পোশাক বদলেই কি সব সন্তুষ্টি? - জনতার আওয়াজ
  • আজ বিকাল ৩:০৭, সোমবার, ১৮ই মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ৪ঠা জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ, ১লা জিলহজ, ১৪৪৭ হিজরি
  • jonotarawaz24@gmail.com
  • ঢাকা, বাংলাদেশ

পোশাক বদলেই কি সব সন্তুষ্টি?

নিজস্ব প্রতিবেদক, জনতার আওয়াজ ডটকম
প্রকাশের তারিখ: সোমবার, মে ১৮, ২০২৬ ২:২৯ পূর্বাহ্ণ পরিবর্তনের তারিখ: সোমবার, মে ১৮, ২০২৬ ২:২৯ পূর্বাহ্ণ

 

ঊনিশ শতকের মার্কিন লেখক গধৎশ ঞধিরহ এর একটি মজার উপন্যাস রয়েছে। নাম ‘The Prince and the Pauper’। উপন্যাসের ঘটনায় ইংল্যান্ডের যুবরাজ এডওয়ার্ডের সঙ্গে টম নামের এক দরিদ্র ছেলের পরিচয় হয়। দু’জনের চেহারায় এতটাই মিল ছিল যে তারা নিজেরাই একে অপরকে দেখে চমকে যায়। মজা করতে গিয়ে তারা তাদের পোশাক বদল করে ফেলে। আর তাতেই ঘটে সব বিপত্তি। রাজপোশাক পরা টমকে কুর্নিশ করে রাজপ্রাসাদে নিয়ে যাওয়া হয়।

অন্যদিকে জীর্ণ পোশাক পরা প্রকৃত যুবরাজকে ফকির ভেবে বের করে দেয়া হয় প্রাসাদ থেকে। লেখক মূলত হাস্যরসের মাধ্যমে বিষয়টি দেখিয়েছিলেন যে, মানুষ অনেক সময় চেহারা-চরিত্রের চেয়ে পোশাককেই বেশি গুরুত্ব দেয়। এডওয়ার্ড আর টমের পোশাক বদলের কথা মাথায় আসলো পুলিশের পোশাক ফের পরিবর্তনের খবরের সূত্র ধরে। সম্প্রতি এ নিয়ে কথা বলেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। বলেছেন, পোশাকের ওপরের অংশ আগে যা ছিল ‘নেভি-ব্লু শার্ট, তাই থাকছে। সঙ্গে খাকি প্যান্ট দেয়া হয়েছে।

পুলিশ বাহিনীর আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে পোশাকে পরিবর্তন আনার বিষয়টি বিবেচনা করা হয়েছে বলে জানান তিনি। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে- পোশাকের এই পরিবর্তনে পুলিশ সদস্যদের মতামতের জরিপের ফলাফল কি প্রতিফলিত হয়েছে? পোশাক পছন্দ নিয়ে স্বয়ং পুলিশ বাহিনী সদস্যদের মাঝে গত মাসে এক জরিপ চালিয়েছে।

জরিপ দেখিয়েছে যে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় পুলিশের জন্য যে পোশাক নির্ধারণ করা হয়েছিল তা পরতে আগ্রহী মাত্র ০.৮৪ শতাংশ পুলিশ সদস্য। আগের পোশাকে থাকতে চায় ৯৬.৫৭ শতাংশ পুলিশ সদস্য। একেবারে নতুন পোশাক চায় মাত্র ২.৫৯ শতাংশ পুলিশ। আগের সময়ে জেলা পুলিশের গাঢ় নীল রঙের শার্ট ও প্যান্ট ছিল।

এতে যদি ৯৬.৫৭ শতাংশ পুলিশের পছন্দ থাকে, তাহলে জরিপের ফলাফল পুলিশের পোশাক পরিবর্তনে পুরোপরি প্রভাব ফেলতে পারেনি বলেই প্রতীয়মান হচ্ছে। নতুন সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর পুলিশের পোশাক পরিবর্তন নিয়ে পুলিশ বিভাগে যে দাবি জোরালো হয়, নতুন সিদ্ধান্তে সাময়িক স্বস্তি মনে হলেও প্যান্ট-প্রশ্নে ভবিষ্যতে শঙ্কা থেকেই যায়।

পুলিশের পোশাক নিছক কোনো পরিধেয় বস্ত্র নয়, এটি রাষ্ট্রের কর্তৃত্ব, শৃঙ্খলা ও দায়িত্বশীলতার প্রতীক। এই পোশাক অপরাধীর জন্য যেমন ভয় আর আতঙ্কের, নিরপরাধীর জন্য তেমনি অভয় আর স্বস্তির। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কোনো একটি নির্দিষ্ট পোশাক চোর-সাধুর ওপর প্রভাব ফেললেও পোশাকের রঙের তারতম্য তাদের মনে তেমন প্রভাব ফেলে না। তাহলে কেন বারবার এই পোশাকে পরিবর্তন? যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, এমনকি আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতেও বিভিন্ন সময়ে পুলিশের পোশাকে পরিবর্তন আনা হয়েছে।

মূলত আধুনিক পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর তাগিদে, আবহাওয়ার সঙ্গে উপযোগী করতে কিংবা মাঠপর্যায়ে কাজের উপযোগী করতে পোশাকে বা রঙে পরিবর্তন আনা প্রয়োজন হয়েছে। নিরাপত্তা সরঞ্জাম বহনের উপযোগিতাও এই কারণের মধ্যে ছিল। কিছু দেশে পুলিশের প্রতি জনগণের আস্থা ও বন্ধুসুলভ ভাবমূর্তি গড়ে তোলার বিষয়ও গুরুত্ব পেয়েছে। আমাদের দেশেও ২০০৪, ২০০৯ ও সর্বশেষ ২০২৫ সালে পুলিশের পোশাকে কম-বেশি পরিবর্তন আনা হয়।

২০০৪ সালে বিএনপি সরকার ক্ষমতায় থাকাকালীন ইউনিফর্মের রং ও নকশায় বড় পরিবর্তন আনা হয়। তখন বাহিনীকে আধুনিক ও পেশাদার রূপ দেয়ার গুরুত্ব আলোচিত হয় সকল মহল থেকে। পরবর্তীতে ২০০৯ ও ২০২৫ সালের পোশাক পরিবর্তনের হাওয়া আসে এক একটি নতুন সরকার আগমনের ওপর ভর করে।

২০০৯ সালে পোশাকে আংশিক পরিবর্তন আসার পর কেটে যায় দীর্ঘ ষোলোটি বছর। রাজনৈতিক পট পরিবর্তন ও পুলিশ সংস্কারের আলোচনার প্রেক্ষাপটে গত বছর নতুন লোগো ও ইউনিফর্ম চালুর উদ্যোগ নেয় অন্তর্বর্তী সরকার। এর লক্ষ্য ছিল পুলিশ বিভাগের ভাবমূর্তি পুনর্গঠন ও পুলিশকে আরও জনবান্ধব হিসেবে সমাজে প্রতিষ্ঠা করা।

২০২৫ সালে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে পোশাক পরিবর্তনে পুলিশের মতামত উপেক্ষিত থেকেছে বলে পুলিশের পক্ষ থেকে বারবার অভিযোগ উত্থাপিত হয়। বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকে পুলিশ সদস্যরা তাদের পোশাক পরিবর্তনের দিকে বারবার সরকারের মনোযোগ আকর্ষণের চেষ্টা করে।

সরকার প্রথমে বিষয়টি আমলে না নিলেও শেষমেশ পরিবর্তনে সায় দেয়। তবে যেহেতু খাকি রঙের প্যান্ট অন্তর্ভুক্তি নিয়ে পুলিশ সদস্যদের মতামতের জরিপে কোনো আগ্রহ দেখা যায়নি, তাহলে ভবিষ্যতে পুলিশ বিভাগে এ নিয়ে আবারো যে অভিযোগ উঠবে না তার নিশ্চয়তা কী? পোশাক পরিবর্তন শুধু ইচ্ছার ব্যাপার নয়, অর্থের বিষয়ও এখানে জড়িত। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে দুটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে ৭৬ কোটি টাকায় শুধু নতুন পোশাকের কাপড় সরবরাহের কাজ দেয়া হয় বলে জানা যায়। ফের পোশাক পরিবর্তনের সিদ্ধান্তে এখন আবারো শত কোটি টাকার প্রশ্ন সামনে আসছে।

এক বছরের মাথায় অর্থের এই সংকটে যেহেতু আবারো অর্থ ব্যয়ের প্রশ্ন আসলো, সেহেতেু পোশাক-প্রশ্নে পুলিশ বিভাগের অন্যতম প্রধান অংশীজন পুলিশ সদস্যদের পূর্ণ মতামত উপেক্ষা করার কারণ বোধগম্য নয়।

অতীতে নানা যুক্তিতে পুলিশের পোশাকে পরিবর্তন এসেছে। তবে এবারের পরিবর্তনের প্রেক্ষাপট আলাদা। এই পরিবর্তন শুধু পোশাকের বাহ্যিক রঙের পরিবর্তন নয়, এই পরিবর্তনের সঙ্গে পুলিশ বিভাগের অভ্যন্তরীণ ভাবমূর্তি পরিবর্তনের বিষয় সম্পৃক্ত। এই পরিবর্তন স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার মাধ্যমে জনআস্থা বৃদ্ধিতে এক নবযাত্রার সূচনার প্রয়াস।

পুলিশ বিভাগের প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ স্বভাবতই সরকারের হাতে। সরকার এই হাতেই আবার জনগণের সেবা নিশ্চিত করে। আর সরকার যখন তার হাতকে কোনো রাজনৈতিক এজেন্ডা বাস্তবায়নের হাত হিসেবে পুলিশকে ব্যবহারের প্রচেষ্টা চালায় অথবা ক্ষমতাকে জোরপূর্বক দীর্ঘস্থায়ী করার মন্ত্রপাঠে সোচ্চার হয়, তখন পুলিশকে তার দায়িত্বে ও কর্মে নিরপেক্ষতা বজায় রাখার কঠিন প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হয়। আর এই প্রশ্নের মুখে পুলিশের কোনো সদস্য তার পেশাদারিত্ব বিকিয়ে দিলে তিনি এক সরকারের মেয়াদে থাকেন বহাল তবিয়তে, আর অন্য সরকারের মেয়াদে কপাল পুড়ে যেতে হয় বাধ্যতামূলক অবসরে। পেশাদারিত্ব বজায় রাখলে আইনপ্রয়োগের চেয়ে ‘নির্দেশ পালন’ কখনো গুরুত্ব পায় না।

শুরু করেছিলাম Mark Twain এর ‘The Prince and the Pauper’ উপন্যাস দিয়ে। যেখানে পোশাক বদলের মাধ্যমে সমাজে মানুষের দৃষ্টিভঙ্গির একটি বড় পরিবর্তন লক্ষণীয়। একইভাবে পুলিশের নতুন পোশাকের মাধ্যমে শুধু বাহ্যিক পরিবর্তন যেন না হয়। কারণ যে যাই বলুক- পুলিশই জনগণের কাছে বিপদে-আপদে সর্বদা আস্থা ও সমাধানের প্রতীক। পুলিশ বাহিনীর পছন্দসই পেশাকের মাধ্যমে আগামী দিনগুলোতে তাদের মানবিকতা ও পেশাদারিত্বের আরও ইতিবাচক পরিবর্তন আসুক। তা না হলে পোশাক পরিবর্তনের নামে রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে শুধু অর্থই খরচ হবে- কাজের কাজ কিছুই হবে না।

লেখক: ঈশা খাঁ ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির শিক্ষক ও গবেষক

 
 
জনতার আওয়াজ/আ আ
 
 

জনপ্রিয় সংবাদ

 

সর্বোচ্চ পঠিত সংবাদ