সংসদে মহিলা আসনের এমপি কেন? - জনতার আওয়াজ
  • আজ দুপুর ১২:৪১, বৃহস্পতিবার, ১৪ই মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ৩১শে বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ, ২৭শে জিলকদ, ১৪৪৭ হিজরি
  • jonotarawaz24@gmail.com
  • ঢাকা, বাংলাদেশ

সংসদে মহিলা আসনের এমপি কেন?

নিজস্ব প্রতিবেদক, জনতার আওয়াজ ডটকম
প্রকাশের তারিখ: শনিবার, আগস্ট ২, ২০২৫ ৫:০৯ অপরাহ্ণ পরিবর্তনের তারিখ: শনিবার, আগস্ট ২, ২০২৫ ৫:০৯ অপরাহ্ণ

 

ব্যারিস্টার রফিক আহমেদ, সমাজচিন্তক, লন্ডন

বাংলাদেশে এক সময় নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করতে সংসদে সংরক্ষিত মহিলা আসন চালু করা হয়েছিল। তখন মনে করা হয়েছিল, এটি হবে নারীর রাজনৈতিক অংশগ্রহণের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। শুরুতে ৩০টি আসন থাকলেও এখন তা ৫০-এ উন্নীত হয়েছে, এবং বর্তমানে সেই সংখ্যা ১০০-তে বাড়ানোর প্রস্তাব আলোচনায়। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে—এই ব্যবস্থাটি কি বাস্তবিক অর্থে নারীর ক্ষমতায়ন ঘটাচ্ছে, নাকি এটি কেবল রাজনৈতিক দলের জন্য একটি প্রাতিষ্ঠানিক অলংকার ও অর্থনৈতিক বোঝায় পরিণত হয়েছে?

সংরক্ষিত আসনের নৈতিক ভিত্তি ও বাস্তবতা

সংরক্ষিত আসনের মূল লক্ষ্য ছিল সংসদে নারীর অংশগ্রহণ বৃদ্ধি করা। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এটি এক ধরনের দলীয় আনুগত্যের পুরস্কার হয়ে উঠেছে। দলগুলো প্রায়ই এই আসনে এমন নারী সদস্যদের মনোনয়ন দেয়, যাঁরা রাজনৈতিকভাবে তেমন সক্রিয় নন অথবা যাঁরা কোনো বিশিষ্ট রাজনৈতিক চিন্তাভাবনা বা জনগণের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত নন। এর ফলে, অনেক নারী সংসদ সদস্যই প্রকৃত নীতি প্রণয়ন বা সিদ্ধান্ত গ্রহণে স্বাধীন মত প্রকাশ করতে পারেন না।

এই ধরনের নিস্তেজ উপস্থিতি নারীর ক্ষমতায়নের পরিবর্তে বরং নারীর রাজনৈতিক সম্ভাবনাকে হ্রাস করছে। অনেকেই একে “অলংকারস্বরূপ” আসন বলেই অভিহিত করেছেন—শুধু দেখানোর জন্য, কার্যকর নয়।

অর্থনৈতিক ব্যয় বনাম কার্যকারিতা

প্রতিটি সংরক্ষিত আসনে একজন এমপি নিয়োগ মানে হচ্ছে—তাঁদের জন্য বেতন, ভাতা, যাতায়াত, অফিস ও স্টাফ বাবদ বিপুল রাষ্ট্রীয় ব্যয়। যদি তাঁরা কার্যকর ভূমিকা পালন না করেন, তাহলে এটি একধরনের জাতীয় সম্পদের অপচয়। এমনকি সংসদে তাঁদের কণ্ঠস্বরও অনেক সময় দলীয় সিন্ডিকেটে হারিয়ে যায়।

অন্যদিকে, যাঁরা সরাসরি জনগণের ভোটে নির্বাচিত হন, তাঁরা তাঁদের নির্বাচনী এলাকার সঙ্গে সরাসরি সংযুক্ত থাকেন এবং জনগণের কাছে জবাবদিহিতামূলক অবস্থানে থাকেন। এদের তুলনায় সংরক্ষিত আসনের এমপিরা অনেকটাই বিচ্ছিন্ন এবং অনুৎসাহী।

কোটা নয়, সরাসরি প্রতিযোগিতা হোক নারীর পথ

বর্তমান সংরক্ষিত আসনের ব্যবস্থার স্থায়িত্ব নিয়ে যদি প্রশ্ন ওঠে, তাহলে তার বিকল্প হোক একটি অংশগ্রহণমূলক রাজনৈতিক সংস্কৃতি। প্রস্তাব হচ্ছে—প্রতিটি রাজনৈতিক দলকে নির্বাচনে ১৫-২০% নারী প্রার্থী মনোনয়নের বাধ্যবাধকতা আরোপ করতে হবে। এতে নারীরা নির্বাচনী মাঠে নেমে, দলীয় ও ব্যক্তিগত পরিচয় নিয়ে জনগণের ভোটে নির্বাচিত হতে পারবেন।

এই মডেল ইতোমধ্যে ভারত, নেপাল ও পাকিস্তানের কিছু রাজনৈতিক দল বাস্তবায়ন করেছে এবং সেখানে সাফল্য এসেছে। নারী নেত্রীদের কণ্ঠস্বর শক্তিশালী হয়েছে এবং তাঁরা প্রশাসনিক ও নীতিগত সিদ্ধান্তে নেতৃত্ব দিচ্ছেন।

উপসংহার: অলংকার নয়, নেতৃত্ব দরকার

আজকের বাংলাদেশে নারীর ক্ষমতায়ন আর প্রতীকী অবস্থানে থেমে থাকতে পারে না। নারী যদি নেতৃত্বে আসেন, তা হোক যোগ্যতা, দক্ষতা ও জনপ্রিয়তার ভিত্তিতে—কেবলমাত্র দলীয় আনুগত্য বা পদক হিসেবে নয়।

সংরক্ষিত মহিলা আসনের বর্তমান রূপটি একটি অকার্যকর ও ব্যয়বহুল প্রথায় পরিণত হয়েছে। নারীর প্রকৃত ক্ষমতায়ন ঘটাতে হলে প্রয়োজন সংস্কারকামী রাজনৈতিক সদিচ্ছা, যেখানে নারী নিজ গুণে নির্বাচিত হবেন এবং সংসদে একটি স্বতন্ত্র ও বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বর হয়ে উঠবেন।

নারীর জন্য সম্মান ও নেতৃত্ব নিশ্চিত করতে হলে তাঁকে ভিক্ষা নয়, মঞ্চ দিতে হবে।

 
 
জনতার আওয়াজ/আ আ
 
 

জনপ্রিয় সংবাদ

 

সর্বোচ্চ পঠিত সংবাদ