মাগুরার শিশুটি এবং আমাদের সামাজিক মনোজগৎ - জনতার আওয়াজ
  • আজ রাত ১২:৫২, শুক্রবার, ১৫ই মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ১লা জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ, ২৮শে জিলকদ, ১৪৪৭ হিজরি
  • jonotarawaz24@gmail.com
  • ঢাকা, বাংলাদেশ

মাগুরার শিশুটি এবং আমাদের সামাজিক মনোজগৎ

নিজস্ব প্রতিবেদক, জনতার আওয়াজ ডটকম
প্রকাশের তারিখ: রবিবার, মার্চ ১৬, ২০২৫ ৬:০১ অপরাহ্ণ পরিবর্তনের তারিখ: রবিবার, মার্চ ১৬, ২০২৫ ৬:০১ অপরাহ্ণ

 

তানিয়া খাতুন
সত্তরের দশকে মা-খালা-ফুপুদের বোনের বাড়ি বেড়াতে যাওয়া, তাদের দুলাভাই, বেয়াই-বেয়ান, তালই-মাউইয়ের সঙ্গে মধুর খুনসুটি সে সময়ের আর্থসামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবনের সরল ছবি তুলে ধরে। দুলাভাইকে নিজের ভাইদের মতো, বোনের বাড়ির আত্মীয়স্বজনকে নিকটাত্মীয় মনে করা হতো সে সময়। তার মানে এই নয় যে, তখন নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতা ঘটত না। কিন্তু ঘটনার সংখ্যা ও সহিংসতার মাত্রা এত তীব্র ছিল না।

মাগুরার কন্যাশিশুটিও গিয়েছিল বোনের বাড়িতে। ঠিক সানন্দে ‘বেড়াতে’ নয়, সে গিয়েছিল বোনকে অনাকাঙ্ক্ষিত অবস্থা থেকে স্বস্তি বা সুরক্ষা দিতে। শিশুটি শেষ পর্যন্ত তার বোনকে বাঁচাতে পেরেছে, কিন্তু বিনিময়ে নিজের জীবনটা দিতে হয়েছে। তার আগে সহ্য করতে হয়েছে পাশবিক নির্যাতন।

এমন অবস্থা পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র কারও কাম্য নয়। কিন্তু ঘটনাগুলো প্রায়ই ঘটে চলেছে। সমাজে একদিকে যেমন হাজার কোটি টাকা বিদেশে পাচার হয়ে যাওয়ার উদাহরণ রয়েছে, তেমনি অন্যদিকে কন্যাকে ‘পার করে’ দিতে পারলে দরিদ্র পিতা-মাতার বেঁচে যাওয়ার দৃষ্টান্তও অহরহ। কন্যা শ্বশুরবাড়িতে নির্যাতনের শিকার হলে তাকে নিয়ে আসার চিন্তা না করে নির্যাতন সহ্য করে সংসার করার শিক্ষা ও পরামর্শ দেওয়া হয়। শুধু দরিদ্র পরিবারে নয়, মধ্যবিত্ত-উচ্চবিত্ত সব পরিবারেই একই অবস্থা। কিছুটা যে পরিবর্তন হয়নি, তা নয়। ডিভোর্সের হার বেড়ে যাওয়া এর প্রমাণ। বিয়েবিচ্ছেদ সংক্রান্ত সালিশি পরিষদের বার্ষিক প্রতিবেদন বলছে, পুরুষদের চেয়ে নারীরাই বিয়ে বিচ্ছেদের উদ্যোগে এগিয়ে।

বিচ্ছেদের হার হ্রাস-বৃদ্ধিতে অবশ্য নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতায় খুব একটা হেরফের হচ্ছে না। অবস্থাদৃষ্টে মনে হতে পারে আমরা নারী ও শিশু নির্যাতনের স্বর্গরাজ্যে বাস করছি। পুলিশ সদরদপ্তরের তথ্য অনুসারে গত বছরের ফেব্রুয়ারি মাসেও ধর্ষণের মামলার সংখ্যা চলতি বছরের মতোই ছিল। মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশনের দেশের বিভিন্ন পত্রপত্রিকা থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুসারে জানা যায়, ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছিল ৬৮টি এবং চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে ৭৬টি। ২০২৪ সালের মার্চ মাসের প্রথম দশ দিনে ধর্ষণের শিকার হয়েছিল ১৫ জন নারী ও শিশু এবং ২০২৫ সালের মার্চ মাসের প্রথম দশ দিনে ২৬ জন নারী ও শিশু।

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে পাওয়া অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে আমাদের প্রত্যাশা অনেক বেশি। কারণ এ সরকার সকল অবিচার-অনাচার ও বৈষম্য বিলোপের অঙ্গীকার করেছে। এই প্রত্যয়ের মূলে রয়েছে দেড় হাজারের বেশি শহীদের তাজা রক্ত। তাই যখন গত ১১ ফেব্রুয়ারি ধর্ষণবিরোধী আন্দোলনে পুলিশ হামলা করে, তখন আমরা স্তম্ভিত হই। চোখের সামনে ভেসে ওঠে বিগত কর্তৃত্ববাদী সরকারের প্রতিচ্ছবি।

সরকারের সদিচ্ছা ও জনসচেতনতা যে সহিংসতা কমাতে পারে তার উদাহরণ এসিড সন্ত্রাসের হার কমে আসা। এসিড সারভাইভারস ফাউন্ডেশন পরিচালিত গবেষণামতে, এই সহিংসতা কমার নেপথ্যে অন্যতম কারণ গণমাধ্যমের ভূমিকা ও বিভিন্ন প্রচার অভিযান, এসিড নিয়ন্ত্রণ আইন ২০০২ এবং এসিড অপরাধ প্রতিরোধ আইন ২০০২। এ ছাড়াও রয়েছে নারী ও মানবাধিকার সংগঠনগুলোর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা এবং এসিড সারভাইভারস ফাউন্ডেশনের কার্যকর ও দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণ।

ধর্ষণের ক্ষেত্রে কঠিন আইন থাকলেও আইনের প্রয়োগ বা বাস্তবায়ন এবং নির্যাতিত নারী নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এ বিষয়গুলোতে বড় সমস্যা রয়েছে। এ ক্ষেত্রে ধর্ষণের শিকার ভুক্তভোগী ব্যক্তির জন্য ন্যায়বিচার নিশ্চিতে ‘ধর্ষণ আইন সংস্কার জোট’ (আরএলআরসি) যে ১০ দফা দাবি জানিয়েছে, তা বিবেচনায় নিলে এসিড সহিংসতার মতো ধর্ষণও কমে যাবে বলে আশা করা যায়।
এটাও মনে রাখতে হবে, অপরাধ সংঘটিত হয় প্রথমে সাংস্কৃতিক মননে। কিশোর ছেলেরা এলাকার মেয়েদের দিকে শিস ছুড়ে দিতে দিতে পুরুষ হয়ে ওঠে। সমাজের নানা-দাদা, বয়োজ্যষ্ঠ, দুলাভাই, বেয়াই-বেয়াইনের অশ্লীল কথাবার্তা এবং অনেক ক্ষেত্রে ইয়ার্কির ছলে গায়ে হাত দেওয়ার প্রশ্রয়ও আমাদের সমাজে আছে। এ মানসিকতাকে কেবল আইনি কাঠামো দিয়ে পরিবর্তন করা যাবে না; মনোজগতে পরিবর্তন প্রয়োজন। এ কাজটিই সবচেয়ে কঠিন।

নারী ও শিশুর প্রতি সামাজিক ও সাংস্কৃতিক মনোজগৎ পরিবর্তনের কাজটি বহুস্তরভিত্তিক এবং এর জন্য রাষ্ট্রের অঙ্গীকার প্রয়োজন। প্রয়োজন যথাযথ বিনিয়োগ; বুদ্ধিবৃত্তিক ও অর্থনৈতিক। অপরাধী মনকে শিক্ষিত করার জন্য, নারী ও কন্যাদেরও সুরক্ষা নিশ্চিত করার জন্য এবং নারী-পুরুষ নির্বিশেষে মানবিক মন গড়ে তোলার জন্য গণমাধ্যমে নাটিকা, তথ্যচিত্র প্রদর্শন কার্যকর হতে পারে। অর্থাৎ সর্বমাত্রিক শিক্ষা-সচেতনতা কার্যক্রমের আওতায় আনতে হবে দেশের মানুষকে। সেইসব বার্তার উদ্দিষ্ট গ্রাহক যে কেবল কিশোর-কিশোরী, তরুণ-তরুণী হবেন এমন নয়; মাতাপিতা, অভিভাবক, সমাজের বয়োজ্যষ্ঠ, স্থানীয় নেতা সবাইকেই শিক্ষিত করার লক্ষ্য থাকতে হবে।
অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে বিনীত অনুরোধ, যে দায় ও দরদের সমাজ প্রতিষ্ঠার অভিপ্রায় নিয়ে আপনারা কাজ করছেন, সেখানে দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করে বলেন– প্রত্যেক শিশু ও নারী থাকবে সুরক্ষিত সারাক্ষণ, কারও অধিকার হবে না ভূলুণ্ঠিত, মাগুরার শিশুটির মতো কোনো শিশুকে পৃথিবী থেকে নিতে হবে না অকালবিদায়।

তানিয়া খাতুন: মানবাধিকারকর্মী

 
 
জনতার আওয়াজ/আ আ
 
 

জনপ্রিয় সংবাদ

 

সর্বোচ্চ পঠিত সংবাদ