প্রথমবারেই নজর কেড়েছেন রানী, লড়ছেন ঊর্মিও - জনতার আওয়াজ
  • আজ রাত ২:৩৬, রবিবার, ১৭ই মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ৩রা জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ, ৩০শে জিলকদ, ১৪৪৭ হিজরি
  • jonotarawaz24@gmail.com
  • ঢাকা, বাংলাদেশ

প্রথমবারেই নজর কেড়েছেন রানী, লড়ছেন ঊর্মিও

নিজস্ব প্রতিবেদক, জনতার আওয়াজ ডটকম
প্রকাশের তারিখ: শনিবার, ডিসেম্বর ৩০, ২০২৩ ৯:৪৯ অপরাহ্ণ পরিবর্তনের তারিখ: শনিবার, ডিসেম্বর ৩০, ২০২৩ ৯:৫০ অপরাহ্ণ

 

নিউজ ডেস্ক
দেশের জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো অংশ নিচ্ছেন তৃতীয় লিঙ্গের (হিজড়া) দুই প্রার্থী আনোয়ারা ইসলাম রানী এবং ঊর্মি। রানী রংপুর-৩ আসন থেকে এবং ঊর্মি গাজীপুর-৫ আসন থেকে হেভিওয়েট সব প্রতিদ্বন্ধীর সঙ্গে লড়ছেন।

প্রথমবার নির্বাচনে অংশ নিয়েই এই দুজন ভোটারদের নজর কাড়তে সক্ষম হয়েছেন। তাদের প্রচার-প্রচারণায় ভোটারদেরও ভালো সাড়া মিলছে। আইন সংশোধন করায় নারী ও পুরুষের পাশাপাশি দ্বাদশ সংসদ নির্বাচন থেকে ‘হিজড়া’ লিঙ্গ পরিচয়ে নির্বাচনে অংশ নেওয়া যাবে। এত দিন সংসদ নির্বাচনের মনোনয়নপত্রে লিঙ্গ পরিচিতির জায়গায় শুধু ‘মহিলা’ ও ‘পুরুষ’ লিঙ্গের উল্লেখ থাকলেও কাজী হাবিবুল আউয়ালের নেতৃত্বাধীন নির্বাচন কমিশন (ইসি) আইন সংশোধন করে ‘হিজড়া’ পরিচয়ে নির্বাচন করার সুযোগ করে দিয়েছে।

রংপুর-৩ আসন থেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে ঈগল প্রতীক নিয়ে নির্বাচনে লড়ছেন আনোয়ারা ইসলাম রানী। এ আসন থেকে জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান জিএম কাদেরও নির্বাচন করছেন। নির্বাচনী সমঝোতার অংশ হিসেবে আসনটি আওয়ামী লীগ জাতীয় পার্টিকে ছেড়ে দিয়েছে। ফলে এই আসনে নেই প্রকৃত নির্বাচনী আমেজ। প্রার্থীদের প্রচার-প্রচারণা ও মাইকিং নেই বললেই চলে। তবে ব্যতিক্রম তৃতীয় লিঙ্গের রানী। সকাল পেরিয়ে দুপুর কিংবা সন্ধ্যা পেরিয়ে রাত পর্যন্ত প্রচার-প্রচারণা, মাইকিং, লিফলেট বিতরণ, গণসংযোগ চালিয়ে নির্বাচনের মাঠ চষে বেড়াচ্ছেন রানী।
রংপুর-৩ আসনে জিএম কাদের ও রানী ছাড়াও আরও ৪ প্রার্থী নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন। তারা হলেন বাংলাদেশ কংগ্রেসের একরামুল হক, এনপিপির আবদুর রহমান, জাসদের শহিদুল ইসলাম ও ন্যাশনাল পিপলস পার্টির শফিউল আলম। কিন্তু এই চারজনের অংশগ্রহণ শুধু নামমাত্র। শুরু থেকেই তাদের প্রচারণা কিংবা গণসংযোগে দেখা যাচ্ছে না, এমনকি নগরীর কোথাও তাদের পোস্টারও চোখে পড়েনি। ফলে এই আসনে নির্বাচনী প্রতিযোগিতার মাঠে রয়েছেন শুধু রানী ও জাপা চেয়ারম্যান জিএম কাদের।

জিএম কাদের ঢাকা থেকে গিয়ে গত ২৩ ও ২৪ ডিসেম্বর দুদিন অল্প কিছুসময় গণসংযোগ ও পথসভা করে ঢাকায় ফিরে আসেন। এরপর থেকে জাতীয় পার্টির কো-চেয়ারম্যান ও রংপুর সিটি মেয়র মোস্তাফিজুর রহমান মোস্তফাসহ জাপা নেতাকর্মীরা অল্পস্বল্প প্রচারণা চালাচ্ছেন। ফলে কার্যত প্রচার-প্রচারণা দিয়ে নির্বাচনের পুরো মাঠ দখলে রেখেছেন রানী। এমনকি রংপুর শহরের রাস্তাঘাটেও জিএম কাদেরের চেয়ে রানীর পোস্টার বেশি দেখা যাচ্ছে।

সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) রংপুরের সভাপতি অধ্যাপক ফখরুল আনাম বেঞ্জু দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ভোটের মাঠের চিত্র যদি বলেন তাহলে রংপুর-৩ আসনের মাঠ রানীর দখলে। অন্য কোনো প্রার্থী মাঠে না থাকায় রানী যেখানেই যাচ্ছেন তুলনামূলক সাড়া পাচ্ছেন। তা ছাড়া সব ধরনের প্রচার চালিয়ে তিনি ভোটারদের মন জয় করার চেষ্টা করছেন। এখানে জাপা প্রার্থী জি এম কাদের হয়তোবা জিতে যাবেন, কিন্তু জনগণ তার ওপর খুশি না। তিনি এই আসনে নিজে মনোনয়ন জমা না দিয়ে প্রতিনিধিকে দিয়ে জমা দিয়েছেন। দুদিনের জন্য ঢাকা থেকে এসে প্রচার চালিয়ে আবার ফিরে গেছেন। বিএনপি ও আওয়ামী লীগের প্রার্থী না থাকায় এখানে নির্বাচনী আমেজ নেই। রানী না থাকলে মানুষ বুঝতেও পারত না যে নির্বাচন হচ্ছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘শেষ পর্যন্ত জি এম কাদের জিতে যাবেন, কিন্তু রানীও ভালো ভোট পাবেন বলে মনে হচ্ছে। কারণ এই আসনের বর্তমান এমপি সাদ এরশাদকেও মানুষ গত ৫ বছর মাঠে পায়নি। এখন জাপা চেয়ারম্যান নির্বাচিত হলেও কিন্তু তিনি ঢাকাতেই থাকবেন, যা নিয়ে মানুষের এক ধরনের ক্ষোভ আছে।’

রংপুর-৩ আসনের নির্বাচনী এলাকার একাধিক বাসিন্দার সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তারা এ রকম নিরুত্তাপ নির্বাচন কখনো দেখেননি। মাইকিং নেই, জনসভা নেই, প্রচারণা নেই। নির্বাচনী আমেজ বলে যে একটা বিষয় সেটা এ আসনে অনুপস্থিত। এখানে যারা প্রার্থী হয়েছেন জিএম কাদের এবং রানী ছাড়া আর কাউকে ভোটাররা চিনেন না। ফলে তাদের এই নির্বাচন নিয়ে খুব একটা আগ্রহ নেই। তবে রানীর প্রচারণা তাদের নজর কেড়েছে।

রানী শুধু এই নির্বাচনেই নন, করোনা মহামারীর শুরু থেকে ত্রাণ সাহায্য নিয়ে মানুষের দ্বারে দ্বারে গিয়েছেন। তিনি শুধু হিজড়াদের নয়, সব শ্রেণির মানুষকে সাহায্য করে থাকেন। রংপুর সিটির ২৬ নম্বর ওয়ার্ডের নূরপুর এলাকার বাসিন্দা রানী। নূরপুর পৌর প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে প্রাথমিকের গণ্ডি পেরিয়ে রংপুর টেকনিক্যাল স্কুল থেকে এসএসসি পর্যন্ত পড়াশোনা করেছেন। তিনি ‘রূপান্তর’ নামে একটি হস্তজাত শিল্পের উদ্যোক্তা। সেখানে ২৪ জন হিজড়া কাজ করেন।
আনোয়ারা ইসলাম রানী বলেন, ‘যেখানেই যাচ্ছি মানুষের সাড়া পাচ্ছি। আমাকে সবাই আপন করে নিয়েছেন। রংপুর অবহেলিত অঞ্চল, এই এলাকার নারীরা বিভিন্নভাবে বঞ্চিত। এ কারণে আমি এই আসনে নির্বাচন করে নেতৃত্বে আসতে চাই, জিততে চাই। হামাক ছাওয়া (আমার ছেলে) বলে বারবার সরল মনে যাকেই এই এলাকার মানুষ ভোট দিয়েছে, তারা কেউ উন্নয়ন করেননি, এলাকায় থাকেননি। ফলে আমি আশাবাদী ভোট পাওয়ার বিষয়ে।’
প্রতিদ্বন্ধীরা মাঠে নেই দেখে কিছুটা সন্দেহ হয় জানিয়ে রানী বলেন, ‘কেউ মাঠে নেই, এটা কিসের ইঙ্গিত দিচ্ছে? নাকি কারও জয় নিশ্চিত হয়ে গেছে।’

এ প্রসঙ্গে রংপুর সিটি মেয়র মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, প্রতিদ্বন্ধী না থাকায় এই আসনে প্রচারণা কম চালানো হচ্ছে। ভোট নিয়ে মানুষের আগ্রহ কম। কিন্তু জিএম কাদের যদি এক দিনের জন্যও মাঠে না যান তার পরও তার জয় নিশ্চিত, কেননা জাপা কর্মীরা মাঠে আছেন।’
রানীর মতো করে তৃতীয় লিঙ্গের আরেকজন হলেন ঊর্মি। যিনি নির্বাচন করছেন গাজীপুর-৫ আসন থেকে। আসনটিতে তাকে মনোনয়ন দিয়েছে লিবারেল ইসলামিক জোট। সদ্য নিবন্ধিত বাংলাদেশ সুপ্রিম পার্টির (বিএসপি) প্রতীক একতারা নিয়ে লড়ছেন তিনি। এই আসনে নৌকার প্রার্থী মহিলা আওয়ামী লীগ সভাপতি বর্তমান সংসদ সদস্য মেহের আফরোজ চুমকি। তার বিরুদ্ধে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন ডাকসুর সাবেক ভিপি ও সাবেক সংসদ সদস্য আখতারুজ্জামান। এ ছাড়া ৫ জন প্রার্থী এই আসনে নির্বাচন করছেন।
তবে এই আসনে মূল লড়াই হবে মেহের আফরোজ চুমকি ও আখতারুজ্জামানের মধ্যে। তাদের প্রচার-প্রচারণা ও লড়াইয়ে কিছুটা আড়ালেই রয়েছেন ঊর্মি। রানীর মতো ভোটের মাঠে আলোচনা তৈরি করতে না পারলেও ঊর্মি নিয়মিত প্রচারণা চালাচ্ছেন, ভোট চাইতে মানুষের কাছে যাচ্ছেন। এ ছাড়া নির্বাচনী এলাকার রাস্তাঘাটে তার পোস্টার সাঁটানো হয়েছে।

ঊর্মি গাজীপুর মহানগরের পুবাইল থানার বাড়ৈবাড়ি গ্রামের ফাইজ উদ্দিন খানের সন্তান। মায়ের নাম সালেহা খাতুন।

ঊর্মি বলেন, ‘সমাজের নানা বৈষম্য আর অবহেলার মধ্য দিয়ে বড় হয়েছি। আমি যদি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হই তাহলে শুধু আমার সম্প্রদায় নয় অবহেলিত সব মানুষকে নিয়ে কাজ করব, সমাজকে বদলে দেব। কোনো বৈষম্য থাকবে না। নির্বাচনের ঘোষণা দেওয়ার পর থেকেই সাধারণ মানুষের ব্যাপক সাড়া পাচ্ছি। যেখানেই যাচ্ছি মানুষ আগ্রহ নিয়ে আমার কথা শুনছে।’

সুপ্রিম পার্টির দপ্তর সম্পাদক ইব্রাহিম মিয়া বলেন, ‘তাকে (ঊর্মি) মনোনয়ন দেওয়ার ক্ষেত্রে মানবিকতাকে প্রাধান্য দিয়েছি। যেহেতু হিজড়ারা বৈষম্যের শিকার, তাই আমরা তাকে মনোনয়ন দিয়েছি, যেন জিততে পারলে নিজেদের কথা বলতে পারেন, অধিকার আদায় করতে পারেন। তা ছাড়া ওই আসনে যারা মনোনয়ন চেয়েছিলেন তাদের মধ্যে ঊর্মিকেই সবচেয়ে যোগ্য মনে হয়েছে।’

 
 
জনতার আওয়াজ/আ আ
 
 

জনপ্রিয় সংবাদ

 

সর্বোচ্চ পঠিত সংবাদ