রংপুরে বিএনপির সমাবেশে বাধা দেওয়া হলে পুরো রংপুরকে অচল করে দেওয়া হবে
নিজস্ব প্রতিবেদক, জনতার আওয়াজ ডটকম
প্রকাশের তারিখ:
মঙ্গলবার, অক্টোবর ২৫, ২০২২ ৬:০৮ অপরাহ্ণ পরিবর্তনের তারিখ:
মঙ্গলবার, অক্টোবর ২৫, ২০২২ ৬:০৮ অপরাহ্ণ

রংপুরে বিএনপি ও ছাত্রলীগের ডাকা সমাবেশকে কেন্দ্র করে উত্তাপ ছড়াচ্ছে রাজনীতিতে। নেতাকর্মী ছাড়াও সাধারণ মানুষের মধ্যে বাড়ছে উদ্বেগ, উৎকণ্ঠা। বিএনপি নেতারা বলছেন, তাঁদের সমাবেশে বাধা দেওয়া হলে পুরো রংপুরকে অচল করে দেওয়া হবে। অন্যদিকে ছাত্রলীগ নেতারা বলছেন, বিএনপি নৈরাজ্য করলে তা প্রতিরোধ করা হবে। দু’পক্ষের এই অনড় অবস্থান ও হুমকি-পাল্টা হুমকিতে বিরাজ করছে টানটান উত্তেজনা। এ পরিস্থিতিতে প্রশাসন এখনও কোনো পক্ষকেই সমাবেশের অনুমতি দেয়নি।
জ্বালানি তেল, চাল-ডালসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি, নেতাকর্মীদের হত্যা, হামলা ও মামলার প্রতিবাদে এবং দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মুক্তি, নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে সারাদেশের দশ বিভাগীয় শহরে গণসমাবেশের ডাক দেয় বিএনপি। এর মধ্যে চট্টগ্রাম, ময়মনসিংহ ও খুলনায় সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়েছে। আগামী শনিবার রংপুরে এ সমাবেশ আয়োজন করেছে বিএনপি। সমাবেশ সফল করতে প্রতিদিনই রংপুরে নেতাকর্মীদের নিয়ে প্রস্তুতি সভা চলছে। জেলা ও উপজেলা পর্যায়েও প্রস্তুতি সভাসহ সমাবেশে উপস্থিতি বাড়াতে প্রচারপত্র বিতরণ, জনসংযোগ, পথসভা করছেন নেতাকর্মীরা। এ সমাবেশের জন্য রংপুর জিলা স্কুল মাঠ চেয়ে আবেদন করেছে বিএনপি। তবে গতকাল সোমবার পর্যন্ত প্রশাসনের অনুমোদন মেলেনি।
অন্যদিকে একই মাঠে দু’দিন আগে আগামী বৃহস্পতিবার বিভাগীয় ছাত্র সমাবেশের ডাক দিয়েছে কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগ। গত রোববার ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি আল নাহিয়ান খান জয় ও সাধারণ সম্পাদক লেখক ভট্টাচার্য স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে সমাবেশের তথ্য জানানো হয়। যদিও এ সমাবেশটি এক সপ্তাহ আগে গত শনিবার রংপুরের পীরগঞ্জে অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল। তবে তা শেষ মুহূর্তে স্থগিত করা হয়। ছাত্রলীগের ঘোষিত ছাত্র সমাবেশে সর্বোচ্চ উপস্থিতিতে নিজেদের শক্তির জানান দিতে পরিকল্পনা নিয়েছেন দায়িত্বশীল নেতারা। তবে সোমবার দুপুর পর্যন্ত ছাত্রলীগকেও সমাবেশের অনুমতি দেওয়া হয়নি।
রংপুর জিলা স্কুলের প্রধান শিক্ষক আবু রায়হান মিজানুর রহমান বলেন, এখন শিক্ষার্থীদের পরীক্ষার প্রস্তুতি চলছে। স্কুলও খোলা। এ কারণে সমাবেশ করার জন্য কোনো পক্ষকে অনুমতি দেওয়া হয়নি। তবে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ যদি কাউকে সমাবেশ করতে অনুমতি দেয়, তা ভিন্ন বিষয়।
রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের উপপুলিশ কমিশনার (সিটিএসবি) আবু বকর সিদ্দীক বলেন, আমরা এ বিষয়ে আবেদন পেয়েছি। তবে এখনও অনুমোদনের সিদ্ধান্ত হয়নি। বিষয়টি আমরা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলে সিদ্ধান্ত নেব।
বিএনপি নেতারা বলছেন, মাঠ চেয়ে অনুমতি পাওয়া না গেলেও পূর্বনির্ধারিত সমাবেশ হবে। এ বিষয়ে তাঁরা কঠোর অবস্থানে রয়েছেন। এ ক্ষেত্রে বিকল্প হিসেবে তাঁরা রংপুর কালেক্টরেট ঈদগাহ মাঠে সমাবেশ করার চিন্তা করছেন। সমাবেশ ঘিরে কয়েক লাখ লোকের সমাগম ঘটানোর পরিকল্পনা রয়েছে তাঁদের। চট্টগ্রাম, ময়মনসিংহ ও খুলনার সমাবেশের মতো রংপুরের সমাবেশে সরকারি দল ও প্রশাসন কী প্রক্রিয়ায় এবং কীভাবে বাধাগ্রস্ত করতে পারে, তা বোঝার চেষ্টা করছেন তাঁরা। তবে যত বাধাই আসুক, রংপুরের সমাবেশকে অন্যান্য তিনটি সমাবেশের চেয়ে বড় করার দৃঢ় অবস্থান ও পরিকল্পনা রয়েছে দায়িত্বশীল নেতাদের।
তাঁরা মনে করছেন, সমাবেশে বাধা এলে কর্মীদের মধ্যে মরিয়া মনোভাব আরও বাড়ে। এ কারণে তাঁরা যে কোনো উপায়ে সমাবেশ সফল করতে সক্রিয় হয়ে ওঠে। রংপুরের সমাবেশেও বাধা দেওয়া হলে তার ব্যতিক্রম হবে না। সরকার যে উপায়ে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করবে, সেরকমভাবে তাঁরাও কৌশল নির্ধারণ করবেন বলে নেতারা জানিয়েছেন।
রংপুরের সিনিয়র নেতারা জানান, এর আগে তাঁদের তিনটি বিভাগীয় সমাবেশে বাধা দেওয়ার ধরন ও কৌশল যেভাবে চরম আকার ধারণ করছে, তাতে পরবর্তী সমাবেশগুলো সফল করা নিয়ে নেতাকর্মীদের ওপর চাপ বাড়ছে। ওই সমাবেশগুলো সফল হলেও সরকার নানাভাবে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করেছে। গণপরিবহন বন্ধ করে এবং পথে পথে বাধা দিয়েছে সরকার। এ পরিস্থিতিতে রংপুরে সমাবেশে লোকসমাগম বাড়াতে বিভিন্ন পরিকল্পনা রয়েছে তাঁদের। এ জন্য ওয়ার্ড পর্যায়েও প্রচারণা চালাচ্ছেন নেতাকর্মীরা। সরকারের বাধার কারণে দূরের জেলা থেকে পর্যাপ্ত লোকজন আসতে না পারলে বিকল্প চিন্তায় লোকসমাগম করবে বিএনপি। অর্থাৎ রংপুর মহানগরীর ছয় থানা ও জেলার আট উপজেলা থেকে সর্বাধিক সংখ্যক নেতাকর্মী ও সমর্থকের উপস্থিতি নিশ্চিত করতে চান তাঁরা। এরই মধ্যে জেলা ও উপজেলা কমিটিকেও এই নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। তাঁরা মনে করছেন, নেতাকর্মীরা যেভাবে স্বতঃস্ম্ফূর্তভাবে মাঠে নেমেছেন, তাতে তাঁদের আটকানোর ক্ষমতা কারও নেই।
রংপুর মহানগর বিএনপির সদস্য সচিব মাহফুজ-উন নবী বলেন, সমাবেশ সফল করতে সব প্রস্তুতি চলছে। কেন্দ্রীয় নেতারা বিভাগের আট জেলা- গাইবান্ধা, কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট, নীলফামারী, ঠাকুরগাঁও, দিনাজপুর ও পঞ্চগড় সফর করছেন। এরই মধ্যে বেশ কয়েকটি জেলায় এই সাংগঠনিক সফর সম্পন্ন হয়েছে। এ সফর শেষে বৃহস্পতিবার থেকে কেন্দ্রীয় নেতারা রংপুরে অবস্থান করবেন বলে তিনি জানান।
ছাত্রলীগের সমাবেশ নিয়ে তিনি বলেন, ছাত্রলীগের সমাবেশ পিছিয়ে বিএনপির সমাবেশের দু’দিন আগে আনা হয়েছে। তারাও একই স্থানে সমাবেশের ডাক দিয়েছেন। কিন্তু পৃথক দিন হওয়ায় তেমন কোনো প্রভাব পড়বে বলে তিনি মনে করছেন না।
রংপুর মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক সামসুজ্জামান সামু বলেন, ১০ দিন আগে বিভাগীয় সমাবেশের স্থান রংপুর জিলা স্কুল মাঠের অনুমতি চেয়ে পুলিশ কমিশনারের কাছে তাঁরা আবেদন করেছেন। জেলা প্রশাসনের কাছে আবেদনের কপি দেওয়া হয়েছে। কিন্তু পুলিশ প্রশাসন জিলা স্কুল মাঠ ব্যবহারের অনুমতি না দিয়ে এর একটু অদূরে কালেক্টরেট ঈদগাহ মাঠে সমাবেশ করার জন্য মৌখিকভাবে বলেছে। এতে তাঁদের তেমন কোনো আপত্তি নেই। কালেক্টরেট ঈদগাহ মাঠটিও শহরের প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত।
বিএনপির রংপুর বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক অধ্যক্ষ আসাদুল হাবিব দুলু বলেন, জনস্রোতের সব রেকর্ড ভঙ্গ করবে রংপুরের গণসমাবেশে। তাঁরা সবরকমের প্রস্তুতি গ্রহণ শেষ করেছেন। রংপুর জেলা স্কুল মাঠে সমাবেশের অনুমোদন চেয়ে আবেদন করা হয়েছে। তবে এখনও সমাবেশের অনুমোদন দেওয়া হয়নি।
এদিকে বিভাগীয় ছাত্রলীগের সমাবেশ ঘিরেও চলছে চূড়ান্ত পর্যায়ের প্রস্তুতি। এই সমাবেশে ব্যাপক লোকসমাগমের জন্য বিভাগের প্রত্যেক থানা, ওয়ার্ড, মহানগর ও জেলা পর্যায়ে চলছে সভা-সমাবেশ। ওই দিন নেতাকর্মীদের সমাবেশস্থলে আনার জন্য নেওয়া হয়েছে নানাবিধ পরিকল্পনা। এর মধ্যে নিজস্ব পরিবহন ব্যবস্থাও করা হয়েছে বলে জানা গেছে।
বিভাগীয় ছাত্র সমাবেশ সম্পর্কে রংপুর জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি এস এম সাব্বির আহমেদ বলেন, ছাত্রলীগের সব ইউনিটের সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডকে আরও গতিশীল করতে বিভাগীয় সমাবেশের আয়োজন করা হয়েছে। সমাবেশ সফল করতে সব সাংগঠনিক ইউনিট কাজ করছে। কেন্দ্রীয় নেতারা এই সমাবেশে দিকনির্দেশনামূলক বক্তব্য দেবেন। এতে ছাত্রলীগের কর্মকাণ্ড আরও বেগবান হবে। এই সমাবেশ থেকেই তাঁরা বিএনপির নৈরাজ্য প্রতিহত করার ঘোষণা দেবেন।
রংপুর মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি সাফিউর রহমান সফি বলেন, বিএনপি শান্তিপূর্ণভাবে সমাবেশ করলে কোনো সমস্যা নেই। যদি তারা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে, তাহলে আমরা প্রতিহত করব।
রংপুর মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক তুষার কান্তি মণ্ডল বলেন, গণতান্ত্রিক উপায়ে রাজনৈতিক কর্মসূচি বিএনপি নিতেই পারে। তবে বিএনপির সমাবেশকে ঘিরে স্বাধীনতাবিরোধী চক্র জামায়াত দেশকে অস্থিতিশীল করতে চায়। বিএনপি শান্তিপূর্ণ সমাবেশ করলে স্বাগত জানাব। নৈরাজ্য সৃষ্টি করলে তাদেরই দায়ভার নিতে হবে।
জনতার আওয়াজ/আ আ