পূর্ণ ক্ষমতা নিয়ে নির্বাচনে মাঠে থাকবে সেনাবাহিনী - জনতার আওয়াজ
  • আজ রাত ৩:৫৫, রবিবার, ১৭ই মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ৩রা জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ, ৩০শে জিলকদ, ১৪৪৭ হিজরি
  • jonotarawaz24@gmail.com
  • ঢাকা, বাংলাদেশ

পূর্ণ ক্ষমতা নিয়ে নির্বাচনে মাঠে থাকবে সেনাবাহিনী

নিজস্ব প্রতিবেদক, জনতার আওয়াজ ডটকম
প্রকাশের তারিখ: রবিবার, আগস্ট ২৪, ২০২৫ ১:৪৯ অপরাহ্ণ পরিবর্তনের তারিখ: রবিবার, আগস্ট ২৪, ২০২৫ ১:৪৯ অপরাহ্ণ

 

জনতার আওয়াজ ডেস্ক
ছবি: সংগৃহীত
দেশে জাতীয় নির্বাচনের হাওয়া বইছে। এরইমধ্যে অনেক দল প্রস্তুতিও শুরু করেছে। তবে এবারের নির্বাচনে আইনশৃঙ্খলার বিষয়ে সেনাবাহিনী শুধু ‘স্ট্রাইকিং ফোর্স’ নয়, অন্যান্য বাহিনীর মতো পূর্ণ ক্ষমতায় আইনশৃঙ্খলার দায়িত্বে থাকবে। এজন্য আরপিও (গণপ্রতিনিধিত্ব অধ্যাদেশ) সংশোধন করে প্রধান উপদেষ্টার দপ্তরে প্রস্তাব পাঠাতে যাচ্ছে ইসি। খবর: ডয়চে ভেলে

এর মাধ্যমে নির্বাচন কমিশন সেনাবাহিনীকে নির্বাচনি দায়িত্বে পূর্ণ ক্ষমতা দিতে চায়। ফলে ম্যাজিস্ট্রেটের চাহিদার ওপরে নয়, সেনাবাহিনী স্বাধীনভাবেই নির্বাচনের আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় কাজ করতে পারবে বলে জার্মান সংবাদ মাধ্যম ডয়চে ভেলেকে জানিয়েছেন নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ।

তিনি বলেন, ‘আমরা আরপিও সংশোধন করে সেখানে ল’এনফোর্সমেন্ট এজেন্সি হিসাবে সেনাবাহিনীকেও অন্তর্ভুক্ত করেছি। আগে ছিল না। আগে শুধু পুলিশ, কোস্টগার্ড, বিজিবি ছিল। এখন সেনাবাহিনীকেও অন্তর্ভুক্ত করা হলো। প্রস্তাবটি এ সপ্তাহের মধ্যেই সরকারের কাছে পাঠানো হবে’।

এই নির্বাচন কমিশনার বলেন, ‘আমাদের দিক থেকে আমাদের রিকমেন্ড করে একটা খসড়া এই সপ্তাহের মধ্যেই চলে যাবে। আমরা পাঠাবো, তারপর ওনারা ওনাদের মতো করে চিন্তা করবেন কতদূর করা যায়৷’

১৬ বছর আগে আরপিওর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তালিকা থেকে সেনাবাহিনীকে বাদ দেওয়া হয়। নির্বাচন কমিশন ও বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, সামনের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সেনাবাহিনী পূর্ণ ক্ষমতায় দায়িত্ব পালন করলে ভোটারদের মনে আস্থা ফিরে আসবে।

২০০১ সালে সপ্তম জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে প্রথম আরপিও সংশোধন করে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সংজ্ঞায় প্রতিরক্ষা কর্ম বিভাগগুলো বা সশস্ত্র বাহিনীকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়৷ আরপিওর ৮৭ অনুচ্ছেদে এই বিধান যুক্ত করে বলা হয় যে, ১৮৯৮ সালের ফৌজদারি কার্যবিধি বা আপাতত বলবৎ অন্য কোনো আইনে যা-ই থাকুক না কেন, নির্বাচন সংক্রান্ত দায়িত্ব পালনকালে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কোনো সদস্য একজন পুলিশ কর্মকর্তা না হয়েও নির্বাচনি অপরাধের জন্য কাউকে বিনা পরোয়ানায় গ্রেফতার করতে পারবেন। ২০০১ সালে এই বিধান অধ্যাদেশের মাধ্যমে আরপিওতে যুক্ত করা হয়।

শুধু জাতীয় সংসদ নির্বাচনেই নয়, পরবর্তী সময় স্থানীয় সরকার নির্বাচন আইনগুলোতেও আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সংজ্ঞায় সশস্ত্র বাহিনীকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। কিন্তু ২০০৮ সালে নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়ী হওয়ার পর আওয়ামী লীগ সরকার ওই সংশোধনী অধ্যাদেশে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সংজ্ঞা থেকে প্রতিরক্ষা কর্ম বিভাগ বাদ দেয়৷ এর ফলে নির্বাচনি দায়িত্ব পালনে পুলিশ, আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন, র্যাব, আনসার, বিজিবি, কোস্ট গার্ডের যে ক্ষমতা তা সশস্ত্র বাহিনীর থাকেনি।

নির্বাচন কমিশন এবার আরপিওর যে সংশোধনী প্রস্তাব পাঠিয়েছে তাতে জাতীয় সংসদ নির্বাচনসহ সব নির্বাচনেই সেনাবাহিনী আইনশৃঙ্খলা বাহিনী হিসেবে অন্তর্ভুক্ত থাকবে৷ নির্বাচনব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের সুপারিশে এবং রাজনৈতিক দলগুলোর দাবি অনুসারে এই প্রস্তাবটি অনুমোদন করা হয়েছে বলে কমিশন জানিয়েছে৷ নির্বাচন কমিশনের এই প্রস্তাব রাষ্ট্রপতির অধ্যাদেশ জারির মাধ্যমে বাস্তব রূপ পাবে৷ ইসি মাছউদ বলেন, ‘নির্বাচন কমিশন সর্বসম্মতভাবে এ প্রস্তাব গ্রহণ করেছে৷’

নির্বাচনি দায়িত্বে সেনা সদস্যদের ম্যাজিস্ট্রেসি ও পুলিশি ক্ষমতা

এবারের নির্বাচনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় দেড় লাখের মতো পুলিশ মোতায়েন থাকবে৷ এর বাইরে বিজিবি, কোস্টগার্ড ও আনসারও থাকছে৷ আর স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী গত ১১ আগস্ট সাংবাদিকদের বলেন, নির্বাচনে ৮০ হাজারের বেশি সেনা সদস্য মোতায়েন করা হবে।

সাবেক সেনা কর্মকর্তা ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক মেজর (অব.) এমদাদুল ইসলাম ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘এখন যেটা হচ্ছে, সেটা হলে নির্বাচনে সেনাবাহিনী মোতায়েন করতে সরকারের দিকে তাকিয়ে থাকতে হবে না৷ তাদের অনুমোদনের অপেক্ষা করতে হবে না৷ নির্বাচন কমিশন সরাসরি সেনা সদর দপ্তরে তাদের চাহিদা জানিয়ে আলোচনা করে নির্বাচনের সময় দায়িত্ব পালনে তাদের কাজে লাগাতে পারবে৷ অতীতে নির্বাচন কমিশন সেনাবাহিনী চেয়েও পায়নি এমন নজির আছে৷ সেই পারিস্থিতির মুখে পড়তে হবে না কমিশনকে৷’

এমদাদুল ইসলাম আরও জানান, আরপিওর এই সংশোধনী হলে নির্বাচনের দায়িত্ব পাওয়া সেনা সদস্যরা ম্যাজিস্ট্রেসি এবং পুলিশের ক্ষমতা একসঙ্গে পাবে৷ আগে তারা স্ট্রাইকিং ফোর্স হিসেবে ভোটকেন্দ্রের বাইরে এক জায়গায় অবস্থান করতেন৷ কোনো সমস্যা হলে ম্যাজিস্ট্রেটের অনুমোদন সাপেক্ষে তারা কাজ করতেন৷ কিন্তু এখন তার আর প্রয়োজন হবে না৷ তারা স্বাধীনভাবে ডেপ্লয়মেন্ট এবং অন্যান্য কাজ করতে পারবেন তাদের কমান্ডারের অধীনে।

সাবেক এই সেনা কর্মকর্তার মতে, ‘নির্বাচনে অনেক সময় স্থানীয় প্রশাসন ও পুলিশের ওপর রাজনৈতিক প্রভাব থাকে৷ অন্য কারণেও তারা প্রভাবিত হতে পারেন৷ কিন্তু সেনাবাহিনীর ওপর আমার মনে হয় সেই ধরনের প্রভাব বিস্তার করা যাবে না৷ ফলে তারা অন্যান্য বাহিনীর মতো আইনশৃঙ্খলার পূর্ণাঙ্গ দায়িত্ব পেলে তা অনেক ইতিবাচক হবে৷ নির্বাচনে প্রভাব বিস্তার কঠিন হয়ে পড়বে৷’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. সাব্বির আহমেদও মনে করেন, ‘বাংলাদেশের বাস্তবতায় নির্বাচনে সেনাবাহিনীকে দায়িত্ব দেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে৷ সেনাবাহিনী নিয়োগ ছাড়া সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয়৷’

সাব্বির আহমেদের মতে, ‘সেটা শুধু স্ট্রাইকিং ফোর্স হিসাবে নয়, পূর্ণ ক্ষমতা দিয়ে তাদের নির্বাচনি দায়িত্ব দিতে হবে৷ নয়ত নির্বাচনে আইনশৃঙ্খলা নিয়ে বড় সংকট তৈরি হতে পারে৷ তাই আরপিও সংশোধন করে নির্বাচনের সময় তাদের যে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পূর্ণ ক্ষমতা দেওয়া হচ্ছে এটা অনেক ইতিবাচক৷’

ঢাবির এই অধ্যাপক মনে করেন, ২০১৮ সালের নির্বাচনে দায়িত্ব পালনে পুলিশ তার আস্থা হারিয়েছে৷ এরপর গত বছরের ৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থানকে কেন্দ্র করে পুলিশের ভূমিকা এবং তাদের ওপর হামলা বাহিনীটির মনোবল আরো ভেঙে দিয়েছে৷ তাই এবারের নির্বাচনে আইনশৃঙ্খলা ও নিরাপত্তায় সেনবাহিনীকে বড় ভূমিকা পালন করতে হবে৷

নির্বাচন ও নির্বাচন কমিশন বিষয়ক আইনজীবী অ্যাডভোকেট আহসানুল করিম বলেন, ‘আগে তো সেনাবাহিনী স্ট্রাইকিং ফোর্স হিসাবে দায়িত্ব পালন করতো৷ তাতে যা হতো তারা চাইলেও নিজেরা কোনো ব্যবস্থা নিতে পারতো না৷ ম্যাজিস্ট্রেটের ওপর নির্ভর করতে হতো৷ এখন যদি আরপিও সংশোধন করে তাদের নির্বাচনের সময় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করে ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতা দেওয়া হয় তাহলে তারা স্বাধীনভাবে ব্যবস্থা নিতে পারবে, দায়িত্ব পালন করতে পারবে৷ তবে উপ-নির্বাচনের জন্য বারবার তাদের মোতায়েন করা কেমন হবে তা দেখতে হবে৷ বড় বা একসঙ্গে অনেক এলাকায় নির্বাচনের জন্য এটা ইতিবাচক৷’

তারপরও সরকার, নির্বাচন কমিশন ও প্রশাসনের মনোভাবের ওপরই সুষ্ঠু নির্বাচন নির্ভর করে বলে উল্লেখ করেন আহসানুল করিম।

ইসি মাছউদ বলেন, ‘নির্বাচন নিয়ে মানুষের মধ্যে এক ধরনের আস্থাহীনতা তৈরি হয়েছে৷ আমরা মনে করেছি তাই শুধু জাতীয় নির্বাচনে নয়, সব নির্বাচনেই সেনাবাহিনী থাকা দরকার৷ সেই কারণে এটা সরকারের ইচ্ছাধীন না রেখে আমরা একটি আইনি কাঠামোর মধ্যে নিয়ে এসেছি৷ এখন নির্বাচন কমিশন অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মতো সেনাবাহিনীর সঙ্গেও আলাপ আলোচনা করে প্রয়োজনীয় ফোর্স চাইতে পারবে৷ আর তারা আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় সব ধরনের দায়িত্বই পালন করতে পারবে৷ এটা এখন আইনের অধীন হলো৷’

 
 
জনতার আওয়াজ/আ আ
 
 

জনপ্রিয় সংবাদ

 

সর্বোচ্চ পঠিত সংবাদ