ফের বিশ্বমঞ্চে নেতৃত্বের সুযোগ বাংলাদেশের - জনতার আওয়াজ
  • আজ রাত ৯:০৭, মঙ্গলবার, ২৬শে মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ১২ই জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ, ৯ই জিলহজ, ১৪৪৭ হিজরি
  • jonotarawaz24@gmail.com
  • ঢাকা, বাংলাদেশ

ফের বিশ্বমঞ্চে নেতৃত্বের সুযোগ বাংলাদেশের

নিজস্ব প্রতিবেদক, জনতার আওয়াজ ডটকম
প্রকাশের তারিখ: মঙ্গলবার, মে ২৬, ২০২৬ ৮:০৬ অপরাহ্ণ পরিবর্তনের তারিখ: মঙ্গলবার, মে ২৬, ২০২৬ ৮:০৬ অপরাহ্ণ

 

জাতিসংঘ অধিবেশনের সভাপতি নির্বাচন

জনতার আওয়াজ ডেস্ক
ছবিঃ সংগৃহীত
বিশ্ব কূটনীতির সর্বোচ্চ মঞ্চ জাতিসংঘে আবারও নেতৃত্বের সুযোগ তৈরি হয়েছে বাংলাদেশের সামনে। আগামী ২ জুন জাতিসংঘ সদর দপ্তরের জেনারেল অ্যাসেম্বলি হলে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের (ইউএনজিএ) ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি নির্বাচন। এ সম্মানজনক পদে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও অভিজ্ঞ কূটনীতিক ড. খলিলুর রহমান সাইপ্রাসের প্রার্থী আন্দ্রেয়াস এস কাকোরিসের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন, যেখানে বাংলাদেশের প্রার্থীর বিজয়ী হওয়ার সম্ভাবনাও বেশ জোরালো।

কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এ নির্বাচন শুধু একটি পদের লড়াই নয়; বরং উন্নয়নশীল দেশগুলোর কণ্ঠস্বরকে আরও শক্তিশালী করার, বহুপক্ষীয়তার সংকট মোকাবিলা এবং জলবায়ু, শান্তি ও সমতার এজেন্ডাকে এগিয়ে নেওয়ার এক ঐতিহাসিক সুযোগ। আগামী ২ জুনের নির্বাচনটি ব্যালটের মাধ্যমে অনুষ্ঠিত হবে। যদি ড. খলিলুর রহমান এ নির্বাচনে জয়ী হন, তবে তা বাংলাদেশের কূটনৈতিক ইতিহাসে একটি ঐতিহাসিক মাইলফলক হিসেবে চিহ্নিত হবে; কারণ ১৯৮৬ সালের পর দ্বিতীয়বারের মতো কোনো বাংলাদেশি এ পদ অলংকৃত করার গৌরব অর্জন করবেন।

এ পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান একজন অত্যন্ত অভিজ্ঞ কূটনীতিক, যিনি গত ১৭ ফেব্রুয়ারি টেকনোক্র্যাট কোটায় পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন। এর আগে তিনি অন্তর্বর্তী সরকারের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা এবং প্রধান উপদেষ্টার রোহিঙ্গাবিষয়ক বিশেষ দূত হিসেবে কাজ করেছেন। জাতিসংঘে কাজ করার ক্ষেত্রে তার ৩০ বছরের বেশি অভিজ্ঞতা রয়েছে—বাংলাদেশের প্রতিনিধি হিসেবে সাধারণ পরিষদে কাজ করা থেকে শুরু করে জাতিসংঘ সেক্রেটারিয়েট এবং ইউএনসিটিএডিতে সিনিয়র পদে দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি। তার ভিশন স্টেটমেন্টে তিনি বহুপক্ষীয়তা পুনরুজ্জীবিত করা, গ্লোবাল সাউথের কণ্ঠস্বরকে শক্তিশালী করা, জলবায়ু ন্যায়বিচার এবং শান্তিরক্ষায় নতুন দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে আসার ওপর জোর দিয়েছেন।

এই পদের মেয়াদ হবে এক বছর। সাধারণ পরিষদের সভাপতি পদটি জাতিসংঘের সবচেয়ে দৃশ্যমান ও প্রভাবশালী পদগুলোর একটি, যা অধিবেশন পরিচালনা, আলোচনা সঞ্চালনা, রেজল্যুশন গ্রহণে সহায়তা এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মধ্যে সেতুবন্ধন গড়ে তোলার কাজ করে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় সাবেক পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেনকে এ পদের জন্য মনোনীত করা হলেও চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনের পর তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি সরকার গঠন করার পর বাংলাদেশের প্রার্থী পরিবর্তন করে ড. খলিলুর রহমানকে চূড়ান্ত মনোনয়ন দেওয়া হয়।

বিশ্লেষকরা মনে করেন, বাংলাদেশের উন্নয়ন মডেল (দারিদ্র্য হ্রাস, নারী ক্ষমতায়ন, শান্তিরক্ষা) এ নির্বাচনে বাংলাদেশের পক্ষে সমর্থন টানতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। জয় পেলে, বাংলাদেশের কূটনৈতিক যাত্রায় এটি এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করতে পারে। এটি দেশের আন্তর্জাতিক মর্যাদা বাড়াতে এবং বিনিয়োগ আকর্ষণে ভূমিকা রাখবে।

ইউরোপীয় দেশ হয়েও এশিয়া-প্যাসিফিক গ্রুপে সাইপ্রাস: জাতিসংঘের নিয়ম অনুসারে সভাপতির পদটি পাঁচটি আঞ্চলিক গ্রুপের মধ্যে ঘূর্ণায়নের ভিত্তিতে বরাদ্দ হয়; আফ্রিকান গ্রুপ, এশিয়া-প্যাসিফিক গ্রুপ, ইস্টার্ন ইউরোপিয়ান গ্রুপ, ল্যাটিন আমেরিকান অ্যান্ড ক্যারিবিয়ান গ্রুপ এবং ওয়েস্টার্ন ইউরোপিয়ান অ্যান্ড আদার্স গ্রুপ। এ ব্যবস্থা ন্যায্যতা ও ভৌগোলিক প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করে। ৮১তম অধিবেশনের (২০২৬-২০২৭) জন্য এশিয়া-প্যাসিফিক গ্রুপের পালা নির্ধারিত হয়েছে। এই গ্রুপে বাংলাদেশ, সাইপ্রাস, ফিলিস্তিনসহ ৫৩টি দেশ অন্তর্ভুক্ত। ফিলিস্তিন প্রার্থিতা প্রত্যাহার করায় লড়াই চলছে বাংলাদেশ ও সাইপ্রাসের মধ্যে। সাইপ্রাস ইউরোপিয়ান ইউনিয়নভুক্ত হলেও জাতিসংঘের আঞ্চলিক গ্রুপিংয়ে এশিয়া-প্যাসিফিকের অন্তর্ভুক্ত, যা একটি ব্যতিক্রমী ব্যবস্থা। এশিয়া-প্যাসিফিক গ্রুপে সাইপ্রাসই একমাত্র ইইউ সদস্য দেশ। সাইপ্রাস ১৯৬০ সালে স্বাধীনতা লাভ করে এবং জাতিসংঘে যোগ দেয়। তখন থেকেই এটি এশিয়া গ্রুপে (বর্তমান এশিয়া-প্যাসিফিক) অন্তর্ভুক্ত হয়। দেশটি ২০১৬ সাল থেকে এ পদের জন্য প্রচার চালিয়ে আসছে। তবে বিতর্ক উঠেছে, বর্তমানে ৮০তম অধিবেশনের সভাপতি জার্মানির সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যানালেনা ব্যারবক। তিনি ওয়েস্টার্ন ইউরোপিয়ান অ্যান্ড আদার্স গ্রুপ থেকে এসেছেন। বিশ্লেষকরা বলছেন, এ নির্বাচনে যদি সাইপ্রাস জয়ী হয়, তাহলে ক্রমাগত দুই অধিবেশনে ইউরোপ-সম্পর্কিত দেশ জার্মানি এবং ইইউর দেশ সাইপ্রাস সভাপতিত্ব করবে যেখানে, জাতিসংঘের ঘূর্ণায়ন নীতির মূল উদ্দেশ্য হলো ভৌগোলিক বৈচিত্র্য নিশ্চিত করা, যাতে উন্নয়নশীল দেশ ও গ্লোবাল সাউথের কণ্ঠস্বর শক্তিশালী হয়। ফলে পরপর দুবার ইউরোপ-সম্পর্কিত নেতৃত্ব হলে অনেক উন্নয়নশীল দেশ এটিকে ইউরোপীয় আধিপত্য হিসেবে দেখতে পারে। অবশ্য আইনগতভাবে এটি সম্পূর্ণ বৈধ, কারণ সাইপ্রাস আনুষ্ঠানিকভাবে এশিয়া-প্যাসিফিক গ্রুপের সদস্য। তবে বাংলাদেশের প্রার্থিতা এখানে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, এটি উন্নয়নশীল দেশের প্রতিনিধিত্ব দেবে, যা জাতিসংঘের অন্তর্ভুক্তিমূলক নেতৃত্বের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।

বাংলাদেশ কেন শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী: বাংলাদেশ জাতিসংঘের একটি বিশ্বস্ত ও সক্রিয় সদস্য। ১৯৭৪ সালে জাতিসংঘে যোগ দেওয়ার পর থেকে শান্তি, উন্নয়ন ও মানবিকতার বিভিন্ন ক্ষেত্রে বাংলাদেশ অগ্রণী ভূমিকা পালন করে আসছে। বাংলাদেশ জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় অবদানকারী। ১৯৮৮ সাল থেকে এ পর্যন্ত ১ লাখ ৮৮ হাজারের বেশি বাংলাদেশি শান্তিরক্ষী ৪০টির বেশি দেশে দায়িত্ব পালন করেছেন। বর্তমানে প্রায় ৭ হাজার শান্তিরক্ষী ১০টি মিশনে দায়িত্ব পালন করছেন। নারী শান্তিরক্ষীর সংখ্যাও উল্লেখযোগ্য—এ পর্যন্ত প্রায় ২ হাজারের বেশি নারী শান্তিরক্ষী জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে যুক্ত হয়ে অবদান রেখেছেন। বাংলাদেশ প্রথমবারের মতো অল-ফিমেল কন্টিনজেন্ট পাঠিয়েছে, যা নারীর ক্ষমতায়নে বড় উদাহরণ। এ ছাড়া বিশ্বের সবচেয়ে জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর একটি হয়েও বাংলাদেশ জলবায়ু অভিযোজন ও প্রশমনের ক্ষেত্রে বিশ্বে অন্যতম সেরা উদাহরণ স্থাপন করেছে। জাতিসংঘের জলবায়ু সম্মেলনগুলোয় বাংলাদেশ সোচ্চার কণ্ঠস্বর। লস অ্যান্ড ড্যামেজ ফান্ডসহ বিভিন্ন উদ্যোগে দেশটির ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশ নারীর ক্ষমতায়নে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি করেছে। জাতিসংঘের উইমেন পিস অ্যান্ড সিকিউরিটি এজেন্ডায় বাংলাদেশ সক্রিয়। ন্যাশনাল অ্যাকশন প্ল্যান অন উইমেন পিস অ্যান্ড সিকিউরিটির (২০১৯) মাধ্যমে নারী শান্তিরক্ষীদের সংখ্যা বাড়ানো হয়েছে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নে নারীর অংশগ্রহণ বৃদ্ধি পেয়েছে। এ ছাড়া বাংলাদেশ ১০ লাখের বেশি রোহিঙ্গা শরণার্থীকে আশ্রয় দিয়ে মানবিকতার অনন্য উদাহরণ স্থাপন করেছে। এ সংকট মোকাবিলায় জাতিসংঘের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করছে বাংলাদেশ। বাংলাদেশ টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) বাস্তবায়নেও উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি করেছে, বিশেষ করে দারিদ্র্য বিমোচন, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে। এসব অবদানের কারণে অনেক সদস্য দেশ বাংলাদেশকে সমর্থন জানাতে পারে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। তবে নির্বাচন নিয়ে জোরালো ক্যাম্পেইন চালানোর পরামর্শ দেন তারা।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ড. ইমতিয়াজ আহমেদ এ নিয়ে কালবেলাকে বলেন, ভূ-রাজনৈতিক একটি প্রেক্ষাপট থাকে এসব নির্বাচনের ক্ষেত্রে। বাংলাদেশেরও একটি ভালো অবস্থানে থাকার কথা। তবে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) সঙ্গে এয়ারবাসের চুক্তি-সংক্রান্ত বিষয়ে কিছুটা টানাপোড়েন তো রয়েছেই। আমরা বোয়িং কিনতে চাইলাম তাদের এয়ারবাস না নিয়ে। বোঝা যাচ্ছে, সাইপ্রাস ইউরোপীয় ইউনিয়নের সমর্থন পাবে। সুতরাং উচিত হবে জোরালো ক্যাম্পেইন চালানো। তবে আমি মনে করি, দেশের স্থিতিশীলতা সবার আগে গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমানে নারী ও শিশুদের ওপর যে ধরনের নিপীড়ন চলছে, মব ভায়োলেন্সের বিষয়টিও আছে—এসব কিন্তু আন্তর্জাতিক পর্যায়ে প্রভাব ফেলে। ইমেজটা অনেক বড় একটি ইস্যু। নির্বাচন যেহেতু জুনের ২ তারিখ, তাই ক্যাম্পেইন চালাতে হবে। ধরে নিলে চলবে না সভাপতির পদে সহজেই বসা যাবে। বাংলাদেশের আফ্রিকা, লাতিন আমেরিকাসহ বিভিন্ন দেশে সমর্থন ছিল। তবে তা ধরে রাখতে পেরেছে কি না, সেটা দেখার বিষয়। ফলে আমি মনে করি, ভূ-রাজনৈতিক বিষয়গুলো বিবেচনা করে নির্বাচনের শেষ সময়েও কূটনীতির জায়গাগুলোয় অনেক কাজ করতে হবে। সমর্থন চাইতে হবে।

সভাপতি হলে ড. খলিলুর রহমান কি পররাষ্ট্রমন্ত্রী থাকবেন: এ পদের গৌরব আগেও পেয়েছিল বাংলাদেশ। ১৯৮৬ সালে বাংলাদেশের তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী জাতিসংঘের ৪১তম অধিবেশনের সভাপতি নির্বাচিত হয়েছিলেন এবং সে সময় তিনি দুটি দায়িত্ব একসঙ্গে পালন করেছিলেন। পররাষ্ট্রমন্ত্রী হলে কেউ সভাপতি হতে পারবেন না—জাতিসংঘের সংবিধানে এমন কোনো নিষেধাজ্ঞা নেই। এ ছাড়া জাতিসংঘের সদস্যপদ প্রাপ্ত মালদ্বীপ, সেন্ট লুসিয়া, নামিবিয়াসহ কয়েকটি দেশের মন্ত্রীরা তাদের জাতীয় পদ থেকে সরে দাঁড়াননি। একসঙ্গে দুটি দায়িত্বই চালিয়েছেন।

তবে গত ১৩ মে জাতিসংঘ ওয়েব টিভিতে দেওয়া ইনফরমাল ইন্টারেক্টিভ ডায়ালগে ড. খলিলুর রহমান স্পষ্টভাবে বলেছেন, নির্বাচিত হলে তিনি ‘পূর্ণকালীন সভাপতি’ হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন এবং তিনি হবেন সবার সভাপতি। তিনি আরও বলেন, তিনি সব সদস্য দেশের জন্য নিরপেক্ষ থাকবেন এবং জাতিসংঘ চার্টার মেনে চলবেন, ছোট প্রতিনিধি দলগুলোর প্রতি বিশেষ নজর দেবেন এবং ঐকমত্য গড়ে তুলবেন।

তবে জানা যাচ্ছে, নির্বাচিত হলে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান ইউএনজিএর ৮১তম অধিবেশনে পূর্ণকালীন সভাপতির দায়িত্ব পালন করলেও তিনি মন্ত্রীর পদ থেকে সরে দাঁড়াবেন না। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একাধিক সূত্র কালবেলাকে নিশ্চিত করেছে, ড. খলিলুর রহমানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর পদ ছাড়া নিয়ে কোনো আলোচনা নেই। তিনি দুটি দায়িত্বই একসঙ্গে চালিয়ে যাবেন।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক কূটনীতিক কালবেলাকে বলেন, পূর্ণকালীন সভাপতির দায়িত্ব পালন করবেন—এর দ্বারা খলিলুর রহমান কী বুঝিয়েছেন, তা তিনিই ভালো বলতে পারবেন। ক্যাম্পেইন অনেক পরে শুরু হলেও জাতিসংঘের সভাপতি পদে নির্বাচন নিয়ে আমরা আশাবাদী। তিনি (মন্ত্রী) অত্যন্ত অভিজ্ঞ কূটনৈতিক। নির্বাচিত হলে মন্ত্রী চাইলে দুটি পদই একসঙ্গে সামলাতে পারবেন, কারণ পররাষ্ট্রমন্ত্রী থাকলে কেউ সভাপতি পদে থাকতে পারবেন না—এমন কোনো নিষেধাজ্ঞা নেই জাতিসংঘের সংবিধানে।

তবে কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশ ক্রমবর্ধমান অর্থনীতির দেশ। ফলে জাতিসংঘের পূর্ণকালীন দায়িত্ব পালন করে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্ব তিনি যথাযথভাবে পালন করতে পারবেন কি না, তা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ড. ইমতিয়াজ আহমেদ কালবেলাকে বলেন, মালদ্বীপ, নামিবিয়া আর বাংলাদেশ এক নয়। তাদের দেশের জনসংখ্যা আর আমাদের জনসংখ্যা এবং কাজের ক্ষেত্র ভিন্ন। এর আগেও বাংলাদেশ সম্মানজনক পদে ছিল। তবে তখনকার বাংলাদেশ আর এখনকার বাংলাদেশের মধ্যে অনেক পার্থক্য। তখন ইকোনোমি এত বড় ছিল না। এখন বাংলাদেশের অর্থনীতি অনেক বড়। সুতরাং তিনি পূর্ণকালীন দায়িত্ব পালন করলে বাংলাদেশেও তার পদটি ধরে রাখতে পারবেন কি না, তা ভাবার বিষয়।

নির্বাচনে জিতলে বাংলাদেশ লাভ কী: জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতি নির্বাচিত হলে তা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের জন্য একটি বড় কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক অর্জন হবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, এটি দেশের গ্লোবাল সাউথের নেতৃত্বের ভূমিকাকে আরও শক্তিশালী করবে, জলবায়ু পরিবর্তন, শান্তিরক্ষা, নারীর অধিকার ও রোহিঙ্গা সংকটের মতো জাতীয় অগ্রাধিকারগুলোকে বিশ্বব্যাপী উচ্চতর প্ল্যাটফর্মে তুলে ধরার সুযোগ তৈরি করবে এবং বাংলাদেশকে উন্নয়নশীল দেশগুলোর মধ্যে একটি প্রভাবশালী কণ্ঠস্বর হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করবে। এর আগে ১৯৮৬ সালে হুমায়ুন রশীদ চৌধুরীর সভাপতিত্বের সময় ‘উন্নয়নের অধিকার’ (রাইট টু ডেভেলপমেন্ট) বিষয়ক ঐতিহাসিক রেজল্যুশন গৃহীত হয়েছিল। নির্বাচিত হলে ড. খলিলুর রহমানের নেতৃত্বে বাংলাদেশ জলবায়ু ন্যায়বিচার, টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) এবং বহুপক্ষীয়তার পুনরুজ্জীবিত করার মতো ইস্যুতে নেতৃত্ব দিয়ে আন্তর্জাতিক সহায়তা, বিনিয়োগ ও কূটনৈতিক সমর্থন বৃদ্ধি করতে পারবে। এ ছাড়া এ পদ দেশের আন্তর্জাতিক মর্যাদা ও দৃশ্যমানতা বাড়াবে, জাতিসংঘের বিভিন্ন কমিটি ও প্রক্রিয়ায় বাংলাদেশের প্রভাব বৃদ্ধি করবে এবং দেশের কূটনীতিকদের জন্য নতুন যোগাযোগ ও দক্ষতা বৃদ্ধির সুযোগ সৃষ্টি করবে, যা দীর্ঘ মেয়াদে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিকে আরও গতিশীল ও কার্যকর করে তুলবে এবং বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে সহায়ক হবে। তবে বিনিয়োগ আকর্ষণে সহায়ক হলেও বিনিয়োগ প্রাপ্তির বিষয়টি নির্ভর করবে দেশের স্থিতিশীলতার ওপর।

এ নিয়ে ড. ইমতিয়াজ আহমেদ বলেন, এখানে স্টেবিলিটির বিষয়টা রয়ে গেছে। যে কোনো দেশ চেষ্টা করবে রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা আছে কি না, তা দেখতে। দেশে এখন কেবল নতুন সরকার এসেছে, এখনো কোনো বিনিয়োগ আসেনি। দেশে আতঙ্ক থাকলে, নিরাপত্তা না থাকলে কখনোই বড় ইনভেস্টমেন্ট আসবে না। তাই আগে এগুলো দূর করতে হবে।

সাবেক রাষ্ট্রদূত মুন্সী ফয়েজ আহমেদ নির্বাচনে জয়ের প্রত্যাশা করে কালবেলাকে বলেন, এ ধরনের নির্বাচনে সমর্থন সাধারণত আগে থেকেই ঠিক করা থাকে। কোন অঞ্চলের দেশগুলো কাকে ভোট দেবে, সেটি তারা আগেই ঠিক করে ফেলে। ফলে নির্বাচন সবসময় খুব প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক হয় না, যদিও মাঝে মাঝে প্রতিদ্বন্দ্বিতা দেখা যায়।

তিনি বলেন, নির্বাচনে জয়ী হওয়া একটি দেশের জন্য বড় ধরনের সম্মানের বিষয়। এটি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করে এবং ভালো কাজগুলো তুলে ধরার সুযোগ তৈরি করে। তবে এ পদে এসে বিশেষ কোনো ক্ষমতা লাভ করা যায় না। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতি মূলত সভা পরিচালনা করেন, এর বেশি প্রশাসনিক বা রাজনৈতিক ক্ষমতা তার থাকে না। সম্মানটাই এখানে মূল্যবান।

আমরা যদি এ নির্বাচনে না জিতি, তাহলে তা বাংলাদেশের জন্য একটি বড় ধাক্কা হিসেবে বিবেচিত হবে মন্তব্য করে মুন্সী ফয়েজ বলেন, এ ধরনের গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচনে অংশ নেওয়ার আগে সবসময় এমনভাবে কূটনৈতিক প্রস্তুতি নিতে হয়, যাতে হার না হয়। আমি মনে করি, যারা বিষয়টি পরিচালনার দায়িত্বে আছেন, তারা অত্যন্ত অভিজ্ঞ কূটনীতিক। ফলে ভালো ফল আসবে বলে আমি আশাবাদী এবং এটি বাংলাদেশের জন্য সম্মান বয়ে আনবে।

 
 
জনতার আওয়াজ/আ আ
 
 

জনপ্রিয় সংবাদ

 

সর্বোচ্চ পঠিত সংবাদ