বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম এর সংবাদ সম্মেলন এর বক্তব্য - জনতার আওয়াজ
  • আজ বিকাল ৫:২৬, শুক্রবার, ১৫ই মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ১লা জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ, ২৮শে জিলকদ, ১৪৪৭ হিজরি
  • jonotarawaz24@gmail.com
  • ঢাকা, বাংলাদেশ

বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম এর সংবাদ সম্মেলন এর বক্তব্য

নিজস্ব প্রতিবেদক, জনতার আওয়াজ ডটকম
প্রকাশের তারিখ: শুক্রবার, অক্টোবর ২১, ২০২২ ১:৪৫ অপরাহ্ণ পরিবর্তনের তারিখ: শুক্রবার, অক্টোবর ২১, ২০২২ ১:৪৫ অপরাহ্ণ

 

প্রিয় সাংবাদিক ভাই ও বোনেরা,
আসসালামু আলাইকুম,
“যা ভাবা হচ্ছে বিদ্যুৎ পরিস্থিতি তার চেয়েও খারাপ”- এ হচ্ছে গত ১৬ তারিখের প্রথম আলো পত্রিকায় একজন ত্বড়িৎ প্রকৌশলীৎর (বুয়েট) মন্তব্য। গত ক’দিন ধরে পত্র-পত্রিকায় বিদ্যুৎ বিশেষজ্ঞদের মতামত বিশ্লেষণ করলেই বিদ্যুতের অশনি-সংকেত স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
আপনারা জানেন গত ৪ অক্টোবর বিদ্যুৎ বিপর্যয়ের কারণে প্রায় সারাদেশ ব্লাকআউটের কবলে পড়ে। টানা ৮ ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে বিদ্যুৎহীন হয়ে পড়ে দেশের ৬০% এলাকা। রাজধানী ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেট, কুমিল্লাসহ দেশের ৩২ টি জেলার মানুষের জীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে, ব্যাহত হয় শিল্প-কারখানা, ব্যবসা-বাণিজ্য, চিকিৎসা সেবা, টেলিযোগাযোগ, নেট-ওয়ার্কিং এবং ব্যাংকের লেনদেনসহ জরুরী সেবা। পিজিসিবি সূত্র মতে, যমুনা সেতুর পুর্ব পাশের ন্যাশনাল গ্রিডে বিপর্যয় হয়। জাতীয় বিদ্যুৎ গ্রিডকে বলা হয় “বিদ্যুতের মহাসড়ক” যার মাধ্যমে সারাদেশে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হয়। জাতীয় বিদ্যুৎ গ্রিডে এ ধরণের বিপর্যয়ের ঘটনা বিদ্যুৎ খাতের পরিকল্পনা, রক্ষণাবেক্ষণ ও ব্যবস্থাপনাগত ব্যর্থতা হিসাবেই বিবেচিত হয়। এটি ছিল গত এক মাসের ব্যবধানে দ্বিতীয় বারের মত জাতীয় গ্রিড বিপর্যয়। গত ৬ সেপ্টেম্বরে মাঝারি গ্রিড বিপর্যয়ের ফলে কুষ্টিয়া, যশোরসহ দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জেলা গুলোতে দেড় ঘণ্টা বিদ্যুৎ ছিলো না। তাছাড়া ২০১৭ সালের ৩ মে এবং ২০১৪ সালের নভেম্বরে জাতীয় গ্রিড বিপর্যয়ের কবলে পড়ে। ২০১৪ সালে সারাদেশে টানা ১০ ঘন্টা বিদ্যুৎ ছিল না। অর্থাৎ নিয়মিত বিরতিতেই চলছে গ্রিড বিপর্যয়। ২০১৪, ২০১৭ এবং ২০২২ সালের ঘটনা বিদ্যুৎ খাতের জন্য এক মহা সতর্ক বার্তা। প্রত্যেক বারের মত এবারও রুটিন তদন্ত কমিটি গঠিত হয়েছে। কিন্তু প্রায় ২ সপ্তাহ পার হলেও এখনো বিদ্যুৎ বিপর্যয়ের সুনির্দিষ্ট কোন কারণ জানানো হয়নি। এই অদক্ষ সরকারের পরিকল্পনাহীনতা, অপরিনামদর্শিতা ও জবাবদিহিহীনতার কারণেই তারা এমন উদাসীনতা দেখাতে পারছে। পিজিসিবির কয়েকজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়াইতো মুখ্য নয়। লোক দেখানো গল্প-কথার প্রতিবেদন নয়। জাতি জানতে চায় কেন এই বিপর্যয় ঘটলো এবং ভবিষ্যতে এ ধরণের বিপর্যয় এড়াবার রোড-ম্যাপ কি।
প্রিয় সাংবাদিকবৃন্দ,
বিদ্যুতের মহাপরিকল্পনা প্রণয়নের সময় উৎপাদন, সঞ্চালন, বিতরণ নেট-ওয়ার্ক ও গ্রাহক সংযোগ- এই চারটি মৌলিক স্তরের সুসমন্বয় করা হয়নি। বিদ্যুৎ উৎপাদন, সঞ্চালন ও বিতরণের মধ্যে ভারসাম্য থাকা জরুরী। ২০০৯ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে সঞ্চালন লাইন যেখানে মাত্র ৬৯% ও ১৪০% বেড়েছে, সেখানে উৎপাদন ক্ষমতা বাড়ানো হয়েছে ৪১৭%। উৎপাদন পরিকল্পনায় পরিনামদর্শিতার অভাবে মহাপরিকল্পনাটি এখন গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে। পায়রা বিদ্যুৎ কেন্দ্র- ২০২০ সালের ডিসেম্বরে উৎপাদনে গেলেও সঞ্চালন লাইনের নির্মাণ শেষ না হওয়ায় কেন্দ্রটি সক্ষমতার অর্ধেক উৎপাদন করছে। কিন্তু কোন বিদ্যুৎ উৎপাদন না করেই ক্যাপাসিটি চার্জ হিসেবে কেন্দ্রটিকে ৫ হাজার কোটি টাকার বেশি পরিশোধ করা হয়েছে। এটা দুর্ভাগ্য যে সরকার বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনে যতোটা আগ্রহী, সঞ্চালন লাইন সংস্কার ও আধুনিকায়নে ততটাই নিষ্ক্রিয় থেকেছে। সঞ্চালন লাইন দুর্বল, লোড ব্যবস্থাপনাও আধুনিকায়ন করা হয়নি। ফলে বারবার গ্রিড বিপর্যয় দেখা দিচ্ছে। এনালগ পদ্ধতির লোড ব্যবস্থাপনা ঝুঁকিপূর্ণ করছে জাতীয় গ্রিডকে। ২০১৪ সালের অভিজ্ঞতা থেকে কোন শিক্ষা নেয়নি সরকার। অতীব গুরুত্বপূর্ণ ন্যাশনাল লোড ডিসপাস সেন্টারের (ঘখউঈ) অটোমেশান এবং কারিগরি সমন্বয়ের বিষয়টি উপেক্ষিতই থেকেছে। ঘখউঈ কে অদ্যাবধি সধহঁধষষু এ কাজ করতে হচ্ছে টেলিফোনের মাধ্যমে। এবার লোডশেডিং করতে গিয়ে দেখা গেছে, বিদ্যুৎ গ্রিড স্মার্ট নয়। অটোমেশান না করে সেখানেও চুরি এবং অপরিণামদর্শী কাজ হয়েছে। গ্রিড সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হলে গ্রিডের কোন একটি লাইন আকস্মিক বন্ধ হয়ে গেলে সেই পরিমাণ সরবরাহ যেন স্বয়ংক্রিয়ভাবে সাথে সাথে বৃদ্ধি করা যায় তার নিশ্চয়তা থাকতে হবে। দেশের বিদ্যুতখাত যত দ্রæত ঝসধৎঃ এৎরফ এর দিকে যাবে, ততই উত্তম। উন্নত বিশ্বে গ্রিডে সমস্যা হলে তা নিয়ন্ত্রণে স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তি ব্যবহৃত হয়। আমাদের দেশেও গ্রিড ব্যবস্থাপনার আধুনিকায়ন অত্যাবশ্যক।
উপস্থিত সাংবাদিকবৃন্দ,
আমরা জানি, বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনা একটি ডায়নামিক সিস্টেম, জীবন্ত একটি ব্যবস্থা। কিন্তু আওয়ামী লীগের ১৪ বছরে প্রাথমিক জ্বালানি পরিকল্পনা ঠিক না করে, সঞ্চালন, বিতরণ ঠিক ঠাক না বাড়িয়ে বা যথাযথ পরিকল্পনা না করে সমন্বয়হীন উৎপাদন বাড়ানোর নামে অর্থ লোপাটের মহা আয়োজন করা হয়েছে। চলমান অর্থবছরেও বিদ্যুৎ উৎপাদন কাজের জন্য বরাদ্দকৃত ৬০% এর বিপরীতে বিতরণে মাত্র ২০% বরাদ্দ করা হয়েছে। সবুজ বিদ্যুতেরও কোন পরিকল্পনা করা হয়নি। মাত্র ৪%। পদ্মা-মেঘনা- যমুনা নদী বিধৌত আঞ্চলিক ভৌগলিক বিভাজনকে মাথায় রেখে সঞ্চালন ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজাতে হবে। উৎপাদন ও লোড অনুসারে সঞ্চালন লাইনের সক্ষমতা বৃদ্ধি না করলে দক্ষিণবঙ্গের পায়রা, চট্টগ্রামের মাতারবাড়ি, উত্তরবঙ্গের রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রসহ অন্য কেন্দ্রগুলোর সুফল জনগণ পাবে না।
বিশ^স্ত সূত্রে জানা যায়, ঘোড়াশাল গ্রিডের কোনো এক লাইন ট্রিপ করায় অন্য লাইন ওভারলোড হয়ে ধারাবাহিক ট্রিপের কারণে বিদ্যুৎ বিপর্যয় হয়েছে। ঘোড়াশাল কেন্দ্রটিতে ফুল লোড দিতে গেলে এ সমস্যার সূত্রপাত- এ কথাটি সত্য হলে প্রশ্ন হলো, এ কেন্দ্রটিতো নতুন। এই চীনা কেন্দ্রটি চালুু করার আগে ‘ফুল লোড টেস্ট’ করা হয়েছে কিনা পিডিবি’কে তা স্পষ্ট করতে হবে।
প্রিয় সাংবাদিকবৃন্দ,
জানা যায় যে, লো ফ্রিকোয়েন্সি সমস্যা সমাধানে প্রকৌশলীরা বেসরকারি কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোকে সচলের নির্দেশ দিলেও এসব বিদ্যুৎকেন্দ্রের কোনোটাকেই উৎপাদনে আনা যায়নি। যে কারণে গ্রিড পুনঃসচল করতে প্রকৌশলীদের অনেক দেরি হয়েছে। বেসরকারি বিদ্যুৎ খাতে বিগত এক যুগে অন্তত ৯০ হাজার কোটি টাকা ক্যাপাসিটি চার্জের ভর্তুকির জোয়ার বইয়ে দেয়া হয়েছে। প্রশ্ন উঠেছে, এসব কেন্দ্রের সক্ষমতা আদৌ পরীক্ষিত এবং প্রমাণিত কি না? এসকল কেন্দ্রকে উৎপাদনে আনয়ন সম্ভব হয়নি, কেননা প্রকৃতপক্ষে এদের কথিত মতে উৎপাদন সক্ষমতাই নেই। অভিযোগ রয়েছে দেশে বেসরকারি পর্যায়ে স্থাপিত রেন্টাল, কুইক রেন্টাল ও দীর্ঘমেয়াদের কিছু আইপিপি কেন্দ্রের যন্ত্রপাতি, বিশেষকরে জেনারেটরগুলো মানসম্পন্ন নয়। এছাড়া রেন্টাল, কুইক রেন্টাল কেন্দ্রগুলো বেজ লোডকেন্দ্র হিসেবে স্থাপন করা হয়নি। এসব কেন্দ্রের কারণেও গ্রিড ঝুঁকিপ‚র্ণ হয়ে পড়ছে।
সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয়েছে যে বহু বেসরকারি ভাড়া বিদ্যুৎকেন্দ্র মিথ্যা সক্ষমতার বিপরীতে অলস থেকে রাষ্ট্রের বাজেট বরাদ্দ হাতিয়ে নিচ্ছে। এসব কেন্দ্রের অনেকগুলো উৎপাদনে যেতেই অক্ষম। মালিকেরা সরকারের প্রভাবশালী মহলের সঙ্গে আঁতাত করে দুর্বৃত্তপ্রক্রিয়ায় ভাড়াভিত্তিক ভুয়া বিদ্যুৎকেন্দ্রের সক্ষমতা দেখাচ্ছেন, যা দেশের স্বাভাবিক ও জরুরি প্রয়োজনে কোনোই কাজে আসছে না।
প্রিয় সাংবাদিক ভাই ও বোনেরা,
বাংলাদেশে গত কয়েক মাস যাবৎ জনজীবনের প্রধান আলোচিত বিষয় বিদ্যুৎ ও জ্বালানী সংকট এবং এর ফলে সৃষ্ট সীমাহীন জনদুর্ভোগ। নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যেমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, মুদ্রাস্ফীতি ও মূল্যস্ফীতির যাঁতাকলে জনজীবনে যখন নাভিশ্বাস উঠেছে, তার সাথে মরার ওপর খাঁড়ার ঘা হয়ে যুক্ত হয়েছে লোডশেডিং। প্রাথমিকভাবে ১ ঘন্টা দিয়ে শুরু হয়ে এখন তা ১২ ঘন্টারও অধিক। সে সময় বলা হয়েছিল লোডশেডিংটা সাময়িক, অক্টোবর থেকে আর থাকবে না। কিন্তু অক্টোবর মাসে এসে দেখা যাচ্ছে, পরিস্থিতির উন্নতি তো হয়ইনি, উল্টো কোথাও কোথাও তা অসহনীয় পর্যায়ে চলে গেছে। জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর মাস পর্যন্ত যেখানে দিনে সর্বোচ্চ ২ হাজার থেকে ২ হাজার ২০০ মেগাওয়াট লোডশেডিং করা হয়েছে, এখন তা বেড়ে আড়াই থেকে তিন হাজার মেগাওয়াট পর্যন্ত হয়েছে। জঊই দেশে ৫৫ শতাংশ বিদ্যুৎ দেয়। তারাও অতিরিক্ত লোডশেডিং চালাচ্ছে। গ্রামাঞ্চলে লোডশেডিং এর ব্যাপ্তি অনেক বেশি। অনেকেই বলছেন বিদ্যুৎ কখন আসে, সেটাই প্রশ্ন। এর ফলে জনজীবনে দুর্ভোগের চেয়েও বড় কথা কৃষি ও শিল্প খাতের দুর্যোগের কারণে অর্থনীতির ব্যাপক ক্ষতি। সরকার লোডশেডিং কমার জন্য প্রকৃতির উপর ভরসা করে বসে আছে কখন শীত আসবে। অথচ শীতকালে স্বাভাবিকভাবেই বিদ্যুতের চাহিদা কমে আসবে। তাতে সরকারের কোন কৃতিত্ব নাই, তা হবে প্রকৃতির আশীর্বাদ। এদিকে মন্দার কারণে প্রবাসী আয় কমলে ডলার সংকট আরও বাড়বে। তাই শীত এলেই বিদ্যুতের সংকট চলে যাবে সেটা নিশ্চিত বলা যায়না। কিন্তু কিছুটা সহনীয় হতে পারে। এটা সংকটের স্থায়ী সমাধান নয়। বরং আশংকা হচ্ছে আসছে মার্চ-এপ্রিলে গরমকালে পরিস্থিতি কি দাঁড়ায়। তথাকথিত “উন্নয়ন-গীত” বয়ান করতে গিয়ে সরকার বিদ্যুৎ খাতের উন্নয়নকে ফলাও করে প্রচার করে থাকে। এ বছরের মার্চে ঘরে ঘরে বিদ্যুৎ পৌঁছে দেয়ার উচ্ছ¡াস উদযাপন করা হ’ল ঘটা করে। চারমাস না যেতেই লোডশেডিং শুরু হলো। প্রশ্ন হচ্ছে দেশে চাহিদার তুলনায় অনেক বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতার ঘোষণার পরও কেন এখন এই মাত্রায় লোডশেডিং করতে হচ্ছে। প্রশ্ন হচ্ছে এক যুগেরও বেশি সময় ধরে এত বিপুল অর্থ ব্যয় করেও কেন আজ বিদ্যুৎ ব্যবহারে সাশ্রয়ী হওয়ার নসিহত দেয়া হচ্ছে, কেন বিদ্যুৎ খাত আজ অর্থনীতির গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে? আগেও বলেছি, আবারও বলি, উত্তর একটাই, এই সরকার একটা লুটেরা সরকার। সরকারের লাগামহীন দুর্নীতি আর হরিলুটের খেসারৎ জনগণকে দিতে হবে কেন?
বিদ্যুৎ মন্ত্রী বলেছিলেন, সেপ্টেম্বরে লোডশেডিং পরিস্থিতির উন্নতি হবে। এখন বলছে, নভেম্বরেও হবেনা, এ বিষয়ে নাকি কোন “পড়সভড়ৎঃ ুড়হব” নাই। থাকবে কিভাবে, সরিষায় ভূত থাকলে ভূত তাড়াবে কে ? সরকারের উচ্চ পর্যায়ের কমিশন বাণিজ্য ও লুটেরা সুবিধাভোগীদের দুর্নীতির কারণে ফঁব ফরষরমবহপব এর সাথে স্বচ্ছ ও ভোক্তাবান্ধব সিদ্ধান্ত নিচ্ছে না তারা।
প্রিয় সাংবাদিকবৃন্দ,
আন্তর্জাতিক বাজারে গত কয়েক মাসে প্রতি ব্যারেল ক্রুড অয়েলের গড় মূল্য ছিল ৮৪ ডলার। গত নভেম্বর থেকে আন্তর্জাতিক বাজারে গড় মূল্যবৃদ্ধি পেয়েছে সর্বোচ্চ ১২-১৫%। অথচ বাংলাদেশে এক বছরের কম সময়ে মাত্র নয় মাসে ৬৫.৫% বেড়েছে। সরকার গত ১২ বছরে অন্তত আটবার বিদ্যুতের দাম বাড়িয়েছে। আর ডিজেলের দাম বাড়িয়েছে ৩৪ টাকা থেকে ১৩০ টাকা। কিন্ত তা সত্তে¦ও সরকার বলছে তারা বিদ্যুৎ ও জ¦ালানি খাতে লোকসান করছে, এক হিসেবে কখনও কখনও দিনেই ১০০ কোটি টাকার বেশি লোকসান করছে।
গত ১১ বছরে বিদ্যুতের পাইকারি দাম বেড়েছে ১১৬% এবং গ্রাহক পর্যায়ে ৯০%। ইতোমধ্যেই সরকারের বিদ্যুৎমন্ত্রী ইঙ্গিত দিয়েছেন খুব শীঘ্রই জ¦ালানি ও বিদ্যুতের দাম বাড়বে। এর অর্থ হলো এক দশকেরও বেশি সময় ধরে জনগণ সরকারকে অর্থ দিয়েই যাচ্ছে। একবার তাদের প্রদত্ত করের টাকায় ভর্তুকি দেয়া হচ্ছে, আরেকবার গ্রাহক হিসেবে তারা সরকারকে অর্থ দিচ্ছে বিদ্যুতের দাম হিসেবে। যাকে বলা হয় ফড়ঁনষব ঃধীধঃরড়হ. নতুন করে বিদ্যুতের দাম বাড়লে তা মরার ওপর খাড়ার ঘা হয়েই আসবে। তাই আমরা বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধি না করার জন্য পুনরায় দাবী জানাচ্ছি।
উপস্থিত সাংবাদিকবৃন্দ,
সরকার গত এক যুগ ধরে দায়মুক্তি আইন করে বিনা টেন্ডারে বিনা প্রতিযোগিতায় আনুকুল্য পাওয়া ব্যবসায়ীদের পকেট ভারি করার জন্য কুইক রেন্টালে আত্মঘাতি চুক্তির ফাঁদ তৈরি করেছে। এসব চুক্তিতে রাঘববোয়ালেরা ইচ্ছামত বিদ্যুতের দাম নির্ধারণ করে নিয়েছে, কোনো সুনির্দিষ্ট নীতিমালা ছিল না। আপনারা জানেন কিভাবে কোনো বিদ্যুৎ উৎপাদন না করেই কিছু কোম্পানি ক্যাপাসিটি চার্জের নামে ১৪ বছরে ৯০ হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। চুক্তির ফাঁকে ও ফাঁদে আটক দেখিয়ে আদতে আওয়ামী লীগের লোকেরাই কৌশলে এ টাকা বাগিয়ে নিয়েছে। অথচ চলমান জাতীয় গ্রিড বিপর্যয়ের মতো এহেন ক্রান্তিকালেও অলস কুইক রেন্টাল বিদুৎকেন্দ্রগুলো চালানোই যায়নি। কিভাবে চালাবে! চুক্তির সময় অনেক কেন্দ্রের সক্ষমতা একদিকে বাড়িয়ে দেখানো হয়েছে, অপরদিকে এসব কোম্পানিগুলো বিদ্যুৎ উৎপাদনেই অক্ষম। অথচ চুক্তি করার সময় প্রতি ইউনিট বেশি দামে বিক্রি, ক্যাপাসিটি চার্জ, আমদানিতে শুল্ক ছাড়, সহজ সুদে ব্যাংক ঋণ পাইয়ে দেয়া, জমি ক্রয়ে সুবিধা- ইত্যাকার অসংখ্য অনৈতিক ও অবৈধ সুবিধা দেয়া হয়েছে এসব কো¤পানিকে। কি অদ্ভুত ব্যবস্থা- সরকার এদের পক্ষে দায়মুক্তি আইন করে বলেছে, এসব কোম্পানি কিংবা সংশ্লিষ্টদের দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগই করা যাবে না। এমনকি কোনো আদালতে এদের বিরুদ্ধে মামলাও দায়ের করা যাবে না। অর্থাৎ রাষ্ট্রীয় আনুক‚ল্যে সবাই মিলে দুর্নীতি করছে এরা, আর তার দায়ভার বহন করতে হচ্ছে এবং হবে এদেশের সাধারণ জনগণকে। কিন্তু দায়মুক্তি আইন করে মানুষের রক্তচোষা এ সকল দুর্নীতিবাজদের কোনভাবেই রক্ষা করা যাবে না। জনগণের আদালতে একসময় এদের বিচার হবেই হবে।
প্রিয় সাংবাদিকবৃন্দ,
জ্বালানির উচ্চ মূল্যবৃদ্ধি ইতোমধ্যে বাজারে অসহনীয় নেতিবাচক প্রভাব বিস্তার করেছে। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি দরিদ্র ও মধ্যবিত্তকে অস্তিত্বের সংকটে ঠেলে দিয়েছে। বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচীর জরীপ অনুযায়ী ৬৮% মানুষ খাবার কিনতে হিমশিম খাচ্ছে। দরিদ্র ও প্রান্তিক পরিবারের মাসিক আয়ের ৭০% ব্যয় হয় খাদ্যের পেছনে। সরকারি হিসাবেই এখন মূল্যস্ফীতি ৯.৫২%, যা ১১ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। অর্থনীতিনিবিদরা মনে করেন, মূল্যস্ফীতি অনেক আগেই ১৫% ছাড়িয়ে গেছে। জ¦ালানি সংকট, মূল্যস্ফীতি এবং বাজেট সহায়তার কথা বলে সরকার আইএমএফ, বিশ্বব্যাংক ও এডিবি’র কাছে ৬.৫ বিলিয়ন ডলার ঋণ চেয়েছে। কিন্তু এই স্বল্প পরিমাণ ঋণ দেশের ২ মাসের খরচ যোগান দেয়ার জন্য আসলে যথেষ্ট নয়।
বিদ্যুৎ ও জ¦ালানি খাতে আমদানি নির্ভরতা বর্তমান জ¦ালানি সংকটের অন্যতম কারণ। সরকার বাপেক্সকে নিষ্ক্রিয় করে রেখেছে। স্থলভাগে ও সমুদ্রে গ্যাস আবিষ্কার ও উত্তোলনে কোনো উদ্যোগ নেয়নি। অথচ মিয়ানমার তাদের অংশে এরইমধ্যে গ্যাস উত্তোলন করেছে। সরকার জ¦ালানি নিরাপত্তাকে কোনো গুরুত্বই দেয়নি। এ জাতির দুর্ভাগ্য যে ভাগ-বাটোয়ারার সুবিধার জন্য দেশের জ¦ালানি নিরাপত্তাকে হুমকির মুখে ঠেলে দেয়া হয়েছে। অথচ জ¦ালানি নিরাপত্তার বিষয়টি এতই স্পর্শকাতর যে বিশে^র শক্তিধর দেশগুলোও এ জন্য এমনকি যুদ্ধে জড়াতেও দ্বিধা করে না। ওপেক কিংবা ওপেক প্লাস দেশগুলো থেকে তেল ও গ্যাস কেনার জন্য বড় ও স্থায়ী সরবরাহ চুক্তি করেনি সরকার। অথচ কমিশন খাওয়ার জন্য তেল উৎপাদনকারী নয় এমন বড় দেশ যেমন চীন, ভারত, ইন্দোনেশিয়ার মতো দেশের সঙ্গে চুক্তি করা হয়েছে। ওপরদিকে মোট আমদানির ৫০% স্পট মার্কেট থেকে উচ্চ দামে কেনার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।
কাতার ও ওমানের মতো দেশের বড় গ্যাস সরবরাহের চুক্তির অফার উপেক্ষা করে কমিশন খাওয়ার লোভে উচ্চদামে স্পট মার্কেট থেকে গ্যাস কিনছে সরকার। এদিকে হাতে ডলার নেই। এক বছরে আমদানি-রপÍানি ঘাটতি ৩৩ বিলিয়ন ডলার। এদিকে বৈদেশিক রিজার্ভ কমছে। সেপ্টেম্বরের হিসাবে যা ৩৬ বিলিয়ন ডলার। এর মধ্যে ৭ বিলিয়ন ডলারের একটা ফাঁকি আছে যা আইএমএফ উত্থাপন করেছে। কারণ ঊউঋ নাম দিয়ে রিজার্ভ তহবিল থেকে ৭.৫ বিলিয়ন ডলার বড় বড় রফতানিকারকদের বৈদেশিক মুদ্রায় ঋণ দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক যা আর রিজার্ভ ফান্ড আকারে এ তহবিলে ফেরার সম্ভাবনা নেই। মোট কথা রিজার্ভ স্থিতি ভাল নয়। রেমিট্যান্স প্রবাহও সুখকর নয়। সরকার তাই রিজার্ভ এর ডলার রক্ষা করতে তেল আমদানি বন্ধ করে দিয়েছে। এভাবে শেষ রক্ষা হয় কিনা তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে।
গ্যাস ও বিদ্যুতের ঘাটতির কারণে দেশের অনেক শিল্প কারখানা রুগ্ন কিংবা বন্ধ হয়ে গেছে। অনেক কারখানা শ্রমিক ছাঁটাই শুরু করেছে। নজিরবিহীন লোডশেডিং এর কারণে উচ্চমূল্যের ডিজেল জেনারেটর চালিয়ে কারখানা সচল রাখতে গড়ে প্রতিদিন ১০-১৫ লক্ষ টাকা ব্যয় হচ্ছে। ঘন ঘন বিদ্যুৎ আসা-যাওয়ায় মূল্যবান যন্ত্রপাতি নষ্ট হচ্ছে। গ্যাসনির্ভর বড় শিল্প যেমন সিরামিক্স টেক্সটাইলগুলো ধুকছে। জেনারেটর চালিয়ে ¯িপনিং মিলসগুলো সচল রাখা যাচ্ছেনা।
সরকার সব কিছুর জন্যই রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ আর করোনার দোষ দিয়ে পার পেয়ে যেতে চাচ্ছেন। অথচ করোনা কিংবা ইউক্রেন যুদ্ধের অনেক আগ থেকেই সরকারের লাগামহীন দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনায় বিদ্যুৎ ও জ্বালানিসহ দেশের সার্বিক অর্থনীতি খাদের কিনারে চলে এসেছিল।
প্রিয় সাংবাদিক ভাই ও বোনেরা,
গত এক যুগে বিদ্যুৎ খাতে অপরিকল্পিত উন্নয়ন ও যথেচ্ছ লুটপাটের কারণে বাংলাদেশে বিদ্যুৎ সংকট অনেকটাই অনিবার্য ছিল। সরকারের অসৎ নীতির কারণেই আজ বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো এখন সাদা হাতিতে পরিণত হয়েছে। বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্র দেশে আগেও ছিল। কিন্তু গত এক যুগে বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্র যেন অর্থ লুটপাটের মাধ্যমে বিলিয়নিয়ার বানানোর শিল্পে পরিণত হয়েছে। বিদ্যুৎ উৎপাদন না করেই হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো। একদিকে চাহিদার চেয়ে প্রায় দ্বিগুণ বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা তৈরি হয়েছে, অন্যদিকে বিদ্যুৎ আমদানিও করা হচ্ছে। তাই শেয়ারবাজার পতনের মত বিদ্যুতখাতের সংকট অনিবার্য ছিল, কেবল প্রহর গুনছিল কখন বিস্ফোরণ হবে। এখন সেই বিস্ফোরণ শুরু হল।
প্রিয় সাংবাদিকবৃন্দ,
বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপি গত এক দশকধরে লাগাতারভাবে এই সংকট সৃষ্টির কারণ ও পরিত্রাণের উপায় নিয়ে বিভিন্ন সময়ে সভা-সেমিনার-সমাবেশ-বক্তব্য-বিবৃতির মাধ্যমে অবৈধ গণবিরোধী সরকারের লুটেরা নীতির প্রতিবাদ জানিয়ে আসছে। এদেশের মানুষের পক্ষে জ্বালানিসহ নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যের মূল্যবৃদ্ধির প্রতিবাদে বর্তমানে চলমান আন্দোলনে ইতোমধ্যেই দলের ০৫ নেতা আব্দুর রহিম, নুরে আলম, শাওন প্রধান,শহিদুল ইসলাম শাওন ও আলিম স্বৈরাচারী সরকারের গুলিতে শহীদ হয়েছেন। আহত হয়েছে বিএনপির শত শত নেতাকর্মীও সমর্থক। গ্রেফতার হয়েছে হাজার হাজার। মানুষের অধিকার আদায়ের আন্দোলনে বিএনপির শীর্ষ নেতা থেকে তৃণম‚ল নেতাকর্মী সমর্থক সকলেই ঐক্যবদ্ধ। রাজপথের আন্দোলন আজ জনসমুদ্রে পরিণত হচ্ছে।
জনগণের অধিকার আদায়ের এই আন্দোলনকে আরো বেগবান করতে সকল শ্রেণি পেশার মানুষকে এগিয়ে আসতে হবে। কারণ, এই দেশ কোনো একজন ব্যক্তি কিংবা দলের নয়। ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় যেমনি এদেশের মানুষ সকলে ঐক্যবদ্ধভাবে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল, একইভাবে আজ সকলে মিলে তীব্র গণআন্দোলনের মাধ্যমে বর্তমান ফ্যাসিবাদ সরকারকে হঠিয়ে একটি নিরপেক্ষ তত্ত¡াবধায়ক সরকার প্রতিষ্ঠা করে সুষ্ঠু ও শান্তিপ‚র্ণ নির্বাচনের আয়োজন করে সত্যিকার অর্থে জনগণের সরকার প্রতিষ্ঠা করতে হবে। আসুন সকলে ঐক্যবদ্ধ সেই গণআন্দোলনে শরীক হই।
সবাইকে ধন্যবাদ।

 
 
জনতার আওয়াজ/আ আ
 
 

জনপ্রিয় সংবাদ

 

সর্বোচ্চ পঠিত সংবাদ