রাজনীতিতে কর্মীদের মূল্যায়ন করতে হবে : সুরঞ্জন ঘোষ - জনতার আওয়াজ
  • আজ রাত ১০:৫৩, বুধবার, ১৩ই মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ৩০শে বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ, ২৬শে জিলকদ, ১৪৪৭ হিজরি
  • jonotarawaz24@gmail.com
  • ঢাকা, বাংলাদেশ

রাজনীতিতে কর্মীদের মূল্যায়ন করতে হবে : সুরঞ্জন ঘোষ

নিজস্ব প্রতিবেদক, জনতার আওয়াজ ডটকম
প্রকাশের তারিখ: শুক্রবার, ফেব্রুয়ারি ১৭, ২০২৩ ১১:১৬ অপরাহ্ণ পরিবর্তনের তারিখ: শুক্রবার, ফেব্রুয়ারি ১৭, ২০২৩ ১১:১৬ অপরাহ্ণ

 

আমি জানি, দেশ জানে, আমার অন্তরে সে দেশ নামীদামি; দেশ জানে কেন? এ দলে পরবাসী- এই দল জানে কেন? এই দলতো বিশ্বাস করেছিলাম। দলের নেতা কে হবে? আমাদের মেধা ও শক্তি সামর্থ্য জীবন যৌবন এই দলের জন্য উৎসর্গ করেছিলাম। পতিত স্বৈরাচার পতিত সাবেক আমলারা কেন অবসরে যাওয়ার সাথে সাথেই রাজনীতি করার শখ জাগে কমপক্ষে তিনটি সরকারে তলপিবাহক হয়

গত জাতীয় পার্টির সময় সে আমলা চাকরিতে যোগদান করেছে, সে সাবেক এরশাদের কর্মী হয়েছে এবং বিএনপি আমলে আরো একধাপ এগিয়ে, আওয়ামী লীগের আমলে আরো দুই ধাপ এগিয়ে সাচ্চা ছাত্রলীগের কর্মী সাজে, ঘুষ দুর্নীতি করে টাকার পাহাড় গড়ে তুলেছে। এই টাকাটা ‘জায়েজ’ করার জন্য বড় রাজনীতি দলগুলোতে যোগদান করে। তারা দেশের জন্য নয়, দলের জন্যও নয়, নিজের স্বাস্থ্য ভালো রাখার জন্য অবসরে গিয়ে বড় দল খোঁজে, কোনো দলে উপদেষ্টা হওয়া যায় এবং কোন দলে এমপি হওয়া যায়- এটাই তাদের মূল লক্ষ্য। তারা দেশ ও জাতির মঙ্গল চায় না। তাই রাজনীতি কর্মীকে মূল্যায়ন করুন, আমলাকে নয়। তবে বাংলাদেশের সমাজ ও রাজনীতিতে সৃজনশীল পরিবর্তন আনবে জনগণ। দেশের প্রয়োজনে নতুন প্রজন্ম থেকে আসবে নতুন নেতৃত্ব। আসছে দশকেই বাংলাদেশ হবে দক্ষিণ এশিয়ার সমৃদ্ধ দেশ।

বাংলাদেশ তার জন্মের পর থেকে নানা অভিধায় চিহ্নিত হয়েছে- মূলত বিদেশী রাজনৈতিক, সামাজিক পণ্ডিতদের বিচার-ব্যাখ্যায়। তাদের মূল্যায়নের ভিত্তি ছিল রাজনৈতিক-রাষ্ট্রনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক। বাংলাদেশকে কখনো বলা হয়েছে ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’, কখনো ‘দরিদ্রতম দেশ’, কখনো ‘এক নম্বর দুর্নীতিগ্রস্ত দেশ’, কখনো ‘জঙ্গিবাদী’ বা ‘সম্প্রদায়বাদী’ চরিত্র-পরিচয়ে।

দীর্ঘ চার দশক সময়ে অবশ্য কিছু কিছু সান্ত্বনা পুরস্কারও মিলেছে। যেমন পোলিও নির্মূল ও শিশুমৃত্যু হ্রাসে, প্রসূতি মৃত্যুর ক্ষেত্রে (ততটা না হলেও), জঙ্গিবাদ হ্রাসে, স্বনির্ভরতার চেষ্টায় খাদ্য-উৎপাদনে, প্রযুক্তির অগ্রযাত্রায়, ক্ষুদ্র ঋণ সহায়তায় দারিদ্র্য হ্রাসে এবং অর্থনীতির দু-একটি সূচকে (যদিও শেষোক্তটির বস্তুগত চারিত্র্যে কারো কারো অবিশ্বাসের কথা শুনি)। এসবই পরাশক্তি-প্রভাবিত প্রাতিষ্ঠানিক হিসাব-নিকাশে।

কিন্তু এসবের পাশাপাশি গত কয়েক দশকে বিশেষ করে এক-দেড় দশকে রাজনৈতিক সংস্কৃতির সুস্থতা, সুশাসন ইত্যাদি বিষয় নিয়ে বিদেশী সমালোচনায় (ইউরো-মার্কিন) বাংলাদেশের মানুষ বড় বিব্রতবোধ করছে। করেছে দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে বহির্দেশীয় মুরব্বিদের নাক গলানো ও অনাহূত পরামর্শ দানের (কারো ভাষার হেদায়েত করার) কারণে। এতে দেশের স্বাধীন সার্বভৌম সত্তার মর্যাদা নষ্ট হচ্ছে বল মনে করেন রাজনীতি সচেতন মানুষ। এসবের মূলে আমাদের সংসদীয় রাজনীতির হীনদশা, দলীয় স্বজনপ্রীতি, ব্যাপক দুর্নীতি এবং জনগণের নিরাপত্তা বিধানে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণের অভাব।

শাসনযন্ত্র যদি স্বচ্ছ, যুক্তিনিষ্ঠ, নিরপেক্ষ ও দুর্নীতিমুক্ত না হয় তাহলে এর প্রভাব সমাজের সর্বস্তরে পড়তে বাধ্য। রাজনীতির দূষণ মানে সমাজে দূষণক্রিয়ার বিস্তার। এর প্রভাব নানামাত্রিক। বিশেষ করে সমাজে সুস্থ মূল্যবোধের অভাব। ক্ষমতার লোভ, অর্থবিত্ত, ছিনতাই, গুম, অপহরণ, খুনসহ কালোবাজারি, মজুদদারি, খাদ্য ও ওষুধে ভেজাল- এ বিশাল অনাচারের তালিকা হিসাব করতে গেলে চোখ কপালে উঠবে।

অথচ আমরা অর্থাৎ সাধারণ মানুষ নির্বিকার। লেখক-কলামিস্ট দেদার লিখে চলেছেন, সম্পাদকীয় কলাম যথারীতি উপদেশ-নসিহত করছে। কিন্তু কে কার কথা শোনে। মনে হয় কোনো কথাই যথাস্থানে পৌঁছাচ্ছে না। অন্য দিকে তা পাঠক, জনচিত্ত স্পর্শ করছে বলেও মনে হয় না।

‘বাণিজ্যে বসতে ল²ী’- প্রাচীনকাল থেকে সমাজ এ আপ্তবাক্যের বাস্তবতা অনুধাবন করে আসছে। একালে তা পত্রপুষ্পপল্লবে বিস্তৃত। তবে ওই শ্লোকে এমন কথাও ছিল (এবং তা অনেকটা প্রতীকী ধরনের) বাণিজ্যের অর্ধেক প্রাপ্তি ‘কৃষিকর্মে’, তারও অর্ধেক ‘রাজসেবায়’, এখন যা আমলাতন্ত্রে চিহ্নিত। সময় পাল্টেছে, সমাজ পাল্টেছে, এমনকি দেশের ভূগোলও পাল্টেছে। তাই পূর্বাবস্থার অনেক পরিবর্তন ঘটেছে।

কৃষি এখন আর দ্বিতীয় অবস্থানে নেই। তাকে ডিঙ্গিয়ে রাষ্ট্রসেবা তথা আমলাতন্ত্র শক্তিমান দ্বিতীয় অবস্থানে। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী হয়তো একে প্রথম অবস্থানে পৌঁছে দিতে আগ্রহী হবেন। কারণ এদের শক্তিমত্তা রাজনৈতিক এবং বণিক-শিল্পপতিদের ছাড়িয়ে যায়। পাশ্চাত্য রাষ্ট্র ও সমাজ সভ্যতার সৃষ্টি আমলাতন্ত্র এ দেশে তথা ভারতীয় উপমহাদেশে পাকাপোক্তভাবে ভিত তৈরি করে পৌনে ২০০ বছর ব্রিটিশ শাসনে।

এদের ক্ষমতার ভয়াবহতা বোঝাতে একদা রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন- ‘আমলাতন্ত্রের দাঁতে বিষ’। সেটি বিদেশী শাসকশ্রেণীর ক্ষমতার কদর্য ভয়াবহতা বোঝাতে, যে ক্ষমতার বাহ্য প্রকাশ আমলাতন্ত্রের মাধ্যমে।

আশ্চর্য যে, উপমহাদেশের রাজনৈতিক শক্তি স্বশাসনের স্বার্থে বিদেশী শাসন থেকে মুক্তি চেয়েছে; কিন্তু আমলাতন্ত্রের হাত থেকে মুক্তি চায়নি- বিশেষ করে যে আমলাতন্ত্রের হাতে তারা নিগৃহীত, নির্যাতিত।

বরং পরাধীনতামুক্ত দেশে নব্য শাসকশ্রেণী পূর্বপ্রভুদের সংগঠিত, সংহত আমলাতান্ত্রিক ব্যবস্থা অটুটই রাখেনি, মাথায় তুলে বরণ করে নিয়েছিল। সে ব্যবস্থা ধারে-ভারে পূর্বঐতিহ্যই রক্ষা করে চলেছে তা নয়; তাদের পূর্ব চরিত্র আশ্চর্য দক্ষতায় সুরক্ষিত। রাষ্ট্রব্যবস্থার পরিবর্তন সত্ত্বেও এদের চরিত্রবদল ঘটানো হয়নি। এখনো তারা অমিত শক্তিধর- এমনকি মন্ত্রীদের চেয়েও। এর অন্তত একটি কারণ, মন্ত্রী বদল হয়; কিন্তু আমলা বদল হয় না। তারা শাসনতন্ত্রের শাশ্বত অংশ। এভাবেই তারা শাসনযন্ত্রের ভয়াবহ শক্তি হিসেবে বিবেচিত।

আপাতদৃষ্টিতে রাজনীতিকরা ক্ষমতাবান- কারণ তাদের হাতে দেশ-পরিচালনার ভার, বলতে হয় শাসনভার। তারাই প্রতিমন্ত্রী, মন্ত্রী, প্রধানমন্ত্রী এবং সংসদ সদস্য হিসেবে রাষ্ট্রযন্ত্রের পরিচালক। কিন্তু সত্য বলতে কী, রাষ্ট্রশাসনের নেপথ্যে প্রকৃত।

এর কারণ শুধুই কি শক্তিমান সংগঠনের অভাব, যে সংগঠন ক্ষুব্ধ মানুষকে দিকনির্দেশনা দেবে, যাতে আরব বসন্তের মতো গণজাগরণ তৈরি হবে। অবশ্য আরব বসন্তের মিসরীয় ব্যর্থতার কারণ বর্তমান আলোচনায় বিবেচ্য নয়। তাহলে কি মানুষ সবকিছু দেখে দেখে হতাশায় এতটা অভ্যস্ত যে, প্রতিবাদে উদ্যোগী হওয়ার মতো প্রেরণা পাচ্ছে না?

শাসক রাজনীতিকে ভেতরে ভেতরে নির্ভর করতে হয় আমলাতন্ত্রের ওপর, বাইরে রসদ জোগানের স্বার্থে বণিক-শিল্পপতিদের ওপর। এখানে অবশ্য রয়েছে পরস্পর নির্ভরশীলতা একে অন্যের স্বার্থরক্ষার গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি।

এরা অর্থাৎ ধনপতি গোষ্ঠী অর্থনৈতিক বিচারে অমিত-পরাক্রমী। রাজনীতির তো বটেই, কখনো কখনো বিশেষকেও তাদের কাছে মাথা নোয়াতে হয়। অর্থ এমনই অনর্থের ক্ষমতা রাখে। রবীন্দ্রনাথ একদা এসব বিষয়ে এক আশ্চর্য সত্যবাণী উচ্চারণ করেছিলেন এই বলে যে, ‘সম্প্রতি বৈশ্যরাজক যুগের পত্তন হয়েছে, সাম্রাজ্যের সাথে তার গান্ধর্ব বিবাহ ঘটে গেছে।

আসলে আধুনিকতার এ যুগে কথাটা অধিকতর তাৎপর্যে সত্য হয়ে উঠেছে। বাণিজ্যিক অর্থশক্তির এখন প্রবল প্রতাপ ও মহিমা এবং সে কারণেই পূর্বভাষা ধার করলে বলতে হয়, বাণিজ্যের সাথে রাজনীতির গান্ধর্ব বিয়ে ঘটে গেছে। আগেই বলেছি, বাণিজ্য ও রাজনীতি এখন পরস্পর নির্ভরশীল প্রকল্প এবং এটা বাংলাদেশের ক্ষেত্রে অতি বড় সত্য হয়ে দাঁড়িয়েছে।

আসছে আগামী শতকে বাংলাদেশে রাজনীতির রূপ কেমন হবে? নতুন শতকের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় কেমন ধরনের রাজনৈতিক নেতৃত্ব গড়ে উঠবে? ১০০ বছর অথবা ৫০ বছরেরর চিন্তাভাবনা নাই বা সম্ভব হলো, অন্তত দু-তিন দশকের ৮০ জনই বেঁচে থাকবেন। কী ধরনের রাজনীতির মুখোমুখি তারা হবেন?

২০২৪ অথবা ২০৩০ সাল নাগাদ বাংলাদেশের রাজনীতির রূপরেখা কেমন হবে, তা জানার জন্য কোনো দৈবজ্ঞের নিকট যাওয়ার প্রয়োজন নেই। প্রয়োজন নেই কোনো রাশিচক্র বিশ্লেষণকারীর পর্যালোচনাও। তা ছাড়া আগামী শতক শুরু হলেও যে বসন্তের ম্যাজিকের মতো সবকিছুতেই নতুন রঙ এর ছাপ লাগবে অথবা শীতকালীন হিমেল হাওয়ার বিশ শতকের অষ্টম ও নবম দশকের রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহ, রাজনীতি চর্চার গতি-প্রকৃতি, রাজনৈতিক নেতৃত্বের রকম-সকম, বিশেষ করে এসব সম্পর্কে জনসাধারণের ক্রিয়া-প্রক্রিয়ার দিকে দৃষ্টি দিন।

ভারতে উদারনৈতিক পাশ্চাত্য শিক্ষার বিস্তার, তথ্য প্রবাহের সূচনা, উন্নত যোগাযোগব্যবস্থা, একটি স্থিতিশীল মধ্যবিত্ত শ্রেণীর উদ্ভব প্রভৃতির মধ্যে এই উপ-মহাদেশে দ্বি-জাতি তত্ত্বের উদ্ভব তথা পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার মূল অনুসন্ধান করতে হবে গত শতাব্দীর ২০ এর দশকে ভারতে হিন্দু জাতীয়তাবাদের উন্মেষ, ১৮৮৫ সালে সর্বভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস এবং তার প্রতিক্রিয়া হিসেবে ১৯০৬ সালে সর্বভারতীয় মুসলিম লীগের জন্ম, ১৯০৯ সালে স্বতন্ত্র নির্বাচনব্যবস্থার প্রবর্তন, ১৯১৯-২০ সময়কালের অসহযোগ এবং খেলাফত আন্দোলন, এমনকি ১৯৩৭-৪০ সময়কালে ভারতের বৃহত্তম প্রদেশগুলোতে কংগ্রেসী শাসনের মধ্যে।

বাংলাদেশের জন্মকাহিনীর মূলও নিহিত রয়েছে ১৯৪০ সালের লাহোর প্রস্তাব, ১৯৪৬ সালের সাধারণ নির্বাচন, ১৯৪৮-৫২ সময়কালের ভাষা আন্দোলন, ১৯৬৬ সালের ছয়-দফা আন্দোলনের মতো ঐতিহাসিক ঘটনাক্রমে। ২০২৪ সালে বাংলাদেশের রাজনীতির রূপও নির্ধারিত হবে বিশ শতকের অষ্টম ও নবম দশকের এবং বর্তমানে বিদ্যমান আর্থ-রাজনৈতিক অবস্থা কর্তৃক। নির্ধারিত হবে জাতীয়, আঞ্চলিক এবং বিশ্ব পর্যায়ে বর্তমানে সূচিত তীব্র প্রতিযোগিতার উত্তরোত্তর বর্ধিত গতিধারা কর্তৃক এবং নির্ধারিত হবে বাংলাদেশের সচেতন জনসমষ্টির আত্মরক্ষা, আত্মপ্রতিষ্ঠা ও সমৃদ্ধির সৃজনশীল প্রচেষ্টা দ্বারা। প্রয়োজন হবে সঠিক তথ্যের, বিভ্রান্তিকর কোনো বিতর্কের নয়। প্রয়োজন হবে ঐক্যের, বিভাজন বা বিচ্ছিন্নতার নয়।

এই পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশের প্রস্তুতি কতটুকু? অগ্রবর্তী চিন্তাভাবনা? আগামী শতকে বাংলাদেশের অগ্রগতির ধারা ও মাত্রা নির্ভর করবে রাজনৈতিক নেতৃত্বের প্রকৃতির ওপর। বাংলাদেশে আজ যে ধরনের রাজনৈতিক কার্যকলাপ চালু রয়েছে এই পরিপ্রেক্ষিতে তা অর্থহীন, নিরর্থক। যে মানের রাজনৈতিক নেতৃত্ব আজ দেশে বিদ্যমান তা অপ্রয়োজনীয়। বিভিন্ন কারণে :

১. বাংলাদেশের রাজনৈতিক নেতৃত্ব অতীতমুখী। আগামী শতকের দাবি কিন্তু ভিন্ন। অতীতকে শুধু স্মরণ রাখাই যথেষ্ট। বর্তমানই হলো আসল। ভবিষ্যতের রঙিন স্বপ্ন প্রধান চালিকাশক্তি। বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে এই চেতনা জাগ্রত হয়নি। ইরাজিম কোহাক বলেছেন, “যে যুদ্ধের সমাপ্তি ঘটেছে, সৈন্যাধ্যক্ষরা দুর্ভাগ্যজনকভাবে তারই প্রস্তুতি গ্রহণ করেন এবং রাজনীতিবিদরাও আরো দুর্ভাগ্যজনকভাবে বিগত প্রজন্মের সমস্যা সমাধানের উদ্যোগ গ্রহণ করেন। সেসব সমস্যা পূর্ব দিগন্তে সবেমাত্র উঁকি দিতে শুরু করেছে, সে সম্পর্কে তারা মোটেই সজাগ নন। ওইসব সমস্যা সমাধানের ক্ষেত্রে তাদের কোনো প্রস্তুতি নেই। তারা অতীতে বসবাস করতে ভালোবাসেন এবং অতীতের ইস্যু নিয়েই ঘাঁটাঘাঁটি করতে অভ্যস্ত। তারা বর্তমানকে কাটাছেঁড়া করেন। অতীতকে বুকে চেপে বেঁচে থাকতে চান। ভবিষ্যতের উজ্জ্বল স্বপ্নে তারা ক্বচিৎ উদ্বেল হয়ে উঠেন।’ বাংলাদেশে রাজনৈতিক নেতৃত্বের চেহারা এমনি। এমনকি কার্যকরণের বিন্যাসে পর্যন্ত অবহেলা আর ঔদাসীন্য প্রদর্শন করে থাকেন।

দৃষ্টান্তস্বরূপ, দেশে বিদেশী বিনিয়োগ বৃদ্ধির জন্য ‘অর্থনৈতিক কূটনীতির’ নামে উচ্চকণ্ঠ হয়েও বিনিয়োগ বৃদ্ধির যেসব মৌলিক শর্ত রয়েছে তার প্রতি উদাসীন। দেশী বিনিয়োগকারীদের যথাযথ উৎসাহ দানে তারা কুণ্ঠিত। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি রোধে তেমন আগ্রহী নন। উন্নয়নের লক্ষ্য, অর্থনৈতিক অবকাঠামো বিনির্মাণে ভীষণ অনীহা। আমলাতান্ত্রিক জটিলতা নিরসনে যথার্থ পদক্ষেপ গ্রহণে দেখা যায়, হয় উত্তাপের অভাব, না হয় উদ্যোগের কমতি। সমাজে বিদেশীদের আকৃষ্ট করার জন্য মনোভাব ও দৃষ্টিভঙ্গিতে বিশ্বনাগরিকতার যে চেতনা তার দিকে কোনো খেয়াল নেই।

২. আমাদের দেশে রাজনৈতিক নেতৃত্ব অনেকটা অক্ষম ও অযোগ্য সন্তানরা যেমন সব সময় পৈতৃক সম্পত্তির দিকে নজর রেখে হালকা হাওয়ায় গা ভাসিয়ে চলে এবং অতীতের সম্পত্তিতে ভাগ বসিয়ে বেঁচে থাকতে চায়, ঠিক তেমনি জাতীয় পর্যায়ে অতীত অর্জনকে নিয়ে ঝগড়া-ফ্যাসাদে প্রবৃত্ত হতে ভালবাসে। নিজেরা বড় কিছু অর্জনে হয় অক্ষম, না হয় আগ্রহহীন। দৃষ্টান্তস্বরূপ, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের গৌরবকে আমাদের দেশের নেতানেত্রীরা ভাগাভাগি করে উপভোগ করতে চান। ভবিষ্যতের কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করলে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের নাগরিকদের ঘরে ঘরে মুক্তিযুদ্ধের ফসল যথার্থরূপে তুলে দেয়া যায়।

৩. বাংলাদেশের রাজনৈতিক নেতৃত্ব অন্য আর একটি কারণেও বর্তমানের জন্য বিশেষ করে ভবিষ্যতের জন্য পুরোপুরি অনুপযোগী। আগামী শতকে গণতন্ত্রের সাফল্য নির্ভর করবে রাজনৈতিক নেতৃত্বের এমন সব ‘অপ্রীতিকর’ সিদ্ধান্তের উপর যার সাথে অতীত অভিজ্ঞতার কোনো সম্পর্ক নেই। বিশ শতকের শেষ পর্যায়ে স্নায়ু-যুদ্ধোত্তর বিশ্বে রাজনৈতিক নেতৃত্ব এমন পরিবেশে কাজ করেছেন যেখানে শত্রুর উপর বিজয় অর্জনই ছিল সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য। আগামী শতকের রাজনৈতিক নেতাদেরকে এমন পরিবেশে কাজ করতে হবে যেখানে বন্ধুত্ব স্থাপনই হয়ে উঠবে প্রধান গন্তব্য। রক্তসিক্ত প্রান্তরে শত্রু নিধনের পরিবর্তে তাদের শস্যশ্যামল মাঠে নতুন নতুন বন্ধু সৃষ্টির প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ হতে হবে। ফলে কোনো কোনো সমাজে, বিশেষ করে উন্নয়নশীল বিশ্বের অধিকাংশ সমাজে দেখা দেবে এক ধরনের ‘প্রশিক্ষিত অযোগ্যতা’। শুধু সৃষ্টিশীল, অগ্রগামী, দূরদৃষ্টিসম্পন্ন রাজনৈতিক নেতৃত্বের পক্ষেই সম্ভব হবে সেই ‘প্রশিক্ষিত অযোগ্যতার’ কবল থেকে মুক্তিলাভ।

কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত আমাদের দেশে তেমন নেতৃত্বের গুণাবলির অপ্রতুলতা অত্যন্ত প্রকট। সোভিয়েত ইউনিয়ন খণ্ডছিন্ন হয়ে পড়লে এবং বিশ্বময় সমাজতন্ত্রের পতনের পরে যেমন ‘কমিউনিজম-বিরোধী স্লোগানের আবেদন অর্থহীন হয়ে পড়ে, অনেকটা সেই কিংবদন্তি বংশীবাদকের বাঁশির সুর যেমন অপ্রয়োজনীয় হয়ে পড়ে ইঁদুরগুলো নদীতে ডুবে যাওয়ার পরে, তেমনি চব্বিশ শতকে রাজনৈতিক নেতৃত্বের এখনো বিশ শতকের উপযোগী গুণাবলিও অপ্রয়োজনীয় হয়ে পড়েছে। বাংলাদেশে কিন্তু রাজনৈতিক নেতৃত্ব স্বাধীনতার পক্ষের ও বিপক্ষের শক্তির বিতর্কের আবর্তেই ঘুরপাক খাচ্ছে; উন্নততর আদর্শের হাতছানিতে উদাসীন।

দীর্ঘ দিন পরে বাংলাদেশের ভূ-রাজনৈতিক ও কৌশলগত অবস্থানে বিপ্লবাত্মক পরিবর্তন এসেছে। বহুদিন পরে এক ধরনের ‘ব্যাক ওয়াটার’ বা সাধারণ অবস্থান থেকে আগামী শতকের মহাসমারোহে যোগ দেয়ার পর্যায়ে বাংলাদেশ ক্রমে ক্রমে এগিয়ে এসেছে। দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ‘সংযোগ পয়েন্ট’ হিসাবে বাংলাদেশের অবস্থান তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এই অবস্থানের পূর্ণ সুযোগ গ্রহণ করতে পারলে বাংলাদেশ নতুন ইতিহাস সৃষ্টি করবে বলে আমাদের বিশ্বাস। ভারত-চীন-থাইল্যান্ড-ইন্দোনেশিয়ার সন্ধিস্থলে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশ সৃজনশীল কূটনীতির মাধ্যমে শুধু নিজের অবস্থান পরিবর্তন করবে না, অন্যান্য বৃহৎশক্তির গতিবিধিও কিছুটা নিয়ন্ত্রণে সক্ষম হবে।

অভ্যন্তরীণ ক্ষেত্রে এরই মধ্যে বাংলাদেশেও নতুন অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। ১৯৯১ সালে বাংলাদেশে সংসদীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়েছে। সংসদের নিকট দায়ী মন্ত্রিপরিষদের প্রধান হয়েছেন রাষ্ট্রের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা। রাজনীতির প্রধান চালিকাশক্তি হিসাবে রাজনৈতিক দল ফিরে পেয়েছে তার গৌরব। দেশের রাজনৈতিক দলগুলো কিভাবে সংগঠিত এবং সৃষ্টিশীল নেতৃত্বের গুণে কিভাবে চালিত হলো তার উপরই নির্ভর করছে আগামী শতকে বাংলাদেশের অগ্রগতির ধারা ও মাত্রা। গণতান্ত্রিক অবস্থা এবং রাজনৈতিক দল অচ্ছেদ্য এক স্বর্ণসূত্রে আবদ্ধ। একটিকে বাদ দিয়ে অন্য দিকে সঠিকভাবে অনুধাবন প্রায় অসম্ভব। জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষা ধারণ করে দুই-ই হয় ধন্য। সমাজে উন্নত জীবনবোধ প্রতিষ্ঠাই দুই-এরই লক্ষ্য। সংস্কৃতি ক্ষেত্রে ঐকমত্য প্রতিষ্ঠা দুই-এরই ভিত্তি। ভবিষ্যতের সুখ স্বপ্নে উভয়ই উদ্বেল।
রাজনৈতিক দল যদি উন্নত চিন্তাভাবনায় সচকিত না হয়, তাহলে গণতন্ত্র কেন, সমাজ জীবনেও নেমে আসে ব্যর্থতার ঘন কুয়াশা। ক্ষোভ-প্রতিহিংসা-অসহিষ্ণুতার মরুভূমিতে গণতন্ত্র যেমন পথ হারায়, রাজনৈতিক নেতৃত্বের পথও তেমনি হয় রুদ্ধ। গণতন্ত্রের সবুজ উদ্যানেই প্রস্ফুটিত হয় রাজনৈতিক নেতৃত্বের লাল গোলাপ আর এই লাল গোলাপই আগামী শতকের মহান উদ্যোগে বাংলাদেশকে দান করতে পারে তার যথার্থ স্থান।

আগামী দিনে বাংলাদেশের আর কিছু না থাকলেও তার রয়েছে কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান, চীন-ভারতের মাঝামাঝি অবস্থানে থাইল্যান্ড ইন্দোনেশিয়ার অনতিদূরে, পূর্ব ও পশ্চিমের সন্ধিস্থলে ভূ-রাজনৈতিক ‘লোকেশনে’ যা কোনো বৃহৎশক্তি, যদি বাংলাদেশ স্বেচ্ছায় নিজের ঘরের চাবি অন্য কারো হাতে তুলে না দেয়, না পারবে গিলতে, না পারবে ফেলতে। এই অবস্থানের সঠিক সুযোগ গ্রহণের জন্য বাংলাদেশের প্রয়োজন শুধু উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ রচনার দৃঢ়সঙ্কল্প এবং বাস্তবায়নের লক্ষ্যে বর্তমানকে ক্রমবর্ধমান জাতীয় কার্যক্রমের ক্ষেত্র হিসাবে সুসজ্জিত করা। ১৯৯২-৯৫ সালে সবার অলক্ষ্যে বাংলাদেশ ‘উদীয়মান ব্যাঘ্রের’ প্রতীকে পরিণত হয়েছিল। সচেতন উদ্যোগ গ্রহণ করা হলে ২০২৪ সাল নাগাদ বাংলাদেশ আর কিছু করতে না পারলেও রোগ-ব্যাধি, দারিদ্র্য ও নিরক্ষরতার উপর বিজয় অর্জনে সক্ষম হবে যদি, আবারো বলছি, বাংলাদেশ মাথা উঁচু করে টিকে থাকার সঙ্কল্পে দৃঢ় থাকে এবং আগামী দিনের জন্য নিজেকে তৈরি করতে সঙ্কল্পবদ্ধ হয়।

বাংলাদেশের কিন্তু এক মহামূল্যবান সম্পদ রয়েছে এবং তা হলো দেশের সচেতন ও সংগ্রামী এক বিরাট জনসমষ্টি। এ জাতি আজো যা কিছু নিয়ে গর্ব করে তাদের সবটুকুই জনগণের সৃষ্টি। গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার অভিযানের দিকে দৃষ্টি দিলে গণশক্তির প্রভাব কিছুটা আঁচ করা সম্ভব।

এ প্রসঙ্গে উল্লেখ করা যেতে পারে, বর্তমানে দেখা যায়, অতীতেও দেখা গেছে, যখন কোনো আন্দোলনের সূচনা হয়, তখন এ দেশের জনগণই অগ্রণী ভূমিকা পালন করে এবং নেতানেত্রীদের পুরাভাগেই তারা অবস্থান গ্রহণ করে থাকে। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধেও তা সুস্পষ্ট হয়েছে। সুস্পষ্ট হয়েছে ১৯৬৯ সালের গণ-অভ্যুত্থানে, ১৯৯০ সালের গণতন্ত্র পুনর্বাসন আন্দোলনে।

আমাদের ধারণা, আজকের অনুপযোগী রাজনীতি ও অক্ষম রাজনৈতিক নেতৃত্ব এভাবে বেশিদিন টিকে থাকবে না। আগামী দু-তিন দশকে এ ক্ষেত্রে দেখা যাবে বিপ্লবাত্মক পরিবর্তন। এসব পরিবর্তনের চালিকাশক্তি হিসাবে পুরোভাগে নিশ্চয় থাকবে জনগণ। তবে আঞ্চলিক ও বিশ্ব পর্যায় থেকেও তারা লাভ করতে পারে প্রেরণা এই কারণে যে, বিশ্বায়নের এই আমলে যখন প্রতিযোগিতার মাধ্যমেই সম্ভব আত্মরক্ষা বা আত্মপ্রতিষ্ঠা, তখন চার দিক থেকে শুধু চাপই অনুভূত হবে না, উষ্ণ হাওয়ার গতিবেগও অনুভব করা সম্ভব। তাই বলছি, আগামী শতকের দ্বিতীয় অথবা তৃতীয় দশকে বাংলাদেশে রাজনীতির বন্ধ্যত্ব ঘুচে যাবে। অনুপযোগী রাজনৈতিক নেতৃত্বের দিন ফুরোবে। ছলচাতুরীর রাজনীতি শুকনো পাতার মতো ঝরে পড়বে। অতীতের মতোই এই মহান উৎসবের নাম ভূমিকায় থাকবে বাংলাদেশের জনগণই। তারাই নতুনভাবে সামাজিক চুক্তি সম্পাদন করবে নিজেদের মধ্যে, যেন উন্নত জীবনের সুযোগ তাদের হাতছাড়া না হয়।

কলামিস্ট : নব্বইয়ের সর্বদলীয় ছাত্র ঐক্যের কেন্দ্রীয় সাবেক ছাত্রনেতা

 
 
জনতার আওয়াজ/আ আ
 
 

জনপ্রিয় সংবাদ

 

সর্বোচ্চ পঠিত সংবাদ