ে কাজ করেন না। সাড়ে তিনশত সংসদ সদস্য রাষ্ট্রের যে সুযোগ সুবিধা ভোগ করেন তার বিপরীতে তারা কেবল ব্যক্তিগত ও দলীয় স্বার্থেই কাজ করেন। তারা জনগণের সেবক না হয়ে প্রভু বনে যান। রাষ্ট্র বিনির্মাণে তারা যদি যথার্থ ভ‚মিকা রাখতেন তবে রাষ্ট্রের শৃঙ্খলা এতো ভঙ্গুর হয়ে পড়ত না।
ব্যক্তিগত সততা আর নৈতিকতা যদি শক্তিশালী না থাকে তবে গুরুত্বপূর্ণ পদে থেকে তিনি ভালো কিছু করতে পারেন না। সেদিক থেকে আমাদের তিন বিচারপতি বাংলাদেশের ইতিহাসে সম্মানের ও গৌরবের স্থান দখল করেছেন। যারা তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ছিলেন। ১. বিচারপতি শাহাবুদ্দিন আহমদ (১৯৯১) ২. বিচারপতি হাবিবুর রহমান (১৯৯৬) ৩. বিচারপতি লতিফুর রহমান (২০০১)। তাদের সময়ে অন্যান্য উপদেষ্টারাও ছিলেন আত্মমর্যাদাসম্পন্ন ও নিজ নিজ অবস্থানে স্বমহিমায় প্রতিষ্ঠিত। ফলে তারা তাদের আন্তরিকতা ও নিষ্ঠা দিয়ে অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করে গেছেন। ওই তিন বিচারপতির সকলেই প্রয়াত হয়েছেন। তাদের বিদেহী আত্মার প্রতি শ্রদ্ধা জানাই।
ইয়াজউদ্দিন-ফখরুদ্দীনের আমলে কিভাবে তত্ত্বাবধায়ক সরকার কিভাবে প্রশ্নবিদ্ধ হয় ও কার্যকারিতা হারায় সে ইতিহাস আমাদের কমবেশি জানা। চতুর্থ তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠিত হয় ২০০৬ সালে। প্রথমে ২৯ অক্টোবর বাংলাদেশের মহামান্য রাষ্ট্রপতি অধ্যাপক ড. ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদ এই সরকারের প্রধান উপদেষ্টার দায়িত্ব গ্রহণ করেন। নিয়োগ দেয়া উপদেষ্টাদের মধ্যে চারজন এক মাসের ঊর্ধ্বে কাজ করার পর বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদের সাথে মতানৈক্যের অভিযোগ তুলে পদত্যাগ করেন। এরা হলেন- ড. আকবর আলি খান, লে. জে. হাসান মশহুদ চৌধুরী, সি এম শফি সামী ও সুলতানা কামাল চক্রবর্তী। একপর্যায়ে সকল প্রধান উপদেষ্টাসহ সকল উপদেষ্টা পদত্যাগ করেন। রাষ্ট্রপতি দেশে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেন। বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. ফখরুদ্দীন আহমদকে নতুন প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়। ২৬ জানুয়ারি রাষ্ট্রপতি এক অধ্যাদেশের মাধ্যমে দেশে সকল রাজনৈতিক কার্যক্রম স্থগিত ঘোষণা করেন। প্রধান দু’টি রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ এবং বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের প্রধান শেখ হাসিনা ও বেগম খালেদা জিয়াকেও দুর্নীতির দায়ে গ্রেফতার করে। দেশের রাজনীতির ইতিহাসে এক কলঙ্কজনক অধ্যায়ের সূচনা হয়।
আওয়ামী লীগ ও বিএনপি জনসমর্থনপুষ্ট দুটো বৃহৎ রাজনৈতিক দল। তারাই দেশ পরিচালনা করবে এটাই স্বাভাবিক। দুর্ভাগ্যজনক হলো তারা কেউই সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করতে ব্যর্থ হয়েছে। ক্ষমতাসীন সরকার গত দুই মেয়াদে বহু উন্নয়ন কর্মসূচি বাস্তবায়ন করলেও ভোটের অধিকার হারা জনগণ সরকারের প্রতি ততটা প্রসন্ন হতে পারেনি। মর্যাদাপূর্ণ রাজনীতির স্বার্থে মানুষের ভোটের অধিকার ফিরিয়ে দেয়া প্রয়োজন। ভোট কিভাবে হবে তা নিয়ে ঐকমত্য না থাকায় জনমনে দিন দিন ভীতি ও নির্বাচনকালীন সংঘাতপূর্ণ পরিস্থিতির আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে। তাই সরকারের উচিত হবে আগামী নির্বাচনে শান্তি ও শৃঙ্খলাপূর্ণ পরিবেশ নিশ্চিত করা।
জনতার আওয়াজ/আ আ