মহান মে দিবস আন্তর্জাতিক শ্রম দিবসের প্রেক্ষাপটে
“বাংলাদেশের শ্রমিক আন্দোলন”
নিজস্ব প্রতিবেদক, জনতার আওয়াজ ডটকম
প্রকাশের তারিখ:
সোমবার, মে ১, ২০২৩ ৫:২৪ অপরাহ্ণ পরিবর্তনের তারিখ:
সোমবার, মে ১, ২০২৩ ৫:২৪ অপরাহ্ণ

শামছুর রহমান শিমুল বিশ্বাস
এক.
১লা’মে আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস। এই দিন সারা দুনিয়ায় শ্রমিকদের অধিকার নিয়ে কথা বলার দিন। শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি, কর্ম নিরাপত্তা, কাজের পরিবেশ এবং মানসম্মত জীবন যাপনের নিশ্চয়তা আদায়ের সংগ্রামের প্রতীকী দিন।
ইউরোপ থেকে এশিয়া,আফ্রিকা থেকে আমেরিকা; পৃথিবীর প্রতিটি প্রান্তে ১লা’ মে শ্রমিকদের অধিকারের প্রশ্নে আওয়াজ উঠে। শ্রমিকরা উৎপাদন ও উন্নয়নের সবচেয়ে শক্তিশালী হাতিয়ার। আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবসের ঐতিহাসিক লড়াইটা আমেরিকায় সংগঠিত হলেও তা আজ বিশ্বের প্রতিটি নিপীড়িত নির্যাতিত শ্রমজীবী মানুষকে অনুপ্রানিত করে। এই দিবসটি বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন নামে পালন করা হয়। যেমন, যুক্তরাষ্ট্রে এটিকে “আমেরিকান লেবর ডে” নামে পালন করা হয়।
১৮৮৬ সালে আমেরিকার শিকাগো শহরের হে মার্কেটে লাখ-লাখ শ্রমিক সমবেত কণ্ঠে দাবি তুলেছিলো সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত নয়, ৮ ঘণ্টা কর্মদিবস চাই। পুলিশের গুলিতে রক্তাক্ত হয় শ্রমিকের অধিকারের আন্দোলন।মে মাসের ৩ এবং ৪ তারিখে সেই আন্দোলনকে নিষ্ঠুরভাবে দমন করাই শুধু নয় আন্দোলনের নেতা অগাস্ট,এঞ্জেলস,স্পাইস, ফিসারকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে হত্যা করা হয়।
শিকাগো শহরের সেই রক্তাক্ত আন্দোলন শ্রমিকের বেদনা ও বিক্ষোভের রূপে ছড়িয়ে পড়েছিলো সারা পৃথিবীতে। যা আজ আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবসের বিশ্বজনীন পরিচিত পেয়েছে। আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস সারা দুনিয়ার শ্রমিক মেহনতী মানুষকে এক ঐক্যের বন্ধনে আবদ্ধ করেছে। ১৮৮৬ সালের ১লা’মে রক্তাত্ব শ্রমিক আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে ১৯১৯ সালে আইএলও( আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্হা)
প্রতিষ্ঠিত হয়। আইএলও কনভেনশনে অনুস্বাক্ষরকারী দেশ হওয়া সত্বেও বাংলাদেশে শ্রমিকের অধিকার আজ পদে পদে লঙ্ঘিত হচ্ছে।
দুই.
এই বছর আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবসের প্রতিপাদ্য “নিরাপদ এবং স্বাস্থ্যকর কাজের পরিবেশসহ কর্মক্ষেত্রের মৌলিক নীতি এবং অধিকার”।
কিন্তু আমরা জানি বাস্তবে বাংলাদেশের শ্রমিকদের কাজের পরিবেশের কি দূরাবস্হা। রানা প্লাজা, তাজরীন গার্মেন্টস এ নিহত শ্রমিকরা আজও পর্যন্ত পূর্ণ ক্ষতিপূরণ পায়নি। দেশের বেশীরভাগ গার্মেন্টস এবং অনান্য শিল্প কলকারখানা গুলোতে শ্রমিকের কাজের পরিবেশ নিরাপদ নয়।
বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস পালনের উদ্দেশ্য তখনই সফল হবে যখন আমরা আমাদের নিজ দেশের শ্রমিক রাজনীতি এবং শ্রমিকদের ন্যায্য অধিকার নিয়ে নিরাপদে কথা ও কাজ করতে পারবো।
ষাট,সত্তর এবং আশির দশকেও বাংলাদেশে শ্রমিক রাজনীতি জাতীয় রাজনীতিকে প্রভাবিত ও অনেকাংশে নিয়ন্ত্রণ করেছে। কিন্তু আজ শ্রমিক রাজনীতি ক্ষমতাশীনদের কর্তৃত্ববাদী হস্তক্ষেপ ও আচরণের জন্য তার নিজস্বতা হারাতে বসেছে। শ্রমিকদের আবেগকে পুঁজি করে ক্ষমতার চেয়ারে বসে শ্রমিক আন্দোলনের সাথে আজ বিশ্বাসঘাতকা করা হচ্ছে।
বাংলাদেশে ২২লাখ সরকারি কর্মকর্তা কর্মচারীর আট ঘণ্টা কর্ম দিবস নিশ্চিত করা গেলেও ৬ কোটি ৩৫ লাখ বেসরকারি শ্রমিকের কাজের কোনো সুনির্দিষ্ট কর্মঘন্টা নেই। প্রায় পঞ্চাশ লাখ পোশাক শ্রমিক মানবেতর জীবন যাপন করছে। কৃষি শ্রমিক, গৃহ শ্রমিক, পরিবহন শ্রমিকেরাও অধিকার বঞ্চিত। এছাড়াও প্রায় ১ কোটি পচিশ লাখ প্রবাসী শ্রমিক নানা সংকটে ভুগছে।প্রতিদিনই আসছে প্রবাসী শ্রমিকের কফিন বন্দী লাশ!
তাজরীন ও রানাপ্লাজায় ভয়াবহ দুর্ঘটনা হওয়ার পরে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় কারখানা গুলোতে শ্রমিক ইউনিয়ন গঠনের জন্য চাপ প্রয়োগ করলেও কাজের কাজ কিছুই হয়নি।
তিন.
কৃষক, শ্রমিক এবং ছাত্র আন্দোলন দেশের ইতিহাসের গতিপথ পালটে দিতে পারে। কিন্তু বাংলাদেশে কৃষক আন্দোলন বলতে এখন আর কিছু নেই। সরকারি পরিকল্পনায় ছাত্র সংসদ গুলো বন্ধ করে রাখা হয়েছে। ট্রেড ইউনিয়ন সংগঠন ও রাজনীতি অকার্যকর করে রাখা হয়েছে। এই পরিস্থিতির পরিবর্তন দরকার। আমরা শ্রমিক রাজনীতির গুণগত পরিবর্তন চাই। আমরা গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ চাই। যেখানে শ্রমিকের অধিকার নিশ্চিত হবে।
এক সময় আদমজি, তেজগাঁও, টঙ্গী, ঘোড়াশাল, চট্টগ্রাম, খুলনা ও যশোহরের নোয়াপাডা শ্রমিক আন্দোলনের চারণভূমিতে পরিনত হয়েছিল। আজ এই পরিবেশ শেষ করে দেয়া হচ্ছে।শ্রমিক আন্দোলন থেমে গেলে নিরব হয়ে গেলে কারা লাভবান হয় সেটা সবাই জানে। লুটেরা পুঁজির মালিকরাই আজ এমপি মন্ত্রী, ব্যাঙ্ক, বীমা ও বিভিন্ন কোম্পানীর মালিক।কর্তৃত্ববাদী শাসকগোষ্ঠী কেন শ্রমিক আন্দোলনের আতংকে ভুগে? তারা জানে গাড়ির চাকা বন্ধ হলে দেশ অচল। সে কারনে ক্ষমতাসীন সরকার “অত্যবশকীয় পরিসেবা বিল” নামে শ্রমিক অন্দোলনের হাতেপায়ে বেরি দেওয়ার জন্য জাতীয় সংসদে এক কালো আইনের বিল পেশ করেছে। উনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানে,একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধে এবং নব্বইয়ের স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনে বাংলাদেশের শ্রমিক আন্দোলন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। স্বৈরচারের কবল থেকে বাংলাদেশে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার ও গনমানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে শ্রমিক ও ছাত্র আন্দোলনের আজও কোনো বিকল্প নেই।
শামছুর রহমান শিমুল বিশ্বাস।
দুনিয়ার মজদুর একহও।
বাংলাদেশ জিন্দাবাদ।
জনতার আওয়াজ/আ আ