বিএনপি থেকে নেতা ভাগিয়ে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণের ছক পাঁচ দলের - জনতার আওয়াজ
  • আজ রাত ১১:১২, বুধবার, ১৩ই মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ৩০শে বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ, ২৬শে জিলকদ, ১৪৪৭ হিজরি
  • jonotarawaz24@gmail.com
  • ঢাকা, বাংলাদেশ

বিএনপি থেকে নেতা ভাগিয়ে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণের ছক পাঁচ দলের

নিজস্ব প্রতিবেদক, জনতার আওয়াজ ডটকম
প্রকাশের তারিখ: শুক্রবার, মে ১২, ২০২৩ ২:৫৮ অপরাহ্ণ পরিবর্তনের তারিখ: শুক্রবার, মে ১২, ২০২৩ ২:৫৮ অপরাহ্ণ

 

ডেস্ক নিউজ

বিএনপি থেকে নেতা ভাগিয়ে বর্তমান সরকারের অধীনে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণের ছক কষছে কিছু রাজনৈতিক দল। নিবন্ধন প্রক্রিয়ায় থাকা তিনটি রাজনৈতিক দলের সঙ্গে এই পরিকল্পনায় যুক্ত আছে বিএনপি নেতৃত্বাধীন বিলুপ্ত ২০ দলীয় জোটের শরিক দুটি দল। নামের সঙ্গে ‘জাতীয়তাবাদী’ থাকা নব্যপ্রতিষ্ঠিত একটি দলকে ঘিরে সাজানো হয়েছে এই পরিকল্পনা। নিবন্ধন সম্পন্ন হওয়ার পর বিএনপি ভেঙে কেন্দ্র ও তৃণমূলের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীরা এই দলটিতে জড়ো হবেন। এর পরই আসবে পাঁচটি দলের জোট গঠনের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা। পরিস্থিতি বুঝে বাড়তে পারে দলের সংখ্যা। এই প্রক্রিয়ার উদ্যোক্তারা আগামী নির্বাচন পর্যন্ত অগ্রসর হচ্ছেন বলে জানা গেছে।

সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানায়, বিএনপি শেষ পর্যন্ত শেখ হাসিনা সরকারের অধীনে নির্বাচনে না যাওয়ার সিদ্ধান্তে অটল থাকলে নতুন জোট গঠন করে ভোটে অংশ নিতে এরই মধ্যে পর্দার অন্তরালে পাঁচটি দলকে ঘিরে সার্বিক পরিকল্পনা সাজানো হয়েছে। এর মধ্যে বিএনপির সঙ্গে যুগপৎ আন্দোলনে থাকা দুটি নিবন্ধিত দল এবং নিবন্ধন প্রক্রিয়ায় থাকা তিনটি রাজনৈতিক দল রয়েছে। নতুন জোট আত্মপ্রকাশের সময় আরও কয়েকটি দল সেখানে অন্তর্ভুক্ত হতে পারে। উদ্যোগটি প্রাথমিক পর্যায়ে থাকায় জোটের নাম এখনো চূড়ান্ত হয়নি। অনিবন্ধিত ওই তিনটি দলের নিবন্ধন প্রাপ্তি নিশ্চিত হলে জোট গঠনের প্রক্রিয়াটিও গতিশীল হবে।

নতুন এই ‘নির্বাচনী জোট’ গঠন প্রক্রিয়ার সঙ্গে সম্পৃক্তদের দাবি, জোটের পাঁচটি দলই নিবন্ধিত হবে। ফলে নির্বাচনী মাঠে তখন এই জোটের অন্যরকম গুরুত্ব থাকবে। তাদের দাবি, বিএনপির অনেকে তখন জোটের ব্যানারে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবে। এ লক্ষ্যে দলটির মধ্যম ও তার উপরের সারির প্রায় অর্ধশত নেতা এখন থেকেই যোগাযোগ রাখছেন। জোট গঠন প্রক্রিয়ার সঙ্গে জড়িতদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে।

বিএনপির অবস্থান হচ্ছে, তারা আন্দোলনে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি আদায় করেই আগামী সংসদ নির্বাচনে অংশ নেবে। তবে আন্দোলন বাধাগ্রস্ত করতে যুগপতের জোটে ভাঙন ধরাতে সরকার নানা চেষ্টা চালাতে পারে—এটা ধরে নিয়েই বিএনপি অগ্রসর হচ্ছে এবং সে অনুযায়ী সতর্কতামূলক ব্যবস্থাও নিচ্ছে বলে দাবি দলটির।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, আগামী নির্বাচন নিরপেক্ষ ও অংশগ্রহণমূলক করা নিয়ে আওয়ামী লীগ সরকার দেশি-বিদেশি নানা চাপে থাকায় যুগপৎ আন্দোলনকে বাধাগ্রস্ত করতে এই উদ্যোগের পেছনে তাদের ইন্ধন থাকতে পারে। তবে বিএনপি শেখ হাসিনা সরকারের অধীনে নির্বাচনে না যাওয়ার অবস্থান ধরে রেখে ঐক্যবদ্ধ থেকে আন্দোলন চালিয়ে যেতে পারলে কোনো চক্রান্তে কাজ হবে না, সরকার দাবি মানতে বাধ্য হবে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ড. নুরুল আমিন বেপারি বলেন, আগামী নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও অংশগ্রহণমূলক করতে সরকারের ওপর বিদেশিদের চাপ অব্যাহত রয়েছে। এ ছাড়া দ্রব্যমূল্যের লাগামহীন ঊর্ধ্বগতিসহ সরকারের দুর্নীতি-লুটপাটে মানুষ অতিষ্ঠ। আইনশৃঙ্খলা অবস্থাও ভালো না। গুম-খুন এখন কিছুটা কমলেও আগের যে অভিজ্ঞতা সেটা মানুষ ভুলতে পারছে না। অর্থনৈতিক অবস্থাও ভালো না। একটি নির্বাচনেও মানুষ ভোট দিতে পারছে না। অন্যদিকে বিএনপির নেতৃত্বে আন্দোলনে সাধারণ মানুষ ক্রমেই সম্পৃক্ত হচ্ছে। সুতরাং সব মিলিয়ে সরকার বিরাট চাপে রয়েছে। তাই চলমান যুগপৎ আন্দোলনকে তারা বাধাগ্রস্ত করার চেষ্টা করবেই। এর অংশ হিসেবে বিএনপির নেতৃত্বে যেসব জোট রয়েছে সেগুলোকে অনেক নগণ্য অফার দেবে। পার্লামেন্টে কিছু আসন দেওয়া, কয়েকটি দলকে নিবন্ধন দেওয়ার প্রলোভন দেওয়া হতে পারে। হয়তো সরকারি সেই প্রলোভনে পড়ে দু-একটি দল আন্দোলন থেকে চলেও যেতে পারে। এটাকে বিএনপির তোয়াক্কা করারই দরকার নেই। সমুদ্রের মতো দল বিএনপি যদি না ভাঙে এবং যারা দলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন তারা যদি ঠিক থাকেন, তাহলে যুগপতের জোট থেকে ক্ষুদ্র দু-একটি দল চলে গেলেও তাতে কোনো ক্ষতি হবে না; বরং যারা যাবে তারাই জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে।

এই রাজনৈতিক বিশ্লেষক আরও বলেন, বিএনপি নির্বাচন নিয়ে রাজনৈতিক যে স্ট্যান্ড নিয়েছে বা যেভাবে আন্দোলনটা চালিয়ে যাচ্ছে—এটা যদি ধরে রাখতে পারে, তাহলে আওয়ামী লীগকে দাবি মানতে হবে এবং পদত্যাগ করে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন দিতে বাধ্য হবে।

গত ১০ ডিসেম্বর ঢাকায় বিভাগীয় গণসমাবেশ থেকে ১০ দফার ভিত্তিতে যুগপৎ আন্দোলনের ঘোষণা দেয় বিএনপি। পরে ২৪ ডিসেম্বর ঢাকার বাইরে জেলা ও মহানগরে এবং ৩০ ডিসেম্বর ঢাকায় গণমিছিলের মধ্য দিয়ে যুগপৎ আন্দোলন শুরু করে মিত্ররা। ৩৮টি রাজনৈতিক দল আন্দোলনে সম্পৃক্ত হয়। দলগুলো গণতন্ত্র মঞ্চ, ১২ দলীয় জোট, জাতীয়তাবাদী সমমনা জোট ও গণতান্ত্রিক বাম ঐক্য—এই চারটি জোটের ব্যানারে আন্দোলনে রয়েছে। অন্যদিকে বিএনপির বাইরে পৃথকভাবে যুগপতের কর্মসূচি পালন করছে জামায়াত। এ ছাড়া কর্নেল (অব.) অলি আহমদের নেতৃত্বাধীন এলডিপি এবং ১২ দলীয় জোট থেকে বের হয়ে লেবার পার্টিও পৃথকভাবে আন্দোলন করছে। আর গণফোরাম (মন্টু) ও বাংলাদেশ পিপলস পার্টি (বিপিপি) যৌথভাবে কর্মসূচি করছে যুগপতের। এদের মধ্যে বিএনপিসহ ছয়টি নিবন্ধিত দল রয়েছে।

এদিকে নতুন নিবন্ধনের লক্ষ্যে আবেদন করা ৯৩টি রাজনৈতিক দলের মধ্যে ১২টিকে নিবন্ধনের জন্য এরই মধ্যে প্রাথমিকভাবে চূড়ান্ত করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। ইসি এখন দলগুলোর কেন্দ্রীয় কার্যালয়সহ আবেদনে দেওয়া মাঠপর্যায়ের তথ্য যাচাই-বাছাই করছে। এরপর নিবন্ধনের বিষয়টি চূড়ান্ত করবে কমিশন। এগুলোর মধ্যে পাঁচটি দল বিএনপির নেতৃত্বে যুগপৎ আন্দোলনে সম্পৃক্ত রয়েছে।

বিএনপির শঙ্কা, জনসম্পৃক্ত চলমান যুগপৎ আন্দোলন দমাতে শরিক জোটে ভাঙন ধরানোর চেষ্টা চালাতে পারে আওয়ামী লীগ সরকার। গত ৮ এপ্রিল যুগপতের শরিক জাতীয়তাবাদী সমমনা জোটের সঙ্গে বৈঠকে এমন শঙ্কা প্রকাশও করে দলটি। মিত্রদের এ ব্যাপারে সতর্ক থাকতে হবে বলে মনে করে বেশ কয়েকবার সরকার পরিচালনার দায়িত্বে থাকা বিএনপি। একই সঙ্গে আন্দোলনে দাবি আদায়সাপেক্ষে নির্বাচন এবং বিজয়ী হলে জাতীয় সরকার গঠনে মিত্রদের যোগ্যতা অনুযায়ী যথাযথ মূল্যায়নের আশ্বাসও দেয় বিএনপি। মিত্রদের সঙ্গে অন্য বৈঠকগুলোতেও যোগ্যতা অনুযায়ী মূল্যায়ন করা হবে বলে আশ্বস্ত করা হয়।

বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব ও যুগপতের লিয়াজোঁ কমিটির সদস্য সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল বলেন, যত দিন যাচ্ছে আন্দোলনে জনগণের অংশগ্রহণ বাড়ছে। সরকারের দুঃশাসনে অতিষ্ঠ জনগণই আন্দোলন সফল করবে। আর আন্দোলন সফল হলে সরকার ক্ষমতায় থাকতে পারবে না। সে কারণে যুগপতের জোটে তারা ভাঙন ধরানোর চেষ্টা অব্যাহত রেখেছে।

আওয়ামী লীগ আগেও এ ধরনের কাজ করেছে দাবি করে বিএনপির এই নেতা বলেন, ১৯৯৬ সালে তারা বিএনপির এমপি ভাগিয়ে নিয়ে মন্ত্রী বানিয়েছে। সর্বশেষ উকিল আব্দুস সাত্তার। তার নির্বাচনী এজেন্ট থেকে শুরু করে প্রচার সবই করছে আওয়ামী লীগের নেতারা। সুতরাং এখনো সেই চেষ্টা তাদের থাকবে। সিলেটে আরিফুল হককে নিয়ে কত গল্প বানানোর চেষ্টা হলো, এখনো পারেনি। যে কারণে সতর্কতামূলক যেসব ব্যবস্থা নেওয়া যায়, সেগুলো নেওয়া হচ্ছে।

এদিকে যুগপৎ আন্দোলনের গুরুত্বপূর্ণ মিত্র সাত দলের জোট গণতন্ত্র মঞ্চ থেকে গত শনিবার বেরিয়ে গেছে রেজা কিবরিয়া ও নুরুল হক নুরের গণঅধিকার পরিষদ। তবে দলটি পৃথকভাবে যুগপৎ আন্দোলনে সম্পৃক্ত থাকবে বলে জানিয়েছে। কিন্তু গণঅধিকার পরিষদের বেরিয়ে যাওয়ার পেছনে সরকারের ইন্ধন রয়েছে বলে সন্দেহ গণতন্ত্র মঞ্চের। মঞ্চের নেতারা মনে করেন, বিএনপি ও যুগপতের মিত্ররা শেখ হাসিনা সরকারের অধীনে নির্বাচনে না যাওয়ার ঘোষণা দিলেও এমপি ও নিবন্ধনের সরকারি প্রলোভনের ফাঁদে পা দিয়েছে গণঅধিকার পরিষদ। তবে এমন অভিযোগ অস্বীকার করে দলটি বলেছে, অসৎ উদ্দেশ্য থেকে পার্টির ইমেজ নষ্ট করা কিংবা মানুষকে বিভ্রান্ত করার জন্যই এ ধরনের কথা বলা হচ্ছে। শেখ হাসিনা সরকারের অধীনে নির্বাচনে যাবে না বলে নিজেদের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছে গণঅধিকার পরিষদ।

এমন প্রেক্ষাপটে গত সোমবার রাতে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার সঙ্গে গুলশানে তার বাসভবনে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন গণতন্ত্র মঞ্চের শরিক নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না। সেখানে বিএনপিপ্রধান বলেন, আওয়ামী লীগবিরোধী নানা কর্মসূচিতে সাধারণ মানুষের বিপুল অংশগ্রহণ রয়েছে। তাই আন্দোলন বাধাগ্রস্ত করতে, জোটে ভাঙন ধরাতে শরিকদের নানা প্রলোভন দেখাতে পারে সরকার। তিনি বিএনপির মিত্রদের ঐক্যবদ্ধ থাকতে এবং সরকারের ফাঁদে পা না দেওয়ার আহ্বান জানান। সাক্ষাৎকালে অতীতের মতো আন্দোলনের অংশ হিসেবে বিএনপি এবার নির্বাচনে যাবে কি না জানতে চান মান্না। জবাবে খালেদা জিয়া বলেন, কোনো পরিস্থিতিতেই শেখ হাসিনা সরকারের অধীনে নির্বাচনে যাবে না বিএনপি। এমন কোনোকিছু তিনি অ্যালাও করবেন না।

বৈঠক প্রসঙ্গে নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মান্না গণমাধ্যমকে আরও বলেন, ‘ম্যাডাম আমাদের বলেছেন, এখন শুধু আমাদের নির্বাচন বর্জনের কথা বললে চলবে না। সেইসঙ্গে মানুষকেও এই সরকারের অধীনে ভোট বর্জনের কথা বলতে হবে। সেই ক্যাম্পেইন শুরু করতে বলেছেন তিনি।’

 
 
জনতার আওয়াজ/আ আ
 
 

জনপ্রিয় সংবাদ

 

সর্বোচ্চ পঠিত সংবাদ