ভোগান্তির আরেক নাম ফুয়েল পাস - জনতার আওয়াজ
  • আজ দুপুর ১:৫৪, বৃহস্পতিবার, ১৪ই মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ৩১শে বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ, ২৭শে জিলকদ, ১৪৪৭ হিজরি
  • jonotarawaz24@gmail.com
  • ঢাকা, বাংলাদেশ

ভোগান্তির আরেক নাম ফুয়েল পাস

নিজস্ব প্রতিবেদক, জনতার আওয়াজ ডটকম
প্রকাশের তারিখ: মঙ্গলবার, এপ্রিল ১৪, ২০২৬ ১:২৭ অপরাহ্ণ পরিবর্তনের তারিখ: মঙ্গলবার, এপ্রিল ১৪, ২০২৬ ১:২৭ অপরাহ্ণ

 

জনতার আওয়াজ ডেস্ক
ছবি সংগৃহীত
‘চৈত্র মাসের ঝাঁঝালো রোদ। রাস্তার ধুলাবালির মধ্যেই লাইনে দাঁড়াই। কিন্তু ভোগান্তি কাকে বলে, ফুয়েল পাস তার বাস্তব প্রমাণ। কারণ কিউআর কোড কাজ করছে না। স্ক্যান করলে অবৈধ উল্লেখ করছে। এটি বাজে সিস্টেম।’

সোমবার (১৩ এপ্রিল) রাজধানীর আসাদগেটে সোনার বাংলা ফিলিং স্টেশনে তেল নেওয়ার সময় এভাবেই সরকারি কলেজের সহকারী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল ইসলাম কিউআর কোডভিত্তিক মোবাইল অ্যাপ ‘ফুয়েল পাস’ ব্যবহারের ভোগান্তির কথা জানান।

শুধু ড. তৌহিদুল ইসলামই নন, অন্য চালকরাও জানান ফুয়েল পাস নিয়ে চরম ভোগান্তির কথা। তারা বলেন, ট্যাগ অফিসার নিয়োগ ও ফুয়েল পাসের নামে সাধারণ মানুষের সঙ্গে এই দুঃসময়ে তামাশা করা হচ্ছে। কারণ শুধু ঢাকাতেই এই দৃশ্য নয়, দেশের অন্য স্থানেও তেল পেতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে চালকদের। বরং আগের তুলনায় ভোগান্তি আরও বেড়েছে। কলা, রুটি খেয়েই পার করতে হয় দীর্ঘ সময়।
রাজধানীতে তেল বিতরণ ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে সরকার এই ডিজিটাল পদক্ষেপ নিয়েছে। গত ১২ এপ্রিল থেকে ঢাকার সাতটি ফিলিং স্টেশনে মোটরসাইকেলচালকদের জন্য মোবাইল অ্যাপ ‘ফুয়েল পাস’ ব্যবহার করে তেল নেওয়া বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।

লালমাটিয়া এলাকার মো. নয়ন খবরের কাগজকে বলেন, ‘গত রবিবার রাত ৯টায় তালুকদার ফিলিং স্টেশনে তেল পেতে জিয়া উদ্যান ছাড়িয়ে লাইন দাঁড়াই। রাত ১২টার দিকে পাম্পের কাছে পৌঁছালে মাইকিং করে জানানো হয়, তেল শেষ, পাম্প বন্ধ। কিন্তু তেল তো লাগবে। তাই খালি হাতে ফিরে যাইনি বাসায়। অপেক্ষা করে রাত কাটাই। সকাল ৯টায় জানতে পারি, তেল আনতে সকালে ডিপোতে গাড়ি পাঠানো হয়েছে। কিন্তু বিকেল ৪টাতেও পাম্পে ফেরত আসেনি গাড়ি। অপারেটররা জানান, সন্ধ্যার পরে গাড়ি আসবে। সেই আশায় অপেক্ষা করছি। এই দীর্ঘ সময়ে না খেয়েই বলা যায় লাইনে আছি। এ সময়ে কলা, রুটি খেয়েছি, তাতে পেট ভরেনি। তারপরও এই সামান্য খেয়েই সময় পার করতে হয়েছে। বলা যায়, তেল পেতে প্রায় ২৪ ঘণ্টা কেটে যায় পাম্পে।’

এই গাড়ির চালকসহ অন্য চালকরাও অভিযোগ করে বলেন, ‘সরকার ট্যাগ অফিসার নিয়োগ করেছে, কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হচ্ছে না। তারা এটি-সেটি দেখবেন শুনেছি। কিন্তু আমাদের যে ভোগান্তি হচ্ছে, সেটি তাদের চোখে পড়ে না। সরকার দেখে না। দরকার হলে দাম বাড়ানো হোক। কিন্তু তেল দেওয়ার নিশ্চয়তা দিতে হবে। ট্যাগ অফিসার নিয়োগের নামে তারা তামাশা করছে। এটি চলবে না।’

একই ভোগান্তির কথা জানান চাঁদ উদ্যান হাউজিংয়ের বাইকচালক শরিফ উদ্দিন। তিনি খবরের কাগজকে বলেন, ‘বেলা ১১টায় লাইনে দাঁড়িয়েছি। এখন ৪টা ৪০ মিনিট। পাম্পের সামনে এসেছি। কিন্তু কখন তেল পাব জানি না। পাম্প থেকে জানিয়েছে ৬টার পর তেলের গাড়ি আসবে। সেই অপেক্ষায় আছি।’

এই পাম্পের বিপরীতে সোনার বাংলা ফিলিং স্টেশনে দেখা গেছে বাইকচালকদের দীর্ঘ লাইন, যা টাউন হল ছাড়িয়ে যায়। গুনে দেখা যায়, সেখান থেকে শুরু করে পাম্প পর্যন্ত ২১৫টি মোটরসাইকেল। ২ লাইনে ৪৩০টি মোটরসাইকেলের চালক তেল পাওয়ার জন্য অপেক্ষা করছিলেন। ফুয়েল পাসের লাইনে তেল দেওয়া হচ্ছে ১ হাজার টাকার, সাধারণ লাইনের চালকদের ৫০০ টাকার, ব্যক্তিগত গাড়িতে ২ হাজার ও মাইক্রোবাসে ৩ হাজার টাকার। এ নিয়ে সাধারণ চালকদের মধ্যে চরম ক্ষোভ দেখা গেছে। তারা বলেন, ‘আমরা সবাই লাইনে দাঁড়াই। অনেকে কিউআর কোডে স্ক্যান করে সাকসেস না হলেও হাজার টাকার তেল পাচ্ছেন। আমরা তা পাচ্ছি না।’

এ ব্যাপারে মোহাম্মদপুরের বছিলার বাসিন্দা মো. সবুজ খবরের কাগজকে বলেন, ‘ভোগান্তির আরেক নাম ফুয়েল পাস অ্যাপ। এখানে ঢোকা যায় না। সকাল ৯ থেকে ৪টা পর্যন্ত বারবার চেষ্টা করেও ঢুকতে পারিনি। বাধ্য হয়ে সাধারণ লাইনে দাঁড়িয়ে মাত্র ৫০০ টাকার তেল পেলাম। তবে যারা এই অ্যাপে ঢুকতে পারছেন। তারা লাইনের ভোগান্তির পরও ১ হাজার টাকার তেল পেয়ে শুকরিয়া আদায় করছেন।’ বাইকচালক মো. রফিক বলেন, ‘আগে রেজিস্ট্রেশন করে বেলা ১১টায় লাইনে দাঁড়াই। তেল পেলাম ৪টায়। আগে ৫০০ টাকার পেলেও এই লাইনে দাঁড়িয়ে হাজার টাকার তেল পেলাম। ১০ দিন চলা যাবে। আমরা রাইড শেয়ার করি। এখন আমাদের দিনের বেশি ভাগ সময় তেল পেতেই চলে যাচ্ছে।’

চালকদের ভোগান্তির ব্যাপারে জানতে চাইলে ফুয়েল পাস অ্যাপের সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা খবরের কাগজকে বলেন, ‘স্ক্যান করে অনেক চালকই সাকসেস হচ্ছেন। কিন্তু সবার চাহিদা তেল। একই সময়ে ২০ লাখের বেশি ট্রাই করেন। এ জন্য কিউআর কোড কাজ করছে না। ঈদের সময় ট্রেনের টিকিট পাওয়ার মতো। ফলে তেল পাওয়া কঠিন হচ্ছে। রাজধানীতে গত রবিবার থেকে সোনার বাংলা ও ট্রাস্ট ফিলিং স্টেশনে পরীক্ষামূলকভাবে এই অ্যাপ চালু হয়েছে। এটা একটা ডিজিটাল সিস্টেম, চালু করেছে জ্বালানি মন্ত্রণালয়।’ এ সময় সোনার বাংলা ফিলিং স্টেশনের সহকারী ম্যানেজার মাসুম বিল্লাহ খবরের কাগজকে বলেন, ‘আমরা যমুনা কোম্পানি থেকে সর্বোচ্চ জ্বালানি পাচ্ছি। কিন্তু চাপও বেশি। ফুয়েল পাস অ্যাপ মন্ত্রণালয় থেকে চালু করেছে। কেউ সাকসেস হলেই আমরা তেল দিচ্ছি হাজার টাকার। সাধারণ চালকদের ৫০০ টাকার তেল দেওয়া হচ্ছে, যাতে অধিকাংশ চালক তা পান।’

অথচ বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু সম্প্রতি জাতীয় সংসদে বলেছেন, ‘দেশে পর্যাপ্ত জ্বালানি তেল মজুত রয়েছে। জ্বালানি তেলের কোনো সংকট নেই।’ ট্রাস্ট ফিলিং স্টেশনেও দেখা গেছে ফুয়েল অ্যাপসে ভোগান্তির একই চিত্র। মোটরবাইকচালক জামাল খবরের কাগজকে বলেন, ‘বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে দেখি অধিকাংশ পাম্প বন্ধ। তাই এখানে আসি। কিন্তু অ্যাপস কাজ না করায় পেলাম মাত্র ৫০০ টাকার। কয়দিন না যেতেই আবার ভোগান্তির লাইনে দাঁড়াতে হবে।’

রাজধানীর মহাখালী, তেজগাঁও, নীলক্ষেত, কল্যাণপুর ফিলিং স্টেশনেও দেখা যায় একই দৃশ্য। তেল না থাকায় অধিকাংশ সময় বন্ধ থাকছে পাম্পগুলো। গত ২৮ ফেব্রয়ারি মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরু হলে এই সংকট শুরু হয়। মাঝখানে দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতির ঘোষণা দেওয়া হয়। কিন্তু দুই দিন না যেতেই সেই যুদ্ধবিরতি ভেস্তে যায়। ফলে পরিস্থিতির কোনো পরিবর্তন হয়নি। বরং ফিলিং স্টেশনগুলোতে যানবাহনের লাইন দীর্ঘ হচ্ছে।

 
 
জনতার আওয়াজ/আ আ
 
 

জনপ্রিয় সংবাদ

 

সর্বোচ্চ পঠিত সংবাদ