সিলেটের ভোটচিত্র উৎকণ্ঠার ‘পঁতাবেলা’ পেরিয়ে শান্ত সারাদিন
নিজস্ব প্রতিবেদক, জনতার আওয়াজ ডটকম
প্রকাশের তারিখ:
বৃহস্পতিবার, ফেব্রুয়ারি ১২, ২০২৬ ৬:৫০ অপরাহ্ণ পরিবর্তনের তারিখ:
বৃহস্পতিবার, ফেব্রুয়ারি ১২, ২০২৬ ৬:৫০ অপরাহ্ণ

উজ্জ্বল মেহেদী, সরেজমিন ঘুরে
সংগৃহীত ছবি
ভোটের দিনে শান্ত পরিবেশে মাঠে দেখা হওয়ায় কোলাকুলি করছেন বিএনপি ও জামায়াত প্রার্থী আরিফুল হক চৌধুরী ও জয়নাল আবেদীন। ছবি: খবরের কাগজ
সিলেট অঞ্চলের একটি পুরোনো হাটের নাম সালুটিকর। মহাসড়কলাগোয়া স্থানটি তিনটি উপজেলার মিলনস্থল। একপাশে সিলেট সদর, আরেক পাশে কোম্পানীগঞ্জ। বাকিটা গোয়াইনঘাট উপজেলায়। গৃহস্থ রফিক মিয়া ভোট দিয়ে স্বস্তিতে বসেছিলেন সড়কপাশের একটি টং দোকানে। কথার শুরুতে ছিল উৎকণ্ঠা। শেষে অবশ্য উচ্ছ্বাস। রফিক বলেন, ‘পঁতাবেলা থাকি হজাগ (শেষ রাত থেকে জেগে থাকা), পয়লাই ভোট দিছি। গরু চরানো শেষে ফিরমু। যারে ভোট দিছি, তার পাস-ফেল দেখমু। এর বাদে বাড়িত যাইমু!’
রফিকের বলা ‘পঁতাবেলা’ শব্দটি অঞ্চলসংস্কৃতির একটি মাহাত্ম্যপূর্ণ অভিব্যক্তি। অধীর আগ্রহ থেকে বলা হয়। সময়টি হচ্ছে, রাত পোহানোর আগেই জেগে থাকা। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিনক্ষণে গত বুধবার রাত থেকে ছিল উৎকণ্ঠা। রাত সাড়ে ১০টার দিকে সিলেট নগরীর মিরাবাজার এলাকার একটি ভোটকেন্দ্রে পাহারায় ধরা পড়ে পর্যবেক্ষক পরিচয়ে প্রবেশ। এ ঘটনার প্রায় দুই ঘণ্টার পর সিলেট-৪ আসনের জৈন্তাপুরের সারিঘাট এলাকায় ঘাটে আরেক ঘটনা। সহকারী প্রিসাইডিং অফিসারকে একটি বাড়িতে রহস্যজনক ব্যাগ বহনকালে জনতার হাতে ধরা পড়েন। এ দুই ঘটনার ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। উৎকণ্ঠার মধ্যে শেষ রাতে ঘটে আরেক ঘটনা। সিলেট-৩ আসনের বালাগঞ্জ এলাকায় ভোটকেন্দ্র ঘিরে রাখা। রাতভর তিন ঘটনায় উত্তপ্ত ওই তিনটি স্থানে বৃহস্পতিবার ভোটের দিন দেখা গেছে শান্ত।
বৃহস্পতিবার (১২ ফেব্রুয়ারি) সকাল সাড়ে সাতটা থেকে ভোটগ্রহণ শুরু হয়েছে। এই ভোটগ্রহণ চলে বিকেল সাড়ে চারটা পর্যন্ত। ভোটগ্রহণ শুরু হলেও ভোটার উপস্থিতি কিছুটা কম। সরজমিনে নগরীর বিভিন্ন ভোট কেন্দ্র ঘুরে দেখা যায়, মানুষজন কেন্দ্রে আসতে শুরু করছেন। সকাল থেকেই কেন্দ্রগুলোতে ভোটারদের সারিবদ্ধ হয়ে ভোট দিতে দাঁড়াতে দেখা গেছে। তবে শীতের দিন হওয়ায় সকালে ভোটার উপস্থিতি কিছুটা কম। সকালে ভোটগ্রহণ শুরুর পর থেকে নির্বাচনকেন্দ্রিক কোনো ধরনের সহিংসতার খবর পাওয়া যায়নি। তবে রাতে সিলেট জেলার বেশ কিছু আসনের বিভিন্ন ‘জালভোট’, পর্যবেক্ষক পরিচয়ে কেন্দ্রে প্রবেশ, জামায়াতের স্থানীয় নেতাদের কেন্দ্রে প্রবেশ করে প্রিসাইডিং অফিসারের সঙ্গে সভা, সহকারী প্রিসাইডিং অফিসারদের জামায়েত নেতার বাসায় যাওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে উতপ্ত পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়। সিলেট-১ আসনে সিলেট নগরীর মিরাবাজার এলাকায় শাহজালাল জামেয়া ইসলামিয়া স্কুল অ্যান্ড কলেজ কেন্দ্রের ভেতরে পর্যবেক্ষক পরিচয়ে প্রবেশের চেষ্টাকালে তিন তরুণকে আটক করে পুলিশের হাতে তুলে দিয়েছেন এলাকাবাসী। একইভাবে নগরীর সাগরদিঘির পাড় এলাকার ব্লু-বার্ড স্কুল অ্যান্ড কলেজ কেন্দ্রেও কয়েকজন প্রবেশের চেষ্টা করলে স্থানীয় মানুষজন ও বিএনপির নেতা-কর্মীদের বাধার মুখে তারা বেরিয়ে আসেন।
বুধবার (১১ ফেব্রুয়ারি) রাত সাড়ে ১০টার দিকে মিরাবাজার এলাকায় এবং রাত ১০টার দিকে সাগরদিঘির পাড় এলাকার ভোটকেন্দ্রে এ ঘটনা ঘটে। সিলেট-৩ আসনে বালাগঞ্জ উপজেলার একটি ভোটকেন্দ্রে ‘জালভোট’ দেওয়াকে কেন্দ্র করে ১১-দলীয় জোট ও বিএনপি সমর্থকদের মধ্যে ব্যাপক উত্তেজনা ও মারামারির ঘটনা ঘটেছে। রাতে উপজেলার পূর্ব গৌরীপুর ইউনিয়ন জামায়াতে ইসলামীর আমির তারিকুল ইসলামসহ কয়েকজন ব্যক্তি ওই ভোটকেন্দ্রে প্রবেশ করেন। বিষয়টি টের পেয়ে আশেপাশে থাকা বিএনপির নেতা-কর্মীরা তাদের কেন্দ্রের ভেতরেই ঘেরাও করেন। এ সময় প্রিসাইডিং কর্মকর্তার কার্যালয়ে উভয় পক্ষের মধ্যে বাকবিতণ্ডা শুরু হয় এবং একপর্যায়ে তা হাতাহাতি ও মারামারিতে রূপ নেয়। এ ঘটনায় প্রিজাইডিং অফিসারকে প্রত্যাহার করেছেন রিটর্নিং কর্মকর্তা।
সিলেট -৪ আসনের জৈন্তাপুরে উপজেলার ভিত্রিখেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রের দুই সহকারী প্রিসাইডিং অফিসার কেন্দ্রের পাশে জামায়াত নেতার বাড়িতে যাওয়ায় স্থানীয়রা তাদের আটক করেন। এতে উত্তেজনাকর পরিস্থিতি তৈরি হয়। বুধবার (১১ ফেব্রুয়ারি) রাত ১২টার দিকে দুই কর্মকর্তাকে আটক করেন স্থানীয় জনতা।
জৈন্তাপুরের যেখানে আগের রাতে সহকারী প্রিসাইডিং অফিসার নিয়ে উৎকণ্ঠার অবসান হয়েছে দুজনকে দায়িত্ব থেকে বাদ দেওয়ায়। জৈন্তাপুর থেকে গোয়াইনঘাট ও কোম্পানীগঞ্জে ছিল শান্তিপূর্ণ পরিবেশ। দুপুরের পর ভোটের মাঠে পথে হঠাৎ দেখা হয় দুই প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী বিএনপির আরিফুল হক চৌধুরী ও জামায়াতের জয়নাল আবেদীন। দুজনই কুশল বিনিময় করে করমর্দন ও কোলাকুলি করেন। প্রতিদ্বন্দ্বী দুই প্রার্থীর এ দৃশ্য কর্মীসমর্থক থেকে শুরু করে ভোটারদের মধ্যে ছিল স্বস্তির।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সিলেট জেলার ৬টি সংসদীয় আসনে ৩৩ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রয়েছেন। সিলেট জেলার ৬টি আসনে মোট ভোটার ২৯ লাখ ১৬ হাজার ৫৭৯ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ১৪ লাখ ৯৮ হাজার ৯৫৩ এবং নারী ভোটার ১৪ লাখ ১৭ হাজার ৬১০ জন। এছাড়া তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার ১৬ জন। ৬টি আসনে মোট ভোটকেন্দ্র আছে সংখ্যা ১ হাজার ১৬টি।
সিলেটের ছয়টি আসনের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ভোটার রয়েছে সিলেট-১ আসনে। সিলেট সিটি করপোরেশনের ৩৬টি ওয়ার্ড, সাত ইউনিয়ন ও একটি ক্যান্টনমেন্ট বোর্ড নিয়ে গঠিত সিলেট-১ আসন। এ আসনে মোট ভোটার ৬ লাখ ৮০ হাজার ৯৪৩ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ৩ লাখ ৪২ হাজার ৬৩৭ জন এবং নারী ভোটার রয়েছেন ৩ লাখ ২৩ হাজার ৬৮০ জন। লিঙ্গের ভোটার রয়েছেন ১৩। এই আসনে মোট ভোটকেন্দ্র আছে ২১৫টি।
দুপুরের দিকে সিলেটে ভোটার উপস্থিতি নিয়ে সন্তোষ প্রকাশ করে সিলেটের রিটার্নিং কর্মকর্তা ও জেলা প্রশাসক মো. সারওয়ার আলম সংবাদ কর্মীদের ব্রিফ করেন।
তিনি বলেন, সিলেট অঞ্চলে সাধারণত মানুষ সকালে একটু দেরিতে ভোটকেন্দ্রে আসেন। সেই তুলনায় বিভিন্ন কেন্দ্রে এখন পর্যন্ত যে ভোটের হার দেখা গেছে, তা মোটামুটি সন্তোষজনক। দিন শেষে ৫০–৬০ শতাংশের বেশি হতে পারে বলে তিনি মনে করেন।
বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ভোটার উপস্থিতি আরও বাড়বে জানিয়ে জেলা প্রশাসক আরও বলেন, তবে গত রাতে দু-একটি স্থানে সামান্য সমস্যা হলেও তা দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আনা হয়েছে।প্রার্থী ও ভোটারদের উদ্দেশে তিনি বলেন, নির্বাচন একটি গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া। সবাইকে সহনশীল আচরণ করতে হবে এবং কোনো ধরনের সহিংসতা বা নির্বাচনি আইন লঙ্ঘন থেকে বিরত থাকতে হবে। জেলার ছয়টি আসনে ৩৩ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন, নির্বাচিত হবেন ছয়জন। জনগণ যাকে নির্বাচিত করবেন, সেই ফলাফল সবাইকে মেনে নেওয়ার আহ্বান আমার।’
এবার সংসদ নির্বাচনের সঙ্গে রাষ্ট্র সংস্কারে ‘হ্যাঁ-না’ ভোট নিয়ে বলা হচ্ছিল ভোটগ্রহণ বিলম্বিত হতে পারে। সিলেট নগরীর ভাতালিয়া ভোট কেন্দ্রে বেলা আড়াইটার দিকে ভোট দেন লিটন চৌধুরী। ভোটারের চাপ কম থাকায় তিনি ব্যালেট হাতে নিয়ে তিন মিনিট সময়ের মধ্যে ভোট দিতে পেরেছেন জানিয়ে খবরের কাগজকে বলেন, ‘আমারও ধারণা হয়েছিল ভোট দিতে গিয়ে না জানি কত সময় লাগবে। কিন্তু গিয়ে দেখি তিন মিনিটেই দিতে পেরেছি ।’
এদিকে, দিনভর বিভিন্ন কেন্দ্রে সরেজমিন অবস্থান ও খোঁজ নিয়ে বড় ধরনের কোনো সহিংসতার খবর পাওয়া যায়নি। বিকেল চারটার পর থেকে সকলের নজর ফল গণনার দিকে। সিলেটের গ্রাম, শহরতলী ও নগরীর বিভিন্ন কেন্দ্রের পাশে জনতার ভিড় লক্ষ্যণীয়ভাবে দেখা গেছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীও তৎপর হয়।
ভোটগ্রহণ শেষে সিলেটের সহকারী রিটানিং কর্মকর্তা সাঈদা পারভীন বলেন, ‘সিলেটে শান্তিপূর্ণভাবেই ভোটগ্রহণ শেষ হয়েছে। বিভিন্ন কেন্দ্র থেকে ফলাফল জেলা রিটার্নিং কর্মকর্তার দপ্তরে আসা মাত্র তা বেসরকারিভাবে ঘোষণা শুরু হবে।
জনতার আওয়াজ/আ আ