যুগপৎ আন্দোলন ফের উজ্জীবিত করতে চান নীতিনির্ধারকরা
নিজস্ব প্রতিবেদক, জনতার আওয়াজ ডটকম
প্রকাশের তারিখ:
মঙ্গলবার, মে ১৬, ২০২৩ ২:২৯ অপরাহ্ণ পরিবর্তনের তারিখ:
মঙ্গলবার, মে ১৬, ২০২৩ ২:২৯ অপরাহ্ণ

ডেস্ক নিউজ
সরকারবিরোধী যুগপৎ আন্দোলন শুরুর পর থেকে সবকিছুই ঠিকঠাক চলছিল। কিন্তু আন্দোলনের ‘যৌথ ঘোষণাপত্র’ নিয়ে এখন মিত্রদের মধ্যে কিছুটা ঝামেলা তৈরি হয়েছে। ফলে এই রূপরেখা প্রণয়ন না হওয়া পর্যন্ত কর্মসূচিও যুগপৎভাবে পালিত হচ্ছে না। সে কারণে বিএনপিও এককভাবে কর্মসূচি দিয়েছে। আগামী শনিবার থেকে চার দিনে দেশব্যাপী ৮২টি সাংগঠনিক জেলায় বিক্ষোভ সমাবেশ করবে দলটি, যেটি আগামী ২৭ মে সম্পন্ন হবে। এর আগে অনুষ্ঠিত বিভাগীয় গণসমাবেশের আদলে এই কর্মসূচি পালনের মধ্য দিয়ে আন্দোলনকে আবার আগের অবস্থায় নিতে চায় দলটি। ঢাকামুখী চূড়ান্ত আন্দোলন শুরুর আগে এই কর্মসূচির মধ্য দিয়ে তৃণমূলে নেতাকর্মীদের সংগঠিত ও ফের উজ্জীবিত করতে চান নীতিনির্ধারকরা।
তবে বিএনপির এই একক কর্মসূচি নিয়ে মিত্রদের মধ্যে নতুন করে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে, কর্মসূচি নিয়ে অনেকে ধোঁয়াশার মধ্যে রয়েছেন। মিত্ররা ভেবেছিল, সমাবেশ থেকে যুগপতের কর্মসূচি ঘোষণা করবে প্রধান শরিক বিএনপি। কারণ, কর্মসূচি প্রণয়ন নিয়ে এর আগে মিত্রদের সঙ্গে সিরিজ বৈঠক করে দলটি। কিন্তু বিএনপির একক কর্মসূচি ঘোষণায় সমমনা দলগুলোর নেতারা অবাক ও ক্ষুব্ধ। তাই তারাও নিজেদের মতো করে কর্মসূচি পালনের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। অবশ্য বিএনপির দাবি, সব কর্মসূচিই যুগপৎভাবে করতে হবে—এমন কোনো কথা নেই। সিদ্ধান্ত আছে, যুগপতের কোনো দল বা জোট চাইলে নিজেরা আলাদাভাবেও কর্মসূচি পালন করতে পারবে। তাই এ নিয়ে মিত্রদের সঙ্গে ভুল বোঝাবুঝির কোনো অবকাশ নেই।
জানতে চাইলে বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব ও যুগপতের লিয়াজোঁ কমিটির সদস্য সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল বলেন, গায়েবি মামলায় নির্বিচারে গ্রেপ্তার, পুলিশি হয়রানিসহ ১০ দফা দাবি আদায়ে জেলা ও মহানগরে বিক্ষোভ সমাবেশের কর্মসূচি ঘোষণা করেছে বিএনপি। কারণ, গ্রেপ্তার ও মামলা-হামলায় আমাদের নেতাকর্মীরা বেশি ভুক্তভোগী। এখন আমরা যদি মাঠ পর্যায় পর্যন্ত কর্মসূচি না দিই, তাহলে মাঠের নেতাকর্মীরা অসহায় বোধ করবে। তাই দলের পক্ষ থেকে এককভাবে এ কর্মসূচি পালনের সিদ্ধান্ত হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, যুগপতের বাইরে কোনো দল বা জোট চাইলে আলাদাভাবেও তাদের দলীয় কর্মসূচিও পালন করতে পারবে। আমাদের মধ্যে আগে থেকেই এমন সিদ্ধান্ত আছে। গণতন্ত্র মঞ্চ গত শুক্রবার জোটগতভাবে সমাবেশ করেছে। গণঅধিকার পরিষদ আগামী ১৯ মে গণসমাবেশ করবে। অন্য দল ও জোটগুলোও তাদের ব্যানারে কর্মসূচি করবে। তাই এ নিয়ে ভুল বোঝাবুঝির কোনো অবকাশ নেই। এক প্রশ্নের জবাবে আলাল জানান, ২৭ মের আগেও যুগপতের কর্মসূচি আসতে পারে।
সরকারের পদত্যাগ ও নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনসহ ১০ দফা দাবিতে গত ২৪ ডিসেম্বর ঢাকার বাইরে এবং ৩০ ডিসেম্বর ঢাকায় গণমিছিলের মধ্য দিয়ে রাজপথে গড়ায় যুগপৎ আন্দোলন। এরপর ধারাবাহিকভাবে গণঅবস্থান কর্মসূচি, বিক্ষোভ সমাবেশ, বিভাগীয় সমাবেশ, মানববন্ধন, প্রতিবাদ সমাবেশ, মহানগর-জেলা-থানা-ইউনিয়ন পর্যায়ে পদযাত্রার কর্মসূচি পালন করা হয়। শুরুটা আশাব্যঞ্জক হলেও সেই ধারা ধরে রাখতে পারছে না তারা। ঈদুল ফিতরের পর থেকেই রাজপথে নেই যুগপৎ কর্মসূচি। গত ১ মে দলীয়ভাবে ‘মহান মে দিবস’ পালন করে বিএনপি। এরপর ঢাকায় গত শনিবার এককভাবে প্রতিবাদ সমাবেশ করে দলটি। ওই কর্মসূচি থেকে ফের এককভাবে কর্মসূচি পালনের ঘোষণা দেয় বিএনপি। এ ঘটনায় যুগপতের মিত্ররা ক্ষুব্ধ। অনেকের অভিযোগ, বিএনপি গত শনিবার এককভাবে কর্মসূচি ঘোষণা করলেও এখন পর্যন্ত তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেনি। সুতরাং তারা কীভাবে কর্মসূচি করবে, সে ব্যাপাারে তারা অনেকটা ধোঁয়াশার মধ্যে আছেন।
যুগপৎ আন্দোলনে থাকা দলগুলোর নেতারা বলেন, বিএনপির সঙ্গে সর্বশেষ আলোচনায় সিদ্ধান্ত হয়েছিল, একসঙ্গে কর্মসূচি করব। তবে বিএনপি এককভাবে কর্মসূচি ঘোষণা করায় তারা কিছুটা কনফিউশনের মধ্যে আছেন। তা ছাড়া কর্মসূচি প্রণয়ন ও চূড়ান্ত করা নিয়েও অনেকের অভিমান রয়েছে।
জানতে চাইলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও যুগপতের লিয়াজোঁ কমিটির প্রধান নজরুল ইসলাম খান বলেন, বিএনপি এখন এককভাবে কর্মসূচি দিয়েছে। মিত্রদের সঙ্গে আলোচনা করে শিগগিরই যুগপতের কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে।
গণতন্ত্র মঞ্চের সমন্বয়ক ও বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক বলেন, গণতন্ত্র মঞ্চ এখন আনুষ্ঠানিকভাবে যুগপতের কর্মসূচি করতে না পারলেও বিএনপি ও মিত্র অন্য দলগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে কর্মসূচি পালন করবে। দু-এক দিনের মধ্যে জোটগত এই কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে। এ ছাড়া বিএনপির সঙ্গেও আমরা কথা বলব, যাতে শিগগিরই যুগপতের কর্মসূচি দেওয়া যায়।
তিনি বলেন, বিএনপি তাদের দলীয় কর্মসূচি ঘোষণা করেছে। গণতন্ত্র মঞ্চও জোটগতভাবে তাদের কর্মসূচি করবে। তবে দুই শরিকের কর্মসূচির মধ্যে একটা সমন্বয় থাকবে। হয়তো একই দিন একই রকম কর্মসূচি নাও হতে পারে। তবে উভয় কর্মসূচিই সরকারের পদত্যাগ ও নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবিতে হবে।
১২ দলীয় জোটের প্রধান ও জাতীয় পার্টির (কাজী জাফর) চেয়ারম্যান মোস্তফা জামাল হায়দার বলেন, বিএনপি যে কর্মসূচি ঘোষণা করেছে, সেটাকে আমরা যুগপৎ আন্দোলনের কর্মসূচি হিসেবে ধরে নেব এবং সেভাবে পালন করার উদ্যোগ গ্রহণ করব। হয়তো সব জেলায় পারব না, কিছু কিছু জেলায় করব। তবে দিনক্ষণ এখনো ঠিক হয়নি। আগামীকাল (মঙ্গলবার) ১২ দলীয় জোটের মিটিংয়ে এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত হবে।
এলডিপি শুরু থেকেই এককভাবে যুগপতের প্রতিটি কর্মসূচি পালন করে আসছে জানিয়ে দলটির প্রেসিডেন্ট কর্নেল (অব.) ড. অলি আহমদ বলেন, এখন আমরা আমাদের দলটাকে বিভিন্ন জায়গায় সংগঠিত করছি। কমিটিগুলো গঠন-পুনর্গঠনের কাজ করছি। আগামী কিছুদিন আমরা সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড নিয়ে ব্যস্ত থাকব।
জাতীয়তাবাদী সমমনা জোটের সমন্বয়ক ও এনপিপির চেয়ারম্যান ড. ফরিদুজ্জামান ফরহাদ বলেন, বিএনপির সঙ্গে সমন্বয় করে আমরা শুরু থেকেই যুগপতের কর্মসূচি পালন করছি। বিএনপি আগামী ২৭ তারিখ পর্যন্ত এককভাবে সমাবেশের কর্মসূচি ঘোষণা করেছে। এই সময়ে আমরাও জোটগতভাবে কর্মসূচি পালন করব। তবে সেটা বিএনপির কর্মসূচির দিন না-ও হতে পারে।
এদিকে যুগপৎ আন্দোলন শুরুর প্রায় পাঁচ মাস অতিবাহিত হলেও এখনো আন্দোলনের ভিত্তি হিসেবে একটি ‘যৌথ ঘোষণাপত্র’ চূড়ান্ত করতে পারেনি বিএনপি ও মিত্ররা। যদিও এটা নিয়ে কয়েক মাস ধরে কাজ করছে তারা। উভয় পক্ষই দ্রুততম সময়ের মধ্যে এই ঘোষণাপত্র চূড়ান্ত করার বিষয়ে নীতিগতভাবে একমত। তবে বিএনপির নীতিনির্ধারকরা এই ঘোষণাপত্র নিয়ে আরও আলাপ-আলোচনার বিষয়ে মত দেওয়ায় কবে নাগাদ এটি চূড়ান্ত হবে, তা নিশ্চিত নয়।
বিএনপির ১০ দফা দাবি ও রাষ্ট্র মেরামতের ২৭ দফা রূপরেখার সঙ্গে গণতন্ত্র মঞ্চের ১৪ দফার সমন্বয়ে এই যৌথ ঘোষণাপত্র প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়। কিন্তু এককভাবে গণতন্ত্র মঞ্চের সঙ্গে বিএনপির যৌথ ঘোষণাপত্র দেওয়ার ব্যাপারে আপত্তি তোলে যুগপৎ আন্দোলনে থাকা অন্য শরিকরা। সেই পরিপ্রেক্ষিতে আন্দোলনে থাকা সব দল ও জোটের সঙ্গে আলোচনা করে এই ঘোষণাপত্র দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিএনপি। চলতি মে মাসের মধ্যে এই যৌথ ঘোষণপত্র চূড়ান্ত করার প্রক্রিয়া চলছে।
গণতন্ত্র মঞ্চের সমন্বয়ক সাইফুল হক বলেন, ‘যৌথ ঘোষণাপত্র নিয়ে কাজ চলছে। চলতি মাসের মধ্যেই এর চূড়ান্তকরণ শেষ করার চেষ্টা চলছে। এর পরই যুগপৎ আন্দোলন নতুন মাত্রা পাবে।’
জনতার আওয়াজ/আ আ