সরকার পতনে কেন্দ্রের ধীরে চলো নীতিতে হতাশ বিএনপির তৃণমূল - জনতার আওয়াজ
  • আজ সন্ধ্যা ৭:১১, শুক্রবার, ১৫ই মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ১লা জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ, ২৮শে জিলকদ, ১৪৪৭ হিজরি
  • jonotarawaz24@gmail.com
  • ঢাকা, বাংলাদেশ

সরকার পতনে কেন্দ্রের ধীরে চলো নীতিতে হতাশ বিএনপির তৃণমূল

নিজস্ব প্রতিবেদক, জনতার আওয়াজ ডটকম
প্রকাশের তারিখ: রবিবার, জানুয়ারি ২২, ২০২৩ ৬:১৬ অপরাহ্ণ পরিবর্তনের তারিখ: রবিবার, জানুয়ারি ২২, ২০২৩ ৬:১৬ অপরাহ্ণ

 

ডেস্ক নিউজ
দীর্ঘদিন এককভাবে কর্মসূচি করার পর গত ৩০ ডিসেম্বর থেকে নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনসহ ১০ দফা দাবিতে যুগপৎ আন্দোলন শুরু করেছে বিএনপি। নিয়মতান্ত্রিক ধারাবাহিক কর্মসূচির পর মোক্ষম সময়ে বিশেষ করে দ্বাদশ সংসদ নির্বাচন ঘিরে নির্বাচনকালীন সরকার গঠনের আগে চূড়ান্ত আন্দোলনে যেতে চায় দলটি। অবশ্য যুগপৎ আন্দোলন শুরুর আগে সংগঠন গুছিয়ে নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধিসহ একাধিক দাবিতে গত ২২ আগস্ট থেকে মাঠে নামে বিএনপি। দেশব্যাপী বিক্ষোভ মিছিল ও বিভাগীয় গণসমাবেশের পর সর্বশেষ ১০ ডিসেম্বর ঢাকায় সমাবেশ করে দলটি। ঢাকার ওই সমাবেশ ঘিরে সারা দেশের নেতাকর্মীরা নতুন করে আশান্বিত হয়েছিল।

তবে কর্মসূচির পর নতুন করে হামলা-মামলার শিকার হওয়া, কেন্দ্র থেকে কাঙ্ক্ষিত আশা দেখাতে না পারা এবং সরকার পতনে কেন্দ্রের ধীরে চলো নীতিতে তৃণমূলের নেতাকর্মীদের মধ্যে এক ধরনের হতাশা ভর করেছে। ফলে আগামীর আন্দোলনে অংশগ্রহণ নিয়ে নতুন করে ভাবছেন তারা। এমন প্রেক্ষাপটে আন্দোলনে সরকারের পতন নিয়ে আশান্বিত হতে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের দিকে তাকিয়ে রয়েছে তৃণমূল, যাদের বিএনপির মূল শক্তি মনে করা হয়। তৃণমূলের একাধিক নেতা ও কর্মী-সমর্থকের সঙ্গে কথা বলে তাদের এমন মনোভাবের কথা জানা গেছে। তবে দলের তৃণমূল চাঙ্গা বলে দাবি কেন্দ্রের।

জানতে চাইলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বলেন, আমাদের তৃণমূল চাঙ্গা আছে। তাদের মধ্যে কোনো হতাশা নেই। জেলা, মহানগর, উপজেলা কোথাও আমাদের কোনো প্রোগ্রামই ছোট হয়নি। সার্বিক পরিস্থিতি ও সময় বুঝে আমাদের আগামীর কর্মসূচিগুলো আমরা সাজাব।

তৃণমূলে নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে মামলা হলে দলের সহযোগিতার বিষয়ে তিনি বলেন, থানায় মামলা হলে দলের পক্ষ থেকে নেতাকর্মীদের সহযোগিতা করা হয়। সব জায়গায় আমাদের নেতাকর্মীরা সহযোগিতা করার চেষ্টা করেন। সংশ্লিষ্ট জেলা ও উপজেলা বিএনপির সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকরা মিলে তাদের সহযোগিতা করেন। এ ব্যাপারে তাদের দলের পক্ষ থেকে আগেই প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

২০১৮ সালের ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত একাদশ সংসদ নির্বাচনে ভরাডুবির পর ঘুরে দাঁড়াতে সংগঠন পুনর্গঠনের কাজে নামে বিএনপির হাইকমান্ড। ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের সার্বিক নির্দেশনা ও তত্ত্বাবধানে কাউন্সিলের মাধ্যমে তৃণমূলে দল ও অঙ্গসংগঠনের কমিটিগুলো পুনর্গঠন করা হয়। পুনর্গঠন প্রক্রিয়া প্রায় সম্পন্ন হওয়ায় জ্বালানি তেল, পরিবহন ভাড়াসহ দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির প্রতিবাদে মাঠে নামে বিএনপি। গত ২২ আগস্ট থেকে সেপ্টেম্বরের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত সারা দেশের উপজেলা, থানা, ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড পর্যায়ে সভা, সমাবেশ ও বিক্ষোভ মিছিল করে। কেন্দ্রীয় নির্দেশনা অনুযায়ী, এসব কর্মসূচিতে নিজ নিজ জেলার কেন্দ্রীয় নেতা, সাবেক সংসদ সদস্য এবং বিগত জাতীয় নির্বাচনে দলের মনোনীত প্রার্থী ও মনোনয়নপ্রত্যাশীরা অংশগ্রহণ করেন। কর্মসূচি করতে গিয়ে অনেকে সরকারি দল ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হামলার শিকার হন। এ ছাড়া অঙ্গসহযোগী সংগঠনের তিনজন নেতাকর্মী মারাও যান। এই কর্মসূচির মধ্য দিয়ে দীর্ঘদিন পর তৃণমূলে নিজেদের সাংগঠনিক শক্তির ‘জানান’ দেয় বিএনপি।

এরপর জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি, লোডশেডিং, গণপরিবহনের ভাড়া বৃদ্ধি, নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের মূল্যবৃদ্ধি এবং নারায়ণগঞ্জে যুবদলের শাওন, ভোলায় ছাত্রদল নেতা নুরে আলম ও স্বেচ্ছাসেবক দল নেতা আবদুর রহিম হত্যার প্রতিবাদে ঢাকায় দুই মহানগরে ১০ সেপ্টেম্বর থেকে অক্টোবরের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত প্রতিবাদ সমাবেশ করে বিএনপি। এসব কর্মসূচি করতে গিয়ে সরকারি দলসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হামলার শিকার হন নেতাকর্মীরা। পরে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, পুলিশের গুলিতে পাঁচ নেতাকর্মী নিহত ও খালেদা জিয়ার মুক্তিসহ একাধিক দাবিতে গত ১২ অক্টোবর চট্টগ্রাম থেকে দেশব্যাপী বিভাগীয় গণসমাবেশ শুরু করে দলটি। ৩ ডিসেম্বর রাজশাহীতে সমাবেশের পর ১০ ডিসেম্বর ঢাকায় সমাবেশের মধ্য দিয়ে গণসমাবেশের কর্মসূচি শেষ করে বিএনপি।

দেখা যায়, বিএনপির বিভাগীয় গণসমাবেশগুলোতে নেতাকর্মীদের পাশাপাশি সাধারণ মানুষেরও ব্যাপক অংশগ্রহণ ছিল। নিত্যপণ্যের লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধি ও সরকারের দুঃশাসনের প্রতিবাদ জানাতে সরকারি নানা প্রতিবন্ধকতা অতিক্রম করে কর্মসূচিতে মানুষ অংশ নিয়েছিল বলে দাবি বিএনপির। তবে বিক্ষোভ মিছিল ও বিভাগীয় গণসমাবেশের কর্মসূচিকে ঘিরে তৃণমূলে নতুন করে মামলা-হামলার শিকার হন নেতাকর্মীরা। এমন প্রেক্ষাপটে তৃণমূলের নেতাকর্মীদের দৃষ্টি ছিল ঢাকার মহাসমাবেশের দিকে। বিশেষ করে ‘১০ ডিসেম্বরের পর খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানের কথায় দেশ চলবে’ বিএনপির এক কেন্দ্রীয় নেতার এমন বক্তব্যে আশান্বিত হয়েছিল তৃণমূল। তাদের প্রত্যাশা ছিল, ঢাকার সমাবেশ থেকে সরকার পতনের এক দফার ভিত্তিতে কঠোর কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে। একই সঙ্গে নেতাকর্মীদের নতুন স্বপ্ন দেখানো হবে। তবে সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় সমাবেশ থেকে ১০ দফার ভিত্তিতে যুগপৎ আন্দোলনের কর্মসূচির ঘোষণা দেয় দলটি। নিয়মতান্ত্রিক শান্তিপূর্ণ কর্মসূচির মধ্য দিয়ে সরকারের পতন ঘটাতে চায় বিএনপি। মূলত ঢাকার সমাবেশের পর কর্মসূচির দিক থেকে ম্রিয়মাণ হয়ে পড়ে দলটি।

এদিকে দলের তৃণমূল ও মধ্যম সারির নেতাদের দিকে কঠোর কর্মসূচি ঘোষণার চাপ থাকলেও সে পথে এ মুহূর্তে হাঁটবে না বিএনপি। সরকারি কোনো উসকানিতে পা দেবে না দলটি। বিএনপির নীতিনির্ধারকরা মনে করেন, হরতাল-অবরোধের মতো ধ্বংসাত্মক কর্মসূচি এখন আন্দোলনের মাঠে কার্যকারিতা হারিয়েছে। তাই সরকার পতন আন্দোলনেও ব্যতিক্রমী শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি দিতে হবে।

দলীয় সূত্রে জানা গেছে, ১০ দফা দাবিতে আপাতত রাজধানী ঢাকামুখী অহিংস কর্মসূচি নিয়ে সামনে এগোতে চাইছে বিএনপি। ঢাকা অভিমুখী লংমার্চ ও রোডমার্চ, ঢাকায় গণঅবস্থান, ঢাকা ঘেরাও, সচিবালয় ঘেরাও, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ঘেরাও এ ধরনের কর্মসূচি নিয়ে বিএনপিতে আলোচনা চলছে। ফেব্রুয়ারি মাসের শেষদিকে বিভিন্ন জেলা থেকে ‘চলো চলো ঢাকা চলো’ রোডমার্চ এবং রমজানের আগে মার্চের প্রথম সপ্তাহে ঢাকায় মহাসমাবেশ করার চিন্তা করছে দলটি। ধারাবাহিক এসব কর্মসূচি পালন করে মোক্ষম সময়ে আন্দোলনের গতি বাড়িয়ে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছাতে চায় দলটি। মূলত দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে নির্বাচনকালীন সরকার গঠনের পূর্বে চূড়ান্ত আন্দোলনে নামতে চায় বিএনপি। দলটির নীতিনির্ধারকরা মনে করছেন, সরকারকে ফের ক্ষমতায় থাকতে হলে যে কোনো মূল্যে নির্বাচন করতে হবে। বর্তমান ব্যবস্থা অনুযায়ী শেখ হাসিনা সরকারকে দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনের তিন মাস পূর্বে নির্বাচনকালীন সরকার গঠন করতে হবে। সেক্ষেত্রে আরও ৮-৯ মাস সময় রয়েছে। এখনই সর্বাত্মক আন্দোলন শুরু করলে সরকারি মামলা-হামলায় নেতাকর্মীরা আরও পর্যুদস্ত হয়ে পড়বে। সেক্ষেত্রে আন্দোলনকে অক্টোবর-নভেম্বর পর্যন্ত টেনে নেওয়া দুরূহ হয়ে যাবে। সে কারণে আন্দোলনে ‘ধীরে চলো নীতি’ গ্রহণ করেছে বিএনপি।

এদিকে বিগত কর্মসূচিগুলোকে ঘিরে নতুন করে মামলায় পর্যুদস্ত তৃণমূলের নেতাকর্মীরা। সাম্প্রতিক আন্দোলন শুরুর পূর্বে আগামী জাতীয় নির্বাচনে দলীয় প্রার্থী হতে ইচ্ছুক নেতাদের বিএনপির হাইকমান্ডের পক্ষ থেকে নেতাকর্মীদের মামলা-হামলার বিষয়টি দেখভালের নির্দেশ দেওয়া হয়। কিন্তু অধিকাংশ জায়গায় এই নির্দেশনা বাস্তবায়ন হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে। দেশের বিভিন্ন উপজেলার নেতাকর্মী-সমর্থকরা অভিযোগ করেছেন, কর্মসূচি পালন করতে গিয়ে নতুন করে মামলার শিকার হয়েছেন তারা। কিন্তু দল বা স্থানীয় নেতাদের কাছ থেকে তেমন কোনো সহযোগিতা পাচ্ছেন না। মূলত নিজেদের টাকায় জামিনের ব্যবস্থা ও এসব মামলা মোকাবিলা করতে হচ্ছে। তা ছাড়া আগামীতে সরকার যে পরিবর্তন হবে কেন্দ্রীয় নেতাদের কোনো বক্তব্য কিংবা নির্দেশনায় তারা আশান্বিত হতে পারছেন না। সে কারণে ভবিষ্যৎ আন্দোলনে অংশগ্রহণের ব্যাপারে ভাবছেন তারা।

চট্টগ্রামের রাউজান, ময়মনসিংহের নান্দাইল, সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুর, দিনাজপুরের পার্বতীপুর, পটুয়াখালীর কলাপাড়া, নড়াইল সদর উপজেলা বিএনপির একাধিক নেতাকর্মী আক্ষেপ করে কালবেলাকে বলেন, কর্মসূচি করতে গিয়ে মামলার শিকার হলে দল থেকে কিছুটা সহযোগিতা পেলেও দলপন্থি আইনজীবীদের কাছ থেকে তেমন সহযোগিতা পাওয়া যায় না। বড় কোনো নেতার বিরুদ্ধে মামলা হলে আইনজীবীরা ঝাঁপিয়ে পড়েন, আমাদের ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ বিপরীত চিত্র। অথচ শুনেছি, মামলায় সহযোগিতা করার জন্য নাকি তাদের কেন্দ্র থেকে নির্দেশনা দেওয়া আছে। কিন্তু বাস্তবে তার প্রতিফলন নেই। এটা দেখারও যেন কেউ নেই।

এ ব্যাপারে বক্তব্য জানতে বিএনপিপন্থি জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরামের সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার কায়সার কামালকে গতকাল শনিবার বিকেলে একাধিকবার ফোন দেওয়া হলেও তিনি রিসিভ করেননি।

 
 
জনতার আওয়াজ/আ আ
 
 

জনপ্রিয় সংবাদ

 

সর্বোচ্চ পঠিত সংবাদ