শ্রীলংকার পরাক্রমশালীর করুণ পরিণতি - জনতার আওয়াজ
  • আজ রাত ৪:৩৭, শুক্রবার, ১৫ই মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ১লা জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ, ২৮শে জিলকদ, ১৪৪৭ হিজরি
  • jonotarawaz24@gmail.com
  • ঢাকা, বাংলাদেশ

শ্রীলংকার পরাক্রমশালীর করুণ পরিণতি

নিজস্ব প্রতিবেদক, জনতার আওয়াজ ডটকম
প্রকাশের তারিখ: শুক্রবার, জুলাই ১৫, ২০২২ ৮:২৫ পূর্বাহ্ণ পরিবর্তনের তারিখ: শুক্রবার, জুলাই ১৫, ২০২২ ৮:২৫ পূর্বাহ্ণ

 

শহীদুল্লাহ ফরায়জী

জাতীয় স্বার্থকে উপেক্ষা করে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতাকে অন্যায্য ভাবে বন্টনের মাধ্যমে নিজেকে অপরাজেয় পরাক্রমশালী হিসেবে গড়ে তুলেছিলেন শ্রীলংকার প্রেসিডেন্ট গোতাবায়া রাজাপক্ষে। ভেবেছিলেন রাষ্ট্রযন্ত্রসহ সর্বসময় তার পক্ষে অবিচল থাকবে, সশস্ত্র বাহিনী কোনদিন তাকে পরিত্যাগ করবে না। ভেবেছিলেন রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে কাজে লাগিয়ে যে কোন গোপন অভিসন্ধি বাস্তবায়ন করতে পারবেন। আরো ভেবেছিলেন, তার ক্ষমতা ও ঐশ্বর্যকে জনগণ আনন্দের সঙ্গে যোগান দিয়ে যাবে। আরো ছিল দিনে দিনে শক্তিশালী হবার বাসনা। কিন্তু পরিশেষে গণঅভ্যুত্থানের মুখে তাকে শ্রীলংকার রাষ্ট্র ক্ষমতা চিরতরে পরিত্যাগ করে নিজের মাতৃভূমি ছেড়ে পালাতে হয়েছে। ভাগ্যের কি পরিহাস এটাই কর্তৃত্ববাদী শাসকদের করুণ পরিণতি।

গোতাবায়া রাজাপক্ষে রাষ্ট্রকে পারিবারিক সম্পত্তিতে পরিণত করে নিজে পরমারাধ্য সম্রাটের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছিলেন। পরিবারতন্ত্রের অধীনে শ্রীলংকার জনগণ চিরদিন একান্ত বশংবদ
হয়ে থাকবে এটাও হয়তো তিনি বিশ্বাস করেছিলেন। আত্মবিশ্বাস ছিল দৃশ্যমান উন্নয়নের নামে চাকচিক্যপূর্ণ স্থাপনা দিয়ে দেশীয় ও ভূ রাজনীতিতে নিজেকে গুরুত্বপূর্ণ করে তুলবেন।

আপন বড় ভাইকে প্রধানমন্ত্রী, জ্ঞাতি গোষ্ঠীকে মন্ত্রিত্ব এবং রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ পদ দিয়ে শ্রীলঙ্কাকে
নিজের ইচ্ছাধীন রাষ্ট্রে পরিণত করেছিলেন গোতাবায়া। তিনি স্তাবকদের প্রশংসা ও গুণকীর্তনে এমন পদক্ষেপ নিয়েছেন যা অসংশোধনীয়।

ফলে জনবিদ্রোহের মুখে পলায়ন ছাড়া অন্য সব দরজা বন্ধ হয়ে গেছে। নির্দেশ দেওয়া, অভিযান পরিচালনা করা, ডিক্রি জারি করা সবকিছু পরিশেষে হাতছাড়া হয়ে গেছে।
শ্রীলঙ্কায় প্রবল বিক্ষোভে প্রেসিডেন্টের প্রাসাদ বিক্ষোভকারীদের নিয়ন্ত্রণে ও দখলে। গোতাবায়া রাষ্ট্রপতি থাকা অবস্থায়ই ভয়ংকর আর্থিক পরিস্থিতির জন্য তার বিরুদ্ধে বিক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে প্রেসিডেন্ট প্রাসাদে শ্রীলংকার জনগণ অবস্থান নেয়। গোতাবায়ার সরকারি বাসভবনটি ভাঙচুরের মাত্র কয়েক ঘন্টা আগেই তিনি পালিয়ে যান। এখন প্রতিদিন হাজার হাজার উৎসুক দর্শক সেখানে যাতায়াত করছে, উল্লাস করছে।

ক্ষমতা হারালে সবাই মুখ ফিরিয়ে নেয়, সৈরশাসকগণ ইতিহাসের এই শিক্ষা গ্রহণ করে না। গোতাবায়া প্রেসিডেন্ট থাকা অবস্থায় বিদেশ যেতে চেয়েছিলেন কিন্তু যেতে পারেননি, বিমানবন্দর থেকে ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে। ভারতেও যেতে চেয়েছিলেন কিন্তু পরিকল্পনা ভেস্তে গেছে। সমুদ্রপথে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টাও ব্যর্থ হয়।

পরাক্রমশালী ৭৩ বছর বয়সি গোতাবায়া তার স্ত্রী ও দেহরক্ষীসহ শেষ পর্যন্ত মধ্যরাতে সামরিক বাহিনীর অনুগ্রহে সামরিক বিমান অ্যান্তোনভ ৩২ এ বন্দর নায়ক আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে মালদ্বীপের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হন। ১৪ জুলাই সন্ধ্যায় সৌদি এয়ারলাইন্সে সিঙ্গাপুর পৌঁছেছেন। তারপর সংযুক্ত আরব আমিরাতে আশ্রয় নিতে পারেন।
তার নিজের ব্যক্তিগত বিলাসবহুল বাড়ি ঘর এখন সব নির্জন ও পরিত্যক্ত।

দুর্নীতিপরায়ণ শাসককে মালদ্বীপে আশ্রয় না দিতে সেখানেও বিক্ষোভ চলছে। মালদ্বীপের নাগরিক এবং প্রবাসী শ্রীলংকানরা দেশটির প্রেসিডেন্টের বাসভবনের কাছে বিক্ষোভ করে গোতাবায়াকে মালদ্বীপ থেকে বের করে শ্রীলঙ্কায় ফেরত পাঠানোর অনুরোধ জানাচ্ছে। প্রেসিডেন্ট হওয়ার কারণে গোতাবায়াকে গ্রেফতারের সংবিধানিক বিধান নেই বলে তিনি গ্রেফতার এড়িয়ে দেশ ত্যাগ করেছেন।
কোথায় ঠাঁই হবে তা কেউ জানে না। ক্ষমতা হারানোর পরেই ‘অনিশ্চয়তা’ অনিবার্যভাবেই তাকে মোকাবেলা করতে হচ্ছে।

জরুরি অবস্থা বা কারফিউ ঘোষণার পরও কলম্বোর রাজপথে বিক্ষোভ করছে মানুষ। বিক্ষোভকারীরা বলছেন সরকার পতনের মধ্য দিয়ে এ লড়াই শেষ হচ্ছে না। তাদের দাবি দেশটির ইতিহাসের সবচাইতে বড় অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের জন্য যারা দায়ী তাদের সবাইকে বিচারের মুখোমুখি করতে হবে।

মেয়াদ থাকতেই প্রেসিডেন্টের পদ শূন্য হোল শ্রীলঙ্কায়। সরকারের পদের মেয়াদ সংবিধানে সুনির্দিষ্ট করে দিলেও গণআন্দোলন, গণঅভ্যুত্থান বা গণজাগরণে যেকোনো সময় সরকারের মেয়াদ শেষ হয়ে যেতে পারে – তা অতীত বহুবার দেশে দেশে প্রমাণ হয়েছে, এবারো হলো।

স্বৈরশাসকদের ক্ষমতার অস্তগামী সূর্য কখনো উজ্জ্বল ও গৌরবময় হয় না, কেউ দেহে বারুদের স্বাদ পায়, কারো গলায় ফাঁসির দড়ি আর কেউ পায় অপমান ও লাঞ্ছনার দুঃসহ জীবন। অর্থ সম্পদ এবং চাটুকাররা পতিত স্বৈরাচারকে রক্ষা করতে পারে না, কেউ তখন আর দরদী হয়ে এগিয়ে আসে না । তাদের নিষ্ঠুরতা, দুর্নীতি, অপচয় ও বেআইনি কর্মকান্ড তাদের পতনের পর মানুষের ঘরে ঘরে ফেরি করা হয়। পরাক্রমশালীর ক্ষমতা তখন বহুদূর অতীতের একটি ঘটনার দুঃস্বপ্ন হয়ে থাকে।

শ্রীলংকার শাসক গোতাবায়া রাজপক্ষের এখন সমূহ বিপদ, দম্ভ ও উদ্ধত্য সব এখন বিলীন। তাকে সবসময় ঘিরে থাকতো ধনী প্রতিপত্তশালী এবং ক্ষমতাবানগণ। এখন সবাই অসন্তুষ্ট, ক্ষুব্ধ। পরিবার জ্ঞাতিগোষ্ঠী আপনজন এমনকি স্তাবকরাও তাকে ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছে। আত্মরক্ষার জন্য আত্মগোপনে থাকাই তার করুণ পরিণতি। এখন তাকে করুণা দেখাবার কেউ নেই। এই চরমতম দুর্ভাগ্য আগে কখনো হয়নি।

স্বৈরশাসকদের দুর্দান্ত ক্ষমতা এবং দুর্দশার মাঝে কোন প্রাচীর থাকে না, ফলে গণজাগরণের মাধ্যমে যে কোনো সময় পতন মারাত্মক কাছাকাছি এসে পড়ে, অসম্ভব অস্বাভাবিক এবং অসম্মানজনক ঘটনার মুখোমুখি হতে হয়, ভয়ংকর ভাগ্যকে নিজের সঙ্গে জড়াতে হয়, এটাই অনিবার্য।

আত্মবিশ্বাস ও আত্মতৃপ্তিতে সুবিধাভোগী স্তাবকেরা যতই বলে ‘সম্রাট দীর্ঘজীবি হোক,’ ততই সম্রাটের পতন ত্বরান্বিত হয়। শাসকরা কখনো পরাজয় ও পলায়নের কথা ভাবতে পারেনা।

শ্রীলংকার এই শিক্ষা থেকে অনেক স্বৈরশাসক যারা ভয়াবহ অন্যায় করেও আত্মতুষ্টির সাথে দেশের ভবিষ্যৎকে ধ্বংসের মধ্যে ঠেলে দিচ্ছে তারা নতুন করে শিক্ষা নিতে পারে।

লিও তলস্তয়ের বিখ্যাত বই ‘ওয়ার এন্ড পিস’ এর একটি উদ্ধৃতি দিয়ে শেষ করছি, “হে ঈশ্বর, আমিতো সর্বস্বান্ত সম্মানহীন একটা মানুষ, সব শেষ! আমার সর্বনাশ হয়েছে! এখন শুধু মস্তিষ্কের ভিতর দিয়ে একটি বুলেট চলে যাবে-এ ছাড়া আমার জন্য আর কিছু বাকি নেই।”

লেখক :গীতিকার
১৪ জুলাই, ২০২২
faraizees@gmail.com

 
 
জনতার আওয়াজ/আ আ
 
 

জনপ্রিয় সংবাদ

 

সর্বোচ্চ পঠিত সংবাদ