বিএনপি নেতাকর্মীরা বছরের পর বছর ‘ফেরারি জীবনে’ - জনতার আওয়াজ
  • আজ সকাল ৯:৪২, বৃহস্পতিবার, ১৪ই মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ৩১শে বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ, ২৭শে জিলকদ, ১৪৪৭ হিজরি
  • jonotarawaz24@gmail.com
  • ঢাকা, বাংলাদেশ

বিএনপি নেতাকর্মীরা বছরের পর বছর ‘ফেরারি জীবনে’

নিজস্ব প্রতিবেদক, জনতার আওয়াজ ডটকম
প্রকাশের তারিখ: মঙ্গলবার, জানুয়ারি ২৩, ২০২৪ ৩:২০ অপরাহ্ণ পরিবর্তনের তারিখ: মঙ্গলবার, জানুয়ারি ২৩, ২০২৪ ৩:২০ অপরাহ্ণ

 

নিউজ ডেস্ক
প্রত্যেক মানুষের জীবনের ‘গল্প’ আলাদা। ভিন্ন তাদের সংকটের ধরনও। তাদের জীবন যেন একেকটা আলাদা ‘গল্প’ নিয়ে ঘুরে বেড়ায়। তবে বিএনপি নেতাকর্মীর সবার জীবনের ‘গল্পটা’ যেন একই রকমের। রাজনৈতিক বৈরী পরিবেশে মামলা-হামলায় জর্জরিত একেকটা জীবন যেন একেকটি ‘কষ্টগাথা’।

দলটির তৃণমূল থেকে শুরু করে একেবারে হাইকমান্ড পর্যন্ত প্রায় সবার বিরুদ্ধেই মামলার পাহাড়। এর মধ্যে প্রায় দেড় হাজার নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে সম্প্রতি সাজার রায় ঘোষণা করেছেন আদালত। নিয়মিত মামলার সঙ্গে এখন সাজার দণ্ড মাথায় নিয়ে ফেরারি জীবন পার করছেন তারা। কবে নাগাদ আত্মসমর্পণ করে জামিন নেবেন, তা কেউ বলতে পারছেন না। কবে আবার মুক্ত জীবনে স্বাভাবিক নিয়মে পরিবারের সঙ্গে সময় কাটাবেন, তাদের সুখে-দুঃখে পাশে থাকবেন, তাও কেউ জানেন না। বাবা-মা, ভাইবোন কিংবা সন্তানের ভালোবাসায় কবে সিক্ত হবেন, তাও অনিশ্চিত।

এ কঠিন পরিস্থিতির মধ্যেই এসব নেতাকর্মীর মনোবলে এখনও চিড় ধরেনি। তারা প্রত্যেকে বলছেন, দেশের গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের আন্দোলনে জাতীয়তাবাদী আদর্শের ধারক বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া ও দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে এর থেকেও বেশি ত্যাগ স্বীকার করতে হচ্ছে। দেশের হাজার হাজার তৃণমূল কর্মী নিজেদের রক্ত দিচ্ছেন, জীবন দিচ্ছেন, ঘরবাড়ি ছেড়ে উদ্বাস্তু জীবন পার করছেন। সেখানে এই ফেরারি জীবনের কষ্ট তুলনামূলক কিছুই নয়। তবে এখান থেকেই তাদের ঘুরে দাঁড়াতে হবে। গণতন্ত্র আর ভোটাধিকার ফিরিয়ে আনতে পারলে এই কষ্টময় জীবনের আমূল অবসান ঘটবে বলে তাদের বিশ্বাস।

কথা হয় স্বেচ্ছাসেবক দলের সাধারণ সম্পাদক রাজীব আহসানের মা ফরিদা বেগমের সঙ্গে। দুই শতাধিক মামলা মাথায় নিয়ে এখন ফেরারি তাঁর ছেলে। চারটি মামলায় সাড়ে আট বছরের সাজা হয়েছে। গত ১১ বছরে তিনি বাড়ি যেতে পারেননি। দুই বোন আর এক ভাইয়ের পরিবারে বাবা নেই। একমাত্র ছেলে বিএনপির রাজনীতিতে জড়িয়েছেন।
.
২০১৩ সালের রাজনৈতিক ডামাডোলের পর আর একসঙ্গে নিশ্চিন্তে জীবন কাটাতে পারেননি পরিবারের সদস্যরা। সারাক্ষণই একটা চাপা আতঙ্কে দিন পার করতে হয়েছে মা ও দুই বোনের– এই বুঝি গ্রেপ্তার হতে হলো, এই বুঝি কারাগারে যেতে হলো। বয়স ৪০ পেরোলেও নিজের ব্যক্তিগত জীবনটাও শুরু করতে পারেননি একের পর এক মামলার জটিলতায়। কখন কী হয়– সে ভাবনায় জীবনসঙ্গীকে শঙ্কায় ফেলতে চাননি বলে বিয়েটাও করেননি তিনি।

২০১৩, ২০১৪ ও ২০১৫ সালে সরকারবিরোধী আন্দোলনের সময়ে রাজীব আহসান কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের সভাপতি ছিলেন। তাঁর নেতৃত্বেই ওই সময়ে ছাত্রদলের পুরো আন্দোলনের ধাক্কা সামলাতে হয়েছে। সেখান থেকেই মামলার জীবন শুরু। ওই সময় থেকে বিভিন্ন মামলায় আড়াই বছরের বেশি সময় কেটেছে কারাগারে। গত দেড় বছরে চলমান আন্দোলনেও তাঁর বিরুদ্ধে কমপক্ষে ৪০টি মামলা হয়েছে বিভিন্ন থানায়। এর আগে পুরোনো মামলায়ও আর হাজিরা দেওয়া যাচ্ছে না। ফলে প্রায় প্রতিটি মামলাতেই ওয়ারেন্ট ইস্যু হয়েছে। এখন এসব মামলায় কবে হাজিরা দিয়ে, সাজার দণ্ড মাথায় নিয়ে আইনি প্রতিকার করবেন, তা তিনি নিজেও বলতে পারেন না।

রাজীব আহসান বলেন, এই সরকারের আমলে নিগৃহীত হয়নি– বিএনপির এমন কোনো নেতাকর্মী পাওয়া যাবে না। এটা পুরো বাংলাদেশের চিত্র। সেখানে তাঁর বিরুদ্ধে মামলার রায় হয়েছে, সাজা দেওয়া হয়েছে, নিত্যনতুন মামলা দেওয়া হচ্ছে– সেটা তেমন গুরুত্বপূর্ণ নয়। যেখানে খালেদা জিয়া আর তারেক রহমানের বিরুদ্ধে সাজা দেওয়া হয়েছে, সেখানে তাঁর এই কষ্ট খুব সামান্যই। তিনি ব্যস্ত আছেন বিগত আন্দোলনে জীবন দেওয়া তাঁর ছয় সতীর্থের পরিবার নিয়ে। চেষ্টা করছেন তাদের পাশে থাকার।

যুবদলের সিনিয়র সহসভাপতি মামুন হাসান। মামলার সংখ্যা তিন সেঞ্চুরি পার হওয়ার পর আর হিসাব রাখেননি তিনি। এর মধ্যে পাঁচটি মামলায় সম্প্রতি সাড়ে ১৩ বছরের সাজা হয়েছে তাঁর। মূলত ওয়ান-ইলেভেনের পর থেকেই পরিবার বিচ্ছিন্ন এই নেতা। ২০১৩ সালের ২৮ ডিসেম্বর তাঁর পরিবারের ওপর নেমে আসে ভয়াবহ নির্যাতন। তাঁকে বাসায় না পেয়ে ভাবি, বোন আর দুই ভাতিজিকে আটক করে নিয়ে যাওয়া হয়। বাসায় মেঝের টাইলস, বাথরুমের কমোড ভেঙে ফেলা হয়; নারীদের শাড়ি-ব্লাউজ কেটে ফেলা হয় তখন। নির্যাতন করা হয় প্রতিবন্ধী বড় ভাইসহ সবাইকে।

তাঁর সহধর্মিণী গুলনাহার ডলি জানান, বিগত ১৫ বছরের হিসাব তিনি এখনও মেলাতে পারছেন না। এভাবে আর কত দিন? মামুন হাসান যখন ঘর থেকে বের হয়ে যান, তখন তাঁর বড় ছেলের বয়স চার বছর আর মেয়ের বয়স আড়াই বছর। তারা কখনও বাবার আদর, শাসন আর ভালোবাসাটুকু পেল না। তাঁর ফেরারি জীবনের সঙ্গে পরিবারের প্রত্যেক সদস্যের জীবনও ফেরারি হয়ে গেছে। তাদের ২৩ বছরের দাম্পত্য জীবনে হয়তো সর্বসাকল্যে ছয় বছর একসঙ্গে থাকতে পেরেছেন। বাসার অভিভাবকের অবর্তমানে অনেক ঘাটতি রয়ে গেছে তাঁর সন্তানদের জীবনে।

গত বছরের ২৮ অক্টোবর ঢাকায় বিএনপির মহাসমাবেশ পণ্ড হয়ে যাওয়ার পর থেকেই সারাদেশে নেতাকর্মীকে গ্রেপ্তার সাঁড়াশি অভিযান পরিচালনা করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। নেতাকর্মীরা গ্রেপ্তার এড়াতে বাড়িঘর ছেড়ে বনে-জঙ্গলে, ধানক্ষেতে আর বিভিন্ন স্বজনের বাড়িতে আশ্রয় নেন। অনেকে এলাকা ছেড়ে শহরমুখী হতে বাধ্য হন।

আন্দোলন আর নির্বাচন শেষেও ঘরে ফিরতে পারেননি নেতাকর্মীরা। তারা এখনও আতঙ্কে ফেরারি জীবনে রয়েছেন। এর মধ্যে যাদের বিরুদ্ধে মামলার সাজা ঘোষণা করা হয়েছে, তারা রয়েছেন আরও বেশি জটিলতায়। নতুন-পুরোনো মামলার সঙ্গে সাজার ঘোষণায় আত্মগোপনেই পার করছেন নিজেদের জীবন। কখনও এ ঠিকানা, কখনও অন্য ঠিকানায় পালিয়ে বেড়াতে হচ্ছে তাদের। এদের বিরুদ্ধে থাকা কোনো মামলাই ব্যক্তিগত অপরাধের নয়। সবারটাই রাজনৈতিক মামলা। এই অপরাধে খুইয়ে যেতে বসেছে তাদের ব্যক্তিজীবন, সংসার-পারিবারিক জীবন, সামাজিক জীবন। ধ্বংস হচ্ছে একেকটি পরিবার।
যুবদলের সভাপতি সুলতান সালাহউদ্দিন টুকু দুই মেয়ে আর এক ছেলের জনক। চার শতাধিক মামলার মধ্যে সম্প্রতি তিনটি মামলায় সাত বছরের কারাদণ্ড হয়েছে তাঁর। গত ১৫ বছরে চার বছরের মতো তাঁকে কারাগারে থাকতে হয়েছে। কবে বাসায় গেছেন, সন্তানদের আদর করেছেন, তা তিনি নিজেও বলতে পারেন না। আর কবে পারবেন, তাও জানেন না তিনি। তাঁর স্ত্রী সায়মা পারভীন মিন্নি জানান, তাদের সন্তানরা বেড়ে উঠছে বাবার ভালোবাসা ছাড়াই। তারা বাবার ছবি দেখে বড় হচ্ছে। কখনও কখনও তাঁর চার বছর বয়সী ছোট ছেলে ছবিকে আদর করে কান্নাকাটি করে, যখন সেই ছবি কথা না বলে। এই দৃশ্য সহ্য করার মতো না। এই রাজনীতির জন্য শুধু টুকু নয়, তাঁর পুরো পরিবারকে সহ্য করতে হচ্ছে অবর্ণনীয় কষ্ট।

সুলতান সালাউদ্দিন টুকু বলেন, দেশের জন্য, গণতন্ত্রের মুক্তির জন্য তারা আন্দোলন করছেন। ইতিহাসে মুক্তিকামী জনতাকে অনেক ত্যাগ স্বীকার করতে হয়েছে। তারাও করছেন। সারাদেশে বিএনপির নেতাকর্মীরা ত্যাগ স্বীকার করছেন, রক্ত দিচ্ছেন, নির্যাতন সহ্য করছেন। দলের দুই অভিভাবক খালেদা জিয়া আর তারেক রহমানকেও সীমাহীন কষ্ট সহ্য করতে হচ্ছে। সেই তুলনায় তাঁর এই কষ্ট কিছুই নয়।
বিএনপির দপ্তর থেকে জানানো হয়েছে, ঢাকার মহাসমাবেশকে কেন্দ্র করে সারাদেশে ২৭ হাজার ৪৯৫ নেতাকর্মীকে গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। এ সময়ে মামলা হয়েছে ১ হাজার ১৭৫টি। এসব মামলার এজাহারভুক্ত আসামি ১ লাখ ৫ হাজারের বেশি। এ ছাড়া ২০০৯ থেকে ২০২৩ সালের জুলাই পর্যন্ত সারাদেশে ১ লাখ ৪১ হাজার ৯৩৪ মামলায় বিএনপির ৪৯ লাখ ৪০ হাজার ৪৯২ নেতাকর্মীকে আসামি করা হয়েছে।

এসব মামলার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়তে থাকে বিগত দিনের পুরোনো মামলার রায়। প্রায় প্রতিদিনই বিরোধী দলের নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে ঘোষণা করা হয় সাজার দণ্ড। গত বছরের অক্টোবর থেকে ১ জানুয়ারি পর্যন্ত ৭৯ মামলায় ১ হাজার ৩৬৮ নেতাকর্মীকে বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দেওয়া হয়। এর মধ্যে সক্রিয় আর জনপ্রিয় অনেক নেতাকর্মী রয়েছেন। যাদের মধ্যে অনেকে আছেন ফেরারি জীবনে, অনেকে আছেন কারাবন্দি। কারাগারে থাকা নেতাদের জামিনে মুক্তি নিয়ে শুরু হয়েছে এক অনিশ্চয়তা। পরিবারের সদস্যরা জানান, নিয়মিত বিভিন্ন মামলায় জামিন পেলেও সাজার মামলায় কী হবে, কবে মুক্তি পাবেন, তা বলতে পারছেন না।

বিভিন্ন মেয়াদে সাজাপ্রাপ্ত নেতাদের মধ্যে যারা কারাগারে আছেন, তাদের মধ্যে– বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলালের সহধর্মিণী সৈয়দা নাসিমা ফেরদৌসী জানান, গত ১৫ বছরে তাঁর বিরুদ্ধে থাকা তিন শতাধিক মামলায় পাঁচ বছরের বেশি সময় কারাগারে থাকতে হয়েছে ৭০ বছর বয়সী এই নেতাকে। গত বছর তাঁর কিডনিতে একটি বড় অস্ত্রোপচার করতে হয়েছে। আরও একটি অস্ত্রোপাচারে ভারতে নেওয়ার সময় পার হয়ে গেছে। এর সঙ্গে ২০১২ সালে মালিবাগ মোড়ে পুলিশের গুলিতে তাঁর মেরুদণ্ডের দুটি হাড় এখনও ক্ষতিগ্রস্ত। সব মিলিয়ে তিনি ভয়ানক অসুস্থ। অথচ এর মধ্যেও তিনি স্বাভাবিক আইনি প্রতিকার পাচ্ছেন না।

আলালের স্ত্রী আরও জানান, গত বছরের ৩১ অক্টোবর আলালকে গ্রেপ্তারের পর ৩১ ডিসেম্বর একটি মামলায় তাঁকে তিন বছরের সাজা দেওয়া হয়েছে। এর পর তাঁর ডিভিশন বাতিল করে সাধারণ কয়েদির সঙ্গে থাকতে দেওয়া হয়। উচ্চ আদালতের নির্দেশনার পরও তা আমলে নেওয়া হয়নি। যদিও অনেক লবিং করে শেষ পর্যন্ত সেই ডিভিশন নিশ্চিত করেন তারা। এখন শুরু হয়েছে ওকালতনামা তাঁর কাছে না পৌঁছানোর ফন্দি-ফিকির। সাত-আট দিন ঘুরিয়ে ওকালতনামা পাওয়া যায় তাঁর। সর্বশেষ গত সপ্তাহে উচ্চ আদালতের আপিল বিভাগের ওকালতনামা কারাগারে পাঠানো হলেও সেটা এখনও ফেরত পাওয়া যায়নি। অসুস্থ নেতাকে বাইরে থেকে খাবার-শীতের পোশাক দিতেও গড়িমসি করা হয় বলে তিনি জানান।

আলালের মতো কারাগারের বন্দিজীবন পার করছেন সাজাপ্রাপ্ত দলের ভাইস চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল (অব.) আলতাফ হোসেন চৌধুরী, চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা আমান উল্লাহ আমান, হাবিবুর রহমান হাবিব, যুবদলের সাবেক সভাপতি সাইফুল আলম নিরব, ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপির সদস্য সচিব রফিকুল ইসলাম মজনু, যুবদলের সাবেক সহসভাপতি এস এম জাহাঙ্গীর, গ্রাম সরকারবিষয়ক সহসম্পাদক বেলাল আহমেদ, সহপ্রচার সম্পাদক শামীমুর রহমান শামীম, নির্বাহী কমিটির সদস্য শেখ রবিউল আলম, ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক হাজি মনির প্রমুখ। সমকাল

 
 
জনতার আওয়াজ/আ আ
 
 

জনপ্রিয় সংবাদ

 

সর্বোচ্চ পঠিত সংবাদ