রাজশাহী-২ আসনে মিনুতে চাঙা বিএনপি, জয় চায় জামায়াত - জনতার আওয়াজ
  • আজ রাত ২:৩৬, বৃহস্পতিবার, ১৪ই মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ৩১শে বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ, ২৭শে জিলকদ, ১৪৪৭ হিজরি
  • jonotarawaz24@gmail.com
  • ঢাকা, বাংলাদেশ

রাজশাহী-২ আসনে মিনুতে চাঙা বিএনপি, জয় চায় জামায়াত

নিজস্ব প্রতিবেদক, জনতার আওয়াজ ডটকম
প্রকাশের তারিখ: শুক্রবার, নভেম্বর ২৮, ২০২৫ ৬:৩৪ অপরাহ্ণ পরিবর্তনের তারিখ: শুক্রবার, নভেম্বর ২৮, ২০২৫ ৬:৩৪ অপরাহ্ণ

 

জনতার আওয়াজ ডেস্ক
ছবি: সংগৃহীত
উত্তরাঞ্চলের আলোচিত ও সবচেয়ে স্পটলাইটে থাকা সংসদীয় এলাকা রাজশাহী-২ (সদর) আসন। পুরো রাজশাহী সিটি করপোরেশন নিয়ে গঠিত এ আসনকে বিএনপির দুর্গ হিসেবে মানা হয় বহুদিন ধরেই। তিন লাখের বেশি ভোটারের এ আসনে ১৯৯১ সাল থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত বিএনপির প্রবল দাপট ছিল। ২০০৮ সালে এ আসনে প্রথমবার নৌকার জয় হয়। এরপর থেকে বিতর্কিত তিনটি নির্বাচনে আসনটি দখলে রাখে আওয়ামী লীগের শরিক হিসেবে ওয়ার্কার্স পার্টির ফজলে হোসেন বাদশা। এবার হারানো দুর্গ ফিরে পেতে মরিয়া বিএনপি। ফলে তিন মেয়াদের সাবেক মেয়র, সাবেক সংসদ সদস্য এবং দলের চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা মিজানুর রহমান মিনুকে এই আসনে আবারও মনোনয়ন দিয়েছে বিএনপি।

প্রার্থী ঘোষণার পরপরই বিএনপির ভেতর দেখা গেছে নতুন উদ্দীপনা। মিছিল, পথসভা, গণসংযোগ, উঠান বৈঠক- বহু বছর পর এমন প্রাণচাঞ্চল্যে আলোড়িত হয়ে উঠেছে রাজশাহীর অলিগলি। কিন্তু প্রতিদ্বন্দ্বীরা পিছিয়ে নেই। আসনটিতে জামায়াত প্রার্থী ঘোষণা করা হয়েছে রাজশাহী মহানগরীর নায়েবে আমির ডা. মোহাম্মদ জাহাঙ্গীরকে। দলটি এবার এ আসনে জিততে চায়। এ জন্য নানা পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছে। এরই মধ্যে নগরীর প্রতিটি ওয়ার্ডে সমাবেশ করেছে জামায়াত। নারীদের নিয়ে তারা আলাদা সভা করেছে। গঠন করা হয়েছে প্রতিটি ওয়ার্ডের জন্য নির্বাচনি কমিটি।

এদিকে নতুন রাজনৈতিক দল জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) এ আসনে লড়াইয়ের প্রস্তুতি নিচ্ছে। এরই মধ্যে দলের মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ ও নির্বাচনি বোর্ডে সাক্ষাৎকার দিয়েছেন এনসিপির রাজশাহী মহানগরীর আহ্বায়ক মোবাশ্বের আলী লাল্টু। লাল্টু অন্যতম জুলাইযোদ্ধা হিসেবে পরিচিত। জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার আন্দোলনের সময় রাজপথে বলিষ্ঠ ভূমিকা রেখেছেন তিনি।

জানা যায়, ১৯৯১ ও ১৯৯৬ সালের নির্বাচনে বিএনপি থেকে কবীর হোসেন এবং ২০০১ সালে তৎকালীন সিটি মেয়র মিজানুর রহমান মিনু এমপি নির্বাচিত হন। ওই নির্বাচনে সারা দেশের মধ্যে রেকর্ডসংখ্যক তৃতীয় সর্বোচ্চ ভোট পান তিনি। রাজনৈতিক বিচক্ষণতা আর সাংগঠনিক দক্ষতার কারণে মূলত ১৯৯৬ সাল থেকেই রাজশাহী মহানগরীর বিএনপির রাজনীতি মিনুর নিয়ন্ত্রণে ছিল। এরপর ২০০৮ সাল থেকে আওয়ামী লীগের শরিক হিসেবে ওয়ার্কার্স পার্টির ফজলে হোসেন বাদশা ২০১৮ সালের নির্বাচন পর্যন্ত রাজশাহী-২ আসনের এমপি ছিলেন। সর্বশেষ ২০২৪ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের ডামি প্রার্থী শফিকুর রহমান বাদশা এ আসনে এমপি নির্বাচিত হন।

১৯৯১ সালে এ আসনে মোট ভোটার ছিলেন ২ লাখ ৫১ হাজার ১৫০ জন। এর মধ্যে প্রদত্ত ভোটের সংখ্যা ১ লাখ ৮৬ হাজার ৬৮৯। নির্বাচনে ধানের শীষ প্রতীকে বিএনপির প্রার্থী কবির হোসেন নির্বাচিত হন। তিনি পান ৮১ হাজার ১৪ ভোট। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতের প্রার্থী আতাউর রহমান দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে পান ৪০ হাজার ১৪১ ভোট। ওই নির্বাচনে ইউনাইডেট কমিউনিস্ট লীগ থেকে প্রার্থী ছিলেন ফজলে হোসেন বাদশা। তিনি পান ৩৪ হাজার ২৬৭ ভোট। আর আওয়ামী লীগের মাহাবুবউজ্জামান ভুলু নৌকা প্রতীকে পান মাত্র ২৪ হাজার ৪৭ ভোট। গুরুত্বপূর্ণ এ আসনটিতে ১৯৯৬ সালের নির্বাচনে ভোটারসংখ্যা ছিল ২ লাখ ৯৩ হাজার ৩৭২। এর মধ্যে ভোট পড়ে ২ লাখ ৪৮ হাজার ৬২৫টি। এ নির্বাচনেও বিপুল ভোটে বিজয়ী হন বিএনপির প্রার্থী কবির হোসেন। তিনি পান ১ লাখ ৮ হাজার ৪৭১ ভোট। ওই নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ভুলুকে বাদ দিয়ে নৌকার প্রার্থী করা হয় এ এইচ এম খায়রুজ্জামান লিটনকে। কিন্তু তিনি ৭৫ হাজার ৮০৩ ভোট পেয়ে পরাজিত হন। ওই নির্বাচনে জামায়াতের আতাউর রহমান পেয়েছিলেন ৪১ হাজার ৭৭৪ ভোট। আর ওয়ার্কার্স পার্টি থেকে প্রার্থী হয়ে ফজলে হোসেন বাদশা মাত্র ৩ হাজার ৮৩৮ ভোট পান।

২০০১ সালের নির্বাচনেও বিএনপি অদম্য ছিল এই সদর আসনে। ওই নির্বাচনে এ আসনে মোট ভোটার ছিলেন ৩ লাখ ৬৩ হাজার ৫২৫ জন। প্রদত্ত ভোট ২ লাখ ৯৬ হাজার ১০৬টি। ওই নির্বাচনে বিএনপি থেকে ধানের শীষের প্রার্থী ছিলেন তুমুল জনপ্রিয় নেতা মিজানুর রহমান মিনু। মিনু ১ লাখ ৭৬ হাজার ৪০৫ ভোট পেয়ে এমপি নির্বাচিত হন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী আওয়ামী লীগের খায়রুজ্জামান লিটন নৌকা প্রতীকে পান ৯৬ হাজার ৬০৪ ভোট। মিনু ৭৯ হাজার ৮০১ ভোটের ব্যবধানে লিটনকে পরাজিত করেন। ওই বছর ১১ হাজার ৪৯০ ভোট পেয়ে তৃতীয় হন ওয়ার্কার্স পার্টির ফজলে হোসেন বাদশা। তবে পুনর্বিন্যাসের কারণে ২০০৮ সালে এ আসনে ভোটার ছিলেন ২ লাখ ৫৮ হাজার ৭৫৯ জন। সেবার ভোট পড়ে ২ লাখ ১২ হাজার ২৩৫টি। আওয়ামী লীগের সঙ্গে জোটবদ্ধ নির্বাচনে নৌকার টিকিটে ওয়ার্কার্স পার্টির ফজলে হোসেন বাদশা ১ লাখ ১৬ হাজার ৫৯৯ ভোট পেয়ে এমপি নির্বাচিত হন। আর তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপি থেকে মিজানুর রহমান মিনু ধানের শীষ প্রতীকে পান ৮০ হাজার ৫০ ভোট।

২০১৪ সালের নির্বাচনে বিএনপি-জামায়াত অংশ নেয়নি। এ বছর বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নৌকার টিকিটে এমপি হন ওয়ার্কার্স পার্টির ফজলে হোসেন বাদশা। ওই বছর ভোটার ছিলেন ২ লাখ ৮৬ হাজার ৮৭৫ জন। ২০১৮ সালের নির্বাচনে ভোটার ছিল ৩ লাখ ১৭ হাজার ৮৫২ জন। ভোট পড়ে ২ লাখ ২৩ হাজার ৯৭৪টি। নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন ১৪ দলের প্রার্থী হিসেবে নৌকা প্রতীকে ওয়ার্কার্স পার্টির ফজলে হোসেন বাদশা ১ লাখ ১৫ হাজার ৪৫৩ ভোট পেয়ে এমপি নির্বাচিত হন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির মিজানুর রহমান মিনু ধানের শীষ প্রতীকে পান ১ লাখ ৩ হাজার ৩২৭ ভোট।

বর্তমানে এ আসনে মোট ভোটার ৩ লাখ ৬৫ হাজার ৬৫১ জন। এর মধ্যে পুরুষ ১ লাখ ৭৬ হাজার ৩০০, নারী ১ লাখ ৮৯ হাজার ৩০৯, তৃতীয় লিঙ্গ ৯ ও নতুন ভোটার ৪ হাজার ৪৯৬ জন।

এ আসনে এবার জনপ্রিয় রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব মিজানুর রহমান মিনু দলীয় মনোনয়ন পাওয়ায় বিএনপির নেতা-কর্মীরা ঐক্যবদ্ধ হতে শুরু করেছেন। রাজশাহী মহানগরীর বিএনপির রাজনীতি দীর্ঘসময় মিনুর নিয়ন্ত্রণে না থাকলেও তার ক্যারিশম্যাটিক ব্যক্তিত্বে ভেদাভেদ ভুলে নেতা-কর্মীরা অল্প সময়েই হয়ে উঠেছেন চাঙা। রাজশাহী মহানগরীর বিএনপির নতুন নেতৃত্ব মিনুকে বিজয়ী করতে নিরঙ্কুশ সমর্থন জানিয়েছে।

বিএনপির সূত্র বলছে, গত ৫ আগস্টের পর রাজশাহীতে দলীয় ভরসা সবচেয়ে বেশি ছিল মিনুকে নিয়েই। দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা, নগরবাসীর সঙ্গে নিবিড় সম্পর্ক, মাঠে অবিচ্ছিন্ন উপস্থিতি- এসব কারণে বিএনপি নিশ্চিত যে, মিজানুর রহমান মিনুই এ আসনে তাদের ‘সেরা বাজি’।

রাত-দিন গণসংযোগ, ধর্মীয়-সামাজিক অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ, এলাকার মানুষের খোঁজখবর নেওয়া, বিভিন্ন মহল্লায় মতবিনিময়- মনোনয়ন ঘোষণার পর মিনুর মাঠ আরও সরগরম হয়েছে। দলীয় নেতাদের দাবি, ‘মিনু ভাই এলে মাঠ আর আলাদা করে সাজাতে হয় না। মানুষ নিজেই এগিয়ে আসেন।’

মিজানুর রহমান মিনু বলেন, ‘আমরা যারা বিএনপি করি, তারা সবাই একই পরিবারের সদস্য। একসঙ্গে বাস করলে ভাইয়ে-ভাইয়ে মান-অভিমান হতেই পারে। আমাদের মধ্যে কোনো ভেদাভেদ নেই। দলের প্রয়োজনে আমরা ঐক্যবদ্ধ।’

তিনি বলেন, ‘মানুষের ভালোবাসাই আমার শক্তি। আমি গণমানুষের রাজনীতি করি। আমি ১৯৯১ সাল থেকে আজ পর্যন্ত রাজশাহীর উন্নয়নে নিয়োজিত রয়েছি। বরাবরের মতো এবারও স্বতঃস্ফূর্তভাবে নগরীর সর্বস্তরের মানুষের আন্তরিক সমর্থন ও দোয়া পাচ্ছি। এই জনগণই আমাকে শক্তি দেয়, তাদের জন্যই মাঠে আছি।’

এ আসনে বিএনপির শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াত ইসলামীর প্রার্থী। দলটির সংগঠিত তৎপরতা এবারের নির্বাচনে ভিন্ন মাত্রা যোগ করেছে। এনসিপি, ইসলামী আন্দোলন, গণসংহতি আন্দোলন, বাসদসহ বিভিন্ন দলও মাঠে সক্রিয়।

সদর আসনে শক্ত সাংগঠনিক ভিত থাকলেও কখনো জয় পায়নি জামায়াতে ইসলামী। অবশ্য এবার এ আসনে দলের ভেতর সবচেয়ে সংগঠিত প্রস্তুতি দেখা যাচ্ছে। জামায়াতের প্রার্থী মহানগরীর নায়েবে আমির ডা. মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর দলীয় নেতা-কর্মী নিয়ে ওয়ার্ড-থানা-মহল্লা চষে বেড়াচ্ছেন। চলছে টিমভিত্তিক গণসংযোগ। জামায়াত এবার এ আসনে জয়ের জন্য প্রাণপণ চেষ্টা করছে। এ জন্য নানা পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছে। এরই মধ্যে নগরীর প্রতিটি ওয়ার্ডে সমাবেশ করেছে। সম্প্রতি তাদের বিশাল মোটরসাইকেল র‌্যালি ব্যাপক আলোচনায় এসেছে।

ডা. মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর বলেন, ‘জামায়াত এখন মানুষের কাছে বিকল্প শক্তি হিসেবে জায়গা করে নিচ্ছে। দলীয় ঘরানার বাইরের ভোটারদেরও সাড়া পাচ্ছি। যে কেউ আসুক- আমরা মাঠে সরাসরি লড়াই করব।’

তিনি বলেন, ‘জামায়াত এবার সবচেয়ে সংগঠিত, সবচেয়ে প্রস্তুত। তাই জয়ের ব্যাপারে আমরা আশাবাদী।’

 
 
জনতার আওয়াজ/আ আ
 
 

জনপ্রিয় সংবাদ

 

সর্বোচ্চ পঠিত সংবাদ