বাংলাদেশের প্রকৃত জনসংখ্যা কত তা নিরূপণে নির্ভুল ও বিশ্বাসযোগ্য শুমারি দরকার - জনতার আওয়াজ
  • আজ দুপুর ১২:০৪, শুক্রবার, ১৫ই মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ১লা জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ, ২৮শে জিলকদ, ১৪৪৭ হিজরি
  • jonotarawaz24@gmail.com
  • ঢাকা, বাংলাদেশ

বাংলাদেশের প্রকৃত জনসংখ্যা কত তা নিরূপণে নির্ভুল ও বিশ্বাসযোগ্য শুমারি দরকার

নিজস্ব প্রতিবেদক, জনতার আওয়াজ ডটকম
প্রকাশের তারিখ: মঙ্গলবার, সেপ্টেম্বর ২, ২০২৫ ৪:২৯ অপরাহ্ণ পরিবর্তনের তারিখ: মঙ্গলবার, সেপ্টেম্বর ২, ২০২৫ ৪:২৯ অপরাহ্ণ

 

ব‍্যারিস্টার নাজির আহমদ

জাতিগতভাবে আমাদের একটি অভ‍্যাসগত চরিত্র হচ্ছে- আমরা জাতির গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ও ঘটনাগুলোর সঠিক হিসাব ও তথ্য রাখি না বা রাখার চেষ্টা করি না। ফলে এ নিয়ে জাতি তর্ক-বিতর্কের মধ‍্যেই পড়ে থাকে। সামনে এগুতে কষ্ট হয়। মহান মুক্তিযুদ্ধে কতজন শহীদ হলেন তার কোনো সঠিক তালিকা নেই। প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের সংখ‍্যা কত তারও যথাযথ হিসাব নেই। কত লোক মুক্তিযুদ্ধে আহত হয়েছেন তারও সঠিক সংখ্যা নেই। এতো গেল ৫৪ বছর আগের কথা। সমসাময়িককালেও তো দেখছি একই অবস্থা। মাত্র এক বছর অতিক্রান্ত হলো চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের শহীদদের প্রকৃত সংখ্যাটিও আমরা বের করতে পারিনি বা পারার চেষ্টা করিনি।

Pause

Mute
Remaining Time -10:30
Unibots.com

ঠিক অনুরূপভাবে বাংলাদেশে প্রকৃতপক্ষে মোট জনসংখ্যা কত তার কোনো সঠিক তথ্য নেই। প্রায় সময় বক্তৃতায় ও মুখে মুখে বলা হয় ১৮ কোটি। অথচ বাংলাদেশের সর্বশেষ জনশুমারি (আদমশুমারির পরিবর্তে দেয়া নতুন নাম) ও গৃহগণনা ২০২২-এর প্রাথমিক প্রতিবেদন অনুযায়ী বাংলাদেশের জনসংখ্যা ১৬ কোটি ৫১ লাখ ৫৮ হাজার ৬১৬ জন।

স্বাধীনতার পর ১৯৭৪ সালে অনুষ্ঠিত প্রথম শুমারিতে দেশের মোট জনসংখ্যা ছিল ৭ কোটি ১৫ লাখ। যদিও লোকেমুখে প্রচলিত ছিল, সেই সময়ে এ দেশের জনসংখ্যার পরিমাণ ছিল সাড়ে সাত কোটি। এরপর ১৯৮১ সালে বাংলাদেশে দ্বিতীয় আদমশুমারি অনুষ্ঠিত হয়। এ শুমারি অনুসারে তখন বাংলাদেশের জনসংখ্যা ছিল ৮ কোটি ৭১ লাখ ১৯ হাজার ৯৬৫ জন। ১৯৯১ সালে বাংলাদেশে তৃতীয় আদমশুমারি অনুষ্ঠিত হয়। এ শুমারি অনুসারে এদেশের মোট জনসংখ্যা ছিল ১০ কোটি ৬৩ লাখ। ২০০১ সালে চতুর্থ আদমশুমারি ও গৃহগণনা অনুষ্ঠিত হয়। এ শুমারি অনুসারে বাংলাদেশের জনসংখ্যা দাঁড়ায় ১২ কোটি ২৪ লাখ। ২০১১ সালে পঞ্চম আদমশুমারি করা হয়। উক্ত আদমশুমারি অনুসারে বাংলাদেশের লোকসংখ্যা দাঁড়ায় ১৪ কোটি ৪০ লাখ। আর ২০২২ সালে ষষ্ট ডিজিটাল জনশুমারি ও গৃহগণনায় বাংলাদেশের জনসংখ্যা দাঁড়ায় ১৬ কোটি ৫১ লাখ ৫৮ হাজার ৬১৬ জনে। অর্থাৎ বিগত এক দশকে (২০১১-২০২২) বাংলাদেশের জনসংখ্যা বেড়েছে ২ কোটি ১১ লাখ ১৪ হাজার ৯২০ জন! এই সংখ্যাগুলো কি বিশ্বাসযোগ‍্য? সব আদমশুমারি/জনশুমারিতে প্রবাসী বাংলাদেশিদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিলো? বিশেষ করে সর্বশেষ (২০২২ সালের) জনশুমারিতে কি দেড় কোটি প্রবাসী বাংলাদেশিদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে?

স্বাধীনতার পর থেকে জনসংখ্যা কত গুণ বেড়েছে তার একটা হিসাব পর্যালোচনা করলে বোঝা যাবে ১৬ বা ১৮ কোটির তথ্য সঠিক নয়। পাকিস্তান আমলে (১৯৬৯ সালে) গোটা পাকিস্তানের মোট জনসংখ্যা ছিল ৯ কোটি। তখনকার হিসাবে পূর্ব পাকিস্তানের (বর্তমান বাংলাদেশ) জনসংখ্যা ছিল ৫ কোটি। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার সময় শেখ মুজিবুর রহমান বললেন, বাংলাদেশের জনসংখ্যা সাড়ে সাত কোটি, অথচ স্বাধীন বাংলাদেশে ১৯৭৪ সালের প্রথম আদমশুমারি অনুযায়ী- বাংলাদেশের জনসংখ্যা ছিল ৭ কোটি ১৫ লাখ। এরপর জিয়াউর রহমান ১৯৭৭ সালে ক্ষমতায় আসার পর বললেন, বাংলাদেশের জনসংখ্যা ৯ কোটি। এরপর এরশাদ ১৯৮২ সালে ক্ষমতা গ্রহণের পর বললেন, বাংলাদেশের জনসংখ্যা ১১ কোটি। এরপর ১৯৯১ তে বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর ঘোষণা দিলো, বাংলাদেশের জনসংখ্যা ১৬ কোটি। তারপর ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় এসে বললো, বাংলাদেশের জনসংখ্যা ১৭ কোটি। সেই ১৭ কোটি থেকে দেশের জনসংখ্যা কি আর বাড়েনি? আমরা যদি ১৯৬৯ থেকে ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত তৎকালীন ২৭ বছরের জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার দেখি, তাহলে সেটা দেখতে পাই সোয়া তিন গুণেরও (৩.২৬ গুণ) বেশি। তাহলে ১৯৯৬ থেকে ২০২৪ সালের এই ২৮ বছরে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার তো ৩/৪ গুণ বাড়ার কথা। কারণ পূর্বের চেয়ে গড় আয়ু বেড়েছে।

অপরদিকে ১৯৭১ সালে পূর্ব পাকিস্তানের জনসংখ্যা বলা হয়েছিল সাড়ে সাত কোটি। আর পশ্চিম পাকিস্তানের জনসংখ্যা বলা হয়েছিল সাড়ে ছয় কোটির চেয়ে কম। পাকিস্তানের মোট জনসংখ্যার ৫৬% ছিল পূর্ব পাকিস্তানে। ২০১৭ সালে পাকিস্তানের আদমশুমারি অনুযায়ী দেশটির জনসংখ্যা ২০ কোটি ৭৬ লাখ ৮ হাজার। ২০২৩ সালে ডিজিটাল পদ্ধতিতে চালানো পুরো দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে সর্ববৃহৎ জরিপ আদমশুমারি অনুযায়ী পাকিস্তানের জনসংখ্যা ২৪ কোটি ১৪ লাখ ৯ হাজার। ২০২৩ সালে পাকিস্তানের (সাবেক পশ্চিম পাকিস্তান) জনসংখ্যা যদি ২৪ কোটির উপর হয়, তাহলে বাংলাদেশের (সাবেক পূর্ব পাকিস্তান) জনসংখ্যা ১৬ বা ১৮ কোটি হয় কিভাবে?

বাংলাদেশের বর্তমান জনসংখ্যা ৪০ কোটি ছাড়িয়েছে বলে গতবছর অক্টোবরে মন্তব্য করেছেন বিশ্ব জরিপ সংস্থার মুখপাত্র সাইয়্যিদ মুহম্মদ আকতার ই-কামাল। তিনি বলেন, বিগত ২৭ বছরে জনসংখ্যার একই হিসাব দেয়া হচ্ছে। এর পেছনে কাজ করছে বিভিন্ন এনজিও। তার মতে “১৯৯৭ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশের জনসংখ্যা ছিল প্রায় ১৭ কোটি। এরপর থেকে বিগত ২৭ বছরে জনসংখ্যার একই হিসাব দেয়া হচ্ছে। তারপর প্রত্যেক সরকারই বাংলাদেশের জনসংখ্যার প্রকৃত সংখ্যা লুকিয়ে রাখতে চেয়েছে। এর পেছনে সরকারের পাশাপাশি কাজ করেছে বিভিন্ন এনজিও। দেশের জনসংখ্যা কমাতে বিদেশি দাতা সংস্থা কর্তৃক দেয়া তহবিলের সঠিক ব্যবহার হয়েছে এটা প্রমাণ করাই ছিল জনসংখ্যা কম দেখানোর আসল উদ্দেশ্য। জনসংখ্যা কমানো যায়নি বা জনসংখ্যা বেশি দেখালে বিদেশি তহবিল আসা বন্ধ হয়ে যাবে-এমন আশঙ্কা থেকেই জনসংখ্যার প্রকৃত সংখ্যা লুকানো হয়েছে”। এটা তো বড় ধরণের গুরুতর অভিযোগ। এটা যদি সত‍্য হয় তাহলে আদমশুমারীর মাধ্যমে বিভিন্ন সময় দেয়া সরকারি তথ্য তাহলে সম্পূর্ণ ভুল ও প্রতারণামূলক।

ইমিগ্রেশন ও মাইগ্রেশন নিয়ে কাজ করেন ঢাকা ও কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের এক সময়ের মেধাবী ছাত্র বর্তমানে লন্ডনে দীর্ঘদিন ধরে আইন পেশায় নিয়োজিত ব‍্যারিস্টার আবু এহসান রেজার মতে, “For reasons best known to the authorities population figure in Bangladesh has always been kept low. For over a decade unofficially the figure was shown as 17 crore! This has been done probably to show better statistics in terms of GDP and human developments. On top of that we need to include one and a half crore Bangladeshis who live and work abroad. The current population in no way can be less than at least 20 crores” (অর্থাৎ “কর্তৃপক্ষের কাছে সবচেয়ে বেশি জানা কারণগুলির জন্য, বাংলাদেশে জনসংখ্যার সংখ্যা সর্বদা কম রাখা হয়েছে। এক দশকেরও বেশি সময় ধরে অনানুষ্ঠানিকভাবে এই সংখ্যাটি ১৭ কোটি দেখানো হয়েছে! সম্ভবত জিডিপি এবং মানব উন্নয়নের দিক থেকে আরও ভালো পরিসংখ্যান দেখানোর জন্য এটি করা হয়েছে। এর উপরে আমাদের দেড় কোটি বাংলাদেশিকে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে যারা বিদেশে থাকেন এবং কাজ করেন। বর্তমান জনসংখ্যা কোনওভাবেই কমপক্ষে ২০ কোটির কম হতে পারে না”)।

শুধু জনসংখ্যার ক্ষেত্রে নয়, বিভিন্ন ক্ষেত্রে গোজামিল বা মিথ্যা তথ্যের উপর দেশ ভাসছে। প্রায় সময় জিপিডি, মাথাপিছু আয় ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে দেখানো হয়। বেশিরভাগ মানুষের জন্মের সঠিক তারিখ নেই। অসংখ্য মানুষের জন্মের তারিখ ১লা জানুয়ারি (০১/০১) দেখে বুঝতে কষ্ট হয় না যে এটা তাদের ভুয়া জন্মের তারিখ। নবম শ্রেণিতে ওঠার পর যখন ভবিষ্যৎ এসএসসি পরীক্ষার জন‍্য ফরম পূরণ করা হয় ইচ্ছাকৃতভাবে বয়স কমিয়ে মনমতো জন্মের তারিখ বসিয়ে দেয়া হয় সর্বোচ্চ সংখ্যকবার বিসিএস পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করার সুযোগ পেতে! ১/১১-এর পর বাংলাদেশের জাতীয় এক নেতা ও সাবেক এক প্রভাবশালী মন্ত্রীর হাইকোর্টে জামিনের শুনানিতে আইনজীবীর পক্ষ থেকে বলা হচ্ছিল, “মাই লর্ড যদিও কাগজপত্রে তাঁর বয়স ৭৯, কিন্তু প্রকৃত বয়স ৮৩”। হাইকোর্টও অবলিলায় তা মেনে নিয়ে জামিন মঞ্জুর করেন। প্রত্যেকটি মানুষের জন্ম ও মৃত্যু তার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দুটি দিবস। এগুলো সত‍্য, সঠিক ও প্রকৃত হোক এটা আইন, বিবেক ও নৈতিকতার দাবি।

জনসংখ্যা যাই হোক তার সঠিক তথ্য থাকা অত‍্যবশ‍্যকীয়। মনে হয় এক জায়গায় এসে ২৫/২৬ বছর আগে সংখ্যা থেমে গেছে বা থামিয়ে দেয়া হয়েছে। সঠিক ও নির্ভুল আদমশুমারি দরকার। জনসংখ্যা যতই হোক তার সঠিক তথ্য জানা ও পাওয়া বাংলাদেশের সব নাগরিকের অধিকার। রাষ্ট্র ও জনগণ নিয়ে সঠিক ও লাগসই পরিকল্পনা হাতে নিতেও দরকার জনসংখ্যার প্রকৃত তথ্য। ভোটাধিকারের মতো মৌলিক ও সাংবিধানিক অধিকার নিশ্চিত করতেও দরকার জনগণের সঠিক সংখ্যা। জনসংখ্যা কমানো যায়নি বা জনসংখ্যা বেশি দেখালে বিদেশি তহবিল আসা বন্ধ হয়ে যাবে-এমন আশঙ্কা থেকেই জনসংখ্যার প্রকৃত সংখ্যা লুকানো হলে তা হবে জাতি ও আন্তর্জাতিক সংস্থার সাথে প্রতারণা। আমরা কোনো ভুল বা প্রতারণামূলক তথ্য চাই না। আমরা চাই জনসংখ্যার সঠিক ও নির্ভুল তথ্য।

লেখক: বিশিষ্ট আইনজীবী, রাষ্ট্রচিন্তক, সংবিধান বিশেষজ্ঞ এবং ইংল্যান্ডের প্র্যাকটিসিং ব্যারিস্টার।

email: ahmedlaw2002@yahoo.co.uk

 
 
জনতার আওয়াজ/আ আ
 
 

জনপ্রিয় সংবাদ

 

সর্বোচ্চ পঠিত সংবাদ