প্রধানমন্ত্রীর প্রাথমিক সাফল্য, সামনের চ্যালেঞ্জ - জনতার আওয়াজ
  • আজ রাত ৯:০৭, বুধবার, ১৩ই মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ৩০শে বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ, ২৬শে জিলকদ, ১৪৪৭ হিজরি
  • jonotarawaz24@gmail.com
  • ঢাকা, বাংলাদেশ

প্রধানমন্ত্রীর প্রাথমিক সাফল্য, সামনের চ্যালেঞ্জ

নিজস্ব প্রতিবেদক, জনতার আওয়াজ ডটকম
প্রকাশের তারিখ: মঙ্গলবার, মার্চ ১৭, ২০২৬ ৭:৪০ পূর্বাহ্ণ পরিবর্তনের তারিখ: মঙ্গলবার, মার্চ ১৭, ২০২৬ ৭:৪০ পূর্বাহ্ণ

 

ড. মাহফুজ পারভেজ
একটি সঠিক ও শক্তিশালী গণতন্ত্রের জন্য কখনই কেবল ক্ষমতার রদবদল যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন তার প্রাতিষ্ঠানিক রূপান্তর ও চেতনার পুনরুজ্জীবন। একজন গণতন্ত্রকামী, মানবাধিকার ও সংবাদপত্রের স্বাধীনতায় বিশ্বাসী মানুষ মাত্রই ক্ষমতার বদলে কিছু নতুন মুখের আসা-যাওয়া প্রত্যাশা করেন না। প্রাতিষ্ঠানিক রূপান্তর ও চেতনার পুনরুজ্জীবন কামনা করেন। এক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রী পদে তারেক রহমানের প্রাথমিক সাফল্য যেমন রয়েছে, তেমনিভাবে সামনের দিনগুলোতে রয়েছে কঠিন চ্যালেঞ্জ বাংলাদেশের রাজনৈতিক বিবর্তনের প্রেক্ষাপটে প্রধানমন্ত্রীর বর্তমান অবস্থানকে কেবল একটি ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে দেখলে ভুল হবে। তাকে দেখতে হবে একটি ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতার সংরক্ষক ও পরিবর্তনের দিশারী হিসেবে। এই ধারায় জিয়াউর রহমান একদলীয় শাসনের গণ্ডি পেরিয়ে বহুদলীয় গণতন্ত্রের দ্বার উন্মুক্ত করেছিলেন। এরপর বেগম খালেদা জিয়া সংসদীয় গণতন্ত্রের যে নবঅভিযাত্রা সূচিত করেন, তা ছিল একটি সাংবিধানিক চেতনার পুনর্জাগরণ।Politics

এই ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর প্রাথমিক সাফল্য হচ্ছেÑএকটি লাইনচ্যুত ও ক্ষত-বিক্ষত গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে পুনরায় প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর মধ্যে ধরে রাখা এবং তাকে গতিশীলতা দান করা। এই অর্জন বাংলাদেশের গণতন্ত্রের ইতিহাসে নিঃসন্দেহে মূল্যবান। কিন্তু ইতিহাসের এই মোড়ে দাঁড়িয়ে শুধু অতীতের কৃতিত্বই ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করে না, বরং সামনে থাকা চ্যালেঞ্জগুলোর মোকাবিলাই তাকে উচ্চতর অবস্থানে নিয়ে যেতে পারে।
সরকারের সামনে প্রথম ও প্রধান চ্যালেঞ্জ হলোÑ নিয়োগ প্রক্রিয়ায় ‘মেধার রাজনীতি’ বনাম ‘দলীয়করণ’কে চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া। সরকারের এই ‘মধুচন্দ্রিমা’ কালে প্রশাসনের বিভিন্ন দপ্তর, বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ও গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ চলছে। কিন্তু দলের মহাসচিবের উক্তি অনুযায়ী, ‘সারাক্ষণ তদবিরের চাপ’ একটি সুস্থ গণতন্ত্রের জন্য অশনি সংকেত। যদি এই নিয়োগ প্রক্রিয়ায় শুধুমাত্র দলের পরিচয় ও আনুগত্য প্রাধান্য পায়, তবে তা বহুদলীয় ও অন্তর্ভুক্তিমূলক গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির পরিপন্থি।
একটি বহুদলীয় গণতন্ত্রে শুধু দলের লোকের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকলে সামনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা দুরূহ হয়ে পড়ে। এই মুহূর্তে প্রয়োজন মেধাবী ও অতীতে ‘পরীক্ষিত’ ব্যক্তিদের সামনে আনা। বিশেষ করে তাদের প্রয়োজন, যারা গণতন্ত্র, মানবাধিকার, দুর্নীতির বিরোধিতা ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতার পক্ষে সোচ্চার ছিলেন- তারা দলের ভিতরে থাকুন বা বাইরে। রাষ্ট্র পরিচালনায় ‘অনুগত অন্ধ কর্মীর’ চেয়ে ‘যোগ্য বিশেষজ্ঞ’ বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

দ্বিতীয় চ্যালেঞ্জ হলো- স্তাবক ও তোষামোদী বেষ্টনী ভেঙে সমাজের গভীরে যাওয়া। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি হলোÑ ‘স্তাবক বেষ্টনী’। শাসকের চারপাশে একদল ‘তেলবাজ ও তাঁবেদার’ চক্র যখন কৃত্রিম দেয়াল তৈরি করে, তখন শাসক জনবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন। এই চক্র নেতাদের তোষামোদ করে তাদের ভুল পথে পরিচালিত করতে পাহাড়সম কৃতিত্ব রাখে। সরকারকে তাই আশপাশের এই স্তাবক ও দলীয় লোকদের ছাড়িয়ে সমাজের ভেতরের স্তরে খোঁজ নিতে হবে। জনমত ও গঠনমূলক সমালোচনা শোনার সাহসই একজন শাসকের প্রকৃত শক্তি।
তৃতীয় ও জটিল চ্যালেঞ্জ হলো- নিরঙ্কুশ সংখ্যাধিক্যের অহমিকা ও পতনের পুনরাবৃত্তি রোধ করা। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, ব্যাপক জনসমর্থন বা সংসদে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অনেক সময় আত্মগর্ভী ও স্বৈরাচারী হওয়ার প্রলোভন তৈরি করে। এই অহমিকা থেকেই পতনের শুরু হয়। বলা হয়, সরকারের ব্যাপক সংখ্যাগরিষ্ঠতা কখনও কখনও অতি ক্ষমতাবানের দাপট ও আত্মম্ভরিতার রূঢ়তা তৈরি হওয়ার ঝুঁকি সামনে নিয়ে আসে। অতীতে বহু সরকার ব্যাপক সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে এসেও শেষদিকে জনসমর্থনে শূন্যে নেমে গেছে। এই প্রবণতা যেন আবারও নতুন সরকারকে গ্রাস করে পতনের মুখোমুখি না করে, সেদিকে সজাগ দৃষ্টি রাখতে হবে।

বর্তমানের সাফল্য থেকে আগামীর প্রকৃত দিশা খুঁজে পাওয়ার ক্ষেত্রে সরকারকে বস্তুনিষ্ঠতার মাধ্যমে আবেগ ও দলীয় পক্ষপাতের বাইরে এসে জনমানুষের স্পন্দনের অনুসরণ করতে হবে। প্রধানমন্ত্রীর জন্য সামনের চ্যালেঞ্জ হলোÑ ভারসাম্য রক্ষা করা। তাকে আইনের শাসন ও ন্যায়বিচারের মাধ্যমে রাষ্ট্রকে জনআস্থার প্রতীকে পরিণত করতে হবে। গণতন্ত্রের এই নতুন যাত্রা যেন দলীয়করণ, স্বজনপ্রীতি ও দুর্নীতিতে আচ্ছন্ন না হয়। যদি তা-ই হয়, তবে অতীতের ভুলের পুনরাবৃত্তি ঘটবে মাত্র।

নতুন সরকারের কাছে সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা হলো-সরকার তারুণ্যের শক্তি এবং অভিজ্ঞ মেধার সমন্বয় ঘটিয়ে একটি জবাবদিহিমূলক, দুর্নীতিমুক্ত, মেধাভিত্তিক প্রশাসন ও পরিচালনা পদ্ধতি গঠন করবে। যারা সামনের কঠিন চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলা করতে পারবে। কারণ, এই চ্যালেঞ্জগুলো সফলভাবে অতিক্রম করতে পারলেই সরকার ও প্রধানমন্ত্রীর সাফল্য হবে নিরঙ্কুশ এবং সেই সাফল্যই তাকে ইতিহাসের উচ্চতর আসনে অধিষ্ঠিত করবে।
লেখক: প্রফেসর ও চেয়ারম্যান, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, নির্বাহী পরিচালক, চট্টগ্রাম সেন্টার ফর রিজিওনাল স্টাডিজ বাংলাদেশ (সিসিআরএসবিডি)।

 
 
জনতার আওয়াজ/আ আ
 
 

জনপ্রিয় সংবাদ

 

সর্বোচ্চ পঠিত সংবাদ