মির্জা সামারুহরও রাজনীতি নিয়ে আগ্রহ রয়েছে
নিজস্ব প্রতিবেদক, জনতার আওয়াজ ডটকম
প্রকাশের তারিখ:
শনিবার, এপ্রিল ২৯, ২০২৩ ৪:৩০ অপরাহ্ণ পরিবর্তনের তারিখ:
শনিবার, এপ্রিল ২৯, ২০২৩ ৪:৩০ অপরাহ্ণ

ডেস্ক নিউজ
দেশের রাজনীতিতে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর পরিবারের সক্রিয় অংশগ্রহণ রয়েছে। সরকার পরিচালনায়ও রয়েছে ভূমিকা। চাচা ছিলেন স্পিকার আর বাবা একাধিকবারের সংসদ সদস্য ও মন্ত্রী। মির্জা ফখরুল নিজেও ছিলেন মন্ত্রী, এমপি। তার বড় মেয়ে মির্জা সামারুহরও রাজনীতি নিয়ে আগ্রহ রয়েছে। পারিবারিক উত্তরাধিকারসূত্রে আসতে পারেন রাজনীতিতে। রাজনৈতিক অঙ্গনে এমন আলোচনা রয়েছে। তবে রাজনীতিতে তিনি কবে সম্পৃক্ত হবেন, তা এখনো পরিষ্কার নয়। সামারুহ রাজনীতিতে এলে আপত্তি থাকবে না বাবা ফখরুলের, বরং তিনি খুশি হবেন।
এদিকে মির্জা সামারুহ সরাসরি রাজনীতিতে সম্পৃক্ত না থাকলেও তিনি রাজনীতি সচেতন। বিভিন্নভাবে খোঁজখবর রাখেন রাজনীতির। শুধু তাই নয়, বিএনপির চরম দুঃসময়ে দেশে দলটির রাজনীতিতে বর্তমানে সিপাহসালার ভূমিকায় থাকা বারবার কারানির্যাতিত মির্জা ফখরুলকে মানসিকভাবে দৃঢ় থাকতে অনুপ্রেরণা দিয়ে আসছেন সামারুহ। বলতে গেলে মির্জা ফখরুলের রাজনৈতিক অনুপ্রেরণা তার কাছ থেকেই আসে। বিভিন্ন সময় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট দিয়ে রাজনীতিতে এবং দেশের মানুষের জন্য মির্জা ফখরুলের ত্যাগ স্বীকারের বিষয়টি তুলে ধরেন সামারুহ। বাবা কোনো কারণে মন খারাপ করলে, হতাশ হলে অস্ট্রেলিয়া থেকে মোবাইল ফোনে খুদেবার্তা পাঠান তিনি, যা রাজনীতিবিদ বাবাকে এগিয়ে চলার শক্তি ও সাহস জোগায়।
বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল কয়েক বছর আগে জাতীয় প্রেস ক্লাবে এক আলোচনা সভায় জানান, ‘দুঃসময়ে সবার আগে সাহস পান বড় মেয়ে মির্জা সামারুহের কাছ থেকে। সুদূর অস্ট্রেলিয়া থেকে মোবাইল ফোনে মেসেজ পাঠিয়ে রাজনীতিবিদ বাবাকে এগিয়ে চলার শক্তি ও সাহস জোগান মির্জা সামারুহ।’
এদিকে মির্জা ফখরুলের পরিবার থেকে উত্তরাধিকার সূত্রে বড় মেয়ে সামারুহ রাজনীতিতে এলে সেটা দেশের রাজনীতির জন্য ইতিবাচক হবে বলে মনে করেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
এ প্রসঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের সাবেক অধ্যাপক নুরুল আমিন বেপারি বলেন, মির্জা সামারুহের যোগ্যতা আছে, ভালো রেজাল্ট আছে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ছিলেন। এখন অস্ট্রেলিয়ায় থাকেন। তার বাবা একজন স্বচ্ছ-পরিচ্ছন্ন রাজনীতিবিদ, দাদারা রাজনীতিবিদ ছিলেন। সুতরাং রাজনৈতিক পরিবার থেকে উত্তরাধিকার সূত্রে তিনি রাজনীতিতে আসতেই পারেন। তার মতো মেধাবীদের রাজনীতিতে আসা উচিত। তারা এলে রাজনীতিতে কন্ট্রিবিউট করতে পারবেন, যা দেশের রাজনীতির জন্য ইতিবাচক হবে। এর ফলে সামগ্রিকভাবে রাজনীতি উপকৃত হবে। মির্জা সামারুহকে রাজনীতিতে আনতে তার বাবা নিশ্চয়ই উৎসাহ দিচ্ছেন বলে মনে করেন এ রাষ্ট্রবিজ্ঞানী।
দুই মেয়েকে নিয়ে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ও রাহাত আরা বেগমের সংসার। বড় মেয়ে মির্জা সামারুহ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও শিক্ষক ছিলেন। পেশায় সায়েন্টিস্ট সামারুহ এখন অস্ট্রেলিয়ায় স্বামী-সন্তান নিয়ে বসবাস করছেন। সেখানে থেকে নির্যাতিত নারীদের সহায়তা ও নারীর ক্ষমতায়নেও কাজ করেন তিনি। সামাজিক উন্নয়নে ভূমিকা রাখায় গত বছরের নভেম্বরে অস্ট্রেলিয়ার ক্যানবেরা থেকে প্রবাসী বাংলাদেশি মির্জা সামারুহকে ‘এসিটি অস্ট্রেলিয়ান অব দ্য ইয়ার’ ঘোষণা করা হয়। ‘এসিটি লোকাল হিরো’ ক্যাটাগরিতে তিনি এ পুরস্কার পান। মির্জা সামারুহ অস্ট্রেলিয়ায় চিকিৎসাবিজ্ঞানী এবং সি তারা’স স্টোরির সহ-প্রতিষ্ঠাতা। ২০১৭ সালে সি তারা’স স্টোরি নামে এ অলাভজনক দাতব্য সংস্থাটি প্রতিষ্ঠা করা হয়। বাংলাদেশের দুই নারী বীরপ্রতীক ক্যাপ্টেন ডা. সিতারা বেগম ও তারামন বিবির নাম থেকে সংস্থাটির নামকরণ করা হয়। সামারুহ তার এ সংস্থার মাধ্যমে লাঞ্ছিত ও নির্যাতিত নারীদের সহায়তা এবং নারীর ক্ষমতায়নে কাজ করেন। আর ঢাকায় বসবাসকারী ছোট মেয়ে মির্জা সাফারুহ পেশায় একজন শিক্ষিকা। তিনিও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেন।
পারিবারিক উত্তরাধিকার সূত্রে মেয়েদের রাজনীতিতে আসা সম্পর্কিত এক প্রশ্নে বাবা মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সম্প্রতি বলেছেন, ‘আমার বড় মেয়ে পেশায় সায়েন্টিস্ট। সে অস্ট্রেলিয়ায় কাজ করছে। এখন সে যদি রাজনীতিতে আসতে চায়, আমি তো অবশ্যই খুশি হব। কারণ, আমি তো মনে করি যে, রাজনীতি এমন একটা জায়গা, যেখানে থেকে কিছু মানুষের সেবা করার সুযোগ আছে, দেশকে কিছু দেওয়ার সুযোগ আছে এবং নিজের যে চিন্তাভাবনাগুলো, সেগুলো বাস্তবে প্রদর্শনের সুযোগ সৃষ্টি হয়। সেদিক থেকে তো আমার কোনো আপত্তি নেই। আর আমার ছোট মেয়ে, তার চিন্তাভাবনাগুলো একটু ভিন্ন। সে একটু সৃষ্টিশীল মেয়ে, সে একটু ছবি আঁকতে ভালোবাসে, খুব ভালো ডিজাইন করে, যেটাকে আমরা বলি ফ্যাশন ডিজাইনিং, সে খুব ভালো করতে পারে। প্রফেশনে সে একজন শিক্ষিকা। সে রাজনীতির ব্যাপারে খুব একটা আগ্রহী নয়। তবে আমার বড় মেয়ের একটু আগ্রহ আছে। সে রাজনীতির ব্যাপারে বিভিন্নভাবে জানতে চায় এবং সে আসতে চাইলে আমি অবশ্যই সেটাকে স্বাগত জানাব।’ তবে এ ব্যাপারে মির্জা সামারুহের মতামত জানা সম্ভব হয়নি।
মির্জা ফখরুল ইসলাম রাজনৈতিক অঙ্গনে একজন স্বচ্ছ ও পরিচ্ছন্ন রাজনীতিবিদ হিসেবে পরিচিত। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতি বিষয়ে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন তিনি। বিশ্ববিদ্যালয়ে লেখাপড়ার সময়েই ছাত্র রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন। ’৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানের সময় ছিলেন ছাত্র ইউনিয়নের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি। এসএম হল শাখারও নির্বাচিত সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর বিসিএস পরীক্ষা দিয়ে হয়ে যান সরকারি চাকুরে। অর্থনীতির প্রভাষক হিসেবে ঢাকা কলেজে শিক্ষকতা জীবন শুরু করলেও কয়েকটি কলেজ ঘুরে পরে সরকারের পরিদর্শন ও আয়-ব্যয় পরীক্ষণ অধিদপ্তরে নিরীক্ষক হিসেবে কাজ করেন। তবে সাত বছরের মধ্যে রাজনীতিতে আবারও ফিরে আসেন। জিয়াউর রহমান সরকারের উপপ্রধানমন্ত্রী এসএ বারীর ব্যক্তিগত সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পরে নিজ জেলা ঠাকুরগাঁওয়ে ফিরে আবারও শিক্ষকতা পেশা শুরু করেন। ১৯৮৮ সালে আবারও শিক্ষকতা ছেড়ে সার্বক্ষণিক রাজনীতিতে ফেরার প্রস্তুতি নেন। নির্বাচিত হন ঠাকুরগাঁও পৌরসভার চেয়ারম্যান। এক বছর পরে যোগ দেন বিএনপিতে। ঠাকুরগাঁও-১ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন ২০০১ সালে। চারদলীয় জোট সরকারের এ শাসনামলে প্রথমে কৃষি মন্ত্রণালয় এবং পরে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন তিনি।
মির্জা ফখরুল বিএনপির অঙ্গ সংগঠন কৃষক দলের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন দীর্ঘদিন। পরে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব ও ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের দায়িত্ব পালন করেন। ২০১৬ সালে বিএনপির ষষ্ঠ জাতীয় কাউন্সিলে তাকে মহাসচিব করা হয়। ২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত একাদশ সংসদ নির্বাচনে বগুড়া-৬ আসন থেকে সংসদ সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হলেও সংসদে যোগ দেননি ফখরুল। বিএনপি মহাসচিবের বিরুদ্ধে বর্তমানে ৮৮টি মামলা রয়েছে। রাজনীতি করতে গিয়ে তাকে আটবার কারাবরণ করতে হয়েছে। তিনি এখন পর্যন্ত ৩৯২ দিন কারাভোগ করেছেন।
মির্জা ফখরুলের বাবা মির্জা রুহুল আমিন একজন আইনজীবী ছিলেন এবং ঠাকুরগাঁওয়ে বাংলাদেশের স্বাধীনতার আগে ও পরে একাধিকবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। তিনি এরশাদ সরকারের মন্ত্রিসভার একাধিক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী ছিলেন। স্বাধীন বাংলাদেশে মির্জা রুহুল আমিন বিএনপির রাজনীতির সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন।
মির্জা ফখরুলের চাচা মির্জা গোলাম হাফিজ ছিলেন একজন বিএনপি নেতা, সাবেক মন্ত্রী ও জাতীয় সংসদের চতুর্থ স্পিকার। মির্জা হাফিজ ১৯৭৮ থেকে ১৯৭৯ সাল পর্যন্ত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকারে ভূমিমন্ত্রী এবং ১৯৯১ থেকে ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন সরকারে আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
মির্জা ফখরুলের অপর চাচা উইং কমান্ডার এস আর মির্জা ১৯৭১ সালের এপ্রিলে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম সরকার, যেটি মুজিবনগর সরকার নামে খ্যাত, এ সরকার কর্তৃক ডাইরেক্টোরেট অব ইয়ুথ ক্যাম্পের পরিচালক হিসেবে নিযুক্ত হয়েছিলেন।
এ ছাড়া মির্জা ফখরুলের ছোট ভাই মির্জা ফয়সল আমিনও রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। তিনি ২০১৬ সালে ঠাকুরগাঁও পৌরসভার মেয়র নির্বাচিত হন। বর্তমানে তিনি ঠাকুরগাঁও জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করছেন।
কালবেলা
জনতার আওয়াজ/আ আ