রাজনৈতিক সংকট: নাগরিক সমাজের মতসংলাপের বিকল্প সংলাপ
নিজস্ব প্রতিবেদক, জনতার আওয়াজ ডটকম
প্রকাশের তারিখ:
শনিবার, অক্টোবর ২১, ২০২৩ ২:৩১ পূর্বাহ্ণ পরিবর্তনের তারিখ:
শনিবার, অক্টোবর ২১, ২০২৩ ২:৩১ পূর্বাহ্ণ

নিউজ ডেস্ক
সংসদ নির্বাচনের বাকি আর মাত্র দুই মাস। এখনো ঘোষণা হয়নি নির্বাচনী তফসিল। তবে এ নির্বাচনকে ঘিরে উত্তপ্ত রাজপথ। দুই বৃহৎ দল এখন মুখোমুখি। চলছে পাল্টাপাল্টি কর্মসূচি। সরকার পতনের একদফা দাবিতে আগামী ২৮শে অক্টোবর ঢাকায় মহাসমাবেশের ডাক দিয়েছে বিএনপি। অভিন্ন কর্মসূচি দিয়েছে সমমনা ও কয়েকটি ইসলামী দল। ওইদিন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগও পাল্টা সমাবেশ করার কথা জানিয়েছে। একই সঙ্গে ঢাকার সবক’টি প্রবেশমুখে সতর্ক অবস্থান নিতে দলটির নেতাকর্মীদের নির্দেশনাও দিয়েছে। পরিস্থিতি যখন এই তখন বিভিন্ন মহল থেকে উঠে এসেছে সংলাপের আহ্বান।
তাদের কথা সংলাপের বিকল্প কিছু নেই। সংলাপের বিকল্প সংলাপই। বিশিষ্টজনরাও রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি সংলাপে বসার আহ্বান জানিয়েছেন। তাদের কথা সহিংসতা ও সংঘাত এড়ানোর একমাত্র পথই হলো সংলাপ। চলমান রাজনৈতিক সংকটও সমাধান হবে সংলাপের মাধ্যমে।
টিআইবি’র নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান মানবজমিনকে বলেন, বিএনপি-আওয়ামী লীগ দুই পক্ষই সংঘাতময় পরিস্থিতির দিকে আছে। যা গণতন্ত্রের জন্য শুভকর নয়। দেশবাসীর প্রত্যাশা এই সংঘাতময় বা বিপরীতমুখী অবস্থান থেকে পরস্পর সরে এসে জাতির স্বার্থে ঐকমত্যে পৌঁছানোর চেষ্টা করবে রাজনৈতিক দলগুলো। তিনি বলেন, ক্ষমতাকেন্দ্রিক রাজনীতিতে সাধারণ মানুষের যে স্বার্থ, সেটা কিন্তু পদদলিত হচ্ছে। ব্যবসা-বাণিজ্য, পেশাজীবীদের স্বাধীনভাবে কাজ করার পরিবেশ বিনষ্ট হচ্ছে। তাদের কর্মক্ষমতা বিনষ্ট হচ্ছে। কাজের সুযোগ নষ্ট হচ্ছে। কাজেই এই পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষের তুলনায় রাজনৈতিক নেতাদের আরও গভীরভাবে বোঝার চেষ্টা করতে হবে। কারণ তারা তো জনস্বার্থে বা জনগণের কল্যাণে রাজনীতি করেন বলে আমরা জানি। যদি তা হয় তাহলে, এই বিপরীতমুখী অবস্থান থেকে সরে এসে জনস্বার্থে, গণতন্ত্রের স্বার্থে তাদের আলোচনার টেবিলে বসা উচিত। সংলাপের মাধ্যমে সংকট সমাধান করা উচিত। সাধারণ মানুষ এটাই আশা করে।
সাবেক আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ বলেন, পাল্টাপাল্টি কর্মসূচিতে কি হচ্ছে বলা যাচ্ছে না। তবে আলোচনার পথে আসা উচিত। আলোচনার বিকল্প নেই।
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার বলেন, রাজনৈতিক দলগুলো যদি কর্মসূচি দেয়, সমাবেশ করে কিংবা মিছিল করে এটা তো তাদের অধিকার। এটাতে যদি বাধা দেয়া হয় তাহলে তো সংঘাত অনিবার্য। রাজনৈতিক পরিস্থিতি একটা ভয়াবহ পরিস্থিতির দিকে ধাবিত হচ্ছে। দেশের বর্তমান এই সংকট থেকে উত্তরণে সংলাপের বিকল্প নেই। রাজনৈতিক দলগুলোকে সমঝোতার মধ্যদিয়ে সমাধান খুঁজতে হবে। আমরা রাজনৈতিক দলগুলোকে সমঝোতার আহ্বান জানাচ্ছি। তিনি বলেন, বিদেশিরাও একই কথা বলছেন। মূল কথা-সংকট সমাধানে রাজনৈতিক দলগুলোকে সমঝোতার মাধ্যমে ঐকমত্যে পৌঁছাতে হবে। আমরা যদি সঠিক সময়ে সমঝোতা না করতে পারি, তাহলে এর পরিণতি ভয়াবহ হতে পারে।
জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি প্রফেসর ড. হারুন-অর-রশিদ মানবজমিনকে বলেন, বাংলাদেশের রাজনীতি হলো দুটি মেরুতে বিভক্ত। এর রূপ হলো সাংঘর্ষিক। জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে এই সাংঘর্ষিক রূপটা প্রকটভাবে দেখা দেয়। বিরোধী দল বিশেষ করে প্রধান বিরোধী দল বিএনপি এবং তার সঙ্গে যারা রয়েছে, তারা যে একদফার দাবিতে অর্থাৎ সরকারের পদত্যাগের দাবিতে যে আন্দোলন করছে তা বাস্তবায়িত হওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই। অপর দিকে মার্কিন ভিসা নীতিসহ পশ্চিমা দেশগুলো যে অবস্থান নিয়েছে, সেই অবস্থানে তারা যদি অনড় থাকে এবং প্রয়োগ করে তাহলে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে সরকারি কিংবা বিরোধী দল কারোই পক্ষে সহিংস কর্মকাণ্ডের আশ্রয় নেয়ার সুযোগ থাকে না। আমি মনে করি গণতন্ত্রের চর্চা করতে হলে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে হবে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক রোবায়েত ফেরদৌস মানবজমিনকে বলেন, দেশের রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে এখনো সমঝোতা, সংলাপের পথ খোলা আছে। যেকোনো গণতান্ত্রিক সমাজে রাষ্ট্রের সংজ্ঞাই হচ্ছে সংলাপ, সমঝোতা, আলোচনা। এর কোনো বিকল্প নেই। সাউথ আফ্রিকাতে সাদা-কালোর মধ্যে যে বিরোধ রয়েছে, আমাদের দেশে আওয়ামী লীগ-বিএনপি’র মধ্যে তো এত বিরোধ নেই। কালো সাদার যে বিভেদ, যেটা কোনো দিন মোচন করা সম্ভব না বলে মনে করা হতো সেখানে নেলসন ম্যান্ডেলা সমঝোতা ও আলোচনা করে সমাধান করেছেন। কাজেই রক্তপাত কোনো সমাধান হতে পারে না। সবাইকে আলোচনার টেবিলে এগিয়ে আসতে হবে। তিনি বলেন, সংলাপ ব্যর্থ হলে আবারো সংলাপ করতে হবে। বর্তমান পরিস্থিতিতে এর কোনো বিকল্প নেই। অন্যদিকে সংলাপ না হলে পাল্টাপাল্টি কর্মসূচিতে মানুষ মারা যাবে। ধর্মঘট হবে, ফ্যাক্টরি বন্ধ হয়ে যাবে। আমাদের রিজার্ভের পতন ঘটবে। রেমিট্যান্স আরও কমে যাবে। বিশ্ববিদ্যালয়, স্কুল কলেজগুলো বন্ধ হয়ে যাবে। সার্বিকভাবে রাষ্ট্র ও জাতি ক্ষতির মুখে পড়বে। যেটা আমরা নাগরিকরা কেউ চাই না।
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী এডভোকেট মনজিল মোরসেদ বলেন, বাংলাদেশে পাল্টাপাল্টি কর্মসূচি একটা রাজনৈতিক কালচারে পরিণত হয়েছে। সরকার বলছে সংবিধানের বাহিরে যাবে না, বিএনপি বলছে নির্বাচন হতে দিবে না। দুই পক্ষের কথাই যদি সত্য হয় তাহলে দেশের জনগণ পিষ্ট হয়ে যাবে। একটা ভয়াবহ অবস্থা সৃষ্টি হবে। সামগ্রিকভাবে আমার কাছে মনে হয় রাজনৈতিক দলগুলো মাঠটা গরম রাখতে চায়। যাতে জনগণ মনে করে এরা খুব শক্তিশালী, এদের পক্ষেই থাকতে হবে। নির্বাচন নিয়ে আদর্শিকভাবে যে মতপার্থক্য রয়েছে এটার সমাধান আলোচনা ছাড়া বিকল্প কিছু আছে বলে মনে করি না। বিদেশি যেসব প্রতিনিধি এসেছেন তারাও কিন্তু সংলাপের কথাটি বলছেন। সংলাপকে গুরুত্ব দিয়েছেন। এজন্য দু’পক্ষকেই ছাড় দেয়ার মন-মানসিকতা নিয়ে এগিয়ে আসতে হবে। তাহলে সংলাপ সফল হবে। নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে করা যাবে। এক পক্ষকে ছাড় দিলে হবে না। দুই পক্ষকে এগিয়ে আসতে হবে। আলোচনায়, সংলাপে বসতে হবে। মনে রাখতে হবে-সংলাপের বিকল্প সংলাপ।
সূত্রঃ মানবজামিন
জনতার আওয়াজ/আ আ