মঙ্গলবার পরীক্ষামূলকভাবে পদ্মার বুকে চলল ট্রেন - জনতার আওয়াজ
  • আজ রাত ১১:২৭, বৃহস্পতিবার, ১৪ই মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ৩১শে বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ, ২৭শে জিলকদ, ১৪৪৭ হিজরি
  • jonotarawaz24@gmail.com
  • ঢাকা, বাংলাদেশ

মঙ্গলবার পরীক্ষামূলকভাবে পদ্মার বুকে চলল ট্রেন

নিজস্ব প্রতিবেদক, জনতার আওয়াজ ডটকম
প্রকাশের তারিখ: বুধবার, এপ্রিল ৫, ২০২৩ ৯:১৯ পূর্বাহ্ণ পরিবর্তনের তারিখ: বুধবার, এপ্রিল ৫, ২০২৩ ৯:১৯ পূর্বাহ্ণ

 

ভাঙ্গা (ফরিদপুর) থেকে ফিরে : পদ্মা সেতু পার হয়ে প্রায় আধাঘণ্টার পথ ফরিদপুরের ভাঙ্গা মোড়। মূল সড়ক থেকে নেমে ইউটার্ন করে সামনে এগিয়ে গেলেই নতুন কাঁচা রাস্তা। প্রায় এক কিলোমিটার পথ পাড়ি দিলেই বেলুন আর রঙিন কাপড়ে সাজানো নবনির্মিত ভাঙ্গা রেলস্টেশন। সামনে ও পেছনে সবুজ ধানের বিস্তর মাঠ। চারপাশজুড়ে সুনসান নীরবতা।

দিনের পর দিন মাটি ভরাট করে এই স্টেশন নির্মাণকাজের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন পাশের জাক্তি গ্রামের বাসিন্দা বাবর হোসেন। পাথর সরবরাহও করেন তিনি। গতকাল মঙ্গলবার তার চোখেমুখে আনন্দ যেন আর ধরছিলই না। বললেন, আমি স্টেশন নির্মাণের সঙ্গে যুক্ত থাকলেও কোনোদিন ভাবিনি সত্যিই এ পথে ট্রেন চলবে। বিশাল গর্ত ভরাট করে অবকাঠামো হবে। আজ সবকিছু বাস্তব মনে হচ্ছে। এ অঞ্চলের মানুষের জন্য আশীর্বাদ বয়ে এসেছে পদ্মা সেতু আর রেলপথ।

গতকাল মঙ্গলবার ভাঙ্গা-মাওয়া পর্যন্ত পরীক্ষামূলক ট্রেন চলাচল কার্যক্রম উদ্বোধনের আগে মাওয়া স্টেশনে দাঁড়িয়ে থাকা ট্রেনে এভাবেই নিজের অভিব্যক্তি প্রকাশ করছিলেন স্থানীয় এই বাসিন্দা। ১৬৯ কিলোমিটার দীর্ঘ পদ্মা সেতু রেল সংযোগ প্রকল্পের ভাঙ্গা-মাওয়া পর্যন্ত ৪২ কিলোমিটার অংশে পরীক্ষামূলক ট্রেন চলাচল কার্যক্রমের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন রেলমন্ত্রী নুরুল ইসলাম সুজন। স্থানীয় জনপ্রতিনিধি থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষের মধ্যে ছিল বাঁধভাঙা উচ্ছ্বাস। সবার কথা একটাই, সেতু আর রেলপথ বদলে দেবে গোটা দক্ষিণের জনপদ। হবে অর্থনৈতিক উন্নয়ন, সঙ্গে বাড়বে কর্মসংস্থান।

উৎসাহ নিয়ে প্রথম ট্রেন যাত্রায় শামিল হন ভাঙ্গার কলেজপাড়ের শাড়শাকান্দি গ্রামের ব্যবসায়ী নাঈম ভূঁইয়া। তিনি বলেন, এত আনন্দ আর কখনো পাইনি। আজ আমাদের মহাআনন্দের দিন। এরপর তিনি মোবাইলে ভিডিও কলে একে একে পরিবারের সদস্যদের ট্রেন যাত্রা দেখান।

ভাঙ্গার তুজারপুর ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান পরিমল চন্দ্র দাস বলেন, পরীক্ষামূলক ট্রেন যাত্রা উপলক্ষে আজ এই অঞ্চলের প্রতিটি ঘরে ঘরে উৎসবের আমেজ। কেউ কোনোদিন ভাবেনি আমরা সেতু পাব, ট্রেন পাব। সত্যিই সবকিছু অবিশ্বাস্য, স্বপ্নের মতো মনে হয়। গোয়ালদী এলাকার বাসিন্দা জাহাঙ্গীরের মুখে একই কথা আজ স্বপ্নের বাস্তবায়ন হয়েছে। আমরা আর কিছু চাই না।

শুধু যে স্থানীয় বাসিন্দাদের চোখেমুখে বাঁধভাঙা উচ্ছ্বাস তা নয়। প্রথমবারে ট্রেন চালাতে পেরে খুশি চালক রবিউল ইসলামও। ঈশ্বরদী এলাকায় ট্রেন চালানোর দায়িত্বে ছিলেন তিনি। কালবেলাকে বললেন, পদ্মা সেতু রেল সংযোগ প্রকল্পের পরীক্ষামূলক ট্রেন যাত্রায় প্রথম চালক হিসেবে আমি আনন্দিত, গর্বিত। আজকের দিনটি আমার জীবনে স্মরণীয় হয়ে থাকবে। লোকমাস্টার হিসেবে চাকরি জীবনে এমন সুযোগ আর আসেনি। আজ ট্রেন চালাব বলে গত রাতে ঘুম হয়নি। ভোরে ঘুম থেকে উঠে স্টেশনে চলে আসি। এই মাহেন্দ্রক্ষণ আমার জীবনের বড় প্রাপ্তি।

ফিতা কেটে উদ্বোধনের আনুষ্ঠানিকতা শেষে দুপুর ১টা ২১ মিনিটে ৬৬২১ ইঞ্জিনের নম্বরের সাত বগির লাল-সবুজের ট্রেন ভাঙ্গা থেকে মাওয়ার উদ্দেশে যাত্রা শুরু করে। সঙ্গে সঙ্গে বাজতে থাকে ‘ছিল বিশ্বাস পারবোই পারবো, আমরাও পারি…/ যদি রাত পোহালেই শোনা যেত…’ সহ দেশাত্মবোধাক গান। প্রতি বগিতে রয়েছে ৮০ আসন। আছে সিসি ক্যামেরাও। প্রতি সারিতে রয়েছে তিন ও দুই করে পাঁচ আসন। মূল ট্রেনের আগে ছেড়ে আসে একটি ট্র্যাকার। ট্রেন যাত্রায় স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের নিয়ে সাংবাদিকদের কামড়ায় ছিলেন রেলমন্ত্রী। এর আগে সকালে রেলওয়ের কর্মকর্তাদের নিয়ে তিনি কমলাপুর থেকে রেল ট্রলিতে করে ভাঙ্গায় পৌঁছান।

এদিন দুপুর ১টা ২২ মিনিটে ট্রেনটি মালিগ্রাম স্টেশন অতিক্রম করে। এই স্টেশনে ২২টি ভবনের নির্মাণকাজ চলমান। দুপুর ২টা ৩৬ মিনিটে পদ্মা স্টেশন অতিক্রম করার সময় নির্মাণকর্মীরা প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে পতাকা নাড়িয়ে স্বাগত জানান। পৌনে ৩টার সময় ট্রেনটি পদ্মা সেতুতে উঠার সময় দুপাশ থেকে হাজারো নেতাকর্মী জয় বাংলা স্লোগান দিতে থাকেন। বেলুন ও আতশবাজি ফুটিয়ে উল্লাস প্রকাশ করেন সবাই। জানালা দিয়ে মোবাইলে ভিডিও করেন অনেকেই। পাশাপাশি সেলফি তুলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্টও দেন।

ঘণ্টায় ২০ কিলোমিটার গতিতে চলে মাত্র ২০ মিনিটে মূল সেতু পাড়ি দেয় ট্রেনটি। ৩টা ৫ মিনিটে সেতু অতিক্রম করে সোয়া ৩টায় মাওয়া রেলস্টেশনে পৌঁছে। সব মিলিয়ে এক ঘণ্টা ৫৪ মিনিটে ভাঙ্গা থেকে মাওয়া প্রান্তে আসে পরীক্ষামূলক প্রথম ট্রেন। তখন স্টেশনের প্ল্যাটফর্মজুড়ে হাজারো মানুষের ভিড়। অসম্পূর্ণ কাজের মধ্যেও রেলুন আর রঙিন পতাকায় সাজানো চারপাশ। রেলওয়ে কর্মকর্তা, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি থেকে শুরু করে উৎসুক জনতা, প্রকল্প সংশ্লিষ্ট লোকজন কড়তালি আর স্লোগানে ট্রেনযাত্রীদের স্বাগত জানায়। বেলুন ফুটিয়ে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেন। আসার পথে রাস্তার দুপাশের বাড়ি ও বাস্তা থেকে সাধারণ হাসিমুখে মানুষ হাত নাড়িয়ে শুভেচ্ছা জানান।

এরপর প্ল্যাটফর্মে আয়োজিত ব্রিফিংয়ে রেলমন্ত্রী নুরুল ইসলাম সুজন বলেন, ভাঙ্গা-মাওয়া পর্যন্ত পরীক্ষামূলক ট্রেন চলাচল কার্যক্রম বাংলাদেশের জন্য ঐতিহাসিক দিন। বহুল কাঙ্ক্ষিত পদ্মা সেতু পাড়ি দিয়ে ভাঙ্গা থেকে আমরা মাওয়া প্রান্তে পৌঁছেছি। পরীক্ষামূলক ট্রেন অতিক্রম করার মধ্য দিয়ে এ সেতুটি পূর্ণাঙ্গতা পেল। আগামী সেপ্টেম্বরের মধ্যে ঢাকা থেকে ভাঙ্গা পর্যন্ত রেলপথ চলাচলের জন্য উপযোগী হবে। প্রধানমন্ত্রী একটি সুবিধামতো সময়ে সেপ্টেম্বর মাসে এর উদ্বোধন করবেন।

রেলমন্ত্রী বলেন, ঢাকা-যশোর পর্যন্ত পুরো রেলপথ আগামী বছরের জুনের মধ্যে সমাপ্ত হবে। প্রকল্পের ব্যয় না বাড়ার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, প্রকল্প শেষ করার সময় ব্যয় বাড়বে কি না তা দেখা যাবে। অন্য রুটের মতোই এই রুটে ট্রেন ভাড়াও নির্ধারণ করা হবে। চলবে সব ধরনের ট্রেন। তা ছাড়া বরিশাল পর্যন্ত ট্রেন লাইন সম্প্রসারণের স্বপ্ন বাস্তবায়ন হবে বলেও জানান তিনি।

এ সময় উপস্থিত ছিলেন চিপ হুইপ নূরে আলম লিটন চৌধুরী, পানিসম্পদ উপমন্ত্রী এনামুল হক শামীম, সংসদ সদস্য আব্দুস সোবহান গোলাপ, ইকবাল হোসেন অপু, নাহিম রাজ্জাক, নিক্সন চৌধুরী, মজিবুর রহমান, সাগুফতা ইয়াসমীন এমিলি, রেল সচিব হুমায়ূন কবীর, রেলওয়ের মহাপরিচালক কামরুল আহসান প্রমুখ।

সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, পদ্মা সেতু রেল সংযোগ প্রকল্পের সার্বিক অগ্রগতি ৭৪ শতাংশ। মাওয়া-ভাঙ্গা অংশের অগ্রগতি ৯১ ভাগ। ঢাকা-মাওয়া সাড়ে ৭২ ভাগ ও ভাঙ্গা-যশোর অংশের অগ্রগতি ৬৮ ভাগ। এ প্রকল্পের জন্য যাত্রীবাহী ১০০ কোচের মধ্যে ৪৫টি সংগ্রহ হয়েছে। ৩৯ হাজার ২৪৬ কোটি টাকা ব্যয়ে ২০১৬ সালের এক জানুয়ারি প্রকল্পটি শুরু হয়। শেষ হওয়ার সময় আগামী বছরের ৩০ জুন নির্ধারণ করা হয়েছে। সরকারের ১০টি অগ্রাধিকার উন্নয়ন প্রকল্পের একটি এটি।

ভাঙ্গা-মাওয়া রেল লিঙ্ক প্রকল্পের ব্যবস্থাপক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সাইদ আহমেদ (এনডিসি, পিএসসি) বলেন, প্রকল্পটির সঙ্গে জড়িত সবাই উচ্ছ্বসিত। ট্রেনটি পরীক্ষামূলক পদ্মা সেতুর রেললাইনে চলাচল শুরু হয়েছে। আশা করি চলতি বছরের সেপ্টেম্বরের মধ্যে যাত্রী সাধারণের জন্য ট্রেন উন্মুক্ত করতে পারব।

প্রকল্পের নিরাপত্তা প্রকৌশলী মো. রাসেল বলেন, আমরা চার বছর এখানে শ্রম দিয়েছি। চার বছরের পরিশ্রম আমাদের সামনে দৃশ্যমান। মন দিয়ে কাজ করেছি। কর্তৃপক্ষকে যে কমিটমেন্ট করেছিলাম তা আমরা রাখতে পেরেছি। জাতীয় এ প্রকল্পের সঙ্গে আমি নিজে জড়িত বলে আনন্দে উচ্ছ্বসিত আমিসহ প্রকল্পের সবার।

পদ্মা ব্রিজ রেল লিঙ্ক প্রকল্পের কর্মচারী সার্জেন্ট জহিরুল ইসলাম বলেন, আমি ২০১৯ সালের মে মাসে জয়েন করে পিবিডি, জমি গ্রহণসহ রেল লিঙ্কের কাজ শুরু করেছি। এখন পর্যন্ত বিভিন্ন কাজ করে যাচ্ছি। আজ ৪২ কিলোমিটার রেলপথ দিয়ে পরীক্ষামূলক রেল চলাচল করেছে। নিজের হাতে গড়া রেলপথ দিয়ে হাজারো মানুষ স্বপ্ন নিয়ে ট্রেনে চলবে, বিষয়টি ভাবতেই আনন্দ লাগছে।

মুন্সীগঞ্জ প্রতিনিধি মো. কায়সার হামিদ জানান, পদ্মা সেতুর ওপর দিয়ে ঢাকা থেকে যশোর পর্যন্ত ১৬৯ কিলোমিটার ব্রডগেজ লাইন নির্মাণ হলে জাতীয় ও আন্তঃদেশীয় রেল যোগাযোগ উন্নয়ন করা মূল উদ্দেশ্য। এ প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে মুন্সীগঞ্জ, শরীয়তপুর, মাদারীপুর, নড়াইল জেলা অতিক্রম করে যশোরের সঙ্গে যুক্ত হবে। পাশাপাশি ভাঙ্গা-পাচুরিয়া রাজবাড়ি, সেকশনটি পদ্মা সেতু হয়ে ঢাকার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত হবে। প্রকল্পে থাকছে মোট ২০টি স্টেশন।

 
 
জনতার আওয়াজ/আ আ
 
 

জনপ্রিয় সংবাদ

 

সর্বোচ্চ পঠিত সংবাদ