রংপুর-৩: প্রার্থিতা নিয়ে বিএনপিতে অসন্তোষ
নিজস্ব প্রতিবেদক, জনতার আওয়াজ ডটকম
প্রকাশের তারিখ:
রবিবার, ডিসেম্বর ১৪, ২০২৫ ৪:৩৫ অপরাহ্ণ পরিবর্তনের তারিখ:
রবিবার, ডিসেম্বর ১৪, ২০২৫ ৪:৩৫ অপরাহ্ণ

জনতার আওয়াজ ডেস্ক
ছবি: সংগৃহীত
ভোটের হাওয়া বইছে রংপুরজুড়ে। উঠান বৈঠক, পথসভা, সামাজিক অনুষ্ঠান ও গণসংযোগে ব্যস্ত প্রার্থীরা। এ জেলাকে জাতীয় পার্টির দুর্গ বলা হলেও দলের অবস্থা একেবারেই নির্জীব। অন্যদিকে মাঠ চষে বেড়াচ্ছেন বিএনপি, জামায়াত ও ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থীরা। জাপা বলছে, নীরবে থাকলেও ঘাঁটি দখলে রয়েছে তাদের।
জেলায় ছয়টি আসনের মধ্যে রংপুর-৩ আসনের প্রার্থী নিয়ে এখনো অসন্তোষ রয়েছে বিএনপিতে। তফসিল ঘোষণা হলেও নিজেদের মধ্যে সমঝোতায় আসতে পারেননি বিএনপি নেতারা। জামায়াত ও ইসলামী আন্দোলনের জোটের সম্ভাবনা থাকলেও মাঠে সরব দুই প্রার্থী। জাপার প্রার্থী আনুষ্ঠানিক ঘোষণা না দিলেও মাঠ দখলে রয়েছে বলে জানিয়েছেন। ওয়ার্ড থেকে শুরু করে গ্রামেগঞ্জে শক্ত অবস্থান রয়েছে বলে দাবি জাপা নেতা-কর্মীদের। জাপা মাঠে না থাকায় নির্বাচনি আবহ তেমন একটি তৈরি হয়নি। অন্যদিকে আট ইসলামি দল একত্রিত হলেও এখন পর্যন্ত প্রার্থী নির্দিষ্ট হয়নি। ফলে দুই প্রার্থী রয়েছেন জোটের আশায়।
রংপুর সিটি করপোরেশনের ৯ থেকে ৩৩ ওয়ার্ড ও সদর উপজেলার পাঁচ ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত রংপুর-৩ আসন। সাবেক রাষ্ট্রপতি এইচ এম এরশাদের জাতীয় পার্টির দুর্গখ্যাত এই আসনে বিএনপি একবার জয় পেয়েছে ১৯৭৯ সালে। ধানের শীষ প্রতীকে সংসদ সদস্য হয়েছিলেন অ্যাডভোকেট রেজাউল হক সরকার রানা।
এবার এই আসনে নিজেদের অবস্থান শক্ত বলে মনে করছে বিএনপি। দলীয় সিদ্ধান্তে রংপুর মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক সামসুজ্জামান সামুকে প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে। তার প্রতি নাখোশ মনোনয়নবঞ্চিত মহানগর বিএনপির সদস্যসচিব অ্যাডভোকেট মাহফুজুন নবী ডনের কর্মী-সমর্থকরা। বারবার প্রার্থী বদলের দাবি তুলছেন সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের আমলের মন্ত্রী মশিউর রহমান জাদু মিয়ার মেয়ে রিটা রহমান।
জানা যায়, বিএনপি মনোনীত প্রার্থী সামসুজ্জামান সামু রংপুর মহানগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। এর আগে জেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক, মহানগরের সিনিয়র সহসভাপতি ও ভারপ্রাপ্ত সভাপতি দায়িত্ব পালন করেন। সামসুজ্জামান সামু কারমাইকেল কলেজের ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। পরবর্তী সময়ে জেলা ছাত্রদলের একই পদে নেতৃত্বে দিয়েছিলেন এবং রাজশাহী বিভাগীয় ছাত্রদলের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদকও ছিলেন তিনি। স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে রাজপথে সম্মুখসারিতে থাকা বিএনপির এই নেতা হাসিনাবিরোধী আন্দোলনে ছিলেন সামনের সারিতে। তিনি স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে বৃহত্তর রংপুর অঞ্চলের সর্বদলীয় ছাত্র ঐক্য পরিষদের সভাপতি ছিলেন।
সামসুজ্জামান সামু ‘সমৃদ্ধ রংপুর’ রূপকল্পে তরুণদের স্বনির্ভরতার ক্ষেত্রে বিকল্প ক্ষেত্র প্রস্তুত, কর্মসংস্থান দৃষ্টিতে কার্যকর কৌশল গ্রহণ ও বাস্তবায়ন, শিক্ষিত বেকারদের জন্য জামানতবিহীন ঋণ কর্মসূচিব্যবস্থা, শিল্পায়নে বন্ধ্যাত্ব ঘোচানো, জাতীয় বাজেটের রংপুরের জন্য বৈষম্য হ্রাস ও ন্যায্যহিস্যা নিশ্চিতকরণ, নারীর ক্ষমতায়নে বিশেষ কর্মসূচি গ্রহণ ও বাস্তবায়ন, স্বাধীন কণ্ঠস্বর প্রকাশের ক্ষেত্রে পরিবেশ তৈরি, শ্যামা সুন্দরী খালকে নগরবাসীর স্বাস্থ্য ও পরিবেশবান্ধব করা এবং রংপুর প্রযুক্তি শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের হাব হিসেবে গড়ে তোলার ব্যাপারে গুরুত্বারোপ করেছেন বৈষম্যবিরোধী নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক সামসুজ্জামান সামু।
এই আসনে জাতীয় পার্টি না থাকায় প্রচারে এগিয়ে জামায়াতে ইসলামী। দলীয় প্রার্থী কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য অধ্যাপক মাহবুবুর রহমান বেলাল। এর আগেই রংপুর সিটি করপোরেশনের নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার আশা প্রকাশ করলেও দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে যেতে পারেননি। তবে এবার জাতীয় পার্টি না থাকায় আসনটিতেই সুযোগ ছাড়া করতে চান না তিনি। শিক্ষাজীবন শেষে বিভিন্ন বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কর্মরত ছিলেন তিনি। পরবর্তী সময়ে রানীপুকুর কলেজে যোগদান করেন এবং সহকারী অধ্যাপক হিসেবে দায়িত্ব পালন শেষে অবসরে যান।
মাহবুর রহমান বেলাল ১৯৮৪ সালের রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতিতে সম্মান এবং একই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৮৬ সালে এমএ ডিগ্রি অর্জন করেন। তিনি ইসলামী ছাত্রশিবিরের প্রতিষ্ঠাকালীন কারমাইকেল কলেজের শাখার সভাপতি, পরের অংকুর শহর সভাপতি, অবিভক্ত ঢাকা মহানগরী সেক্রেটারি, কেন্দ্রীয় কার্যকরী পরিষদ সদস্য এবং কেন্দ্রীয় প্রচার সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
ছাত্রজীবন শেষে তিনি জামায়াতে ইসলামীতে যোগদান করেন এবং বিভিন্ন সময়ের রংপুর শহর শাখার আমির, জেলার সেক্রেটারি ও আমির এবং মহানগরীর আমির হিসেবে দীর্ঘ সময় দায়িত্ব পালন করেন। বর্তমানে তিনি জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য ও রংপুর-দিনাজপুর অঞ্চল পরিচালনা কমিটির সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। রাজনৈতিক কারণে ২০১৮ সালে তিনি ৬ মাস কারাভোগ করেন। জুলাই আন্দোলনে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। মাহবুবুর রহমান বেলাল খবরের কাগজকে বলেন, ‘আমরা দেখছি প্রশাসনের লোকজন একটি বিশেষ দলের ভূমিকা পালন করছেন। এখন পর্যন্ত লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরি হয়নি।’
ইসলামী আন্দোলন
ইসলামী আন্দোলনের আমিরুজ্জামান পিয়াল এখন পরিচিত মুখ। রাজনীতির শুরুতে জাসদ ছাত্রলীগ করতেন। পরবর্তী সময়ে ১৯৯৮ সালে ইসলামী আন্দোলনের রাজনীতিতে যোগদান করেন। ভাইবোনদের বেশির ভাগই চিকিৎসক। বিএ পাস করা আমিরুজ্জামান পিয়ালই ব্যবসার পাশাপাশি রাজনীতিতে যুক্ত হন। হামলা ও মামলার পাশাপাশি আমিরুজ্জামান পিয়ালকে কারাবরণ করতে হয়েছে। ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় শুরা সদস্য, ইসলামী শ্রমিক আন্দোলন বাংলাদেশের সাবেক কেন্দ্রীয় সহসভাপতি ছিলেন তিনি। বর্তমানে রংপুর মহানগরের সেক্রেটারি পদে রয়েছেন।
আমিরুজ্জামান পিয়াল রংপুর সিটি করপোরেশনের সর্বশেষ নির্বাচনে মেয়র পদে জাতীয় পার্টির প্রার্থী মোস্তাফিজার রহমানের সঙ্গে তুমুল প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে তোলেন। লাঙ্গল প্রতীকের প্রার্থী পেয়েছিলেন ১ লাখ ৪৬ হাজার ৭৯৮ ভোট। ৪৯ হাজার ৮৯২ ভোট পেয়ে (হাতপাখা মার্কায়) দ্বিতীয় হয়েছিলেন ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থী আমিরুজ্জামান পিয়াল। এর আগে ২০১৮ সালে অনুষ্ঠিত সংসদ নির্বাচনেও অংশ নিয়েছিলেন তিনি।
আমিরুজ্জামান পিয়াল বলেন, হাতপাখার রিজার্ভে সিটি নির্বাচনের ৫০ হাজার ভোট রয়েছে আগেরই। এর সঙ্গে ৫টি ইউনিয়নে অংশগ্রহণ করা পূর্বের চেয়ারম্যান প্রার্থীদের প্রাপ্ত ভোট যোগ করলে রিজার্ভ ভোটই রয়েছে এক লাখের ঊর্ধ্বে। তিনি জয়ের ব্যাপারে আশাবাদী।
রংপুর-৩ আসনে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী ও ইসলামী আন্দোলন ছাড়াও গণসংহতি আন্দোলনে তৌহিদুর রহমান (মাথাল প্রতীক), খেলাফতে মজলিসের তৌহিদুর রহমান মণ্ডল রাজু (দেয়াল ঘড়ি), বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মাওলানা নুর আলম সিদ্দিক (রিকশা প্রতীক), বাম জোট থেকে বাসদের কেন্দ্রীয় নেতা রাজেকুজ্জামান রতন অথবা জেলা আহ্বায়ক আব্দুল কুদ্দুস প্রার্থী হতে পারেন। জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) এখন পর্যন্ত প্রার্থী ঘোষণা দেয়নি। জাতীয় পার্টি অংশ নিলে পার্টির চেয়ারম্যান জি এম কাদের প্রার্থী হবেন।
জাতীয় পার্টির কো-চেয়ারম্যান মোস্তাফিজার রহমান মোস্তফা খবরের কাগজকে বলেন, ‘জাতীয় পার্টি নির্বাচনে যাবে এটি নিশ্চিত। শিগগিরই এ বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ সিদ্ধান্ত আসবে। প্রার্থী সব জায়গায় প্রস্তুত করা আছে। জাতীয় পার্টির ভোট আগের অবস্থানেই আছে। এবার আরও বেশি হতে পারে।’
তিনি আরও বলেন, ‘জাপার দুর্গ রংপুরকে কেউ পিছিয়ে রাখতে পারবে না। আগে যেমন জাপার জয়জয়কার ছিল, এখনো আছে। ঠিক আবারও সেভাবেই আসবে। এখন পর্যন্ত নির্বাচনি আবহ কম। জাতীয় পার্টি যখন মাঠে নামবে, তখন পরিস্থিতি বদলে যাবে।
মাঠে তৃতীয় লিঙ্গের রানী
রংপুরে আলোচনা এখন তৃতীয় লিঙ্গের আনোয়ারা ইসলাম রানী। তিনি রংপুরের নুরপুরের বাসিন্দা। ২০১৮ সালের ভোটে জাপার চেয়ারম্যান জি এম কাদেরের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে ভোট করেছেন। ভোট পেয়েছিলেন ২৩ হাজার ৩২৬। রানী বলেন, ‘নির্বাচনের আগে জনগণকে কথা দিয়েছিলাম তাদের পাশে থাকব। সেভাবেই এলাকায় কাজ করছি।’
জনতার আওয়াজ/আ আ