সরকারবিরোধী যুগপতের যৌথ ঘোষণাপত্র চূড়ান্ত হয়নি তিন মাসেও - জনতার আওয়াজ
  • আজ রাত ৪:০২, শুক্রবার, ১৫ই মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ১লা জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ, ২৮শে জিলকদ, ১৪৪৭ হিজরি
  • jonotarawaz24@gmail.com
  • ঢাকা, বাংলাদেশ

সরকারবিরোধী যুগপতের যৌথ ঘোষণাপত্র চূড়ান্ত হয়নি তিন মাসেও

নিজস্ব প্রতিবেদক, জনতার আওয়াজ ডটকম
প্রকাশের তারিখ: শনিবার, এপ্রিল ১, ২০২৩ ৮:৫৬ পূর্বাহ্ণ পরিবর্তনের তারিখ: শনিবার, এপ্রিল ১, ২০২৩ ৮:৫৬ পূর্বাহ্ণ

 

ডেস্ক নিউজ

সরকারবিরোধী যুগপৎ আন্দোলন শুরুর তিন মাসের বেশি সময় পার হলেও এর ভিত্তি হিসেবে এখনো ‘যৌথ ঘোষণাপত্র’ চূড়ান্ত করতে পারেনি বিএনপি ও সাত দলীয় জোট গণতন্ত্র মঞ্চ। বিএনপির ১০ দফা দাবি ও ২৭ দফা রূপরেখার সঙ্গে গণতন্ত্র মঞ্চের ১৪ দফার সমন্বয়ে এ ঘোষণাপত্র প্রস্তুত করা হচ্ছে। গত ফেব্রুয়ারিতে যৌথ ঘোষণাপত্রের ৭ দফা একটা খসড়াও প্রণয়ন করা হয়। শুরুতে ফেব্রুয়ারির মধ্যেই যুগপৎ আন্দোলনের শরিকদের মতামতের ভিত্তিতে বিএনপির নীতিনির্ধারণী কমিটির বৈঠকে এটি চূড়ান্ত হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু যুগপতের বাকি শরিকরা এ ইস্যুতে কার্যত অন্ধকারে রয়েছে। বিএনপিও পরে ‘যৌথ ঘোষণাপত্র’ চূড়ান্ত করা নিয়ে শরিকদের কাছে অবস্থান পরিষ্কার করেনি, ফলে ঝুলে যায় বিষয়টি। আগামীকাল রোববার বিএনপির সঙ্গে গণতন্ত্র মঞ্চের বৈঠকের পর ‘যৌথ ঘোষণাপত্র’ ঘোষণার বিষয়টিতে গতি সঞ্চার হবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্ট নেতারা।

জানতে চাইলে গণতন্ত্র মঞ্চের সমন্বয়ক ও রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়কারী হাসনাত কাইয়ুম বলেন, যুগপৎ আন্দোলনের যৌথ রূপরেখা ঘোষণার দিনক্ষণ এখনই বলা যাবে না। তবে আমরা যখন এটি নিয়ে সম্মিলিতভাবে কাজ শুরু করি, প্রথমে ফেব্রুয়ারিতে এবং পরে মার্চে এটি চূড়ান্ত হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু গণতন্ত্র মঞ্চের সঙ্গে বিএনপির হয়ে যিনি লিয়াজোঁ করতেন, সেই ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু শারীরিকভাবে অসুস্থ থাকার কারণে এই প্রক্রিয়াটা অনেকাংশে বিলম্বিত হয়েছে। এই বিষয়টি নিয়ে শিগগির লিয়াজোঁ কমিটির বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। আশা করছি, এর পরে আন্দোলনের যৌথ রূপরেখা ঘোষণার দিনক্ষণ বলা যাবে।

গত ১০ ডিসেম্বর ঢাকার বিভাগীয় গণসমাবেশ থেকে ১০ দফার ভিত্তিতে যুগপৎ আন্দোলনের ঘোষণা দেয় বিএনপি। ১০ দফা দাবির মধ্যে সরকারের পদত্যাগ ও নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন ছাড়াও ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনসহ সব কালাকানুন বাতিল এবং খালেদা জিয়াসহ দলীয় নেতাকর্মীদের মুক্তির বিষয়টি রয়েছে। পরে রাষ্ট্রের সার্বিক সংস্কারে ১৯ ডিসেম্বর রাষ্ট্রকাঠামো মেরামতের ২৭ দফা রূপরেখা ঘোষণা করে দলটি। বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ১৯ দফা এবং চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া ঘোষিত ‘ভিশন-২০৩০’-এর আলোকে ২৭ দফার ওই রূপরেখা প্রস্তুত করা হয়। ভবিষ্যতে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় গেলে কী কী করতে চায়, ওই রূপরেখার মধ্যে সেটা স্পষ্ট করেছে বিএনপি। রূপরেখায় তারা সংবিধান সংস্কার কমিশন, জাতীয় সমঝোতা কমিশন, জুডিশিয়াল কমিশন, প্রশাসনিক কমিশন, মিডিয়া কমিশন, অর্থনৈতিক সংস্কার কমিশন করবে বলে ঘোষণা করেছে। এদিকে গত ১০ ডিসেম্বর জামায়াতে ইসলামীও ১০ দফা দাবির ভিত্তিতে দেশব্যাপী যুগপৎ গণআন্দোলন গড়ে তোলার আহ্বান জানায়। এ ছাড়া বিএনপি ঘোষিত ১০ দফার সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করে ১২ ডিসেম্বর যুগপৎ আন্দোলনের ১৪ দফা ঘোষণা করে গণতন্ত্র মঞ্চ। সেখানে সরকারের পদত্যাগ, সংসদ বাতিল, সংবিধানের ৭০তম অনুচ্ছেদের সংশোধন করে সরকার গঠনে আস্থা ভোট ও বাজেট পাস ছাড়া অন্যান্য বিষয়ে সংসদ সদস্যদের স্বাধীনভাবে ভোট দেওয়ার ক্ষমতা রাখাসহ বেশ কিছু দাবি রয়েছে।

ভিন্ন ভিন্ন এসব দফার ভিত্তিতে যুগপৎ আন্দোলন শুরু হয়। প্রথম কর্মসূচি হিসেবে ২৪ ডিসেম্বর ঢাকার বাইরে জেলা ও মহানগরে এবং ৩০ ডিসেম্বর ঢাকায় গণমিছিল অনুষ্ঠিত হয়। আজ শনিবার সারা দেশের জেলা ও মহানগরে দুই ঘণ্টার অবস্থান কর্মসূচি পালিত হবে। বিএনপিসহ ৩৮টি রাজনৈতিক দল যুগপৎ আন্দোলনে সম্পৃক্ত হয়েছে। এর মধ্যে কয়েকটি দল পৃথকভাবে এবং বাকি দলগুলো তিনটি জোটে বিভক্ত হয়ে আন্দোলন করছে।

যুগপৎ আন্দোলনে সম্পৃক্ত একটি জোটের একজন নেতা বলেন, ভিন্ন ভিন্ন মতাদর্শভিত্তিক পৃথক দফার ভিত্তিতে যুগপৎ আন্দোলন পরিচালিত হওয়ায় শরিকদের মধ্যে ‘প্রকৃত’ ঐক্য নিয়ে মানুষের মধ্যে এক ধরনের সন্দেহ সৃষ্টি হয়। এতে আন্দোলনেও সমন্বয়হীনতা দেখা দেয়। তা ছাড়া বিভিন্ন সময় ক্ষমতাসীন দলের নেতারাও আন্দোলনে শরিকদের ঐক্য নিয়েও প্রশ্ন তোলেন। বিষয়টি অনুধাবন করে আন্দোলনের ‘অভিন্ন দফা’ প্রণয়নের উদ্যোগ নেয় বিএনপি। তিনি দাবি করেন, অভিন্ন দফার ভিত্তিতে আন্দোলন শুরু হলে দেশবাসীর কাছে এই বার্তা যাবে যে, দেশের স্বার্থে মতপার্থক্য ভুলে সরকার হটাতে শরিকরা সবাই ঐক্যবদ্ধ হয়েছে। তখন দেশবাসীর মধ্যেও সাহসের সঞ্চার হবে, তারা আন্দোলনে আরও বেশি করে সম্পৃক্ত হবে।

জানা যায়, যুগপৎ আন্দোলনের অভিন্ন দফা প্রণয়নে গত জানুয়ারি মাসের প্রথমদিকে বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল এবং গণতন্ত্র মঞ্চের জোনায়েদ সাকি ও হাসনাত কাইয়ুমকে নিয়ে একটি ড্রাফট কমিটি গঠন করা হয়। তারা একাধিক বৈঠক করে অভিন্ন রূপরেখার ৭ দফা খসড়া প্রণয়ন করেন। এরপর প্রয়োজনীয় মতামত নিতে গণতন্ত্র মঞ্চের কাছে তা হস্তান্তর করে বিএনপি। গণতন্ত্র মঞ্চ ওই খসড়া রূপরেখার সঙ্গে ঐকমত্য পোষণ করে। এরপর ২৩ ফেব্রুয়ারি বিএনপির সঙ্গে বৈঠকে যৌথ ঘোষণার সাত দফা খসড়া রূপরেখা হস্তান্তর করে গণতন্ত্র মঞ্চ।

পরদিন ২৪ ফেব্রুয়ারি ১২ দলীয় জোট ও জাতীয়তাবাদী সমমনা জোটের সঙ্গে একত্রে বৈঠক করে বিএনপি। সেখানে জোটের পক্ষ থেকে কয়েকজন নেতা ৭ দফা যৌথ রূপরেখার বিষয়টি উত্থাপন করে বলেন, গণমাধ্যমে খবর এসেছে—বিএনপি ও গণতন্ত্র মঞ্চ মিলে যুগপৎ আন্দোলনের যৌথ ঘোষণাপত্রের ৭ দফা খসড়া প্রণয়ন করেছে। কিন্তু এ বিষয়ে আমরা শরিকরা কিছুই জানি না। বিষয়টি আপনারা (বিএনপি) পরিষ্কার করেন। তখন বিএনপির পক্ষ থেকে বলা হয়, এটি গণতন্ত্র মঞ্চের প্রস্তাব। আমরা এখনো তাতে সম্মত হয়নি। যখন বিষয়টি এগোবে তখন আপনাদের মতামতও নেওয়া হবে।

যুগপৎ আন্দোলনের যৌথ ঘোষণাপত্র সম্পর্কে জানতে চাইলে বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব ও লিয়াজোঁ কমিটির সদস্য সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল বলেন, বিএনপির ১০ দফা দাবি ও ২৭ দফা রূপরেখার সঙ্গে গণতন্ত্র মঞ্চের ১৪ দফার সমন্বয়ে যুগপৎ আন্দোলনের যৌথ ঘোষণাপত্র তৈরি করা হচ্ছে। এ নিয়ে আমাদের মধ্যে আলোচনা হয়েছে। আমাদের লিয়াজোঁ কমিটির (গণতন্ত্র মঞ্চের সঙ্গে বিএনপি) চিফ হলেন ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু। কিন্তু উনি অসুস্থ হয়ে বেশ কিছুদিন ধরে সিঙ্গাপুরে চিকিৎসাধীন। টুকু ভাইয়ের এই অনুপস্থিতির কারণে আমরা এ ব্যাপারে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে যেতে পারছি না। সে কারণে এই বিলম্ব।

বিএনপি সূত্রে জানা গেছে, ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকুর সাময়িক অনুপস্থিতিতে পুরো বিষয়টি দেখভাল করতে উদ্যোগী হয়েছেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। এর অংশ হিসেবে আগামীকাল রোববার বিএনপি ও গণতন্ত্র মঞ্চের লিয়াজোঁ কমিটির বৈঠক হবে। সেখানে মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের উপস্থিত থাকার কথা রয়েছে।

এ বিষয়ে গণতন্ত্র মঞ্চের শরিক ভাসানী অনুসারী পরিষদের আহ্বায়ক শেখ রফিকুল ইসলাম বাবলু বলেন, ‘২ এপ্রিল আমাদের বৈঠক রয়েছে। আশা করি, সেখানে যুগপৎ আন্দোলন কীভাবে আরও বেগবান করা যায়, যৌথ ঘোষণাপত্রের কাজ যাতে দ্রুত সম্পন্ন করা যায়—সেগুলো নিয়ে আলোচনা হবে। আশা করছি, রোডম্যাপ গুছিয়ে নিতে পারব।’

বিএনপির অবস্থান হচ্ছে, নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনে বিজয়ী হলে আন্দোলনরত সবাইকে নিয়ে জাতীয় সরকার গঠন করবে। সুশাসন প্রতিষ্ঠায় সেই জাতীয় সরকার রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক রূপান্তরে কাজ করবে, যা দলটি ২৭ দফা রূপরেখায় স্পষ্ট করেছে। এজন্য তারা একাধিক কমিশন গঠন করবে। অন্যদিকে গণতন্ত্র মঞ্চের কথা হচ্ছে, নির্বাচনের আগে অন্তর্বর্তী সরকার গঠন করতে হবে। যারা উপযুক্ত পরিবেশ তৈরির মাধ্যমে একটি অবাধ, সুষ্ঠু নির্বাচন করবে। পাশাপাশি দেশে সুশাসন প্রতিষ্ঠায় কী কী বিষয়ে সংস্কার করতে হবে, সে বিষয়েও ঐকমত্য তৈরি করবে। অর্থাৎ নির্বাচিত হয়ে এসে তারা (নির্বাচিত সরকার) যাতে এটা করতে বাধ্য থাকে সেই পরিস্থিতি তৈরি করা। গণতন্ত্র মঞ্চের একজন নেতা জানান, অন্তর্বর্তী সরকারের কাজ হবে দুটি। একটি হচ্ছে নির্বাচন, অন্যটি হচ্ছে সংবিধান সংস্কারের বাধ্যবাধকতা তৈরি করা।

জানা যায়, নির্বাচনের আগে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ইস্যুতে প্রথমে অনড় থাকলেও দেশ ও জাতির বৃহত্তর স্বার্থে সেখান থেকে আপাতত সরে আসে গণতন্ত্র মঞ্চ। বিএনপি ও গণতন্ত্র মঞ্চের একাধিক নেতা জানান, সরকারের পদত্যাগ এবং নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবিতে বিএনপি ও গণতন্ত্র মঞ্চের মধ্যে এখন মতপার্থক্য নেই। তবে সংবিধানের ৭০তম অনুচ্ছেদের সংস্কার; রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য; সংসদ, নির্বাহী বিভাগ ও বিচার বিভাগের মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য প্রতিষ্ঠার মতো কিছু বিষয়ে দুইপক্ষ আলোচনা করছে।

জানা গেছে, ৭০ অনুচ্ছেদ নিয়ে বিএনপি বলেছে, এ নিয়ে কী করা যাবে তা জাতীয় সরকার এসে সিদ্ধান্ত নেবে। কিন্তু গণতন্ত্র মঞ্চ বলছে, অনাস্থা ও বাজেট ছাড়া বাকি যা আছে তা সদস্যদের নিজস্ব মতামতে চলবে। এই দুটি বিষয়ে দলের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী সদস্যরা ভোটে দেবেন এবং এটা এখন ঘোষণা দিতে হবে। পরে বিএনপি চারটি বিষয় সামনে নিয়ে আসে। সেগুলো হচ্ছে—অনাস্থা, বাজেট, রাষ্ট্রের নিরাপত্তা ও সংবিধান সংশোধন। এই চারটি বিষয়ে পার্টির সিদ্ধান্তে সদস্যরা ভোট দেবেন, বাকিগুলো সদস্যদের নিজস্ব মতে চলবে। এগুলো নিয়ে বার্গিনিং হয়েছে, তবে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। এ ইস্যুতে বিএনপির স্থায়ী কমিটিতে আলোচনা করে পরবর্তী সিদ্ধান্ত জানানোর কথা। এ ছাড়া বিএনপি রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার মধ্যে ভারসাম্য আনয়নের কথা বললেও কার কতটুকু ক্ষমতা থাকবে—গণতন্ত্র মঞ্চের সঙ্গে আলোচনায় সে বিষয়টিও বেশিদূর এগোয়নি।

 
 
জনতার আওয়াজ/আ আ
 
 

জনপ্রিয় সংবাদ

 

সর্বোচ্চ পঠিত সংবাদ