বিএনপির চলমান আন্দোলন এখন চূড়ান্ত পর্যায়ে
নিজস্ব প্রতিবেদক, জনতার আওয়াজ ডটকম
প্রকাশের তারিখ:
বুধবার, এপ্রিল ২৬, ২০২৩ ৩:০৮ অপরাহ্ণ পরিবর্তনের তারিখ:
বুধবার, এপ্রিল ২৬, ২০২৩ ৩:০৮ অপরাহ্ণ

ডেস্ক নিউজ
সরকারের অবিলম্বে পদত্যাগ, নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকার ও নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশনের অধীনে নির্বাচনের দাবিতে বিএনপির চলমান আন্দোলন এখন চূড়ান্ত পর্যায়ে। ফলে নির্বাচনের আগের সময়গুলো কার্যকরভাবে কাজে লাগাতে চায় দলটির হাইকমান্ড। আন্দোলনের পরবর্তী কর্মসূচি হিসেবে কোরবানির ঈদের আগেই এক বিভাগ থেকে আরেক বিভাগে রোডমার্চ বা সমাবেশের ঘোষণা আসতে পারে। এরপর সেপ্টেম্বর থেকে ক্রমান্বয়ে বাড়বে যুগপৎ আন্দোলনের গতি। এই সময়ের মধ্যে সংকট উত্তরণে রাজনৈতিক সমঝোতা না হলে কর্মসূচি এক দফা দাবিতে পরিণত হবে। অন্যদিকে আগামী নভেম্বরে আসন্ন দ্বাদশ জাতীয় নির্বাচনের তপশিল দেওয়ার চিন্তা করছে নির্বাচন কমিশন। বিএনপির দায়িত্বশীল নেতারা বলছেন, তাদের আন্দোলন এখন একটি চূড়ান্ত পর্যায়ে এসে দাঁড়িয়েছে। জানা গেছে, গত রোজায় সারা দেশে বিভাগ, জেলা ও ইউনিয়নে সমন্বিত ইফতার মাহফিলের মাধ্যমে বিএনপি ও অঙ্গসংঠনের নেতাকর্মীরা এখন উজ্জীবিত ও ঐক্যবদ্ধ। ঈদুল ফিতর-পরবর্তী আগামী ১ মে আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবসে প্রথম কর্মসূচি পালন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিএনপি। ওই দিন রাজধানীতে বড় ধরনের শোডাউনের পরিকল্পনা আছে দলটির হাইকমান্ডের। দলটির নেতারা বলছেন, আগামীতে তারা নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকার ছাড়া কোনো নির্বাচনে যাবেন না। এ দাবি আদায়ে তাদের সামনে আন্দোলনের বিকল্প নেই। ওই আন্দোলনের প্রস্তুতি হিসেবে তৃণমূলকে ঐক্যবদ্ধ করতেই তারা কাজ করছেন। এর মাধ্যমে এলাকায় নিজের শক্ত অবস্থানও জানান দেওয়ার চেষ্টা করছেন অনেকে। সেই লক্ষ্যে আবারও সারা দেশে নতুন কর্মসূচি দেওয়া হবে। সে ক্ষেত্রে রোডমার্চ এবং সমাবেশের কর্মসূচি দেওয়া হবে।
বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, ১০ দফা দাবিতে আমাদের চলমান আন্দোলন চূড়ান্ত পর্যায়ে এসে দাঁড়িয়েছে। আমরা আন্দোলন শুরুর পর অলরেডি ১৭ জন সহকর্মী প্রাণ দিয়েছেন, আমাদের হাজার হাজার নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে, আমাদের শত শত মানুষ এখনো কারাবন্দি। চলমান আন্দোলনের মাঝখানে রোজার মধ্যেও আমরা কর্মসূচি পালন করেছি। কয়েকদিন আগে ইউনিয়ন পর্যায় পর্যন্ত অবস্থান কর্মসূচি করেছি। এসবের মাধ্যমে নেতাকর্মীরাও আরও বেশি সংঘবদ্ধ ও শক্তিশালী। আমরা আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছি। এখন সেটা আরও বেগবান হবে। সরকারের আচরণের ওপর নির্ভর করবে আন্দোলনের ধরন কী হবে, জনগণই সেটা সিদ্ধান্ত নেবে।
শ্রমিক সমাবেশ নিয়ে মতবিনিময় সভা : এদিকে চলমান আন্দোলনের মধ্যেই ঈদুল ফিতর-পরবর্তী রাজধানীতে বড় ধরনের শোডাউন করার পরিকল্পনা নিয়েছে বিএনপির হাইকমান্ড। দলটির শ্রমিক সংগঠন জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের উদ্যোগে মহান মে দিবস উপলক্ষে আগামী ১ মে নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে শ্রমিক সমাবেশ ও র্যালি করা হবে। এ নিয়ে গতকাল মঙ্গলবার সকালে নয়াপল্টনে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে মতবিনিময় সভা হয়েছে। এতে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান, ভাইস চেয়ারম্যান আবদুল্লাহ আল নোমান, কেন্দ্রীয় নেতা শামসুর রহমান শিমুল বিশ্বাস, সৈয়দ এমরান সালেহ প্রিন্স, আমিনুল হক, হুমায়ুন কবীর খান, ফিরোজ-উজ-জামান মামুন মোল্লা, শ্রমিক দলের সভাপতি আনোয়ার হোসাইন, প্রচার সম্পাদক মঞ্জুরুল ইসলাম মঞ্জু, ঢাকা মহানগর দক্ষিণ শ্রমিক দলের আহ্বায়ক সুমন ভূঁইয়া, উত্তর শ্রমিক দলের আহ্বায়ক কাজী শাহ আলম রাজা, দক্ষিণের সদস্য সচিব বদরুল আলম সবুজ প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।
তৃণমূল উজ্জীবিত, কুশল বিনিময় অব্যাহত : সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এবারের রমজান মাসকে সাংগঠনিক মাস হিসেবে ঘোষণা করার পাশাপাশি রাজপথের নিয়মিত কর্মসূচিতে সক্রিয় ছিল বিএনপি। লাগাতার সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে ব্যস্ত ছিলেন দলটির কেন্দ্র থেকে তৃণমূলের নেতাকর্মীরা। একদিকে সারা দেশে বিভাগ ও জেলাভিত্তিক সমন্বিতভাবে ইফতার ও দোয়া মাহফিল, অন্যদিকে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারে পূর্বঘোষিত ১০ দফা দাবিতে কর্মসূচিও অব্যাহত ছিল। সারা দেশে ৬০টিরও বেশি কর্মসূচিতে ভার্চুয়ালি যুক্ত হয়ে বক্তব্য দেন দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। তার বক্তব্যের মাধ্যমে তৃণমূলের নেতাকর্মীরা আরও উজ্জীবিত এবং অনুপ্রাণিত। যারা দীর্ঘদিন তারেক রহমানের কথা শুনতে পারেননি কিংবা তাকে দেখতে পাননি ইফতার মাহফিল ও কর্মিসভায় তাকে দেখার সুযোগ পেয়েছেন। যে কারণে তারা বেশ উচ্ছ্বসিত। প্রতিটি কর্মসূচিতে কেন্দ্রীয় নেতারা যেমন উপস্থিত ছিলেন তেমনি জেলা, উপজেলা পর্যায়ের নেতারাও ছিলেন। এ সুযোগ কাজে লাগিয়ে এলাকায় পোস্টার, ব্যানার ও ফেস্টুন সাঁটিয়েছেন অনেকে। যদিও এসব প্রচারণায় গণসংযোগের চেয়ে সরকারের দুর্নীতি, অপশাসনের চিত্রই বেশি তুলে ধরা হয়। অনেকে নিজের পরিচিতি তুলে ধরেও এলাকাবাসীকে শুভেচ্ছা জানিয়ে পোস্টার করেছেন। নিজের অবস্থানকে জানান দিতেই নেতাকর্মীরা এটা করেছেন।
এদিকে দলীয় কর্মসূচি বাস্তবায়ন আর ঈদ উপলক্ষে এলাকায় ছুটে যান বিএনপির কেন্দ্রীয় ও নির্বাচনে মনোনয়নপ্রত্যাশী নেতারা। এখনো অনেক নেতা তৃণমূলের নেতাকর্মী ছাড়াও সাধারণ মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ ও সম্পর্ক বাড়াতে তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছেন। সরকার পতনের এক দফার আন্দোলনকে সফল করতে তারা কাজ করছেন। সবাইকে ঐক্যবদ্ধ করে রাজপথে নামার প্রাক-প্রস্তুতি হিসেবে প্রায় প্রতিদিনই বৈঠক করছেন। কেন্দ্রের দিকনির্দেশনা পৌঁছে দিচ্ছেন। তাগাদা দেওয়া হচ্ছে দলের কর্মসূচি বাস্তবায়নে। বিএনপির কেন্দ্রীয় পল্লী উন্নয়নবিষয়ক সম্পাদক ফরহাদ হোসেন আজাদ বলেন, এবার রোজায় ইফতার মাহফিলের মাধ্যমে তৃণমূলের নেতাকর্মীরা আমাদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে দেখে ও তার বক্তব্যে আগের তুলনায় বেশি উজ্জীবিত। তারা এক দফার আন্দোলনের জন্য যে কোনো ত্যাগ স্বীকারে প্রস্তুত।
অন্যদিকে আগামী জাতীয় নির্বাচনের জন্যও এলাকায় নিজের অবস্থানকে জানান দিচ্ছেন নেতারা। কারাবন্দি থাকায় এলাকার মানুষের কাছে যেতে পারেননি মুন্সীগঞ্জ-১ (শ্রীনগর-সিরাজদীখান) আসনে মনোনয়নপ্রত্যাশী বিএনপির স্বেচ্ছাসেবকবিষয়ক সম্পাদক মীর সরফত আলী সপু। তিনি ঈদের দুই দিন আগে বৃহস্পতিবার মুক্তির পর এলাকার নির্যাতিত নেতাকর্মীদের পরিবারে গিয়ে খোঁজখবর নিয়ে তারেক রহমানের পক্ষে শুভেচ্ছা বিনিময় করছেন। সিলেটে সন্ত্রাসীদের হাতে নিহত কামালের পরিবারে গিয়ে খোঁজ নিয়েছেন। নরসিংদী-৫ (রায়পুরা) আসনে বিএনপির বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিবিষয়ক সহ-সম্পাদক প্রকৌশলী আশরাফ উদ্দিন বকুল স্থানীয় ক্ষতিগ্রস্ত নেতাকর্মীসহ সাধারণ গরিব মানুষকে ঈদের উপহার ও তারেক রহমানের পক্ষে ঈদের শুভেচ্ছা দিয়েছেন। নেত্রকোনা-৩ আসনে মনোনয়নপ্রত্যাশী বিএনপির পেশাজীবী সংগঠন এ্যাবের সহসভাপতি প্রকৌশলী মো. মোস্তাফা-ই-জামান সেলিম কালবেলাকে বলেন, তিনি এলাকার ক্ষতিগ্রস্ত দলীয় নেতাকর্মী ছাড়াও সাধারণ মানুষের পাশে সাধ্যমতো পাশে দাঁড়িয়েছেন। বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া ও ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের পক্ষে এলাকাবাসীকে ঈদের শুভেচ্ছা জানিয়ে পোস্টার লাগিয়েছেন। রাজশাহী-৫ আসনের মনোনয়নপ্রত্যাশী বিএনপির নির্বাহী কমিটির সদস্য আবু বকর সিদ্দিক কালবেলাকে বলেন, ২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর নির্বাচনী সহিংসতায় মারাত্মকভাবে আহত হন দুর্গাপুর উপজেলার মাড়িয়া ইউনিয়ের জয়কৃষ্ণপুর গ্রামের মৃত আমজাদ হোসেনের ছেলে মোস্তাক আহমেদ। তার বাড়িতে গিয়ে পরিবারের মাঝে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের পক্ষ থেকে ঈদ উপহার তুলে দিয়েছি। ঢাকা-১৮ (উত্তরা) আসনে মনোনয়নপ্রত্যাশী বিএনপির নির্বাহী কমিটির সাবেক সদস্য শিল্পপতি সৈয়দ সাদাত আহমেদ অসহায় নেতাকর্মী ছাড়াও সাধারণ মানুষের মাঝে সাহায্য দিয়েছেন। তিনি খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানের পক্ষে ঈদের শুভেচ্ছা বিনিময় করেছেন। নরসিংদী-৫ (রায়পুরা) আসনে মনোনয়নপ্রত্যাশী জেলা বিএনপির সদস্য রফিকুল আমিন ভূঁইয়া রুহেল স্থানীয় ক্ষতিগ্রস্ত নেতাকর্মীসহ সাধারণ মানুষের মাঝে সাহায্যের পাশাপাশি ঈদের শুভেচ্ছা ও কুশল বিনিময় করেছেন। সিলেট-৬ (গোলাপগঞ্জ-বিয়ানিবাজার) আসনে মনোনয়নপ্রত্যাশী জেলা বিএনপির শিল্প ও বাণিজ্যবিষয়ক সহ-সম্পাদক তামিম ইয়াহিয়া আহমদ স্থানীয় নেতাকর্মীসহ গরিব মানুষের মাঝে ঈদের উপহার, খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানের পক্ষে ঈদ শুভেচ্ছা দিয়েছেন।
নির্যাতিত নেতাকর্মীদের পরিবারে সহায়তা : জানা গেছে, এবার ঈদুল ফিতরে সারা দেশে নির্যাতিত, গুম, খুন হওয়া সহস্রাধিক নেতাকর্মীর পরিবারের পাশে দাঁড়িয়েছে বিএনপি। দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের ঈদ উপহার ভুক্তভোগী পরিবারে পৌঁছে দেন কেন্দ্রীয় নেতারা। কারাবন্দি ৪৪৬ নেতাকর্মীর ঈদের দিন খোঁজ নিতে কেন্দ্রীয় নেতাদের নিয়ে টিম গঠন করা হয়। বন্দিদের পরিবারের সদস্যদের জন্য পায়জামা-পাঞ্জাবি ও শাড়ি উপহার দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন বিএনপির সহ-দপ্তর সম্পাদক তাইফুল ইসলাম টিপু। দলীয় নেতাকর্মী ছাড়াও সারা দেশে অসহায়-দুস্থদের জন্যও বস্ত্র ও খাবার বিতরণ করেন দলটির নেতারা।
জনতার আওয়াজ/আ আ