পঞ্চগড়-১: বিএনপি-জামায়াত-এনসিপির মধ্যে ত্রিমুখী লড়াই হবে
নিজস্ব প্রতিবেদক, জনতার আওয়াজ ডটকম
প্রকাশের তারিখ:
শুক্রবার, ডিসেম্বর ৫, ২০২৫ ৩:৩৩ অপরাহ্ণ পরিবর্তনের তারিখ:
শুক্রবার, ডিসেম্বর ৫, ২০২৫ ৩:৩৩ অপরাহ্ণ

জনতার আওয়াজ ডেস্ক
ছবি: সংগৃহীত
পঞ্চগড় সদর, তেঁতুলিয়া ও আটোয়ারী উপজেলা নিয়ে গঠিত পঞ্চগড়-১ আসন। এটিই বাংলাদেশের সংসদীয় এক নম্বর আসন। এখানে আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে মাঠ চষে বেড়াচ্ছেন বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রার্থীরা। তারা সভা, সেমিনার, গণসংযোগসহ বিভিন্ন কর্মসূচি পালনের পাশাপাশি ভোটারদের দ্বারে দ্বারে গিয়ে নানা প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন। স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এই আসনে বিএনপি, জামায়াত ও এনসিপির প্রার্থীর মধ্যে ত্রিমুখী লড়াই হবে।
ইতোমধ্যে পঞ্চগড়-১ আসনে কম-বেশি সব রাজনৈতিক দলই তাদের প্রার্থীর নাম ঘোষণা করেছে। বিএনপির প্রার্থী হিসেবে দলটির জাতীয় নির্বাহী কমিটির আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক ব্যারিস্টার মুহম্মদ নওশাদ জমিরের নাম ঘোষণা করা হয়েছে। তিনি সাবেক রাষ্ট্রপতি ও বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মুহম্মদ জমির উদ্দিন সরকারের ছেলে। জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী জেলা আমির অধ্যাপক ইকবাল হোসাইন এবং এনসিপির প্রার্থী দলটির উত্তরাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক সারজিস আলম। এ ছাড়া জাতীয় গণতান্ত্রিক পাটির (জাগপা) মুখপাত্র ও সহ-সভাপতি রাশেদ প্রধান, বাংলাদেশ জাসদের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক সংসদ সদস্য বীর মুক্তিযোদ্ধা নাজমুল হক প্রধান, গণঅধিকার পরিষদের মাহফুজুর রহমান, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের কারি মোহাম্মদ আবদুল্লাহ, গণসংহতি আন্দোলনের সাজেদুর রহমান সাজুসহ কয়েকটি দলের প্রায় তিন ডজন প্রার্থী নির্বাচনে অংশ নিতে পারেন।`
জানা গেছে, নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের পর পঞ্চগড়-১ আসনটি ধীরে ধীরে বিএনপির আসন হিসেবে পরিচিতি পায়। ১৯৯১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির বর্ষীয়ান নেতা ও সাবেক স্পিকার মরহুম মির্জা গোলাম হাফিজ এ আসনে বিজয়ী হন। এরপর ১৯৯৬ এবং ২০০১ সালের নির্বাচনেও বিএনপির আরেক প্রবীণ নেতা ও সাবেক রাষ্ট্রপতি ব্যারিস্টার মুহম্মদ জমির উদ্দিন সরকার নির্বাচিত হন। ২০০৮ সালের নির্বাচনে চিত্র পাল্টে যায়। আওয়ামী লীগের প্রার্থী মজাহারুল হক প্রধানের কাছে হেরে যান জমির উদ্দিন সরকার। দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ জাসদকে আসনটি ছেড়ে দেয়। সেই নির্বাচনে জাসদের প্রার্থী বর্তমান বাংলাদেশ জাসদের কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক নাজমুল হক প্রধান নির্বাচিত হন। ২০১৮ সালের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী হন জমির উদ্দিনের ছেলে নওশাদ জমির। কিন্তু বাবার আসন ফেরাতে পারেননি তিনি। আওয়ামী লীগের মজাহারুল হক প্রধানের কাছে পরাজিত হন। সবশেষ, ২০২৪ সালের নির্বাচনে জেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি নাঈমুজ্জামান ভূঁইয়া (মুক্তা) বিজয়ী হন।
আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে পঞ্চগড়-১ আসনে জয়-পরাজয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবেন নারী ও তরুণ ভোটাররা। এ ছাড়া আওয়ামী লীগের সমর্থক-ভোটারদের অবস্থানও ফলাফল নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখতে পারে বলে ধারণা রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের। সাধারণ ভোটাররা বলছেন, যেহেতু আওয়ামী লীগ ভোটের মাঠে এবার থাকছে না। সে ক্ষেত্রে বিএনপি, জামায়াত ও এনসিপির প্রার্থীর মধ্যে ত্রিমুখী লড়াই হবে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, বাবার হারানো আসন পুনরুদ্ধারে মরিয়া নওশাদ জমির। ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার এলাকায় বিভিন্ন উন্নয়ন করায় তার বেশ জনপ্রিয়তা রয়েছে। বাবার জনপ্রিয়তা আর নিজের যোগ্যতাকে কাজে লাগাতে চান নওশাদ জমির। তিনি বিভিন্ন এলাকায় গিয়ে বিএনপির নেতা-কর্মীদের সঙ্গে মতবিনিময়সহ বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করছেন। স্থানীয় ভোটাররা বলছেন, ভোটের মাঠে নওশাদ জমির শক্তিশালী প্রার্থী।
জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী অধ্যাপক ইকবাল হোসাইন জেলা আমিরের পাশাপাশি জামায়াতের কেন্দ্রীয় শুরা সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তিনি সংসদ নির্বাচন এবারই প্রথম করলেও এর আগে তেঁতুলিয়া উপজেলা পরিষদের সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান ছিলেন। প্রথমবারের মতো সংসদ নির্বাচনের মাঠে নেমে বিভিন্ন এলাকায় গিয়ে মানুষের সঙ্গে কথা বলছেন তিনি। জুলাই অভ্যুত্থানের পর থেকে তিনি নির্বাচনের মাঠ গোছাচ্ছেন।
এদিকে জুলাই অভ্যুত্থানের পর রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) উত্তরাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক সারজিস আলম। তিনি এনসিপি থেকে পঞ্চগড়-১ আসনের মনোনয়ন তুলেছেন। আটোয়ারীর এই তরুণ নেতা দল ঘোষণার পরপরই বিশাল গাড়িবহর নিয়ে শোডাউন করে রাজনৈতিক মহলে ব্যাপক আলোচনায় আসেন। তরুণ ভোটারদের মধ্যে জায়গা করে নিতে তিনি ধারাবাহিকভাবে মাঠে কাজ করে চলেছেন। তিনি ইতোমধ্যে জেলা, উপজেলা, ইউনিয়ন কমিটি ঘোষণাসহ বিভিন্ন এলাকায় সভা-সেমিনার করে ভোটারের কাছে বার্তা পৌঁছাচ্ছেন।
এ ছাড়া আসনটিতে জাগপার মুখপাত্র রাশেদ প্রধানও বেশ সরব। জাগপার প্রতিষ্ঠাতা মরহুম শফিউল আলম প্রধানের ছেলে হিসেবে তিনি এলাকায় ইতোমধ্যেই বেশ পরিচিত ও জনপ্রিয় মুখ। তিনি দলীয় নেতা-কর্মীদের নিয়ে জেলার প্রত্যন্ত এলাকার হাট বাজারে গণসংযোগ অব্যাহত রেখেছেন। তবে তিনি জাগপা নাকি জোটগতভাবে নির্বাচন করবেন, এই নিয়ে সাধারণ ভোটারদের মধ্যে নতুন আলোচনা সৃষ্টি হয়েছে।
বাংলাদেশ জাসদের প্রার্থী হিসেবে মাঠে আছেন দলটির কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক সংসদ সদস্য বীর মুক্তিযোদ্ধা নাজমুল হক প্রধান। ২০১৪ সালে তিনি এ আসন থেকেই সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন।
সারজিস আলম বলেন, ‘মানুষ যেন কোনো দলের প্রতি, মার্কা ও ব্যক্তির প্রতি অন্ধ না থাকেন সেই বিষয়ে আমরা সচেতন করার চেষ্টা করছি। আমরা কিছু কমিটমেন্ট দিচ্ছি। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, চিকিৎসা, প্রশাসন, রাজনীতি থেকে শুরু করে প্রতিটি জায়গায় আমরা কমিটমেন্টগুলো তুলে ধরছি। আমরা দেখছি, মানুষ অনেক আগ্রহ` দেখাচ্ছেন। পঞ্চগড়ের প্রত্যেকটি ইউনিয়নে আমরা আহ্বায়ক কমিটি করেছি। আমরা আশাবাদী জনগণ আমাদের তাদের সেবা করার সুযোগ দেবেন।’
বিএনপি প্রার্থী নওশাদ জমির বলেন, ‘বিএনপির উন্নয়ন পরিকল্পনা মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে কাজ করছি। দীর্ঘদিনের ফ্যাসিবাদী শাসন মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার কেড়ে নিয়েছে। এখন জনগণ বিএনপিকে আবারও দেশ গড়ার দায়িত্ব দেবে। জাতীয় অর্থনীতিতে পঞ্চগড় জেলার অবদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এখানকার চা-শিল্প, পাথর, বালু ও পর্যটন খাত দেশের অর্থনীতিকে সমৃদ্ধ করছে। বিএনপি ক্ষমতায় এলে এ সম্ভাবনাগুলোকে কাজে লাগিয়ে জেলার মানুষের অর্থনৈতিক মুক্তি নিশ্চিত করা হবে এবং সবার কর্মসংস্থান নিশ্চিত করা হবে।’
জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী অধ্যাপক ইকবাল হোসাইন বলেন, ‘আমরা এবার অভাবনীয় ফলাফলের আশা করছি। নির্বাচনকেন্দ্রিক প্রশিক্ষণ ও সাংগঠনিক কার্যক্রম চলছে। আমরা জনগণের কাছে ব্যাপক সাড়া পাচ্ছি।’
জনতার আওয়াজ/আ আ