সম্পত্তি ক্রোকের আদেশ নেতৃত্বকে ‘বিতর্কিত’ করার ষড়যন্ত্র দেখছে বিএনপি
নিজস্ব প্রতিবেদক, জনতার আওয়াজ ডটকম
প্রকাশের তারিখ:
শনিবার, জানুয়ারি ৭, ২০২৩ ২:৩৬ অপরাহ্ণ পরিবর্তনের তারিখ:
শনিবার, জানুয়ারি ৭, ২০২৩ ২:৩৬ অপরাহ্ণ

ডেস্ক নিউজ
দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান ও তার স্ত্রী ডা. জোবাইদা রহমানের সম্পত্তি ক্রোকের আদেশের ঘটনায় বিচলিত নয় বিএনপি। বরং চলমান আন্দোলনের মধ্যে হঠাৎ করেই পুরোনো একটি মামলায় আদেশের বিষয়টিকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হিসেবেই অভিহিত করছে দলটির হাইকমান্ড।
তাদের মতে, বর্তমানে তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি আরও বেশি সুসংহত এবং ঐক্যবদ্ধ। তার নেতৃত্ব ও নির্দেশে প্রতিটি কর্মসূচিতে নেতাকর্মীরা জীবন বাজি রেখে অংশগ্রহণ করছেন। একইভাবে দলের চলমান আন্দোলন কর্মসূচিতে সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণও বাড়ছে। ঠিক এই মুহূর্তে তারেক রহমান ও তার স্ত্রী ডা. জোবাইদা রহমানের সম্পদ ক্রোকের আদেশ দেওয়ার মানে হলো—বিএনপির নেতৃত্বকে ‘বিতর্কিত’ ও কোণঠাসা করা। কিন্তু এসব ষড়যন্ত্র ও অপকৌশল সরকারের কোনো কাজে আসবে না বলে বিএনপি নেতাদের দাবি।
জানতে চাইলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেন, এসব অপকৌশল করে চলমান গণ আন্দোলনকে দমানো যাবে না। এসব ঘটনায় বিএনপির নেতৃত্বের ওপর প্রভাব পড়বে না। যার প্রমাণ দেশবাসী গত ১০ ডিসেম্বর ঢাকা বিভাগীয় গণসমাবেশ এবং ৩০ ডিসেম্বর গণমিছিল কর্মসূচিতে প্রত্যক্ষ করেছে। এত বড় গণমিছিল অতীতে কেউ দেখেনি। সুতরাং হামলা-মামলা ও গ্রেপ্তার করে আমাদের আন্দোলন দমানো যাবে না।
সূত্র জানায়, সম্পদের তথ্য গোপন ও জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগে ২০০৭ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর তারেক রহমান, তার সহধর্মিণী ডা. জোবাইদা রহমান ও তার মা সৈয়দা ইকবাল মান্দ বানুর বিরুদ্ধে রাজধানীর কাফরুল থানায় মামলা করে দুদক। পরের বছর তাদের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়। তবে মামলাটি বাতিল চেয়ে হাইকোর্টে আবেদন করেন জোবাইদা রহমান। চূড়ান্ত শুনানি শেষে ২০১৭ সালের ১২ এপ্রিল হাইকোর্ট ওই আবেদন খারিজ করে রায় দেন। মামলায় আট সপ্তাহের মধ্যে জোবাইদাকে বিচারিক আদালতে উপস্থিত হতে নির্দেশ দেওয়া হয়। হাইকোর্টের এই রায়ের বিরুদ্ধে একই বছর লিভ টু আপিল করেন ডা. জোবাইদা। সেটিও ২০২২ সালের ১৩ এপ্রিল খারিজ করে দেন আপিল বিভাগ। এরপর বিচারিক আদালতে মামলার বিচার কার্যক্রম শুরু হয়।
বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদু বলেন, বিএনপি চলছে যৌথ নেতৃত্বে। ইতোমধ্যে তারেক রহমানের নেতৃত্ব ও সাংগঠনিক দক্ষতা প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে। এটিকে ভয় পেয়েই সরকার বিচলতি। তারা একের পর এক অপকৌশল অবলম্বন করছে। এভাবে তারেক রহমানের নেতৃত্বকে বিতর্কিত করতে ষড়যন্ত্র করছে। কিন্তু এসবে কোনো কাজ হবে না। দেশের মানুষ জানে আওয়ামী লীগ মানেই ষড়যন্ত্র ও মিথ্যাচার।
বিএনপি চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার বড় ছেলে তারেক রহমান। মূলত ২০০১ সালের নির্বাচনী প্রচারণায় অংশগ্রহণের মাধ্যমে রাজনীতিতে তার সক্রিয় আগমন ঘটে। দেশে বিশৃঙ্খল অবস্থা সৃষ্টি হওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি নিয়মতান্ত্রিক তত্ত্বাবধায়ক সরকারকে অপসারণ করে সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠিত হয়। পরদিন ১২ জানুয়ারি উপদেষ্টা পরিষদ গঠনের পর সরকারের পক্ষ থেকে দেশের শীর্ষ রাজনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগে মামলা করা হয়। ২০০৭ সালের ৭ মার্চ একটি দুর্নীতির মামলার আসামি হিসেবে তারেক রহমানকে তার ঢাকা ক্যান্টনমেন্টের মইনুল রোডের বাসা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। সে সময় তার বিরুদ্ধে আরও ১৩টি দুর্নীতির মামলা দায়ের করা হয় ও তাকে বিচারের সম্মুখীন করা হয়। তবে তারেক রহমানের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে বিএনপির দাবি।
জানা যায়, গ্রেপ্তারের কিছুদিন পর তারেক রহমানকে আদালতে হাজির করা হলে তার ওপর শারীরিক নির্যাতনের অভিযোগ তোলেন তার আইনজীবীরা। আদালতের নির্দেশে চিকিৎসকদের একটি দল পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর আদালতকে জানায় যে, তারেক রহমানের ওপর শারীরিক নির্যাতনের অভিযোগ যুক্তিযুক্ত। একপর্যায়ে আদালত রিমান্ডে নেওয়ার আদেশ শিথিল করেন এবং তারেক রহমানকে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের পরিবর্তে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে (বিএসএমএমইউ) স্থানান্তর করা হয়। ২০০৭ সালের ২৫ আগস্ট তারেক রহমান হাসপাতালে পা পিছলে পড়ে আহত হওয়ার খবর ছড়িয়ে পড়ে। এতে দেশের বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভ দেখা দেয়। বিশেষ করে ঢাকা, চট্টগ্রাম ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা কলেজ ও ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে।
একপর্যায়ে ২০০৮ সালের আগস্টে তারেক রহমানের বিরুদ্ধে মামলাগুলো আদালতে গতি পায়। ২০০৮ সালের ৩ সেপ্টেম্বর সব মামলায় তারেক রহমানের জামিন হয় ও বিএসএমএমইউ থেকে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মুক্তি লাভ করেন। এরপর ওই বছরের ১১ সেপ্টেম্বর রাতেই তিনি উন্নত চিকিৎসার জন্য যুক্তরাজ্যে যান। এখনো সপরিবারে লন্ডনেই আছেন তিনি। এর মধ্যে ২০০৯ সালের ৮ ডিসেম্বর বিএনপির পঞ্চম জাতীয় কাউন্সিলে তিনি সংগঠনের সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। তার স্ত্রী ডা. জোবাইদা রহমান সরকারি চাকরিতে ছিলেন। ছুটি নিয়ে যাওয়ার পর আর কর্মস্থলে না ফেরায় ২০১৪ সালে তাকে বরখাস্ত করে সরকার। বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া ২০১৮ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি দুর্নীতির মামলায় সাজাপ্রাপ্ত হলে ওইদিনই কারাবন্দি হন। এর পরই বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করছেন তারেক রহমান।
বিভিন্ন সময় সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে যে, তারেক রহমানকে দেশে ফিরিয়ে আনতে উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। অন্যদিকে, বিএনপি নেতাদের অভিযোগ, রাজনীতি থেকে দূরে রাখতে তাদের নেতা তারেক রহমানকে মিথ্যা মামলায় ফাঁসানো হচ্ছে।
এ প্রসঙ্গে খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেন, আমাদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান ও তার স্ত্রী ডা. জোবাইদা রহমানের সম্পত্তি আদালত কর্তৃক ক্রোকের আদেশ সম্পূর্ণ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। কেননা, এ মামলাটি হয়েছিল ১/১১’র সরকারের আমলে। এতদিন পরে এই মামলার রায় দেওয়া হলো। ঠিক এমন সময়ে এই আদেশ দেওয়া হলো, যখন বর্তমান ফ্যাসিস্ট সরকারের বিরুদ্ধে দেশের মানুষ জেগে উঠেছে এবং বিএনপির কর্মসূচিতে দেশের সাধারণ মানুষের সম্পৃক্ততা বাড়ছে। এসব কারণে সরকার ভয় পেয়েছে। যার প্রমাণ গত ৭ ডিসেম্বর নয়াপল্টনে আমাদের দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে পুলিশ তাণ্ডব চালিয়েছে। কোনো কারণ ছাড়াই সেদিন সিনিয়র নেতাসহ আমাদের পাঁচ শতাধিক নেতাকর্মীকে গ্রেপ্তার করেছে। এরপর একইভাবে কোনো কারণ ছাড়াই আমাদের দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ও স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাসকে গ্রেপ্তার করেছে। মূলত আন্দোলন দমন করতেই সরকারের এই ঘৃণ্য উদ্যোগ।
তারেক ও ডা. জোবাইদার সম্পদ ক্রোকের আদেশের ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের সংগঠন ইউনিভার্সিটি টিচার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ইউট্যাব)। সংগঠনের প্রেসিডেন্ট অধ্যাপক ড. এবিএম ওবায়দুল ইসলাম ও মহাসচিব অধ্যাপক ড. মো. মোর্শেদ হাসান খান গতকাল এক বিবৃতিতে বলেন, তারেক রহমান ও তার স্ত্রীর বিরুদ্ধে যে মামলাটি করা হয়েছিল, তা ছিল সম্পূর্ণরূপে মিথ্যা ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। কারণ, তথাকথিত জরুরি সরকার ছিল বর্তমান আওয়ামী সরকারেরই আন্দোলনের ফসল। দীর্ঘদিন পর ওই মামলায় আদালত তারেক রহমান ও ডা. জোবাইদা রহমানের সম্পদ ক্রোকের যে আদেশ দিয়েছেন, তা সরকারের ইঙ্গিতেই।
বিভিন্ন সংগঠনের বিক্ষোভ
তারেক ও ডা. জোবাইদার সম্পদ ক্রোকের আদেশের প্রতিবাদে রাজধানীতে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করেছেন ছাত্রদল, যুবদল, স্বেচ্ছাসেবক দল এবং ঢাকা জেলা বিএনপির নেতাকর্মীরা। তারা তারেক ও ডা. জোবাইদার বিরুদ্ধে সম্পদ ক্রোকের আদেশ ও সব মিথ্যা মামলা প্রত্যাহারের দাবিতে স্লোগান দেন এবং গ্রেপ্তার নেতাকর্মীদেরও মুক্তি দাবি করেন। গতকাল সকালে প্রথমে বিক্ষোভ মিছিল করে স্বেচ্ছাসেবক দল। মিছিলে স্বেচ্ছাসেবক দলের রাজিব আহসান, ইয়াছিন আলী, রফিকুল ইসলাম, নাজমুল হাসান, ঢাকা উত্তরের গাজী রেজওয়ানুল হক রিয়াজ, ঢাকা মহানগর দক্ষিণের জহির উদ্দিন তুহিন, সাদ মোরশেদ পাপ্পা শিকদার, ডা. জাহেদুল কবির জাহিদ, সর্দার মো. নুরুজ্জামান, মোর্শেদ আলম প্রমুখ ছিলেন। এরপর বাদ জুমা একই স্থানে যুবদলের উদ্যোগে বিক্ষোভ মিছিলে ছিলেন মামুন হাসান, মোনায়েম মুন্না, শফিকুল ইসলাম মিল্টন, গোলাম মাওলা শাহীন, ইসহাক সরকার প্রমুখ। এরপর বিকেলে জাতীয়তাবাদী মহিলা দলের উদ্যোগে পৃথক মিছিলে আফরোজা আব্বাস, হেলেন জেরিন খান, রুমা আক্তার, শাহিনুর নার্গিস, নাযাবা ইউসুফ, রুনা লায়লাসহ সংগঠনের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীরা অংশ নেন। পরে ঢাকা জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক নিপুন রায় চৌধুরীর নেতৃত্বে জেলা বিএনপির বিক্ষোভ মিছিল হয়।
জনতার আওয়াজ/আ আ