সীমান্তে অস্ত্র আওয়ামী চক্রান্তের আভাস
নিজস্ব প্রতিবেদক, জনতার আওয়াজ ডটকম
প্রকাশের তারিখ:
বৃহস্পতিবার, জুলাই ২৭, ২০২৩ ৫:৩২ অপরাহ্ণ পরিবর্তনের তারিখ:
বৃহস্পতিবার, জুলাই ২৭, ২০২৩ ৫:৩২ অপরাহ্ণ

আমিরুল ইসলাম কাগজী ও অধ্যাপক ড মোর্শেদ হাসান খান
সীমান্ত দিয়ে বিএনপির অস্ত্র আনার খবর পাওয়া যাচ্ছে বলে দাবি করেছেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের। মঙ্গলবার দুপুরে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে যৌথসভায় এসব কথা বলেন ওবায়দুল কাদের। সেতুমন্ত্রী বলেন, ‘খবর পাচ্ছি, সীমান্ত থেকে অস্ত্র কিনছে তারা (বিএনপি)। চাঁপাইনবাবগঞ্জ তাদের অস্ত্র সরবরাহের একটি ঘাঁটি। আগ্নেয়াস্ত্র এনে তারা মজুত করছে। — প্রথম আলো,২৫-০৭-২০২৩। ওবায়দুল কাদের আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সরকারের সেতুমন্ত্রী। ক্ষমতাসীন দল ও সরকারের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ব্যক্তি। কোনো যাচাই বাছাই ছাড়া হাওয়া থেকে পাওয়া খবর তিনি প্রকাশ্যে বলবেন এটা বিশ্বাসযোগ্য নয়।
ওবায়দুল কাদেরের এই অস্ত্র আমদানির কথা শুনে বাতাসে বারুদের গন্ধ পাওয়া যাচ্ছে । যেখানে ঘোষণা দিয়ে আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা অস্ত্রের লাইসেন্স নিয়েছে, প্রতিনিয়ত তাদের নেতাকর্মীদের মধ্যে গোলাগুলি করে নিজেরাই মারা যাচ্ছে সেখানে অস্ত্র আমদানির কথা বলে বিএনপির উপর একটি দায় চাপানোর অপচেষ্টা হচ্ছে। এটি আরেকটি ষড়যন্ত্রের সূচনা বলে উল্লেখ করেছেন বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।
বিগত ১৫টি বছর বিএনপি বিরোধী দলে আছে, সরকার বিরোধী বহু আন্দোলন সংগ্রাম মিছিল মিটিং করেছে, কোথাও কোনদিন কোন একটি ঘটনায় বিএনপি নেতাকর্মীরা গোলাগুলি করে মারা গেছে এমন নজির কি আছে? ওবায়দুল কাদের এমন কোন উদাহরণ কি দেখাতে পারবেন? তাহলে হঠাৎ কেন ভারত থেকে অস্ত্র আমদানির এই সংবাদ মানুষের সামনে আনলেন? তাহলে কি ধরে নিতে হবে আওয়ামী লীগ এখন সড়ক-মহাসড়ক বাদ দিয়ে অলি গলির কানা ঘুপছি পথে ক্ষমতা আকড়ে ধরে রাখার পথ খুঁজছে? ভোটের মাঠে তারা এক ঘরে হয়ে পড়েছে। হাতেগোনা কয়েকটি অতি ডান অতি বাম সংগঠনই এখনো তাদের শেষ ভরসা যাদের কোনো ভোট নেই বললেই চলে। এক ব্যক্তি এক দল, এক ভোট নিয়ে এগিয়ে চল।
ঠিক তার বিপরীতে জনগণের বিপুল অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে ফ্যাসিস্ট সরকারের পদত্যাগ দাবির আন্দোলন এগিয়ে চলেছে। বিএনপি আন্দোলনে জনগণকে সফলভাবে সম্পৃক্ত করতে সক্ষম হয়েছে। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিতে যখন তাদের দিশেহারা অবস্থা, নুন আনতে পানতা ফুরায়, গ্যাস-বিদ্যুতের জন্য বাড়তি টাকা গুনতে হয় তখন তারা আর ঘরে বসে থাকতে পারে না। রাজপথের আন্দোলনই তাদের একমাত্র বাঁচার পথ। তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপির এবারের আন্দোলনের সাফল্য একটাই জনগণকে সর্বোচ্চ সম্পৃক্ত করা। এখানেই আওয়ামী লীগের তথা শেখ হাসিনার বড় ভয়। সেটা তিনি টের পেয়েছেন ১৯৯১ সালের নির্বাচনে, টের পেয়েছেন ২০০১ সালের নির্বাচনে। তিনি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে প্রবল আন্দোলন করে বিএনপিকে ক্ষমতাচ্যুত করে জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় পার্টি জাসদ, ওয়ার্কার্স পার্টিকে সাথে নিয়েও ১৯৯৬ সালে সরকার গঠন করতে পারেননি। তাইতো আসম রব, দীলিপ বড়ুয়া এবং আনোয়ার হোসেন মঞ্জুকে মন্ত্রীত্ব দিয়ে সমঝোতার সরকার গড়তে হয়েছিলো। আর নাস্তানাবুদ বিএনপি এককভাবে বাংলাদেশের ইতিহাসে ১১৭ আসন নিয়ে বিরোধী দলের আসনে বসে। যে কারণে শেখ হাসিনা ২০০৭ সালের নির্বাচনে অংশ নিয়ে পরাজয়ের গ্লানি প্রকাশ্যে আনতে চাননি। যে কারণে তিনি কুখ্যাত এক এগারোর মতো সেনাশাসন ডেকে এনেছিলেন। মইনুদ্দিন-ফখরুদ্দিন সরকারের তত্ত্বাবধানে ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর নির্বাচন ছিল সবচেয়ে কলঙ্কজনক। ভদ্রতার মুখোশে ডক্টর হুদা নির্বাচন কমিশন ১৭০ টি আসনে ভোটকাস্টিং দেখিয়েছে ৮৫% থেকে ৯৫% যা এক কথায় নজিরবিহীন। মইন-ফখর উদ্দীনরা নিজেদের পিঠ বাঁচাতে অতিরিক্ত ভোট কাস্টিং করে আওয়ামী জোটকে ক্ষমতাসীন করেছিলো।
জনগণের এই সমর্থনের কথা আমাদের মত আমজনতার চেয়ে শেখ হাসিনা অনেক বেশি জানেন। আর জানেন বলেই তিনি ক্ষমতায় বসে প্রথম হাত দিলেন তত্ত্বাবধাযক সরকার বাতিলের কাজে। নিজের ইচ্ছার কথা তিনি আদালতের ঘাড়ের উপর চাপিয়ে দিয়ে বললেন, “আদালতই তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাতিল করেছে। তারই ধারাবাহিকতায় সংসদে বিল উত্থাপন করে তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাতিল করা হলো।” এটা ডাহা মিথ্যা কথা। আদালত বলেছিল আরো দুই টার্ম তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে জাতীয় নির্বাচন করা যেতে পারে। শেখ হাসিনা সেই আদেশ বাতিল করে দিলেন। ২০১৪ সালে তার অধীনেই নির্বাচনের আয়োজন করলেন। জনগণ ভোট কেন্দ্রে যাওয়ার আগেই ১৫৪ আসন নিয়ে সরকারও গঠন করে ফেললেন তিনি। ২০১৮ সালের নির্বাচনে যখন বিএনপি যোগদানের ঘোষণা দিল তখন তিনি দিশেহারা হয়ে গেলেন। গোয়েন্দা রিপোর্ট যখন বলছে আওয়ামী লীগের ভরাডুবি হবে তখন তিনি ভোটের আগের রাতেই ব্যালট বাক্স ভরে নির্বাচন শেষ করে দিলেন। পাঁচ শতাংশ ভোটের অধিকারী জাতীয় পার্টি কে বানালেন গৃহপালিত বিরোধী দল। যেন বাপ দাদার তালুক, তিনি যা বলবেন সেটাই হবে যাকে যা খুশি দিবেন তাকে সেটাই মেনে নিতে হবে। তিনি রাজা বাকিরা প্রজা, এমন মানসিকতা নিয়ে তিনি দুটি নির্বাচন শেষ করেছেন। দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনও এমন কায়দায় পার করে নিতে চান। কিন্তু তারেক রহমানের নেতৃত্বে জেগে উঠেছে জনতা, ‘বারে বারে ঘুঘু তুমি খেয়ে যাও ধান’, সেটা এবার হবে না। তাইতো জনতার জোয়ার দেখে দলটি চেনা সড়ক মহাসড়ক পরিহার করে কানাগলি বেছে নিচ্ছে। ইন্ডিয়ার সীমান্ত থেকে অস্ত্র আনার গল্প ফাঁদছে। বিরোধী দলের উপর কি ধরনের নির্যাতন চালানো হতে পারে এটা তার ছোট্ট একটা নমুনা। আর বিরোধী দলের ওপরে নির্যাতন নিপীড়ন চালানো হলে কেউ যাতে বক্তব্য রাখতে না পারে সেজন্য শাসানো হচ্ছে রাষ্ট্রদূতদের। চোটপাট করা হচ্ছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ওপর।
ঢাকা ১৭ আসনের উপনির্বাচনের ভোট গ্রহণ হয়েছে ১৭ জুলাই। সেইদিন স্বতন্ত্র প্রার্থী হিরো আলমকে কেন্দ্রের বাইরে রাস্তায় ফেলে তাঁকে পিটিয়েছিলেন নৌকা প্রতীকের ব্যাজধারীরা। একদিন পর ১৯ জুলাই ওই ঘটনার নিন্দা জানিয়ে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা, ফ্রান্স, জার্মানি, ইতালি, নেদারল্যান্ডস, স্পেন, ডেনমার্ক, সুইডেন, নরওয়ে, সুইজারল্যান্ড এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন-ইইউ একটি যৌথ বিবৃতি দেয়। বিবৃতি দেওয়ার এক সপ্তাহ পর ২৬ জুলাই রাষ্ট্রদূতদের ডেকে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী মো. শাহরিয়ার আলম সরকারের অসন্তোষের কথা জানালেন। সরকারকে পাশ কাটিয়ে ভবিষ্যতে এ ধরনের ‘অকূটনৈতিক’ আচরণ থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানানো হয়েছে বিদেশি রাষ্ট্রদূতদের।
ক্ষুদ্র জ্ঞানে যা বুঝা যায় তা হলো, ইইউসহ এই ১২ দেশকে আওয়ামী লীগ এখন প্রতিপক্ষ ভাবতে শুরু করেছে। বিলম্বে হলেও তাদের ডেকে এই বার্তা দেওয়া হলো যে, “তোমরা আমাদের অভ্যন্তরিন ব্যপারে নাক গলাবে না।”
এ ঘটনার মধ্য দিয়ে বিএনপিকে ও একটি বার্তা পৌঁছে দেওয়া হল যে, সরকার এখন থেকে তাদের বিরুদ্ধেও কড়া অ্যাকশনে চলে যাবে। এখন থেকে হামলা হবে, মামলা হবে, প্রতিরোধ হবে, পাল্টাপাল্টি কর্মসূচি হবে, রাজপথে মোকাবেলা হবে। দলীয় নেতাকর্মীদের পাশাপাশি পুলিশ প্রশাসন তো আছেই যে কারণে বিএনপিকে ২৭ তারিখের কর্মসূচি ২৮ তারিখে নিতে হয়। সমাবেশের ভেন্যু নিয়ে পুলিশের সঙ্গে দেনদরবার করতে হয়। আওয়ামী লীগ যেকোনো জায়গায় যেকোনো অবস্থানে যেকোনো পরিস্থিতিতে সভা সমাবেশ করতে পারে তাদের কোন অনুমতির প্রয়োজন হয় না দেন দরবার করার দরকার হয় না।
এখন থেকে বিএনপির উপরে যে সমস্ত অ্যাকশান নেওয়া হোক না কেন সে ব্যপারে বিদেশি বন্ধুরা যাতে আর মুখ খুলতে না পারে তার একটা মহড়া হয়ে গেল।
আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের যে বললেন, “সীমান্ত থেকে অস্ত্র কিনছে বিএনপি। চাঁপাইনবাবগঞ্জ তাদের অস্ত্র সরবরাহের একটি ঘাঁটি ” এ তো রীতিমতো চোখ কপালে তোলা সংবাদ।
এখন কয়েকটি প্রশ্ন —
১. এমন সংবাদ জানার পর সেই অস্ত্র উদ্ধারে তিনি কী ব্যবস্থা নিয়েছেন?
২. কোন তারিখে এই অস্ত্র সীমান্ত পেরিয়ে চাঁপাইনবাবগঞ্জ এনে মজুত করা হয়েছে?
৩.অস্ত্র কি বিজিবির চোখ ফাঁকি দিয়ে বাংলাদেশে ঢুকেছে নাকি তাদের জ্ঞাতসারেই?
৪. অপর পক্ষে এই অস্ত্র কি বিএসএফ বিনা বাধায় পার করে দিয়েছে?
৫.পররাষ্ট্রমন্ত্রী একে মোমেন বলে থাকেন মোদি ও হাসিনা সরকারের মধ্যে সম্পর্ক স্বামী-স্ত্রীর। ইন্ডিয়া এই অস্ত্র কাকে মারার জন্য পাঠালো ?
তাহলে তো বলতে হবে ওবায়দুল কাদেরের সরকারের পায়ের তলায় মাটি নেই। থানা পুলিশ ও সীমান্ত বাহিনি তাদের সাথে অসহযোগ শুরু করে দিয়েছে। আর ইন্ডিয়া এই সরকারকে সাপোর্ট দিচ্ছে না।
জনতার আওয়াজ/আ আ