বিএনপি নেতাকর্মীদের গ্রেপ্তারে অব্যাহত রয়েছে পুলিশের সাঁড়াশি অভিযান
নিজস্ব প্রতিবেদক, জনতার আওয়াজ ডটকম
প্রকাশের তারিখ:
মঙ্গলবার, নভেম্বর ৭, ২০২৩ ১:০৯ পূর্বাহ্ণ পরিবর্তনের তারিখ:
মঙ্গলবার, নভেম্বর ৭, ২০২৩ ১:০৯ পূর্বাহ্ণ

নিউজ ডেস্ক
২৮শে অক্টোবর মহাসমাবেশে সংঘর্ষের পর বিরোধী জোটের নেতাকর্মীদের ওপর রীতিমতো ক্র্যাকডাউন চলছে। বিএনপি নেতাকর্মীদের গ্রেপ্তারে অব্যাহত রয়েছে পুলিশের সাঁড়াশি অভিযান। প্রতিরাতেই নেতাদের বাসায় বাসায় চলছে তল্লাশি। প্রতিদিনই গড়ে সারা দেশে পাঁচ শতাধিক নেতাকর্মী গ্রেপ্তার হচ্ছেন। সিনিয়র থেকে মাঠপর্যায়ের নেতা কেউ বাদ যাচ্ছেন না। ইতিমধ্যে গত ১০ দিনে দলটির মহাসচিব, দুইজন স্থায়ী কমিটির সদস্য, তিনজন ভাইস চেয়ারম্যান, তিনজন যুগ্ম মহাসচিব, দুইজন সাংগঠনিক সম্পাদকসহ সাড়ে ৫ হাজার নেতাকর্মীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। গ্রেপ্তারের পর সিনিয়র নেতাদের পাঠানো হচ্ছে রিমান্ডে। তালা ঝুলছে নয়াপল্টনের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে। বন্ধ রয়েছে বিএনপি চেয়ারপারসনের গুলশান কার্যালয়ও। গ্রেপ্তার এড়াতে আড়ালে চলে গেছেন দলটির সিনিয়র নেতারা।
কৌশলী অবস্থানে থেকেই ভার্চ্যুয়ালি দলের আন্দোলন কর্মসূচি ঘোষণা করছেন বিএনপি’র সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী। দলীয় কর্মপন্থা নির্ধারণে বৈঠকও করছেন ভার্চ্যুয়ালি। রাজপথে কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছেন দলটির মাঝারি ও মাঠপর্যায়ের নেতাকর্মীরা। প্রতিদিনই অভিযানের কারণে নেতাকর্মী কেউ বাসায় থাকছেন না। অনেকে ধানক্ষেতে, মাঠে, ঝোপজঙ্গলে রাত যাপন করছেন।
বিএনপি ও সমমনা দলগুলো বলছে- রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে নেতাকর্মীদের গ্রেপ্তার করা হচ্ছে। তবে পুলিশ বলছে, নিয়মিত কার্যক্রমের অংশ হিসেবে মামলার আসামিদের গ্রেপ্তার করা হচ্ছে। আইনমন্ত্রী আনিসুল হকও জানিয়েছেন, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে কাউকে গ্রেপ্তার করা হচ্ছে না। যারা মামলার আসামি পুলিশ তাদের আইনের আওতায় আনছে।
বিএনপি’র একাধিক নেতা জানিয়েছেন, নভেম্বরের মাঝামাঝিতে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা হতে পারে। তফসিলের আগে ধরপাকড় আরও তীব্র হতে পারে। তবে চলমান আন্দোলন থেকে বিএনপি’র পিছু হটার কোনো সুযোগ নেই। হরতালের পর দু’দফা অবরোধ কর্মসূচিও সফলভাবে পালিত হয়েছে। এসব কর্মসূচিতে সাধারণ মানুষের নীরব সমর্থন ছিল। এতে বিএনপি নেতাকর্মীরা অনেকটা উজ্জীবিত। তাই চলমান কর্মসূচি অব্যাহত থাকবে। তফসিলকে ঘিরে কর্মসূচিতে ভিন্নতা আনার আলোচনা চলছে। রাজপথের আন্দোলনেই সরকারকে পদত্যাগে বাধ্য করা হবে।
গ্রেপ্তার-তল্লাশি অব্যাহত
এদিকে গতকালও বিএনপি নেতাদের গ্রেপ্তারে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। রোববার মধ্যরাতে বোনের বাসা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়েছেন বিএনপি’র ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদুকে। এ সময় তার ভাগ্নে ব্যবসায়ী হাসনাত আশরাফ রবিনকে তুলে নিয়ে যায় পুলিশ। একইসময়ে অভিযান চালানো হয় ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপি’র যুগ্ম আহ্বায়ক আনম সাইফুল ইসলামের বাসায়। ওদিকে উখিয়া উপজেলা বিএনপি’র সাধারণ সম্পাদক সুলতান মাহমুদ চৌধুরীর বাসায় অভিযান চালায় র্যাব ও বিজিবি’র যৌথ দল। এ সময় এলাকার সাধারণ জনগণ ও বিএনপি নেতাকর্মীরা প্রতিবাদ করায় তাদের ওপর নির্বিচারে গুলি চালানো হয়। এতে পালং ইউনিয়ন বিএনপি’র সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক জাগির হোসেন, যুগ্ম আহ্বায়ক জাহাঙ্গীর ও ছাত্রদল নেতা শাহাবুদ্দীনসহ বেশ কয়েকজন গুলিবিদ্ধ হন। এদিকে ফেনীর দাগনভূঞা উপজেলা যুবদলের যুগ্ম আহ্বায়ক নাসির উদ্দিনের গ্রামের বাড়িতে স্থানীয় আওয়ামী যুবলীগ ও ছাত্রলীগের কর্মীরা অতর্কিত হামলা চালিয়ে বাড়িঘর ভাঙচুর করে।
পাবনা পৌর বিএনপি’র সাবেক সাধারণ সম্পাদক কারারুদ্ধ জাকারিয়া পিন্টুর অফিসসহ বেশ কয়েকজন নেতৃবৃন্দের বাড়িঘর তল্লাশির নামে ভাঙচুর করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।
‘ঘরছাড়া ২ কোটি মানুষ’
বিরোধী জোটের চলমান আন্দোলনকে কেন্দ্র করে সরকারের গ্রেপ্তার, নিপীড়ন ও গায়েবি মামলার আসামি হয়ে দেশের ২ কোটি মানুষ ঘরছাড়া বলে মন্তব্য করেছেন বিএনপি ও সমমনা আইনজীবীরা। গতকাল সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সামনে ইউনাইটেড ল’ইয়ার্স ফ্রন্টের (ইউএলএফ) ব্যানারে আয়োজিত মিছিল ও সমাবেশে এসব কথা বলেন তারা। ইউনাইটেড ল’ইয়ার্স ফ্রন্টের কো-কনভেনর এডভোকেট সুব্রত চৌধুরী বলেন, এই দানব সরকারের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মিথ্যা মামলা, গায়েবি মামলার কারণে আজ দেশের ২ কোটি মানুষ ঘর ছাড়া। তারা আজ মাঠে, বনে জঙ্গলে রাত যাপন করছে। এই সরকার আজ পুরো বাংলাদেশকেই কারাগার বানিয়ে ফেলেছে। অবিলম্বে সরকারকে পদত্যাগ করে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন দেয়ার দাবি জানান তিনি। বিএনপি’র সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সমগ্র দেশটাকে এখন বৃহৎ কারাগার বানিয়ে ফেলেছেন। একদিকে সরকারের আজ্ঞাবহ নির্বাচন কমিশন বিএনপিকে আগামী নির্বাচনে অংশগ্রহণের জন্য আহ্বান জানাচ্ছে। অন্যদিকে সিনিয়র নেতৃবৃন্দসহ সর্বস্তরের নেতাকর্মীকে গ্রেপ্তারে ক্র্যাকডাউন শুরু হয়েছে। নেতাকর্মীদের যেভাবে সাঁড়াশি অভিযান চালিয়ে গ্রেপ্তার করা হচ্ছে, তাতে এটি সুস্পষ্ট যে, আগামী নির্বাচন যেকোনো প্রকারে অনুষ্ঠিত করে আবারও রাষ্ট্রক্ষমতা দখলে নিতে বদ্ধপরিকর অবৈধ শাসকগোষ্ঠী। কিন্তু এবার আওয়ামী অবৈধ সরকারের এ স্বপ্ন বাস্তবায়িত হতে দেবে না জনগণ।
১০ দিনে গ্রেপ্তার ৫৫৫৯ নেতাকর্মী
বিএনপি’র সিনিয়র যগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী জানিয়েছেন, গত ২৪ ঘণ্টায় সারা দেশে বিএনপি ও এর অঙ্গসহযোগী সংগঠনের ২৭৫ জন নেতাকর্মীকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। বিভিন্ন থানায় মামলা দায়ের হয়েছে ১০টি। এসব মামলায় আসামি করা হয়েছে ৯৯৫ জন নেতাকর্মীকে। এছাড়া ২৮শে অক্টোবর মহাসমাবেশকে কেন্দ্র করে গত ১০ দিনে সারা দেশে ৫৫৫৯ জন নেতাকর্মীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। মামলা দায়ের হয়েছে ১৩২টি। আহত হয়েছেন ৩৫১৮ জন। আওয়ামী লীগের হামলা ও পুলিশের গুলিতে একজন সাংবাদিকসহ ১০ জনের মৃত্যু হয়েছে। ওদিকে গত ২৮শে জুলাই থেকে গতকাল পর্যন্ত সারা দেশে গ্রেপ্তার করা হয়েছে ৮২৪৯ জন নেতাকর্মীকে। মামলা হয়েছে ৫২৫টি। এসব মামলায় আসামি করা হয়েছে ৪০,৬১৫ জনকে। আহত হয়েছেন ৫৮০৯ জনের অধিক নেতাকর্মী। এছাড়া ১৭টি মামমলায় ৯ জনের মৃত্যুদণ্ডাদেশ ও প্রায় ১১১ জনের অধিক নেতাকর্মীকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ডাদেশ দেয়া হয়েছে।
ডিএমপিতে ১০২ মামলায় গ্রেপ্তার ১৫৫৪:
ঢাকা মহানগর পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ২৮শে অক্টোবর বিএনপি’র মহাসমাবেশকে ঘিরে সংঘর্ষের ঘটনায় ৯ দিনে ঢাকায় ১০২টি মামলা হয়েছে। ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) ৮টি বিভাগের বিভিন্ন থানায় এসব মামলা হয়েছে। এর মধ্যে মতিঝিল বিভাগে সবচেয়ে বেশি মামলা হয়েছে। এই বিভাগে মোট মামলা ৩৩টি। মতিঝিলের পল্টন থানায় সবচেয়ে বেশি ১৫টি মামলা হয়েছে। ২৮শে অক্টোবর থেকে ৫ই নভেম্বর পর্যন্ত এসব মামলা হয়েছে। ১০২টি মামলায় রোববার পর্যন্ত বিএনপি’র ১ হাজার ৫৫৪ জন নেতাকর্মীকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।
কারাগারে আছেন যারা-
২৮শে অক্টোবর সংঘর্ষের পর গ্রেপ্তার করা হয়েছে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস, আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, ভাইস চেয়ারম্যান আলতাফ হোসেন চৌধুরী, ব্যারিস্টার শাহজাহান ওমর, শামসুজ্জামান দুদু, যুগ্ম মহাসচিব মজিবুর রহমান সারোয়ার, সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল, খায়রুল কবির খোকন, সাংগঠনিক সম্পাদক সৈয়দ এমরান সালেহ প্রিন্স, বিলকিস জাহান শিরিন, সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক শরীফুল আলম, বিএনপি মিডিয়া সেলের আহ্বায়ক জহির উদ্দিন স্বপন, ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপি’র সদস্য সচিব মো. আমিনুল হকসহ অনেকে। তাদের অনেককে রিমান্ডে পাঠানো হয়েছে। অনেকে আবার রিমান্ড শেষে কারাগারে আছেন।
এছাড়া ২৮শে অক্টোবরের আগে গ্রেপ্তার করা হয়- বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা আমান উল্লাহ আমান, সাংগঠনিক সম্পাদক রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলু, সাবেক এমপি সালাহউদ্দিন আহমেদ, প্রচার সম্পাদক শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানী, তাঁতীদলের কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক আবুল কালাম আজাদ, ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপি’র সদস্য সচিব রফিকুল আলম মজনু, ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপি’র ভারপ্রাপ্ত সদস্য সচিব তানভীর আহমেদ রবিন, শেখ রবিউল ইসলাম রবি, যুবদলের সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি সাইফুল আলম নীরব, এসএম জাহাঙ্গীর, বর্তমান সাধারণ সম্পাদক আবদুল মোনায়েম মুন্না, সিনিয়র যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক গোলাম মাওলা শাহীন, যুবদলের সাবেক সহ-সভাপতি আলী আকবর চুন্নু ও নরসিংদী জেলা ছাত্রদল সভাপতি সিদ্দিকুর রহমান নাহিদ।
জনতার আওয়াজ/আ আ