পিআর পদ্ধতিতে কার লাভ, কার ক্ষতি? সমঝোতায় পৌঁছতে না পারলে সমাধান কিভাবে?
নিজস্ব প্রতিবেদক, জনতার আওয়াজ ডটকম
প্রকাশের তারিখ:
সোমবার, সেপ্টেম্বর ২২, ২০২৫ ১১:৪৮ অপরাহ্ণ পরিবর্তনের তারিখ:
সোমবার, সেপ্টেম্বর ২২, ২০২৫ ১১:৪৮ অপরাহ্ণ

ব্যারিস্টার নাজির আহমদ
আনুপাতিক হারে নির্বাচন পদ্ধতি তথা Proportional Representation (PR – পিআর) এখন বাংলাদেশের সবচেয়ে আলোচিত বিষয়। বাংলাদেশের প্রচলিত নির্বাচন পদ্ধতি হচ্ছে – কোন আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারি প্রার্থীদের মধ্যে যে সবচেয়ে বেশি ভোট পাবেন (একটি ভোট বেশি হলেও) তিনিই নির্বাচিত হবেন। এতে বিজয়ী প্রার্থী শতকরা কত ভাগ ভোট পেলেন তা ধর্তব্য নয়। এটাকে ইংরেজিতে “First-Past-the-Post” (FPTP) বলে। অপরদিকে পিআর পদ্ধতিতে আসন ভিত্তিক নয় বরং জাতীয় ভিত্তিক দলীয় প্রতিকে নির্বাচন হয়। যে দল যত ভোট পাবে আনুপাতিকহারে সে দল ততটা সিট পাবে। বর্তমান নির্বাচন পদ্ধতি ও পিআর দুটিরই পক্ষে-বিপক্ষে যুক্তি আছে, আছে মেরিট ও ডিমেরিট। পৃথিবীতে উভয় পদ্ধতিই চালু আছে। পিআর পদ্ধতির মধ্যে আবার তিন ধরনের নিয়ম আছে। এগুলো হলো: পার্টি-লিষ্ট পিআর, মিক্সড-মেম্বার পিআর এবং সিঙ্গেল ট্রেন্সফারেবল ভোট পদ্ধতি। পার্টি-লিষ্ট পিআর পৃথিবীর ৮৫টি দেশে আছে, অপরদিকে মিক্সড-মেম্বার পিআর পৃথিবীর সাতটি দেশে আছে। আয়ারল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়ার সিনেটে, মাল্টা ও ভারতের রাজ্যসভায় পিআরের সিঙ্গেল ট্রেন্সফারেবল ভোট পদ্ধতি অনুশীলন করা হয়।
পিআর পদ্ধতি নিয়ে বাংলাদেশে রাজনৈতিক অঙ্গনে দীর্ঘদিনের মিত্র বিএনপি এবং জামায়াতের মধ্যে বাকযুদ্ধ (tug of war) চলছে। তাদের স্ব স্ব দলের নেতারা টকশোগুলো মাতিয়ে রাখছেন। তারা একে অন্যকে কটাক্ষ করছেন, করে চলছেন রীতিমতো আক্রমণ। শুধু এখানেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং তারা মাঠে আন্দোলনে নামার হুমকি দিচ্ছেন, কোন কোন দল ইতিমধ্যে নেমে পড়েছেনও। ফলে জনগণ দ্বিধান্বিত ও শংকিত যে কি হতে যাচ্ছে দেশে! দ্রুত পরিবর্তন হওয়া পরিস্থিতিতে তাদের প্রশ্ন: নির্বাচন কি আদৌ সময় মতো হবে? বিএনপি কি পিআর মানবে? বিএনপি যদি না মানে তাহলে জামায়াত ও তার সমমনা জোট কি করবে? আন্দোলন করে দাবি বাস্তবায়ন করতে পারবে?
বিএনপির জন্য পিআর পদ্ধতিতে নির্বাচনে যাওয়া দৃশ্যত জেনেশুনে বিষ পান করার মতো। কেননা পিআর পদ্ধতিতে নির্বাচন হলে বিএনপি এককভাবে কখনো ক্ষমতায় যেতে পারবে না। অতীতে ৪০% এর নীচে ভোট পেয়েও সংখ্যাগরিষ্ঠ আসন নিয়ে রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় গিয়েছে। বিএনপি সর্বোচ্চ ৪০% ভোট পেলেও তাতে পিআর পদ্ধতিতে আসন পাবে মাত্র ১২০টি যা সরকার গঠনের জন্য যথেষ্ট নয়। বিএনপিকে এক বা একাধিক দলের সাথে কোয়ালিশন করতে হবে। আবার বিদ্যমান পদ্ধতিতে ৪০% ভোটে পেয়েও বিএনপির দুই-তৃতীয়াংশ আসন পাবার সম্ভাবনা আছে।
পিআর জামাতের জন্য আবার আবির্ভূত হবে আশীর্বাদ হিসেবে। জামায়ত ১৯৯১ সালে এককভাবে নির্বাচন করে ১২.১% ভোট পেয়ে আসন পেয়েছিল মাত্র ১৮টি। পিআর পদ্ধতি থাকলে আসন সংখ্যা তাদের হতো ৩৬টি। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর জামায়াতের সমর্থন ও ভোট নি:সন্দেহে বেড়েছে। কত বেড়েছে বা বাড়তে পারে তা দেখার জন্য আগামি নির্বাচন পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। তবে সম্প্রতি অনুষ্ঠিত হওয়া ডাকসু ও জাকসু নির্বাচনের ফলাফলের ট্রেন্ড কিছুটা সুদূর প্রসারী ইঙ্গিত দেয়। জামায়াত জাতীয়ভাবে ২০% থেকে ২৫% ভোট স্কোর করতে পারলে পিআরে তাদের আসন সংখ্যা দাঁড়াবে ৬০ থেকে ৭৫টি। বিদ্যমান পদ্ধতিতে নির্বাচন হলে ২০% থেকে ২৫% ভোট স্কোর করেও বিপুল সংখ্যক আসনে অল্প ভোটের ব্যবধানে হারতে হতে পারে। ফলে আসন পাবার সম্ভাবনা তুলনামূলকভাবে কম।
জামায়াত পিআর পদ্ধতিতে নির্বাচন অনুষ্ঠিত করার দাবি নিয়ে চরমোনাইর পীরের দল ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশসহ তাদের সমমনা জোট নিয়ে মাঠে আন্দোলনে নেমেছে। জামায়াত ও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের নেতৃবৃন্দ মাঠে ময়দানে গরম গরম বক্তব্য রাখছেন। শেষ পর্যন্ত তারা অবস্থান কি ঠিক ধরে রাখতে পারবে? ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের সাথে জামায়াতের কি ঐক্য থাকবে? জামায়াত ও তার সমমনা জোট আন্দোলন করে দাবী আদায় করতে পারবে? বিএনপি কোনভাবেই মানবে না, অপরদিকে জামায়াত ও তার সমমনা জোট যেকোন মূল্যে আন্দোলন করে দাবী আদায় করতে চায়। সমাধান হবে তাহলে কিভাবে? নির্বাচন কি সময় মতো হবে? এসবগুলো উত্তর পেতে আর কিছু দিন অপেক্ষা করতে হবে।
ছোট ছোট দলগুলো জন্য পিআর অনেকটা পোয়া বার। যারা বিদ্যমান পদ্ধতির নির্বাচনে হয়তো কোনদিন সংসদে যেতে পারবে না তারা পিআরে নির্বাচন হলে কয়েকটা আসন পেতে পারে। যেমন ধরুন চরমোনাইর পীরের দল ইসলামিক আন্দোলন বাংলাদেশ এককভাবে হয়তো কোন আসন পাবে না, অতীতে পায়নি কিন্তু ভোটের দিক দিয়ে দুই বা তিন শতাংশ পেয়ে যেতে পারে। ফলে পিআর পদ্ধতিতে তারা ৬ থেকে ৯ টি আসন পাবে। অনুরুপভাবে খেলাফত মজলিস ও এবি পার্টি এককভাবে আসন পাওয়া দূরুহ হতে পারে কিন্তু পিআর পদ্ধতিতে শতকরা এক শতাংশ ভোট পেলেও তাদের জন্য তিন তিনটি আসন নিয়ে আসতে পারে।
বাংলাদেশের ৫৪ বছরের ইতিহাসে পিআর পদ্ধতিতে কোন নির্বাচন হয়নি। কোন কিছু না হলেই যে ভবিষ্যতে কখনোই তা হতে পারবে না ব্যাপারটি তেমন নয়। তবে যে কোন পদ্ধতির বাস্তবতা ও উপযুক্ততা যাচাই বাছাই করা দরকার। এক সময় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থাকে এ জাতি চিনতো না। নিরপেক্ষ তত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার দাবিতে তুমুল গণআন্দোলনের সময়ও এদেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় নেত্রী পর্যন্ত বলেছিলেন “পাগল ও শিশু ছাড়া কেউ নিরপেক্ষ নন”। ইতিহাস সাক্ষী এই তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থাই সবচেয়ে ভালো ও প্রয়োজনীয় ছিল বাংলাদেশে। এই ব্যবস্থার মাধ্যমেই একাধিক সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল বাংলাদেশ, যদিও পতিত সরকার আদালতের রায়ের নামে গুজামিলের আশ্রয় নিয়ে তা বাতিল করে যার পরিণতি ছিল গত বছরের গণঅভ্যুত্থান ও তাদের দেশ ছেড়ে পলায়ন।
পিআর পদ্ধতির মাধ্যমে বাংলাদেশে কোন নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়নি সত্য তবে শহীদ জিয়া সত্তর দশকের শেষের দিকে অনুষ্ঠিত হওয়া নির্বাচনে নিশ্চিত করেছিলেন যেন ছোট ছোট দল থেকে তাদের প্রতিনিধি (যেমন সুরন্জিত সেন গুপ্ত) বিজয়ী হয়ে সংসদে আসেন। রাস্তা বা রাজপথ নয় বরং সংসদকেই রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু বানাতে চেয়েছিলেন শহীদ জিয়া। এটাকে অনেকটা পরোক্ষ পিআর বা পিআরের বিকল্প বলা যেতে পারে। ছোট ছোট দল পিআরের জন্য অতি উৎসাহী হলেও নির্বাচনে ক্ষমতায় যাওয়ার সম্ভাবনাময় বড় দল বিএনপির কাছে থেকে কয়েকটি আসনে বিজয়ী হওয়ার নিশ্চয়তা বা আশ্বাস পেলে তারা হয়তো পিআর নিয়ে মাঠের আন্দোলনে যাবে না।
পিআর নিয়ে বেশ জটিলতার সৃষ্টি হতে চলছে মনে হয়। বড় দল বিএনপি কোনমতেই পিআর মানবে বলে মনে হয় না। তারা চায় নিম্নকক্ষ প্রচলিত পদ্ধতিতে নির্বাচন হোক। আর নিম্নকক্ষে প্রাপ্ত সীটের আনুপাতিক হারে (সংরক্ষিত মহিলা আসনের মতো) উচ্চকক্ষের আসন বণ্টন করা হোক। দ্বিতীয় বৃহত্তম দল জামায়াত ও তাদের সমমনা জোটের অবস্থান বিএনপির পূরো উল্টো। এ নিয়ে তারা মাঠে আন্দোলনে নেমেছে। ঐক্যমত্য কমিশনের সমঝোতা বৈঠক চলছে এমতাবস্থায় আন্দোলনে যাওয়ায় বিএনপি কঠোর ভাষায় সমালোচনা করছে এবং তারাও মাঠে নামার হুমকি দিচ্ছে। জামায়াত থেকে বলা হচ্ছে ঐক্যমত্য কমিশনে কোন অগ্রগতি হচ্ছে না এবং এটাকে সময় ক্ষেপণ বলে তারা মনে করেন। তারা মনে করেন এভাবে সময় ক্ষেপণ করে করে একসময় ডিসেম্বরে নির্বাচনের সিডিউল ঘোষনা হয়ে যাবে। আর তখন বলা হবে সিডিউল ঘোষনা হয়ে গেছে এবং নির্বাচন অতি সন্নিকটে। এখন কিছুই করার নাই। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে বিএনপি ও জামায়াত পিআর নিয়ে ধীরে ধীরে পয়েন্ট অব নো রিটার্নে চলে যাচ্ছে।
এভাবে পারস্পরিক দোষারোপ করতে থাকলে এবং আস্তে আস্তে পরস্পর পরস্পরের বিরুদ্ধে আন্দোলনে মাঠে নামলে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের দূর্বল সরকারের পক্ষে সামলানো কঠিন হবে। পরিস্থিতি ঘোলাটে হয়ে গেলে তখন তা সরকার ও রাজনৈতিক দলগুলোর নিয়ন্ত্রনের বাহিরে চলে যেতে পারে। এমতাবস্থায় জরুরী অবস্থা জারিসহ ১/১১ সরকারের মতো সরকার জাতির ঘাঢ়ে চেপে বসার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেয়া যায় না। তখন রাজনীতিবিদদের কিছুই করার থাকবে না।
পিআর নিয়ে সৃষ্ট জটিলতা কয়েকভাবে দূর হতে পারে। প্রথমত: দেশের বৃহত্তর স্বার্থের কথা ভেবে সব দল ঐক্যবদ্ধভাবে সিদ্ধান্ত নিবে উভয় কক্ষের নির্বাচন বিদ্যমান পদ্ধতিতে হবে অথবা পিআরের মাধ্যমে হবে। দুটোই বিশ্বে স্বীকৃত পদ্ধতি। দ্বিতীয়ত: সবাই যদি ঐক্যমতে পৌঁছতে না পারেন তবে তারা ঐক্যবদ্ধভাবে সিদ্ধান্ত নিবেন যে নিম্নকক্ষ বিদ্যমান পদ্ধতিতে নির্বাচন হবে আর উচ্চকক্ষ পিআরের মাধ্যমে হবে। তৃতীয়ত: উপরের দুটি অপশনের কোনটিতেই যদি মতৈক্যে পৌঁছা না যায় তাহলে ৫০% হবে বিদ্যমান পদ্ধতিতে আর ৫০% হবে পিআর পদ্ধতিতে। চতুর্থত: উপরের কিছুতেই যদি সমঝোতা বা ঐকমত্য না হয় তাহলে পূরো ব্যাপারটি জনগণের কাছে ছেড়ে দেয়া। ছোট্র অপশন দিয়ে গণভোটের ব্যবস্থা করুন। Let the people decide (অর্থাৎ জনগণকেই সিদ্ধান্ত নিতে দিন)। জনগণ যাই বলবে তা সবাইকে মেনে নতে হবে।
গণভোটের গুরুত্ব, প্রাসঙ্গিকতা ও প্রয়োজনীয়তা আছে। নির্বাচন কমিশন গঠিত হয়েছে বছরের উপর হতে চলল কিন্তু তারা ১৮ কোটি মানুষের দেশে সুন্দরভাবে নির্বাচন পরিচালনা করতে পারবেন এমন সক্ষমতা জাতির কাছে প্রমাণ করার সুযোগ পাননি। গণভোটের আয়োজন করে নির্বাচন কমিশন একদিকে জাতিকে সংঘাতময় পরিস্থিতি থেকে ফিরে আনতে পারেন অপরদিকে গোটা দেশে সাধারণ নির্বাচন পরিচালনার মতো মহাযজ্ঞ সম্পাদনে তাদের সক্ষমতা প্রমান করতে পারেন।
লেখক: বিশিষ্ট আইনজীবী, রাষ্ট্রচিন্তক, সংবিধান বিশেষজ্ঞ এবং ইংল্যান্ডের প্র্যাকটিসিং ব্যারিস্টার।
Email:
ahmedlaw2002@yahoo.co.uk
জনতার আওয়াজ/আ আ