সুনামগঞ্জ-২ দিরাই-শাল্লাভোটের মাঠে আগামী জাতীয় নির্বাচন কেমন হবে?
নিজস্ব প্রতিবেদক, জনতার আওয়াজ ডটকম
প্রকাশের তারিখ:
সোমবার, সেপ্টেম্বর ২২, ২০২৫ ৭:৩৪ অপরাহ্ণ পরিবর্তনের তারিখ:
সোমবার, সেপ্টেম্বর ২২, ২০২৫ ৭:৩৪ অপরাহ্ণ

জনতার আওয়াজ ডেস্ক
ছবি: সংগৃহীত
ব্যক্তির চেয়ে দল বড়। এ কথা রাজনৈতিক অঙ্গনে অনেকটা প্রবাদ সত্য হয়ে প্রচলিত। ভোটের মৌসুমে মনোনয়নবঞ্চনায় মনঃক্ষুণ্ন কর্মীদের তুষ্ট করতে এ কথা আরও বেশি করে বলা হয়। বহুল প্রচলিত প্রবাদ যেন মিথ্যা হয়ে আছে সিলেট অঞ্চলের একটি নির্বাচনি এলাকায়। দল নয়, ব্যক্তিই যেখানে ভোটে জেতার শক্তি!
এ রকম এক ভোটের মাঠ হচ্ছে সুনামগঞ্জের দিরাই-শাল্লা। বাংলাদেশের ভাটির এলাকা হিসেবে পরিচিত সুনামগঞ্জ-২ নির্বাচনি (দিরাই-শাল্লা) আসনটির ভোটের ফলাফলে এ সত্যটি ভোটের রাজনীতিতে গাথা হয়ে আছে। সর্বশেষ ২০২৪ সালের ৭ জানুয়ারির নির্বাচনেও ব্যক্তির শক্তি দেখা গেছে। পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের শেষ একতরফা নির্বাচনে দলীয় প্রার্থী চৌধুরী আব্দুল্লাহ আল মাহমুদ (আল আমিন চৌধুরী) নৌকা প্রতীক নিয়েও জিততে পারেননি। সেখানে জিতেছিলেন ব্যক্তিত্বের শক্তিতে স্বতন্ত্র প্রার্থী জয়া সেনগুপ্তা।
ব্যক্তিশক্তির এমন ভোটের মাঠে আগামী জাতীয় নির্বাচন কেমন হবে? এ প্রশ্নে দল ছাপিয়ে ব্যক্তিত্বের জোরে অগ্রসর হওয়ার পন্থা অবলম্বন করছে বিএনপি-জামায়াতসহ নতুন রাজনৈতিক দল জাতীয় নাগরিক পার্টিও (এনসিপি)।
ব্যক্তিশক্তির প্রকাশ
সুনামগঞ্জ-২ (দিরাই-শাল্লা) আসনটি ভোটের রাজনীতিতে ‘সুরঞ্জিতের আসন’ হিসেবে পরিচিত। পার্লামেন্টারিয়ানখ্যাত এই রাজনীতিবিদ ২০১৭ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি মারা গেলে তার স্ত্রী ড. জয়া সেনগুপ্ত ওই বছরের ৩০ মার্চ অনুষ্ঠিত উপনির্বাচনে আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী হিসেবে প্রথম সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। ২০১৮ সালে দ্বিতীয়বার সংসদ সদস্য হন। তৃতীয়বার আর দলীয় মনোনয়ন পাননি জয়া সেনগুপ্ত। তখন দল ছাপিয়ে ব্যক্তি ইমেজ আবার প্রকাশ পায়। ব্যক্তি ইমেজে ভোটে গোষ্ঠী-গোত্র-ধর্মই প্রাধান্য পায়।
তথ্যানুসন্ধানে দেখা গেছে, ব্যক্তিশক্তির উন্মেষ ঘটে সুরঞ্জিতের ভোটের রাজনীতির সূত্র ধরে। এই উন্মেষে রাজনীতিও এগিয়েছে। সুরঞ্জিতের সঙ্গে জাতীয়পার্টি ছেড়ে বিএনপিতে যোগ দেওয়া সাবেক সংসদ সদস্য নাছির উদ্দিন চৌধুরী ও সাবেক বিচারপতি এবং সাবেক সংসদ সদস্য মিফতা উদ্দিন চৌধুরীর নাম পাওয়া যায়।
সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত এ আসনে মোট সাতবার সংসদ সদস্য নির্বাচন করেন। প্রাদেশিক পরিষদের সদস্যও নির্বাচিত হয়েছিলেন। সুরঞ্জিতের মৃত্যুতে তার উত্তরসূরি হিসেবে স্ত্রী জয়া সেনগুপ্তর মাধ্যমে ব্যক্তি ইমেজে জয়ের ধারা অব্যাহত ছিল। এ হিসেবে আসনটিতে দলের চেয়ে ব্যক্তি ইমেজ প্রায় অর্ধশত বছর ধরে প্রায় প্রতিষ্ঠিত বলা যায়।
ছাত্র জীবনে বামপন্থি রাজনীতির সক্রিয়তায় হাওরাঞ্চলে ‘জাল যার জলা তার’ দাবির আন্দোলনের ফলে ভোটের রাজনীতিতে প্রভাবশালী হয়ে ওঠেন। ১৯৯১ সালে নৌকা প্রতীক নিয়ে সুরঞ্জিত জিতলেও ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারির পর ১২ জুন অনুষ্ঠিত নির্বাচনে সদ্য আওয়ামী লীগে যোগ দিয়ে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে হেরে যান। এখানেও ছিল দলবদলে ব্যক্তিগত ইমেজের ঘাটতি। পরে অবশ্য হবিগঞ্জ-২ আসনে উপনির্বাচন তিনি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। হবিগঞ্জের সংসদ সদস্য হয়েও সুরঞ্জিত তার জন্ম এলাকায় জনসংযোগ অব্যাহত রাখেন। ফলে সুরঞ্জিত ২০০১ সাল থেকে ফের জয়ের ধারায় ফেরেন এবং আমৃত্যু ছিলেন ভোটে অপরাজিত সংসদ সদস্য।
হারজিতে ভোটের হার
আসনটির নির্বাচনি ফলাফল পর্যালোচনায় দলবদলে ব্যক্তি ইমেজের ঘাটতি ভোটে ভরাডুবির চিত্র পাওয়া যায়। ১৯৯৬ সালের ১২ জুনের নির্বাচনে সুরঞ্জিতকে হারিয়ে জাতীয় পার্টির প্রার্থী নাছির চৌধুরী ৫৯ হাজার ভোট পেয়ে বিজয়ী হয়েছিলেন। সুরঞ্জিত পেয়েছিলেন ৫৮ হাজার ৪৯৬ ভোট। দুজনের হারজিতে ভোটের হার ছিল মাত্র ৫ শতাংশ। নাছির পেয়েছিলেন ৪৮ দশমিক ৭ ভাগ। সুরঞ্জিত ৪৮ দশমিক ৩ শতাংশ। প্রতিদ্বন্দ্বী দুজনের মধ্যে বিএনপিদলীয় প্রার্থী জহির আহমেদ ভোট পেয়েছিলেন ১ হাজার ৮৮৬, জামায়াত প্রার্থী মো. আব্দুল মান্নান পেয়েছিলেন ১ হাজার ১০৪ ভোট।
২০০১ সালে বিজয়ী সুরঞ্জিত ৮২ হাজার ৮৩৯ ভোট পান। প্রাপ্ত ভোটের হার ছিল ৫৫ শতাংশ। নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির প্রার্থী নাছির চৌধুরী পেয়েছিলেন ৬৬ হাজার ৫৫৮ ভোট। প্রাপ্ত ভোটের হার ছিল ৪৪ দশমিক ২। ২০০৮ সালে বিজয়ী সুরঞ্জিতের প্রাপ্ত ভোট ছিল ৯৫ হাজার ৫৯৩ ভোট। প্রাপ্ত ভোটের হার ছিল ৫৫ দশমিক ১। নাছির ৭৭ হাজার ৮৮৯ ভোট পান। প্রাপ্ত ভোটের হার ছিল ৪৪ দশমিক ৯।
২০১৪ সালে বিনাভোটে জেতার পর সুরঞ্জিতের জীবনে আর কোনো নির্বাচন করার সুযোগ হয়নি। তবে তার মৃত্যুর পর ২০১৭ সালে উপনির্বাচনে দেখা গেছে, তার স্ত্রী জয়া সেনগুপ্ত ২০০৮ সালে বিজয়ী সুরঞ্জিতের জেতা অঙ্কের চেয়ে বেশি ভোট পান। ৯৫ হাজার ৯৫৯ ভোট পেয়েছিলেন জয়া সেনগুপ্ত। সর্বশেষ ২০২৪-এর ৭ জানুয়ারির নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী জয়া সেনগুপ্ত (কাঁচি প্রতীক) ৮০ হাজার ১৩৯ ভোট পেয়েছিলেন। নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী নৌকা প্রতীকের প্রার্থী আল আমিন চৌধুরী পেয়েছিলেন ৫৪ হাজার ৯৯৮ ভোট। দলীয় প্রার্থীর সঙ্গে স্বতন্ত্র প্রার্থীর ভোটের ব্যবধান ছিল ২৫ হাজার ১৪১ ভোট।
প্রবীণশক্তি নাছির-রুমি
জীবদ্দশায় সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের ভোটের প্রতিদ্বন্দ্বীখ্যাত রাজনীতিবিদ, বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য ও সাবেক সংসদ সদস্য নাছির উদ্দিন চৌধুরী। তিনি দীর্ঘ অসুস্থতা কাটিয়ে মাঠে নেমেছেন। গত ১০ সেপ্টেম্বর দিরাই ও ১৫ সেপ্টেম্বর শাল্লায় জনসভা করে আগামী নির্বাচনে বিএনপি থেকে তার মনোনয়নপ্রত্যাশার বিষয়টি জানান দেওয়া হয়েছে।
ভোটের মাঠে অপ্রতিদ্বন্দ্বী সুরঞ্জিতের সঙ্গে পাল্লা দেওয়া রাজনীতিবিদ নাছির চৌধুরী ছাত্রজীবনে সিলেটের এমসি কলেজ ও সুনামগঞ্জ সরকারি কলেজ ছাত্রসংসদের ভিপি ছিলেন। ১৯৮৫ ও ১৯৮৯ সালে দুইবার দিরাই উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদে নির্বাচিত হন। ১৯৯৬ সালের সপ্তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জাতীয় পার্টির হয়ে সুনামগঞ্জ-২ (দিরাই-শাল্লা) আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। পরে বিএনপিতে যোগ দেন। ভোটের রাজনীতিতে ‘ভাটির শার্দুল’ অভিহিত নাছির চৌধুরী মূলত দলবদলের কারণে ব্যক্তি ইমেজের ঘাটতিতে পড়েছিলেন। যদিও তিনি সুনামগঞ্জ জেলা বিএনপির আহ্বায়কের দায়িত্ব পালন করে এখন বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য পদে আছেন।
এদিকে, ব্যক্তি পরিচয়ে খ্যাতিমান অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি মিফতা উদ্দিন চৌধুরীর মাঠে নামায় বিএনপির রাজনীতিতে ফিরে এসেছে হারানো অতীত। প্রায় ২৮ বছর আগে নির্বাচনে ধানের শীর্ষ প্রতীকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন সাবেক বিচারপতি রুমি। পরবর্তী সময়ে সংসদ ভেঙে দেওয়ায় আর প্রার্থী হননি। তার অনুসারীরা বলছেন, এ অভিমান থেকে পরবর্তী সময়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীন নির্বাচনে প্রার্থী হননি। বিচারপতি থেকে অবসরের পর সুনামগঞ্জ জেলা বিএনপির সহসভাপতির দায়িত্ব পালন করা এই রাজনীতিবিদ ভোটের মাঠে নামায় ৯৬-এর ভোটের সমীকরণও সামনে এসেছে।
ভোট সচেতনরা বলছেন, ব্যক্তি ইমেজে ভোটে জয়ের ধারার সূচনা করেছিলেন সুরঞ্জিত। শেষটা দেখিয়েছেন তারই স্ত্রী জয়া সেনগুপ্ত। জুলাই-আগস্ট গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে জয়ার আত্মগোপনে থাকা ও কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ নির্বাচনের বাইরে থাকায় ব্যক্তিশক্তির নতুন উন্মেষের প্রকাশ দেখার অপেক্ষায় এখন ভাটির মানুষ।
নবীন শক্তি শিশির-অনিক
ভোটের মাঠ পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, ব্যক্তির অগ্রগামী হওয়ার মধ্যে তারণ্য শক্তিও উঁকি দিচ্ছে। যে দুই তরুণ রাজনীতিবিদকে ঘিরে তারুণ্য শক্তির উন্মেষ, তারা দুজনই কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের মুখ। একজন জামায়াতের ছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্রশিবিরের সাবেক কেন্দ্রীয় সেক্রেটারি। পেশায় তিনি সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের আইনজীবী শিশির মনির। অপরজন জুলাই-আগস্ট গণ-অভ্যুত্থানে প্রথম সারির সাবেক ছাত্রনেতা ও নতুন রাজনৈতিক দল এনসিপির কেন্দ্রীয় যুগ্ম আহ্বায়ক অনিক রায়। এই সূত্রে কেন্দ্র থেকে তৃণমূলে তার প্রভাব ক্রমে বিস্তৃত হচ্ছে।
শিশির মনির ব্যক্তিগত ইমেজে অগ্রসর হচ্ছেন। জনসংযোগে গ্রামে গ্রামে গিয়ে মানুষের নানাবিধ সমস্যার কথা শুনছেন, ব্যক্তিগতভাবে সমাধানেও ভূমিকা রাখছেন। ব্যক্তিগত অর্থায়নে তিনি বিভিন্ন গ্রামে মসজিদ, মন্দিরে নগদ অনুদান, গ্রামীণ রাস্তাঘাট নির্মাণ, খেলার মাঠ উন্নয়ন, প্রত্যন্ত এলাকার হাট-বাজারে সিসি ক্যামেরা স্থাপন, বিভিন্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে নিয়মিত শিক্ষাবৃত্তি চালু, নৌকা বাইচ প্রতিযোগিতা ও ফুটবল খেলাসহ নানা আয়োজনে ভোটারদের দৃষ্টি আকর্ষণ করছেন।
নতুন রাজনৈতিক দল এনসিপি থেকে এ আসনে লড়তে চান কেন্দ্রীয় যুগ্ম আহ্বায়ক পদে থাকা অনিক রায়। তার বাড়ি শাল্লায়। পড়াশোনা করেছেন বাংলাদেশ টেক্সটাইল বিশ্ববিদ্যালয় (বুটেক্স), বিএসসি ইন টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে। বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নের সাবেক কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক অনিক জুলাই-আগস্ট বিপ্লবে ছাত্র-জনতার আন্দোলনে রাজধানীর রাজনৈতিক কেন্দ্রস্থলে ছিলেন। আওয়ামী লীগ সরকার আমলে তার বিরুদ্ধে সাতটি মামলা রয়েছে। দুবার কারাগারে গেছেন, ১০ বারের বেশি হামলার শিকার হয়েছেন।
এনসিপি থেকে ঘোষণা এলেই অনিক রায়কে নিয়ে মাঠের প্রচার শুরু হবে বলে জানিয়েছেন সংগঠনটির সুনামগঞ্জ জেলার প্রধান সমন্বয়ক দেওয়ান সাজাউর রাজা চৌধুরী সুমন। গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে এনসিপির নেতৃত্ব নিয়ে রাজনীতিতে সক্রিয় তরুণ এই রাজনীতিবিদও জানিয়েছেন ভাটির রাজনীতির ভিন্নতার কথা। তিনি খবরের কাগজকে বলেন, ‘ভাটির রাজনীতিতে ব্যক্তিগত ইমেজ একটি ফ্যাক্টর। দলের চেয়ে ব্যক্তি ইমেজ ভোটে মুখ্য ভূমিকা পালন করে। ব্যক্তিকে তুলে ধরতে সেখানকার রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে নানা কথারও প্রচলন ঘটে। এর মধ্যে একটি হচ্ছে, যদি রাজনীতি দেখতে যাও, দিরাই-শাল্লায় যাও।’
এ কথার বাস্তবতায় গণ-অভ্যুত্থানের কেন্দ্রস্থলে ভূমিকা রাখা সুনামগঞ্জের একমাত্র সন্তান হিসেবে ভাটি এলাকায় অনিক রায়কে নিয়ে দেখার মতো কিছু একটা করে শিগগিরই মাঠে নামা হবে জানিয়েছেন এনসিপি নেতা দেওয়ান সাজাউর রাজা চৌধুরী।
জনতার আওয়াজ/আ আ